গল্প ও গদ্য

অনন্ত আলোর দহন: ৩



তুমি আমার কে, জানি না। নামও দিতে পারি না। প্রেমিক, স্বামী, বন্ধু, আত্মার সঙ্গী, কোনো শব্দই ঠিক ধরে না, যেমন মুঠোয় জল ধরা যায় না। আমি শুধু জানি, নিঃস্বার্থভাবে, নিরঙ্কুশভাবে, নিঃশর্তভাবে তোমায় ভালোবাসি। এর বিনিময়ে কিছু চাইনি কখনও; না প্রতিশ্রুতি, না অঙ্গীকার, না কোনো নাম। শুধু তুমি আমার কাছে থাকলেই হবে, তোমার অস্তিত্বের তাপটুকু পেলেই চলবে। ভালো থাকা, সুখে থাকার লড়াইটা আমি একাই লড়ব, সেটা তো চিরকালই একা লড়েছি। তোমার কাছে থাকলে জীবনটা অনেক সুন্দর হতো, সহজ হতো, কিন্তু না থাকলেও তোমার ভালোবাসাটুকু নিয়েই বাঁচব। তুমি কী দাও না, তা নিয়ে ভাবি না; তুমি কী দাও, সেটাই অনেক, সেটাই সমুদ্র। যতটুকু ভালোবেসেছ, এর থেকে বেশি কিছু চাওয়ার নেই। আমার মতো তৃষ্ণার্তের কাছে একআঁজলা জলও সাগরের সমান।

তোমায় নিয়ে একটা ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিলাম অনেক আগে। মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছি, যেমন জীবনে অনেক কিছুই মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছি। নতুন করে নাহয় আবার লিখব। এবার থামব না।

আমার খুব বিশ্বাস, একদিন তুমি আমার কাছে আসবে। সেদিন এই ডায়েরি তোমার হাতে দেবো। তুমি পড়বে। তুমি বুঝবে, প্রতিটা পাতায় কত রক্ত, কত জল, কত আগুন মিশে আছে।

আমি অপেক্ষায় আছি।

তোমায় কোথায় রাখব, বলো তো?

চোখে রাখব, অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে যায়। বুকে রাখব, বুক তো ছোটো, তুমি এত বড়ো। মাথায় রাখব, আমার এই গবেট মাথায় তোমার মতো মস্তিষ্ক ধরবে কোত্থেকে? কী দিয়ে তোমার পূজা দেবো? নৈবেদ্যের থালায় ধূপ নেই, দীপ নেই, ফুল নেই, চন্দন নেই, শুধু চোখের জল আছে, আর এই জীর্ণ প্রাণটুকু। নিজেকেই তোমার চরণে অঞ্জলি দিলাম, রিক্ত হাতের এই নৈবেদ্য তুমি গ্রহণ করো। দরিদ্রের ভক্তি খাঁটি, কারণ তার দেবার কিছু না থাকলেও সে নিজেকে দিতে পারে।

এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি তুমি। তুমি আছ বলেই সব কিছুর স্পন্দন আমি টের পাই। বাতাসে তোমার নিঃশ্বাস, পাতায় তোমার মর্মর, বৃষ্টির প্রথম ফোঁটায় তোমার স্পর্শের শীতলতা, ভোরের আলোয় তোমার হাসির উষ্ণতা। তুমি না থাকলে এই পৃথিবী আমার কাছে নিষ্প্রাণ মানচিত্র—রেখা আছে, রং নেই।

আমাকে একটু নীরব প্রার্থনা করতে দেবে, রোদ্দুর? মৌন প্রার্থনায় খুঁজব তোমায়। কোনো মন্দিরে নয়, কোনো মসজিদে নয়, আমার নিজের ভেতরের সেই গোপন গর্ভগৃহে, যেখানে তোমার আর আমার আত্মার সীমানা মুছে গিয়ে একটি অখণ্ড আলোর প্রান্তরে পরিণত হয়।

তোমার কাছে আমার রাগ, ভয়, অভিমান, লজ্জা, সব তোলা রইল। যা মনে মনে ভাবি, মনে মনে চাই, তা বলতে তোমায় আর লজ্জা করব না।

