গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: ছয়



কামানো হয়নি আজ, গতকালও বোধ হয় নয়, বোধ হয় বেশ কিছুদিন। চোয়ালে খোঁচা, হাত দিলে খসখসে, এসব তোমার ভাবনার বিষয় নয়, শরীরের বিষয়, আর শরীরের আপত্তি নেই মনে হয়। তুমি যা দাও আর যা দাও না, দুটোই সমান করে নেয়, চুপচাপ, অভিযোগ না করে, সেই মান-অভিমান ছাড়া, যা মানুষের সঙ্গে লাগে।

শরীরের বুদ্ধি, গাছের বুদ্ধি, শেকড়ের বুদ্ধি, মাটির নিচের বুদ্ধি। আলোর দিকে বাড়ে, আলো কী, জানে না, জানার দরকারও বোধ করে না, শুধু বাড়ে, শুধু টিকে থাকে।

আর এটাই সেই জিনিস, যার নাম দাওনি এখনও, থামা যা দেখিয়ে দিয়েছে। শরীর তোমায় ক্ষমা করে, রোজ সকালে, এমনিই। ক্ষমা চাওনি, তবু পেয়ে গেছ। শরীর দরাজ, মনের চেয়ে বেশি, যাকে অবহেলা করেছ, সে-ই বাঁচাচ্ছে।

যে-শরীরকে গোনোনি, বাগানের মতো, জল দাওনি, আগাছা ছাড়োনি, তবু ফুল ফোটে। ভুলেই ছিলে যে, আছে, ধন্যবাদ দেবার কথা মনেও করোনি, সেই শরীর তোমার জন্য ওঠে প্রতিদিন, বাটি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যায়, জল গরম করে, কাপ ধরে কাঁপা হাতে হলেও, ঠোঁটে তোলে, নামিয়ে রাখে।

তোমার জন্য, যে-তুমি তার জন্য কিছু করোনি, কিছুই নয়, চেনাওনি, বসে আছ তার মধ্যে, যেমন বসে থাকো এমন ঘরে, যা তোমার নিজের, কোনো ধন্যবাদ ছাড়া, এই বোধটুকুও নেই যে, ঘর তোমাকে ধরে আছে, তুমি নিজেও জানো না কতটা।

আর শরীর চালিয়ে যাচ্ছে, বয়ে নিয়ে চলেছে, ধন্যবাদ না পেয়েও। শরীরের তো ধন্যবাদ লাগে না, আশ্চর্যের ব্যাপার, যদি আশ্চর্য হবার শক্তি থাকত এখনও, চালিয়ে যাবে, দেখভাল করবে, চেনা ছাড়া, দেখাও না পেয়ে ছায়ার মতো, কাপ যেমন ধরে রাখে ধন্যবাদ ছাড়া।

শরীর ক্ষমা করে কথায় নয়, শুধু চালিয়ে যায়, যে দেখেও না তাকে, যে ধন্যবাদও দেয় না তাকে, যে হাত ফিরিয়ে নিয়েছে, তার দিকেও।

শরীরই প্রথম জিনিস, জন্মের আগে থেকে সঙ্গে, সবচেয়ে পুরোনো সঙ্গী। কাপের চেয়ে বিশ্বস্ত, কারণ কাপ নামিয়ে রাখা যায়, চেয়ারের চেয়ে কাছের, কারণ চেয়ার ছেড়ে ওঠা যায়, শরীর নামানোর জায়গা নেই। কোথায় রাখবে ওকে?

শরীর বইছে তোমাকে, চাও বা না চাও। আর এই বওয়াটা, দেখতে পেলে, ধরে রাখার সবচেয়ে খাঁটি রূপ, জিনিসগুলো যা শিখিয়েছে, না চেয়ে ধরে রাখা, অনুগ্রহ, যে দিয়ে যায়, যে নেওয়া বন্ধ করেছে, তাকেও। সাধারণ নিয়মে। চালিয়ে যাবার সাধারণ নিয়মে।

ঘরে ফিরে এসেছ, কেটলি ছোটো ঘরের কল থেকে ভরে এনেছ টেবিলে, প্লাগ দিয়েছ। তারটা একটু ন্যাড়া জায়গায় জায়গায়। ধরো, প্লাগ আছে, বিদ্যুৎ আছে, আছে, শহরে এখনও বিদ্যুৎ আছে, কোনোরকমে জল আছে, চালিয়ে যেতে যতটুকু লাগে, তা আছে, তোমার যেমন, শহরেরও তেমন, একই রকম সরু, একসঙ্গে কোনোরকমে চলছ দু-জনে।

কেটলি গরম হচ্ছে, শুনতে পাচ্ছ। সেই চাপা গুনগুন পেটের ভেতর থেকে, ধীরে ধীরে বাড়ছে, এখনও চিন্তা হয়ে ওঠেনি, এমন চিন্তা। গর্ভের শিশুর মতো, তলার নিচে। ধোঁয়া উঠছে ঢাকনার ফাঁক দিয়ে, সাদা, পাতলা, লোহার গন্ধ মেশানো, ছাদের দিকে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে, জমা হচ্ছে, জোর ধরছে।

গুনগুন বাড়ে, ভেতরের জল তাপ পেলে যা করে, তা-ই করছে। নড়ছে, ছটফট করছে, বুদবুদ উঠছে, একরকম জীবন্ত হয়ে উঠছে, ঘরে একমাত্র প্রাণ তোমার ছাড়া, তোমারটাকে প্রাণ বলা যায় কি না, ধরো, যায় না, এর চেয়ে কম কিছু, প্রাণের পাশে ছায়ার মতো থাকা কিছু, একই বাতাস একই সময় ভাগ করে, কিন্তু একই জাতের নয়।

জল ফুটলে বুদবুদে বুদবুদে বেঁচে ওঠে, তুমি ওঠো না, তোমার ফোটার দিন গেছে অনেক আগে। বসে থাকো, ফোটার জন্য অপেক্ষা করো, যা আসবে, তা-ই আসবে, তোমার হাত দেবার দরকার নেই।

ফোটাটা জলের কাজ, বিদ্যুতের কাজ, তোমার কাজ শুধু অপেক্ষা। পৃথিবীতে তোমার বাকি একটাই। জলের জন্য, আলো বদলানোর জন্য, গাঙচিলের জন্য, ঘণ্টার জন্য, স্বপ্নের জন্য, জাগার জন্য, অপেক্ষা এটাই করো এটুকুই, এটুকুও তো কম না, আর এটুকুই যথেষ্ট।

অপেক্ষাও তো চালিয়ে যাবারই রূপ, সবচেয়ে চুপচাপ রূপ, সবচেয়ে কম যা লাগে, তা দিয়ে, তবু রূপ, তবু চলছে, তবু শ্বাস নিচ্ছে।

আর লক্ষ করতে শুরু করেছ, অপেক্ষাটা ফাঁকা নয়। শুরুর দিকে মনে হতো থামা, যখন তাজা ছিল, মনে হতো, অপেক্ষা হলো করার না-থাকা, কাজ চলে যাবার পর যে ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে, সেটা, কিন্তু তা নয়। অপেক্ষার নিজের একটা ঘনত্ব আছে, হাতে ধরলে টের পাওয়া যায়।

ধূসরের মতো। ধূসরকেও মনে হয়েছিল, রং নেই, পরে দেখা গেল, নিজেই একটা রং, অপেক্ষাও নিজেই একটা জিনিস, করার অভাব নয়, দুই করার মাঝের ফাঁক নয়, নিজেই কিছু-একটা, নিজের গড়ন আছে, ভার আছে, চরিত্র আছে, তিতকুটে চায়ের মতো নয়।

এর মধ্যে বসে আছ, ধূসরের মধ্যে যেমন, আর অপেক্ষা তোমাকে ধরে আছে, ধূসর যেমন ধরে, ঘর যেমন ধরে, না চেয়ে, চাওয়া যে করো, তা ছাড়া।

জল ফুটল, জল ফুটল, কেটলি ক্লিক করে থামল। ঢালো; ধোঁয়া ওঠে, মুখে এসে লাগে, গরম, ভেজা। জল কাপে, বয়াম থেকে গুঁড়ো, নাড়ো চামচ দিয়ে, ধরো চামচ, একটাই, বাঁট পাতলা হয়ে গেছে আঙুলের ঘষায়, তোমার আঙুলের আকৃতি বসে গেছে ধাতুতে। বছরে বছরে।

ধাতু তোমাকে মনে রাখবে তুমি চলে গেলেও, কাপে বহুবার গেছে, কাপকে চেনে, যেমন কাপ টেবিলকে চেনে, যেমন টেবিল ঘরকে চেনে, যেমন তোমার হাত চামচের বাঁটকে চেনে, যেমন ঘর তোমাকে চেনে।

সবাই চেনে একে অন্যকে, জিনিসপত্র যেভাবে চেনে কথা ছাড়া, ভাবনা ছাড়া, কাছাকাছি থেকে থেকে, গায়ে গায়ে লেগে থেকে, বার বার একই কাজ করতে করতে।

ধীরে ধীরে চেনা জমে ওঠে। যা ভালোবাসা নয়, বন্ধুত্ব নয়। যার কোনো নাম নেই, নামের দরকারও নেই, শুধু চেনা, কাছে থাকা, একই জায়গা ভাগ করা বছরের পর বছর। একই ধুলো, একই আলো, একই নীরবতা। জিনিসপত্র একে অন্যের জন্য এটুকুই করতে পারে, আর এটুকুই যথেষ্ট।

৪।

চেয়ারে বসে আছ, জানালার ধারে, হাতে কাপ। চা বলো; চা তো নয় আসলে, চা বলে চালানো হয়, ধোঁয়া উঠছিল একটু আগে, এখন আর নেই, ধোঁয়া বেরিয়ে গেলে চা-ও শেষ। জীবনটুকু ওইটুকুতেই ছিল, ধোঁয়া ফুরোনোই ঘরের ঘড়ি, একমাত্র ঘড়ি।

খাও বা না খাও, কাপ মুখের কাছে আসে, ঠোঁট ছোঁয়, তরল নামে। গলা জানে, কী করতে হয়, একটু গরম নামে বুকের দিকে।

তার নিচে? ভেতরের কারবার, তোমার জানার বাইরে, জানার দরকারই-বা কী? একটা কারখানা চলছে ভেতরে একাই, কেউ দেখছে না, কেউ চালাচ্ছে না, ফোরম্যান নেই, ম্যানেজার নেই, বোর্ড-টোর্ড কিছু নেই, যন্ত্র ঘুরছে অন্ধকারে গুমগুম করে, যন্ত্রের যা কাজ।

উদ্দেশ্য? না, উদ্দেশ্য বলো না ওটাকে, চলা বলো। শরীর চালায়, তুমি চালাও না, তুমি তো বসে আছ শুধু, ওপরতলায়, নিচে কী হচ্ছে, খবর নেই।

এখান থেকে দেখলে, সমুদ্র, এই বেলায়, নীল নয়, সবুজ নয়, কিছুই নয়, একটা ধূসর, যা রংই নয়, রঙের না-থাকা। সন্ধ্যা যেমন দিনও নয়, রাতও নয়, সেই মাঝের ঘণ্টা, যখন জিনিস নিজেদের নাম ভুলে যায়। চা খেতে বসো। কাপ আছে, চা আছে, তৃষ্ণা নেই। যাকে কী বলবে, ঠিক করতে পারো না। সত্যিকারের জিনিসকে কোনোদিন নাম দেওয়া যায়নি।

পিউটার? ছাই? সীসা? বলো কিছু-না, সেটাই ঠিক। সমুদ্রের রং কিছু-না-র রং, কারণ সমুদ্র নিজেই তো কিছু-না। বিশাল, চ্যাপ্টা, যেদিকে তাকাও, শুধু ও-ই। নড়ছে, কোথাও যাচ্ছে না, ফিরে আসছে, কোথাও যায়নি তো। একই জায়গায় এই নড়া, এই খাটুনি, কীসের জন্য? ঘরই তো নমুনা।

কিন্তু সমুদ্রে একটা জিনিস আছে, ঘরে নেই। দিগন্ত, সরু কাঁপা রেখা। ওপারে কী? আরও সমুদ্র বোধ হয়, বা অন্যকিছু, বা একদম কিছুই নয়, দেখতে পাও না, সেটাই দিগন্ত, না-দেখা, একটা সীমা, এর পর আর তাকিয়ে লাভ নেই বলে।

চোখ যেতে পারে না ওপারে, মন পারে। মন তো সবসময়ই পারে। ক্ষুধার্ত মন, কল্পনা করতে পারে, অনুমান, ধরে নেওয়া, আবিষ্কার, মন এসবে বড়ো পাকা, বেশিই পাকা, এটাই তো তোমার সর্বনাশ হলো। মন চলত, সবসময়, প্রতিটি দিগন্তের ওপারে, প্রতিটি অন্ধকারে ঢুকে পড়ত, না থেমে, রাতেও নয়, স্বপ্নেও নয়, কল্পনা করতে করতে অনুমান করতে করতে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটত, যতদিন না তুমি থামলে।

মন অবশ্য প্রথমে চলল, হাত ছেড়ে দিলে চাকা যেমন ঘোরে। ঘুরল, ধীর হলো, টলমল, কাঁপুনি, যেন শেষ নিঃশ্বাস ফেলছে, তারপর, স্থির। প্রায় স্থির বলো। মাঝে মাঝে একটু কাঁপন, ফাঁকা গাড়ির ইঞ্জিন যেমন রাতের পার্কিংয়ে চলতে থাকে, কোথাও যাবার নেই, শুধু গুমগুম, চলছে।

গাঙচিল। জানালায় আসে মাঝে মাঝে। ডাকে, তীক্ষ্ণ, কানে আটকে যায়, ঘুমের মধ্যেও শুনতে পাও।

কিন্তু ওটা ডাক নয় তো, মানুষের কাছে মানে নেই। কষ্ট নয়, আনন্দ নয়, রাগ নয়, ডাক শুধু, যেমন বাতাস বয়, কারণ ছাড়া, ভালোবাসা তো একদমই নয়, তোমার শব্দভাণ্ডারে ওটার কোনো নাম নেই, সেই শব্দভাণ্ডার। কী বলব, শুকনো ন্যাকড়ার মতো কুঁচকে আসছে দিনে দিনে।

একসময় ভাণ্ডার ছিল, জিনিসের নাম দিত, আলাদা করত, ভাগ করত। সেটা যাচ্ছে, বাকি সবের মতো। ইচ্ছে গেছে, চাওয়া গেছে, পরোয়া গেছে, শব্দও যাচ্ছে। একসঙ্গে নয়, একটা একটা করে, অতিথি যেমন বিদায় নেয়।

কঠিন শব্দ আগে গেল। ন্যায়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অগ্রগতি, মানে। হাওয়ায় উড়ে গেল, শেকড় ছিল না কোনোদিন, আসল কোনোকিছুতে লেগে ছিল না তো। তারপর সামাজিক শব্দ; দয়া করে, ধন্যবাদ, কেমন আছ; বলার কেউ নেই, চারদেয়ালকে বলে কী হবে। তারপর বর্ণনার শব্দ; সুন্দর, কুৎসিত, ভালো, মন্দ; রং যখন একটাই, তখন সুন্দর কোথায়, কুৎসিত কোথায়, এরাও গেল।

এখন যা আছে, নাম-শব্দ। ঘর। চেয়ার। কাপ। সমুদ্র। ধূসর। গাঙচিল। এরা আছে, আপাতত, কিন্তু পাতলা হয়ে আসছে এরাও, আঁকড়ানোর জোর কমছে।

ঘর কম ঘর হচ্ছে, বেশি করে শুধু যেখানে-আছ-সেটা, কাপ কম কাপ, বেশি করে শুধু যেটায়-চা-থাকে। নাম আলাদা হয়ে যাচ্ছে জিনিস থেকে, আলতো করে, যেন সুতো কেটে গেছে, ভেসে যাচ্ছে, গাঙচিল যেমন মাটি ছেড়ে ভাসে, তুমি যেমন ভেসে গেছ যে-জীবনটা ছিল, তা থেকে।

ভাসছ। ধূসরে। শব্দ আর জিনিসের মাঝে। জিনিস আর জিনিসের নামের মাঝখানে, যেখানে কিছু নেই, কিন্তু তুমি তো সেখানেই।

কেটলি। তাকিয়ে আছ ওটার দিকে। টেবিলে, আর কেটলি শব্দটা আসে, বা আসে না ঠিক, আসে কিন্তু মেলে না কেমন যেন। কেটলি শব্দ, আর টেবিলে যে-জিনিসটায় জল ভরো, প্লাগ দাও, যেটা ফোটে, দুটো আলাদা হয়ে যাচ্ছে। শব্দ এদিকে, জিনিস ওদিকে, জোড়া মোজা যেমন হারায় ড্রয়ারে, টের পাচ্ছ।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *