এক। তোমাকে এতটুকু রাগ করতে দেখলে ভয় লাগে না—বরং বেশ স্বস্তি হয়। রাগ তো সে-ই করে, যে ভালোবাসে। অভিমানে তো সে-ই বাঁধে, যার কাছে আমি গুরুত্ব রাখি। তুমি প্রকাশ করেছ—ভালোই করেছ। মানুষ তার সবচেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষোভটুকু কেবল সেই মানুষটির সামনেই উন্মুক্ত করে, যাকে সে নিজের মনে করে।
জানো, এই পুরো পৃথিবীতে যদি কারও আমার ওপর জোর খাটানোর অধিকার থাকে—সে কেবল তুমি। আর কারও কোনো কথা, কোনো মতামত, কোনো অনুযোগ আমি মানি না—কোনোদিন মানব না। আমি শুধু এই একটি মানুষের সব কিছু আজীবন মাথা পেতে মেনে নেব।
শুধু একটাই অনুরোধ—আমাকে কখনও ভুল বুঝো না।
আমি আসলেই একটু গাধা ধরনের মেয়ে। ভাবনায় ধীর, বোধে দেরি হয়, ভালোবাসা প্রকাশে আড়ষ্ট। কিন্তু যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, সে আমার কারণে কষ্ট পাচ্ছে—এই ভাবনাটুকুই আমাকে ভেতর থেকে খুন করে দেয়। অপরাধবোধে মরে যেতে ইচ্ছে করে—বেঁচে থেকে কী হবে, যদি নিজের মানুষটিকেই কষ্ট দিই?
আমি জানি, তুমি কতটা সতর্কভাবে সব কিছু সামলাও—যেন আমি কখনও কষ্ট না পাই। তুমি শব্দ বাছো, সময় বোঝো, নীরবতার ভাষা জানো। এসব আমি বুঝি। আমিও তো ঠিক তেমনই করি—তুমি যেন কষ্ট না পাও, সেই চেষ্টায় প্রতিটি মুহূর্ত মেপে মেপে চলি।
কিন্তু গাধা তো—ভুল হয়ে যায়। মাফ করে দিয়ো।
দুই। এই পৃথিবীর কারও কাছে আর কোনোদিন মাথা নত করব না।
যে-মানুষগুলোকে সুখে-শান্তিতে রাখতে দিনের পর দিন নিজে সব কষ্ট সয়ে গেছি—কাউকে কখনও বুঝতেও দিইনি, কষ্ট কী—সেই মানুষগুলোই দিনশেষে অপমান করছে, অবহেলা করছে। আজ থেকে ওদের জন্য আর একবিন্দুও নিজেকে শেষ করব না। নিজেকে নিজে সম্মান করব। যারা রোজ অপমান করতে আসবে, তাদের জীবন থেকেই মুছে দেবো। এ আমার নিজের সঙ্গে নিজের ওয়াদা।
এমন কাউকেই আর এতটুকুও ভালোবাসব না, যে আমাকে ভালোবাসা তো দূরস্থ, নিজের তালিকাতেই রাখেনি। জীবন অনেক ছোটো—কারও জন্য আর নিজেকে কষ্ট দেব না।
চাইলেই চলে যেতে পারি।
কিন্তু আব্বু-আম্মুর শরীরের যা অবস্থা—সন্তান হয়ে তাঁদের পথে ফেলে একা করে চলে গেলে স্রষ্টা নারাজ হবেন। তাঁদের অনেক বয়স হয়েছে। বিশেষ করে আব্বু—স্ট্রোকের পর থেকে অনেক দুর্বল। ভাইয়া দেশের বাইরে, আপু চাকরি করে—আব্বু-আম্মুকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কিংবা দেখাশোনা করার মতো অবস্থায় কেউ নেই। দুলাভাইয়ের মানসিকতাও এমন নয় যে, হুটহাট অসুস্থ হলে চিকিৎসার দায়িত্বটুকু নেবেন। আব্বু-আম্মুর যাবতীয় খরচ কোনো সন্তানকেই বহন করতে হবে না—সেই ব্যবস্থা তাঁরা নিজেরাই করে রেখেছেন। শুধু পাশে থাকতে হবে।
ঠিক এই মুহূর্তে তাঁদের এভাবে ফেলে চলে যাওয়া মানে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া—বিয়ের পর এটা আরও স্পষ্ট বুঝেছি। বাবা-মা তো—তাঁদের উপেক্ষা করলে এ জীবনে দুঃখ নেমে আসবেই।
ভাইয়া যদি দু-এক বছরের মধ্যে দেশে ফেরে, তাহলে হয়তো যেতে পারতাম। কিন্তু কবে আসবে, এলেও থাকবে কি না—কিছুই নিশ্চিত নয়। তাছাড়া যার যার দায়িত্ব তার তার। সন্তান হিসেবে আমার যেটুকু কর্তব্য, সেটুকুই পালন করব।
আমি আসলে জানি না, ঠিক করছি কি না। ওই যে বললাম—আমার জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই। এই পৃথিবীতে আমি উদ্বাস্তু।
হয়তো সবসময় ঠিক কাজটা বুঝি না। জীবনে অনেক বেশি উচ্চাশা নেই—তবু আব্বু-আম্মুকে কষ্ট দেবো না, নিজের কাছে এটাই প্রতিজ্ঞা। স্রষ্টা যদি কোনোদিন ভালো কিছু রাখেন কপালে—তাহলে ভালো। আর যদি সারাজীবন এমনই কষ্ট করতে হয়—আফসোস থাকবে না।
আমি পৃথিবীতে কাউকেই খুশি করতে পারলাম না। যেদিকেই যাই—শুধু দোষ, আর অভিযোগ।
তিন। কত কিছুই আছে আমাদের, তবুও মানুষ ভালোবাসা নামক এক অদৃশ্য সুখের জন্য কী নিদারুণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে!
অবশ্য, অনুভূতিটা ভীষণ জোরালো, ভেতরটায় কেউ একজন নড়েচড়ে বসে—হৃৎপিণ্ডটাকে আঁকড়ে ধরে রক্তাক্ত করে, এরপর ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দেয়। আরাম লাগে।
কিছু যন্ত্রণাও নাকি সুখের হয়? হা হা হা...!
চার। 'শেষ' মানে নতুন কোনো অধ্যায়ের শুরু, আমার পুরোনো মানুষটাকে সঙ্গে নিয়ে—অনেক পুরোনো একটা ঘ্রাণ, খুব পরিচিত অতৃপ্ত সুখ। আমাদের দেখা হয় রোজ, স্পর্শ করি সেই মুখ।
জানি...এখনও ভালোবাসি তোকে খুউব।
আমি অনেক সাহসী, জানিস। তুই দেখিস...আমি তোকে এত বেশি ভালোবাসব, তুই কল্পনাও করতে পারবি না। You deserve more...
একটা কথা বলি তোকে...তুই যখন সকালে ফোন করেছিলি, আমার হার্টবিট এত বেড়ে গিয়েছিল যে, বুকে হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখছিলাম অনেকটা সময়; কিছুক্ষণ পরে স্বাভাবিক হয়েছে। পৃথিবীর আর কারও জন্য এরকম অনুভূতি কখনও হয়নি আমার।
আমি যে কখনও কাউকে ভালোবাসিনি, ব্যাপারটা এমনও নয়—কিন্তু তোর প্রত্যেকটা বিষয়ে আমি অনেক মনোযোগী, অনেক গভীর। এটাকে কী বলে, আমি জানি না। ভালোবাসার বাইরেও অন্য কোনো ব্যাকরণ আছে নিশ্চয়ই; বিষয়টা এত সহজ নয়।
আচ্ছা, তোর কি কখনো এমনটা হয়েছে? আমি ঠিকঠাক বোঝাতে পারছি না হয়তো, কিছুটা অনুমান করে নিস।
পাঁচ। আমি অনেক ভালো আছি। সংসার নেই। ঘুরেফিরে জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই, লক্ষ্যে পৌঁছানোর তাড়া নেই। জীবনে সবাইকে কিছু-একটা করতেই হবে—কে বলেছে, বলো?
আমার মতো কিছু মানুষ থাকবে, যাদের জীবনে কোথাও যাবার কোনো তাড়া থাকবে না, কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয় থাকবে না, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকবে না—মোটকথা, বলার মতো যার কিছুই থাকবে না, সেই মানুষটাই আমি। যার মৃত্যুর সাথে সাথে সবাই তাকে ভুলে যাবে, মহাকালের চক্রে হারিয়ে যাবে—সেই মানুষটাই আমি।
আচ্ছা, আমি বোধ হয় নিজের কাছ থেকে আবারও পালিয়ে বেড়াচ্ছি, তাই না? নিজেকে কিছু-একটা ফাঁকি দিতে চাইছি। বেঁচে থাকতে গেলে কখনো কখনো নিজেকেও ফাঁকি দিতে হয়। আমার মতো অপদার্থ কয়জন আছে আর, বলো?
ছয়। : আমি তোমায় ভুলিনি, ভুলতে পারি না।
: আমাকে জড়িয়ে ধরবে?
: কষ্ট বাড়ে...
: কেমন আছ তুমি?
: নিঃশব্দে।
: তোমার মুখটা এত মলিন কেন?
: আমাদের শেষ দেখা হয়ে গেছে।
সাত। তোমাকে একদিন না দেখলে আমার ভীষণ জ্বর আসে, বাড়তে থাকে শ্বাসকষ্ট, এই অসুখটা হয়তো তীব্র শোকের মতোই স্থায়ী কিছু-একটা। কাঁচা রং হাতে লেগে যাবে—তুমি আমায় খুব বেশি শক্ত করে ধোরো না। পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে ছোট্ট কোনো পরিবর্তনে, নিখুঁত এক সত্য তোমার ভেতরে উন্মোচিত হবে—তুমি জানো, আমি তোমার কে? কেনই-বা তোমার কথা ভাবছি?
শুনছ—যে-সত্যিটা আমি খুঁজে পেয়েছি, তার কোনো কিছুই তোমার অজানা নয়; আবার এর পুরোটাই অজানা। আমার জীবনের মূল্যবান সময়ের একটি মাত্র পালক আমি তোমার নামে এঁকেছি—যা দেখলে তোমার চোখ গভীর অনুভূতির ছাপে রক্তিম বর্ণ ধারণ করবে।
তুমি আমায় হারিয়েছ, তবু চিনতে পারোনি; দেখেছ, কিন্তু দেখোনি, স্পর্শ করেছ, তবে ভালোবাসোনি।
আট। একদিন আমি হোয়াটসঅ্যাপে আমার এক সিনিয়রের সাথে অফিসের একটা জরুরি বিষয়ে আলাপ করছিলাম। আলাপের মাঝখানে দেখি, আমার দূরসম্পর্কের এক মামা আমাকে একটানা ফোন করে চলেছেন। পরপর আট বার। আমি স্যারের অনুমতি নিয়ে কলটা কেটে মামাকে তড়িঘড়ি করে তৎক্ষণাৎ কলব্যাক করলাম।
আমার ধারণা হয়েছিল, কেউ হয়তো মারা গেছেন এবং এই খবরটা আমাকে দেবার জন্যই মামা এতটা ব্যস্ত হয়ে ফোন করছেন। তাই আমি একটু ভয়ে ভয়েই কলটা করেছিলাম। হয়তো মামার সাথে কথা বলামাত্রই আমার বুকটা ভেঙে খানখান হয়ে যাবে।
মামা আমার কলটা ধরেই বললেন, অ্যাই, তুই কোথায়? আজকে সন্ধ্যায় অবশ্যই অবশ্যই আমার বাসায় আসবি।
তখন বুঝলাম, যাক, কেউ মারা যায়নি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম! একইসাথে মাথায় খেলল, মামা এত জরুরি ভিত্তিতে বাসায় ডাকছেন কেন? মামার এক ছোটো বোনের বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু ক্যাচাল লেগেছে, এটা মায়ের কাছে আগেই শুনেছিলাম। তাহলে নিশ্চয়ই সেটা নিয়েই কোনো একটা জরুরি মিটিং হবে মামার বাসায়। কিংবা, এমনও হতে পারে, সন্ধ্যায় মামার বাসায় গিয়ে ওখান থেকে সবাই মিলে ছেলের বাসায় গিয়ে ছেলেপক্ষের লোকজনকে ধোলাই দিতে হবে।
কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, মামা, সন্ধ্যায় আপনার বাসায়...
আমার কথা শেষ হবার আগেই মামা বললেন, সন্ধ্যায় রাহুলের জন্মদিন। নিমন্ত্রণ করার জন্য ফোন দিলাম।
রাহুল মামার ছোটো ছেলে। ছেলের জন্মদিনে নিমন্ত্রণ করার জন্য এই ভদ্রলোক আমাকে পরপর আট বার ফোন করলেন!
সৌম্যর সেন্স ও হিউমার সেন্স দুই-ই অনেক উঁচু লেভেলের। (আপনারা ইউটিউবে সৌম্যর সাথে আমার প্রায় পৌনে ৫ ঘণ্টার অনলাইন প্রোগ্রামে এর প্রমাণ পেয়েছেন।) আজ এই মামার কীর্তির কথা শুনে হাসতে হাসতে বললাম, ভাই, কী আর বলব! এটা আমাদের সিগনেচার কোড অব কন্ডাক্ট! দিন দিন আমাদের জ্ঞান বাড়ছে এবং বাড়তেই থাকবে, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান কেয়ামত পর্যন্ত শূন্যের কোঠায় থেকে যাবে!
নয়। মন ভালো নেই। কিছুই ভালো লাগে না ইদানীং—সব কিছু জাস্ট অর্থহীন মনে হয়। বেঁচে আছি কেন শুধু শুধু? আর কতদিন এভাবে? এত লম্বা জীবন ভালো লাগে না।
পৃথিবীর কোনো প্রান্তে আমার জন্য কিছু নেই। কিচ্ছু নেই।
অসম্মানের জীবন নিয়ে বেঁচে ছিলাম, আর শেষবেলায় এসে একটা ক্লাউনকে বিয়ে করে আরও বেশি আটকে গেলাম—গিলতেও পারছি না, ফেলতেও পারছি না। সারাজীবন বাবার বাড়িতে একধরনের কষ্ট সহ্য করলাম, আর এখন এসে পড়েছি আরেক ফাঁদে।
কাউকে দেখাতে ইচ্ছে হয় না নিজেকে। কারও সামনে যেতে ইচ্ছে হয় না। কিচ্ছু করতে ইচ্ছে হয় না—অযথা মনে হয় সব কিছু। আমি অনেক শৌখিন, গোছানো একটা মানুষ—অথচ দেখি, জীবনটা সেই যে অগোছালো হয়ে গেল, আর কিছুতেই ঠিক করতে পারলাম না।
এজন্যই জীবন নিয়ে খুব বেশি আশা করতে নেই। স্বপ্ন সাজাতে নেই।
জাস্ট সব ভেঙেচুরে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয়। কিচ্ছু মানতে ইচ্ছে হয় না আর। সব অসহ্য লাগে।
জীবনকে শেষ করে দেবার জন্য বিয়ের উপর অস্ত্র নেই।
দশ। জীবনে সংগ্রাম করতে করতে একটা নারী কখন যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, সে নিজেও টের পায় না। একটুকরো বেঁচে থাকা খুঁজতে গিয়ে তার ভেতরের সব স্বাভাবিক সৌন্দর্য ঝরে যায়—সে হয়ে ওঠে রুক্ষ, উস্কখুস্ক, ক্লান্ত। এই পৃথিবীর সুখ, সাচ্ছন্দ্য, শান্তি—যেন তার জন্য বরাদ্দ নয়।
তবুও ভালোবাসা আসে। কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে—"How do I love thee? Let me count the ways..." কিন্তু যার জীবনে জায়গা নেই, সে ভালোবাসা গুনবে কী করে?
তখন মনে হয়—এই পৃথিবীর কোথাও হয়তো তার জন্য কোনো ঠাঁই নেই। ছোট্ট একটা আঘাতেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে। ভালো মানুষ তো জলদি চলে যায়—তাহলে যে এখনও টিকে আছে, সে কি তবে ভালো নয়? কেমন এক দমবন্ধ বেঁচে থাকা—শুধুই খাওয়া, ঘুমোনো, আর নিঃশ্বাস নেওয়া। অকারণ। উদ্দেশ্যহীন।
তবু—বেঁচে আছে।
এগারো। কতদিন আমাদের কোনো কথা হয় না,
তোমার চোখজুড়ে আমায় দেখি না...
বহুদিন তোমায় ছুঁয়ে দেখি না।
কেন এত অমিল আমাদের?
তবুও অপেক্ষা শেষ হয় না।
আমাদের থাকার কোনো কারণ নেই,
আমাদের যাবার কোনো জায়গা নেই।
বারো। মানুষের অন্তরে স্বাধীনতার জন্য এক আদিম আকাঙ্ক্ষা সবসময়ই কাজ করে, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা সবসময় স্বাধীনতাকে ধারণ করার ক্ষমতা তৈরি করে না। খাঁচাবন্দি পাখি যেমন মুক্ত আকাশের স্বপ্ন দেখে, তেমনি মানুষও মুক্তির কথা ভাবে; অথচ দীর্ঘদিনের অভ্যেস, নিরাপত্তার মোহ, এবং পরিচিত শৃঙ্খলের ভেতর বাস করতে করতে সে বন্দিত্বকেই নিজের স্বভাব বলে ভুল করতে শুরু করে। তাই যখন সত্যিই মুক্তির দরজা খুলে যায়, তখন সে শুধু বিস্তৃত আকাশ দেখে না, দেখে অনিশ্চয়তার গভীরতা, একাকিত্বের ভার, এবং নিজের সামনে নিজেরই অসীম দায়।
এ কারণেই স্বাধীনতা সকলের কাম্য হলেও, সকলের কাছে সহনীয় নয়। স্বাধীনতা মানে কেবল বাইরের শৃঙ্খল ভাঙা নয়; স্বাধীনতা মানে নিজের অস্তিত্বের সম্পূর্ণ দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। এই দায় মেনে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন অন্তরের স্বচ্ছ নির্মলতা, যাতে মানুষ নিজেকে ভ্রান্তি ছাড়া দেখতে পারে; প্রয়োজন সাহস, যাতে সে পরিচিত নিরাপত্তার বিনিময়ে অজানাকে গ্রহণ করতে পারে; আর প্রয়োজন একরকম সৃজনশীল উন্মাদনা, যাতে সে প্রতিষ্ঠিত সীমার বাইরে গিয়ে নিজের সত্যকে বেছে নিতে পারে। স্বাধীনতা, শেষপর্যন্ত, কোনো উপহার নয়—এটি এক গভীর আত্মিক সাধনা।
তেরো। তোমাকে ভালোবাসিনি...
কেবল নিজেকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছিলাম।
যেমনটা তুমি ছিলে—
সমঝোতার প্রাচীর ভেদ করতেই ব্যস্ত!
নিখুঁত অভিনয়ে রাখা সংযমের শর্ত;
ঠিকই শুনেছ—
আমার প্রার্থনারাই ব্যর্থ।
চৌদ্দ। মানুষ শুধু একজন বিশ্বস্ত সঙ্গীর খোঁজেই জীবনটা কাটিয়ে দেয়। নিজের সঙ্গ কতখানি ভয়ংকর হতে পারে? নিজেকে সহ্য করা অনেক কঠিন একটা কাজ।
তোকে স্বপ্নে দেখেছি...তুই ছাদে বসে আছিস, আর আমি হঠাৎ এলাম—তোর পায়ের ওপর শুয়ে আকাশ দেখছি, তুই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিস। খুউব শান্তি লাগছে। তখন আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছি—"আমি তোকে এত ভালোবাসি কেন?"
আর তক্ষুনি তুই আমাকে খুব বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, অনেক জোরে জোরে হাসছিস। তারপর না আমার ঘুম ভেঙে গেছে, এইমাত্র। এখনও গুড ফিল হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তোকে বহুদিন পর এত কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখলাম।
পনেরো। মানুষ যাকে ভয় পায়, তাকে কখনও ভালোবাসতে পারে না। এ কারণেই বেশিরভাগ মানুষ সারাজীবনই শুধু ধর্মালয়ে যায়, ঈশ্বরের কাছে আর যেতে পারে না।
ষোলো। দুঃখের প্রতিশোধ নিই সৃষ্টির তীব্রতায়।
সতেরো। মানুষ যাকে ভয় পায়, তাকে কখনও ভালোবাসতে পারে না। এ কারণেই বেশিরভাগ মানুষ সারাজীবনই শুধু ধর্মালয়ে যায়, ঈশ্বরের কাছে আর যেতে পারে না।
আঠারো। ইসস্! কত সুন্দর আকাশটা! তোমাকে খুউব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে! খুব কাছাকাছি কোথাও থাকলে দৌড় দিয়ে গিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরে আবার চলে আসতাম।
একটা মোমবাতিও নিয়ে আসতাম—বাইরে ঝড়ো বাতাস, চুপচাপ শুধু তোমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে আছি! মোমের আলোয় তোমার মুখটা ভীষণ মায়াবী লাগত জানি, ভীষণ ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে করবে—অসুখটা যে বড্ড জেদি।
চলো না...কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজতে থাকি, তারপর দু-জনে মিলে লিখতে বসব, কফি বানিয়ে দিয়ো...সারাক্ষণ তোমার নীরবতা উপভোগ করব।
উনিশ। তুমি আমায় ছেড়ে কত দূরে যাবে?—আমি যে অভ্যস্ত অসমাপ্ত চিঠি, লোডশেডিং, পায়ে-পিষে-যাওয়া ফুল, থেতলানো জখম আর অপেক্ষায়। অভ্যস্ত ফেরত না-আসা ফোনকলে, শেষ না-হওয়া বাক্যে, ভোর চারটেয় জেগে থেকে কারও পায়ের আওয়াজ খোঁজায়। অভ্যস্ত এমন বৃষ্টিতে, যেখানে ছাদ নেই; এমন রাস্তায়, যেখানে গন্তব্য নেই—শুধু হাঁটা আছে, শুধু হাঁটতেই থাকা।
তুমি দূরে গেলে আমার কিছু বদলায় না, নীরা—অন্ধকার আগেও ছিল; হ্যাঁ, তোমার আসার আগেও ছিল। তফাৎ শুধু এটুকুই—তখন অন্ধকারটার কোনো নাম ছিল না।
বিশ। তুমি যদি আমার লেখাগুলোর কখনো উত্তর দিতে, তাহলে আমরা উপন্যাসের কোনো এক পাতায় থাকতাম। ধুর, আমি কী যে ভাবছি...উত্তর দেবেই-বা কী করে—আমার লেখাগুলোই তো তুমি।
যদিও তুমি আমার জীবনে কোনো এক গল্পের চরিত্র হয়েই এসেছিলে, তোমাকে কখনোই ভুলতে পারব না—চেষ্টাও করব না।
ভালোবাসি বলেই যে একসাথে থেকে যেতে পারব...এমন ভাগ্য কি আর আমার আছে? তবে ইচ্ছে করে বাকি জীবন সুন্দর কিছু মুহূর্ত আর ভাবনা নিয়ে কাটাতে—তোমাকে নিয়ে লিখতে, কারণ—যদি আমরা কেবল একটি মুহূর্তই হই,
কিংবা আরও দ্রুত, বিক্ষিপ্ত কোনো কিছু...!
আরেকটা আলো নিভে গেলে সত্যি কার কী এসে যায়?—কিন্তু আমার এসে যায়।
একুশ। শেষ বার যখন দেখা হয়েছিল,
তুমি বলেছিলে,
একদিন এমন সময়...
আবার আসবে তো?
যদি ইচ্ছে হয়,
তোমার শরীরের ঘ্রাণে আমায় আটকে রেখো।
বাইশ। : তুমি কখনও আমার কোনো চিঠির উত্তর দাওনি। অথচ তোমাকে করা কত-শত প্রশ্নের ভিড় বেড়েছিল, ক্ষণে ক্ষণে অপেক্ষার অশ্রু নামল—তবুও তুমি ভেবে নিলে, এর সবটাই শিল্প ছিল।
: শিল্প নয়, নীরা। যা ছাড়া ভেতরটা শূন্য, কখনো হয়ে ওঠে পূর্ণ—তা-ই তো সৃষ্টির সত্যরূপ। অনন্তকাল জাগ্রত এই সত্তা কেবল মানুষের ভেতরেই স্পষ্ট—তুমিই আমি, আমিই তুমি, সময়ের হাতে-লেখা এক অস্থায়ী লিপি।
: তোমার সাথে আমি সত্যিই যদি থেকে যেতে পারতাম, আরও সুন্দর হতো সব কিছু। আমি যখন থাকব না...দেখবে, আরও সুন্দর হচ্ছে। তবু এখন মানুষের থেকে দূরে থাকি—ইচ্ছে করে নয়, তোমার মুখটা আবছা মনে আসে—অনেকটা বাধ্য হয়ে।
তোমাকে আমি এর কাছাকাছি ভালোবাসি, হয়তোবা এর থেকেও বেশি...তুমি জানো না, তোমাকে বলি না। বললে তুমি আমাকে উন্মাদ ভাবতে পারো, দূরে চলে যেতে পারো। একতরফা ভালোবাসা ব্যাপারটা ভীষণ যন্ত্রণার—এর মধ্য দিয়ে গিয়ে দেখেছি, তোমাকে যে-মুহূর্ত থেকে ভালোবেসেছি। তবে সৃষ্টিশীল কাজ বেশি বেশি করা যায়—এটুকু পেয়েছি তোমার কাছ থেকে। কিন্তু প্রায়ই খুব কষ্ট হয়, কাউকে বলা যায় না—যার জন্য এসব করছি, তাকেও না। তোমার প্রতি আমার এ ভালোবাসা কতদিন থাকবে, তা আমি নিজেও জানি না।
তেইশ। দিনটা অন্যরকম হতে পারত, অনুভূতির প্রকাশটা কেমন হওয়ার কথা ছিল? আপন মানুষগুলোর খুউব কাছে থাকলে বুকের ধরফর আওয়াজটা কি বেড়ে যেত? প্রিয় স্মৃতিগুলো মনের খাতায় আজ কত বার লেখা হলো?
নিজেকে আজ বড়ো অচেনা মনে হলো—জানি না, কতখানি সময় পেরোল! শরীরজুড়ে অস্পষ্ট চাপা এক আনন্দ, হাজার মাইল দূরে থেকেও প্রিয়মুখগুলো ছুঁয়ে গেল! দূর আকাশে চোখ রেখেও বুকের ভেতর একফালি আনন্দ ছুঁয়ে গেল—কেউ যেন চোখদুটো চেপে ধরে রাখল, ততক্ষণ, যতক্ষণ না অশ্রু গড়িয়ে পড়ল!
প্রকৃতি স্বস্তির সুবাস ছড়াল—দিনটি ইদের, খুশির, আনন্দের।
চব্বিশ। হুঁ, তুই-ই আমার সব।
তবুও আমি তোর কেউই নই; জীবনটাই ব্যাকস্পেস।
তুই আজকাল এভাবে কল্পনায় এসে থাকিস—একতরফা কথা বলতে থাকি, যেন তুই গভীরভাবে ছুঁয়ে আছিস, অথচ নেই। যেন প্রতিটা বাক্য লিখে মুছে ফেলি, আবার লিখি—কেউ পড়ে না, কেউ পড়বে না।
আমি তোকে অদ্ভুতভাবে ভালোবাসি...এটা বুঝতে পারবি একসময়। পরিমাণটা অনেক বেশি, অসম্ভব বেশি—যতটুকু মুছে ফেলা যায়, তার চেয়ে ঢের বেশি।
পঁচিশ। তুমি কি ভুলে-যাওয়া সেই কবিতা,
যে আমার বুকের ভেতরে রক্ত ঝরিয়ে
নিজেই মরফিনের ঘোরে ডুবিয়েছিল?
এক শীতের রাতের তীব্রতায় যে-দিন
তোমার হাতের উষ্ণতায় নিজের উম হারিয়েছি,
সেদিনই বুঝি আমার কবিতা হারিয়েছিল।
ছাব্বিশ। আচ্ছা বাবা, ইলন মাস্কের অত টাকা, তবুও তো ইলন মাস্ক অত খাবার খায় না। তুমি তো ইলন মাস্কের চেয়েও মোটা।
(পরে পুত্রের সাথে কথা বলে জানলাম, সে জেমিনিকে বলেছিল, শো মি দ্য পিকচার অব ইলন মাস্ক। জেমিনি ইলন মাস্কের ছবি দেখানোর পর সে একটু হতাশ হয়, কেননা তার ধারণা ছিল, ইলন মাস্ক সবচাইতে মোটা লোক।)
সাতাশ। থাক, এত অভিমান করে কী হবে, বলো? সেই তো মনের মধ্যে রয়েই গেছ। আমি কেমন আছি, নিজেই বুঝতে পারি না।
কিছু কথা বলতে আমি এখনও লজ্জা পাই। আমার গোটা জীবনের সমস্ত অন্ধকারের মধ্যে তুমিই একমাত্র আলো। আমি নিজের যতটুকু, আমার আত্মার যতটুকু—তোমারও ততটুকুই। কারও সাধ্য নেই এ বন্ধন ছিন্ন করার। আর কখনও কারও হতে পারিনি, আর কাউকে নিজের ভাবতেও পারিনি।
শরীর বুড়ো হয়, মরে যায়; আত্মারা তো চিরতরুণ, তাই না?
হাজার মানুষের ভিড়ে তোমার যখন একা লাগে, তখন কি বুঝতে পারো—কোথাও কেউ একজন তোমার সঙ্গে কথা বলছে? তুমিও কি সবসময় আমাকে ভাবো? তাই কি আমারও সবসময় একা লাগে, মন খারাপ লাগে, কোথাও যেতে ইচ্ছে করে?
আমরা না-হয় পেনফ্রেন্ড হয়েই থাকব।
বাইরে খুব মেঘ ডাকছে; বৃষ্টি হবে বোধ হয়। আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি—কী-একটা ভালো লাগা, তাই না? আমার একটু প্রেম প্রেম পায়। মনে হয়, সারারাত জেগে গল্প করি। এত এত গল্প আছে আমার বলার।
আটাশ। শোনো, আমি এত সুন্দর করে চিঠি লিখতে পারি যে, চিঠি পড়ে অনেক শক্ত মনের মানুষও কেঁদে ফেলে। তোমাকেও লিখতাম; পরে ভাবলাম, আহা, মেয়েটাকে কাঁদিয়ে লাভ কী?
আচ্ছা, ভালো থেকো।
উনত্রিশ। মনের ভেতরঘরে যে-আমিটা...
তোমার প্রতীক্ষায় থাকে,
কতখানি উষ্ণতা পেলে সে জ্যান্ত হবে?
যতটা তোমার স্পর্শ, উপেক্ষা, আদরের
সবটা ছিল আমার কবিতায়...
ততখানি ভালোবাসলে না কেন আমায়?
ত্রিশ। ভালোবাসা যেন শুধু দূরত্বেই সুন্দর।
অপেক্ষাতে ভালোবাসার তীব্র রূপ
যতখানি স্পষ্ট হয়—
ততখানি নীরবে থেকেও দেখেছি...
তোমাকেই আমার ক্ষতের অংশ বলে মনে হয়।
কিছু অনুভূতি বুকের গভীরের
আর্তনাদে চাপা পড়ে রয়...
যেন তুমিই ছিলে এ সত্তার একমাত্র পরিচয়।
যে-অনুভূতির শুদ্ধস্বর তোমার স্পর্শে সীমাবদ্ধ...
সে কবিতা হোক কেবল তোমাতেই সমর্পিত।
একত্রিশ। 'হারিয়ে যাওয়া' মানে জানিস?
অভিমানের জন্ম কি কেবল ভালোবাসা থেকেই হয়?
আমি তোকে যত বার বলি—
'ভালো থাকিস'...ঠিক তখনই,
আমি তোকে ছেড়ে বহুদূর
যাবার জন্য মনটাকে
শক্ত করে নিই।
যদিও, তা সম্ভব হয়নি।
বত্রিশ। তুই আমাকে ভুলে গেলেও, দূরে যাস না।
অনেকটা পথ একসাথে...
অনেকটা এখনও বাকি।
গল্পের এই বাঁকে
আমি বড়ো একাকী।
তেত্রিশ। তোকে আমি মনে রাখব। হয়তো কথা হবে না, দেখা হবে না, কেমন আছিস শুনতে চাওয়া হবে না; আমার অবস্থান তোকে বোঝাতে চাইব না।
যদি কখনো আবার সুযোগ হয়...তোর সামনে গিয়ে দাঁড়াব। জানি, ফিরিয়ে দিবি না, আর দিলেও কীই-বা করার থাকে...আমি খুবই সামান্য।
তুই আমার লাইফে কিছু সময়ের জন্য হলেও এসেছিলি...নয়তো ওটা মিনিংলেসই থেকে যেত।
যদিও এখন আমি ভীষণ এলোমেলো হয়ে আছি; ভেতরকার মানুষটার অসহ্য যন্ত্রণা শুনতে হয় প্রতিনিয়ত—এসব কিছুই আর আমার পক্ষে কাজ করে না।
চৌত্রিশ। তোমার কণ্ঠস্বরে একধরনের বিশ্বস্ততা লুকোনো—শুনলে মনটা বড়ো শান্ত হয়ে যায়; প্রায়ই ভাবি...এত সুন্দর যার কণ্ঠ, তাকে নিজের করে পেয়েও, কেউ কীভাবে দূরে যেতে পারে? আমি তো একজীবন শুধু তোমার কণ্ঠস্বর শুনেই... সব যন্ত্রণা ভুলে থাকতে পারতাম।
আমাকে তোমার বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে...একবার গুনগুন করে বলেছিলে—যে-মানুষটা আমাকে এত বেশি ভালোবাসে, এখনও তাকে নিজের করে পেলাম না; আমার কি কষ্ট হয় না, বলো?
আমি তোমার কাছে, একমাত্র তোমার কাছেই যেতে চেয়েছি... কিন্তু পারিনি কখনও; এ আমার দুর্ভাগ্য।
পঁয়ত্রিশ। আসলে মানুষের মধ্যেই দুটো রূপ থাকে—কেউ একজন আপনার জীবনে শুভেচ্ছাদূত হয়ে এসেছিল, তবুও...তাকে হারাতে হয়েছিল বড্ড অসময়ে, তাড়াতাড়িই!
মৃত্যু আমাদেরকে আলাদা করেছে ঠিকই...কিন্তু সত্য?—সত্যের বেড়াজাল থেকে যে মুক্তি কখনোই মেলেনি; আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিই যখন বিশ্বাসঘাতকতা করে...কিংবা ভালোবাসার মানুষটি যখন অন্য কারও সংস্পর্শে—সম্পর্ক কতখানি টিকে থাকে তখনও?
কেন মানুষ সম্পর্কের অভিশাপ থেকে মুক্তি চায় না? কেনই-বা সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এত অভিযোগ করে?
নিয়মের বাইরে এক সূক্ষ্ম রেখা রয়েছে—যা প্রকৃতপক্ষে আপনার গতি নির্ধারণ করে।
ছত্রিশ। আমি তোমার ঠোঁটের উষ্ণতা ছুঁতে চেয়েছিলাম, অতৃপ্ত উত্তেজনায় ভুলবশত তোমাকে আমার কাছে টেনে নিতে চাইলাম!
বিভ্রম বাড়তে না দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম, অসজ্জিত চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে...করেছিলাম দ্রুত সময়ে প্রস্থান!
কাকতালীয়ভাবে, আমার অনুভূতির খুউব কাছাকাছি থেকেও, চূড়ান্ত প্রকাশটা তুমি... তখনও দেখতে পেলে না!
সাঁইত্রিশ। মন ভালো নেই—হয়তো থাকবেও না কোনোদিন। কপালটাই বুঝি এমন, তাই আক্ষেপ করে আর কী লাভ!
সারাজীবন একটাই স্বপ্ন ছিল—শিক্ষিত, রুচিশীল, ভদ্র পরিবার দেখে বিয়ে করব। ওরা দুই ভাই-বোন নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করেছে ঠিকই, কিন্তু পুরো পরিবারের শেকড়টা অন্যরকম—বংশে তেমন কেউ শিক্ষার আলো দেখেনি।
পরিবার তো শুধু দু-জনের মিলন নয়, দুটো বংশের সংমিশ্রণ। বংশগতভাবে সুশিক্ষিত পরিবেশে বেড়ে না উঠলে মানুষের মধ্যে রুচিবোধ আর শিষ্টাচারের ভিত গড়ে ওঠে না—এটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
তার ওপর নিজের পরিবারের ভেতরেও জটিলতার শেষ নেই। এসব নিয়ে ভাবতে বসলে হতাশা এসে গিলে খায়। নিজের চিন্তাভাবনার সঙ্গে চারপাশের কিছুই মেলাতে পারি না। সমস্যাটা হয়তো আমারই—আমি সব কিছু সহজে মেনে নিতে পারি না।
প্রতিনিয়ত স্রষ্টার কাছে একটাই আকুতি—এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করো। কিন্তু পরিবারের ভেতরের এসব সমস্যা দূর করা যেমন অসম্ভবের কাছাকাছি, তেমনি আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেও তো বেঁচে থাকা যায় না। মানুষ পরিবার ছাড়া টিকে থাকতে পারে না—এই সত্যটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর।
আমার অধিকাংশ বন্ধুর পারিবারিক ভিত অনেক সমৃদ্ধ, অনেক দৃঢ়। তাদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে গেলে ভেতরটা ভেঙে পড়ে। এই বিয়ের সিদ্ধান্তটা সঠিক হয়নি—আসলে আমার বিয়ে করাটাই হয়তো ভুল ছিল। সবার কি আর সংসার হয়? সংসার টিকিয়ে রাখতে অনেক কিছু গিলে খেতে হয়, মানুষ খায়ও—কিন্তু আমি পারি না। আমার সব কিছু মনের মতো চাই, আর এখানেই সব সংকট।
মনে হয়, ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু হওয়ার সামর্থ্য রাখি, অথচ বাস্তবে এসে দাঁড়িয়েছি এমন এক চোরাবালিতে—যেখানে যতই ছটফট করি, ততই ডুবি। কী করব বলো, তাই শুধু আক্ষেপই করে যাই।
আটত্রিশ। আমি ভালো কি খারাপ, সে বিষয়ে আপনার মতামত চাইনি। আমি চেয়েছি, ভালো লাগলে মিশবেন, আর ভালো না লাগলে বিদেয় হবেন। ফ্রিতে সার্টিফিকেট দেওয়া বন্ধ করুন; মাথায় রাখবেন, টয়লেট টিস্যু কিনতেও পয়সা লাগে।
উনচল্লিশ। একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছি; তোকেও দেখেছি।
তোর সাথে অনেক দিন কথা হয় না৷ তাই আমি তোকে এক-শো'টা মেসেজ দিয়ে ফেলেছি, আমি যে-রকম অস্থির হয়ে যাই তোকে খুঁজে না পেলে...
তার চেয়েও বেশি ডেস্পারেট হয়ে অনেক আজেবাজে কথাও লিখেছি। তারপর তুই আমাকে রিপ্লাই করেছিস—খুব আদর করে কিছু কথা লিখেছিস।
তারপর আমাকে ব্লক করে দিয়েছিস।
আমি ওই মেসেজগুলো পড়ে এত কান্না করেছি...শুধু এটা ভেবে যে—তুই আর কক্ষনো আমার সাথে কথা বলবি না...
তোর একটা মেসেজ না এলে আমি কতগুলো মুহূর্ত অপেক্ষা করি...এখন অপেক্ষাটা করে আর কী হবে? এসব বলে বলে আমি কাঁদছি...
আমি ডিসাইড করেছি, এভাবে আমার পক্ষে বাঁচতে পারা সম্ভব নয়৷ আমি একটা কঠিন পথ বেছে নিয়েছি—এভাবে যদি আমি মারা যাই, তাহলে কেউ সন্দেহ করবে না (সেটা কী, আমি জানি না, তবে স্বপ্নে ওটা ভেবে আমি ভীষণ শান্তি পাচ্ছিলাম); মনে হবে, মৃত্যুটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু আসলে তা নয়।
পরে আরও দেখেছি যে...
কিছুদিন এভাবে চলে যাবার পর তুই আমাকে টেক্সট করেছিস...পাগলি! আমি তোর ওপর রাগ করে থাকতে পারি না, তুই ভালো আছিস তো?
আমি তোকে শুধু বললাম—তুই এমন করলি কেন? সারাক্ষণ আমার কল্পনাতে আসিস, আর তুই যে এটা মন থেকে করিসনি, এই অনুমানটা আমি একবারের জন্যও কল্পনায় আনতে পারলাম না কেন?
আমি তখনও তোর কাছে এত যাবার চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না! আমি ভাবছি, তখন তুই ফিরে এসেছিস...কিন্তু আমি যে শুধু এই কারণে মারা যাচ্ছি, এটা শুনলে তুই এখন ভীষণ কষ্ট পাবি৷ তাই, আমি তোকে কোনোভাবেই কিছু শেয়ার করব না।
চল্লিশ। - বুকের ভেতরটা কেমন?
- কবরের পরতে পরতে মাটি চাপা রাখা হয় যেমন।
একচল্লিশ। আমি যখন একা থাকি...তোকে ভীষণ শক্ত করে ধরে রাখি। তুই খুউব কাছাকাছিই থাকিস আমার। যখন তোকে ভুলে থাকার একধরনের চেষ্টা করি...তখনও আমি তোকে গভীরভাবে স্পর্শ করি।
ভাবছি, কীভাবে কল্পনায় তোকে আদর করা যায়। আমি চলে যাচ্ছি...তোকে রেখে গিয়ে লাভ কী! বাহিরটাতে কিছুই নেই, বরং সাথে নিই তোকে—কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারবে না। আমি তোকে পড়ছি, দেখছিও...
শুনতে পাই না, কারণ মনের ওপারে একটা দরজা আছে। তুই কি আমাকে একটুও মনে রেখেছিস?— শোনা যায় না কিছুই।
বিয়াল্লিশ। কিছু সময়ের জন্য, আমি আমার ধ্যান ত্যাগ করি...আশ্চর্যজনক কোলাহলেও নিরুত্তাপ ভাবটুক বজায় রাখি।
যে-একাকিত্বে তোমার অবস্থান নেই—
তা কেবলই নিজের বোঝার অভাব।
আমাদের মধ্যকার এই বিচ্ছিন্নতাটি হতাশা নয়—এটি স্পষ্টতা।
তেতাল্লিশ। সুন্দর মুহূর্ত? আমার কাছে ভীষণ সুন্দর এবং দামি মুহূর্ত হলো—তুই যখন আমাকে জড়িয়ে ধরিস! এতটাও শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে পারি না আমি তোকে...কিন্তু, আমার ভেতরটা তোর নিঃশ্বাসকে বিশ্বস্ততা ভেবে সজোরে আলিঙ্গন করে; আমি চাই, তোর স্পর্শটা আরও বেড়ে যাক, গাঢ় হোক এই অনুভূতিটুকু। মৃত্যুর ভয় এই মুহূর্তে আমাকে একেবারেই ছুঁতে পারে না, বরং নিজের অস্তিত্বের তরঙ্গে জন্ম নেয় কবিতা।
বাস্তবতার রূপরেখায়, এর চেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা আমি এখন অবধি খুঁজে পাইনি।
মানুষের বুকের গভীরে কতখানি জায়গা আছে? জমিনের সবটাই কি? কতটা ফারাক আমাদের? জানিস, আমার কাছে আমাদের বিদায়ের মুহূর্তটা ভারি যন্ত্রণার...ও বড্ড ভোগায় রে!
চুয়াল্লিশ। কেউ আমায় বিশ্বাস করলে, আমি বিশ্বাসের কাজই করি।
কেউ আমায় অবিশ্বাস করলে, আমি অবিশ্বাসের কাজই করি।
হিসেব সহজ!
পঁয়তাল্লিশ। আমার এ গভীর অনুনয়
কেবল তুই শুনতে পারিস,
এ ভঙ্গুর আলিঙ্গনের কারণ
কেবল তুই জানিস;
তবুও কি, সত্যিই,
তুই আমাকে এতটুকুও বুঝিস?
আমি ইচ্ছে করেই আর
তোকে ভেবে লিখছি না—
কেননা, আমি ভুলে থাকতে চাই...
তুই আমার সবটা।
ছেচল্লিশ। ইদানীং আমাদের কথা আর খুব বেশি এগোচ্ছে না, খেয়াল করছ? শুধু একটা-দুটো শব্দ...এর বেশি কিছু বলতে ইচ্ছে করে না, ব্যাপারটা এমন নয়, আমি বোধ হয় শব্দই খুঁজে পাই না; যদিও, এতেই হাঁপিয়ে উঠছ!
যত দূরে সরিয়ে রাখবে, আমার লেখা আরও নিখুঁত ও শূন্যতার সূক্ষ্ম স্বরে আকুতি করে বলবে—আমি তোমাকে মুক্ত করতে চাই না; তবে, এমনটি ঘটেনি।
শ্বাসরোধে চাপা পড়ে গেছে আমাদের সুন্দর মুহূর্তগুলো; ভেস্তে গেছে অস্তিত্বের প্রয়োজনে সাজানো শব্দগুচ্ছ; নিষ্ঠুর অবহেলায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে আমাদের স্মৃতিগুলো, নিঃসঙ্গতায় ডুবে যায় শুদ্ধ অনুভূতিগুলো।
তোমার জন্য অধিক অধিকার দেখিয়েও, ভেতরের মানুষটাকে কথা বলাতে পারি না—তা সত্ত্বেও, ওরা ভাবছে, আমি জীবিত।
সাতচল্লিশ। : আমি কি শুধুই তোমার প্রয়োজন?
: তুমি যা ভেবে শান্তি পাও।
: যদি বলি...তা শুধুই তোমাকে কাছে রেখে?
: আমি নিজেই এক উদ্বাস্তু, পথ খুঁজছি।
আটচল্লিশ। মানুষের পুরোনো দুঃখরা প্রাক্তন হয় নতুন সুখের আগমনে, আর আমার পুরোনো দুঃখরা প্রাক্তন হয় নতুন দুঃখের জাগরণে। দুই-ই প্রস্থান, স্মৃতির রোমন্থন...তবু কত দূরত্ব! ঈশ্বর নাকি মানুষ বুঝে ভাগ্য লেখেন; তবে কি আমি সেই মানুষ, যাকে ঈশ্বর সারাক্ষণই প্রার্থনারত দেখতে চান?
উনপঞ্চাশ। অচেনা শহরে...
চেনা বন্ধু, চেনা নিকোটিন।
পঞ্চাশ। রাহাত খানের 'অমল ধবল চাকরি' বইটা খুঁজছিলেন যাঁরা, তাঁদের জন্য এই পোস্ট। বইটা বাজারে এসে গেছে। বাতিঘর-এ পাবেন। নিশ্চয়ই আরও অনেক জায়গায় পাবেন। আমি 'বাতিঘর' থেকে নিয়েছি।
বহুদিন হয়, বইটা পুরোনো বইয়ের দোকানেও খুব-একটা পাওয়া যায় না। আমার কাছে ছিল এক কপি, তা-ও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পেয়েছি। (ফেইসবুকে বইয়ের নাম-ছবি-সহ পোস্ট দেখামাত্রই দোকানিকে ফোন করে ঢাকার গলিঘুপচি পেরিয়ে তাঁর গোডাউনে গিয়ে নিয়ে এসেছিলাম, মনে আছে। তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, স্যার, আমি পাঠিয়ে দেবো, আসার দরকার নেই। আমি তবু অপেক্ষা করিনি। অফিস থেকে লাঞ্চের পর ছুটি নিয়েছিলাম সেখানে যাবার জন্য।)
বড়ো আদরের বই। অনেক বছর পর বেরিয়েছে। আপনাদের জানালাম।
একান্ন। কাউকে বার বার বিব্রত করবেন না। তার চেয়ে বরং তার সাথে যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দিন। এতে পারস্পরিক সম্মানবোধটুকু অন্তত নষ্ট হবে না। এ পৃথিবীতে কেউ কারও জন্য অপরিহার্য নয়। তা যদি হতো, তাহলে তো সন্তানের মৃত্যুর পর মায়ের বেঁচে থাকারই কথা নয়! নিজের সন্তানের চেয়েও প্রিয় নিশ্চয়ই আর কেউ নেই, তাই না? তবে কীসের এত ধরে রাখার বাধ্যতা?
দিনশেষে দেখি, অচেনা মানুষই চেনা মানুষের চেয়ে বেশি কাছের হয়ে রয়।
বায়ান্ন। বলো, কাছে থাকবে কি তুমি আমার?
নীরবতায় যতক্ষণ স্মৃতির তোলপাড়!
বলো, ভালোবাসবে কি তুমি আবার?
অস্পৃশ্য নিঃশ্বাসে বেড়ে-চলা অজুহাত!
তেপান্ন। যার যতটুক ভাব, তার ততটুক লাভ।
ছাপান্ন। তোমাকে “ভালোবাসি” বলেছি—যখন শূন্যতায় আমার কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হয়, এবং দুটি আত্মা ভীষণভাবে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে—শ্বাসরোধকে ঘনিষ্ঠতা ভেবে ভুল করে।
শেষপর্যন্ত, ভালোবাসা আমৃত্যু আমাদের শূন্যতায় ভাসিয়ে রাখে।
একদিন, অনুশোচনা নয়—আমার সৃষ্টিই হয়ে ওঠে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকার সারমর্ম—ভালোবাসার তীব্রতাও যা ছাড়িয়ে যায়; এক বিশেষ মহত্ত্ব এটিকে আলিঙ্গন করে।
আমি কি তোমাকে এতটাই ভালোবাসি যে তা মৃত্যুর পীড়নকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করতে পারবে?
সাতান্ন। : তোমার চোখ এত লাল কেন?
: তোমাকে কল্পনায় আনতে...আমি আজকাল বড্ড ভয় পাই!
: তুমি ভীষণ বদলে গেছ!
: তোমার উপেক্ষাতেই, নিঃশব্দে স্মৃতিরা...মৃত্যুর পথ বেছে নিল।
: কিছু বলছ না কেন?
: দূরত্বের হস্তক্ষেপে অনুভূতিরা শঙ্কিত।
ভাবনাদেয়ালের পলেস্তারা: ১৫১
লেখাটি শেয়ার করুন