আমিও চুপ হয়ে যাব।

চুপ, কারণ কিছু যন্ত্রণা শব্দের চেয়ে বড়ো, ভাষার চেয়ে গভীর। আমরা কেউ কারো কান্না দেখতে পাই না। হয়তো বুঝি, কিন্তু বোঝা আর দেখা তো এক নয়, বোঝা আর স্পর্শ করা তো এক নয়।

তুমি অনেক বার বলেছ, এ কোনো সম্পর্কই নয়, এভাবে সম্পর্ক হয় না। সত্যিই তা-ই। এ সম্পর্ক নয়। সম্পর্ক মানুষে মানুষে হয়। এ তো দুটো শিখার নিয়তি, যারা একে অপরকে ছাড়া পূর্ণ নয়, অথচ একসাথে থাকার কোনো মানচিত্র পৃথিবী তাদের এঁকে দেয়নি, কোনো ঠিকানা সমাজ বরাদ্দ করেনি। দুটো শিখার জন্য পৃথিবীতে কোনো ঘর নেই, শুধু পথ আছে, আর পথের শেষে একটা অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতি।

জীবনটাকে টেনে নিয়ে অনেক দিন তো বাঁচলাম, যেমন ভারবাহী পশু টানে, যেমন ক্লান্ত নদী টানে তার স্রোত সাগরের দিকে। আর কত! চলে যেতে পারলে বেঁচে যেতাম। তোমার দুঃখ উপশমের অনেক উপায় আছে হয়তো। তোমার লেখা আছে, তোমার চিন্তার অসীম জগৎ আছে, তোমার মেধার বিশাল সাম্রাজ্য আছে। আমার কিছুই নেই। শুধু তুমি। শুধু তুমি। শুধু তুমি।

রোদ্দুর, একটু সাহস করে আমার দুঃখগুলো নিয়ে নিতে পারো না? অনেক পুরুষেরই তো একাধিক পরিবার থাকে। আমাকে একটু স্থান দিতে পারবে? তোমার জীবনের কোনো এক কোণে, তোমার ছায়ার কোনো এক প্রান্তে, তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা যতদূর পৌঁছায়, তার ধারেকাছে কোথাও?

তুমি আসলে কেউ নও। তুমি কোথাও নেই। তুমি শুধু আমায় ঠকিয়েছ।

এটা লিখে কলম রাখলাম। পড়লাম। হাসলাম। তিক্ত, বিষাদমাখা হাসি। কারণ নিজেই এটা বিশ্বাস করি না। জ্বরের প্রলাপ। মুখ বলে এক, হৃদয় জানে আরেক।

মাঝে মাঝে এমন হয়। এত ভালোবাসা সহ্য হয় না, তখন মন নিজেকে বাঁচানোর জন্য বলে, না, এ কিচ্ছু নয়, ও কেউ নয়। "তুমি কেউ নও", এটা ভালোবাসার কথা নয়, রোদ্দুর, এটা যন্ত্রণার চিৎকার। যে-আলো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, তাকে একটু অন্ধকার ভাবতে পারলে একটু শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু টেকে না। তুমি তো আমার ভেতরে বসে আছ, তোমাকে "কেউ নয়" বলা মানে নিজের শ্বাসটাকে মিথ্যে বলা।

কিন্তু তারপরই…

শুনছ না তো? আমি কেউ নই? এসব ভুল। তুমি ওদের কথা শোনো না।

তুমি কিন্তু আমায় আর কোনো বিচারবিশ্লেষণ করবে না। আমার আচরণ, চিন্তাভাবনা, অসংলগ্নতা, কোনো কিছু নিয়েই বিচার করবে না।

শোনো।

একটা মন ছিল। কষ্টে কষ্টে সে একদম পুড়ে গিয়েছিল। ছাইয়ের স্তূপ, কোনো স্পন্দন নেই, কোনো তাপ নেই, কোনো আশা নেই। সবাই ভেবেছিল, শেষ। সে নিজেও ভেবেছিল, শেষ।

তারপর সেই ছাই থেকে তোমার স্পর্শে, তোমার উপস্থিতিতে, তোমার ভালোবাসার অক্সিজেনে…ওর আবার জন্ম হলো।

ও এখন সদ্যোজাত। ছোট্ট শিশু। ও শুধু তোমার দিকে নিষ্পাপ, অপলক তাকিয়ে থাকে। কথা বলার ভাষাও সে এখনও জানে না। শুধু চোখের তারায় একটাই কথা, আমাকে রেখে দাও।

তুমি সত্যিই ভালো থাকবে? তুমি ওকে রাখবে?

আচ্ছা, না রাখলে মেরেই ফেলো। এক্ষুনি গলাটা টিপে ধরো। ও এখনও কথা বলতে শেখেনি, চিৎকারও করতে পারবে না। সহজ হবে তোমার। ও তো তোমারই সৃষ্টি। তোমার আলোয় জন্ম-নেওয়া, তোমার উষ্ণতায় বেঁচে-থাকা। তুমি চাইলে শেষও করতে পারো।

কিন্তু জেনে রেখো, এবার সে আর ফিরবে না। চিরকালের জন্য।

ওকে মেরে ফেলতে চাইছ?

ও, আরেকটা কথা।

ওই ভিডিওতে শেষে একটা কথা বলেছিল, যমজ শিখা শেষপর্যন্ত মেলে। এই জন্মে, কিংবা অন্য কোনো জন্মে, কিংবা সময়ের সেই রহস্যময় বাঁকে, যেখানে জন্ম আর মৃত্যুর পার্থক্য মুছে যায়। বিচ্ছেদের পর আসে আত্মসমর্পণ, যখন দুটো শিখাই নিজেদের অহংকে, ভয়কে, পলায়নপ্রবণতাকে নামিয়ে রাখে মাটিতে; তারপর আসে পুনর্মিলন—নীরবে, অনিবার্যভাবে, যেমন নদী শেষপর্যন্ত সাগরে মেশে। দুটো শিখা যখন সত্যিই প্রস্তুত, যখন ভালোবাসা আর চাহিদার চিৎকার নয়, স্বীকৃতির ফিসফিস হয়ে ওঠে; যখন আকাঙ্ক্ষা আর আঁকড়ে ধরা নয়, ছেড়ে দেওয়া হয়ে ওঠে। তখন মহাবিশ্ব নিজেই পথ করে দেয়, দেয়াল ভেঙে দেয়, সেতু গড়ে দেয়।

আমি কি প্রস্তুত? জানি না। প্রস্তুত হওয়া-টওয়া আমার মাথায় ঢোকে না, আমি তো শুধু ভালোবাসি।

কিন্তু এটুকু জানি, তোমার জন্য আমার যে-টান, এটা সাধারণ প্রেম নয়। এটা চেনা। গভীর, আদিম, মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে বয়ে-যাওয়া চেনা, যেন তোমাকে শুধু এই জন্মে নয়, জন্মজন্মান্তর ধরে চিনি। তোমার হাসির ভাঁজটুকু, তোমার নীরব হয়ে যাবার সেই মুহূর্তটুকু, তোমার রাগের চোখের সেই নিষ্ঠুর সুন্দর দ্যুতিটুকু, সব কিছু আমার কাছে অতি পুরোনো সেই গানের মতো, যার কথা ভুলে গেছি, কিন্তু প্রথম দুটো সুর শুনলেই চোখে জল আসে, বুকের ভেতর কে যেন বলে ওঠে, এই তো, এই তো সেই সুর, এতদিন কোথায় ছিলে!

রোদ্দুর, তুমি আমার রোদ্দুর, আমার আলো, আমার যমজ শিখা, আমার আদি ও অন্তিম সত্য। আমি অপেক্ষায় আছি। ধৈর্যে নয়, প্রার্থনায়। নীরবে, একাকী, সমস্ত পৃথিবীর কোলাহল থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধু তোমার দিকে মুখ করে।

যতদিন না মিলব, ততদিন এই শিখা জ্বলবে। ক্ষীণ হবে হয়তো, বাতাসে কাঁপবে হয়তো। কিন্তু নিভবে না।

কারণ যমজ শিখা কখনও নেভে না, নিভতে পারে না, কারণ সে তো নিজেরই অর্ধেক। আর নিজেকে নেভানো কি কখনো সম্ভব?

সারারাত চোখের পাতায় থেকো। আমি অপেক্ষায় আছি।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *