গল্প ও গদ্য

অনধিকার নিবাস: ১



তোমার জীবনে আমার কোনো স্বীকৃত স্থান নেই—এই সত্য আমি অনেক আগেই জেনে গেছি।


তোমার দিনযাপনের দৃশ্যপটে আমার নামে আলাদা কোনো আলোকরেখা টানা নেই, তোমার সম্পর্কের ভাষায় আমার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সম্বোধনও সংরক্ষিত নয়। তবু মানুষের অন্তর্জীবন কি কখনো কেবল স্বীকৃত নামের ভেতরে বাস করে? কত কিছুই তো সেখানে জন্মায়—যার কোনো সামাজিক পরিচয় নেই, কোনো ঘোষিত বৈধতা নেই, অথচ তার উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। তুমি আমার ভেতরে সেই রকমই—অঘোষিত, অননুমোদিত, অথচ অনিবার্য।


চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যে-আগন্তুককে কেউ ভেতরে ডাকে না, অথচ যার পায়ের ছাপ ধুলোয় গেঁথে যায়—আমি সেই আগন্তুক। আর সেই ধুলো? সেই ধুলোই সবচেয়ে পবিত্র—কারণ সেখানে প্রিয়তমের পদচিহ্ন আছে।


তোমাকে আমি কোনোদিন অধিকার করতে চাইনি; বরং তুমি যে-শূন্যতার মধ্যে এসে বসেছিলে, তার প্রকৃতি বুঝতে গিয়েই আমি নিজেকে নতুনভাবে চিনেছি। আগে মনে হতো, মানুষের ভেতরকার নীরবতা একধরনের অব্যবহৃত প্রান্তর—সেখানে বাতাস আসে, ধুলো জমে, সময় কেটে যায়। এখন জানি, সেই নীরবতারও গোপন স্থাপত্য থাকে। কেউ একজন এসে সেখানে এমনভাবে বসতি গড়ে তুলতে পারে যে, বাইরে থেকে কিছুই বদলায় না, অথচ ভেতরের প্রতিটি দেয়ালের প্রতিধ্বনি পালটে যায়।


তুমি আমার জীবনে তেমনই এসেছিলে—ঝড় হয়ে নয়, কোনো নাটকীয় আলোকপাত নিয়ে নয়। বরং এমন এক গভীর ও ধীর উপস্থিতি নিয়ে, যার প্রভাব প্রথমে বোঝা যায় না। যেমন কোনো পুরোনো বাড়ির ভেতর অদৃশ্য আর্দ্রতা ধীরে ধীরে কাঠের গন্ধ বদলে দেয়, জানালার ফাঁকে জমে-থাকা আলোকে ভারী করে তোলে—তেমনি তুমি আমার ভেতরের স্বর বদলে দিয়েছিলে। আমি একই মানুষ রইলাম, অথচ আর আগের মানুষটি রইলাম না।


বাঁশ যখন বনে দাঁড়িয়ে থাকে, সে নীরব। কেটে আনলে, শরীরে ছিদ্র করলে—সে গান গায়। তোমার আসার আগে আমি সেই নীরব বাঁশটি ছিলাম। তুমি আমার ভেতরে সেই ছিদ্র—যেখান দিয়ে এখন বাতাস ঢুকলে সুর বেরোয়। কিন্তু সুর তো কান্নারই আরেক নাম।


সম্ভবত ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন রূপ তা-ই, যার কোনো নিশ্চয়তা নেই, কোনো প্রতিষ্ঠিত পরিণতি নেই, এমনকি নিজের পরিচয় দেওয়ার মতোও সহজ কোনো ভাষা নেই। তাকে বন্ধুত্ব বললে কম বলা হয়, প্রেম বললে ভাষাটি অতিরিক্ত জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠে, আর নৈকট্য বললে তার অন্তর্লীন দহনটি ধরা পড়ে না। কিছু সত্য আছে, যাদের সংজ্ঞা দেওয়ামাত্র তারা ছোটো হয়ে যায়। যেদিকেই মুখ ফেরাও, সেদিকেই যে-আলো—তাকে কি কোনো ভাষায় ধরা যায়? নিরানব্বইটি নাম জানা যায়—শততমটি গোপন। সেই গোপনতাই সৃষ্টিকে টিকিয়ে রেখেছে। তোমাকে নিয়ে আমার অনুভবও সেই শততম নামের মতো—উচ্চারণের বাইরে, অথচ সবচেয়ে সত্য।


আমি অনেকবার নিজেকে বোঝাতে চেয়েছি—এভাবে কারও সঙ্গে বাঁধা পড়া বোধ হয় প্রজ্ঞার লক্ষণ নয়। যে-সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা নেই, যার সামাজিক পরিভাষা পর্যন্ত নির্মিত হয়নি, তার পক্ষে এত ভেতর নিঃশেষ করে দেওয়া কি সমীচীন? কিন্তু হৃদয়ের নিজস্ব এক যুক্তি আছে, যা বুদ্ধির আদালতে হাজিরা দেয় না। সে তার সিদ্ধান্ত নিজেই লেখে, নিজেই জারি করে, নিজেই তার সাজা ভোগ করে।


পতঙ্গ জানে, আগুন তাকে পোড়াবে—তবু সে ওড়ে। কারণ পতঙ্গের কাছে বেঁচে থাকা মানে নিরাপদ থাকা নয়; আলোর কাছে সমর্পিত থাকাই তার একমাত্র নৈতিকতা।


পতঙ্গ জানে, সে পুড়বে। তবু ওড়ে। কারণ না-পোড়া অন্ধকারের চেয়ে পুড়ে-যাওয়া আলো বেশি সত্য।


তোমাকে নিয়ে আমার ভেতরে যা গড়ে উঠেছে, তা আকস্মিক আবেগের ঢেউ নয়। এটি দীর্ঘকালীন, অবিচ্ছিন্ন, স্তরে স্তরে জমে-ওঠা এক অন্তর্মহাদেশ—যার নিচে আগ্নেয় তাপ আছে, উপরে শীতলতা, মাঝখানে অসংখ্য অজ্ঞাত সঞ্চয়। বাইরে থেকে আমাকে স্বাভাবিক দেখাত—আমি কথা বলতাম, মানুষের সঙ্গে মিশতাম, হাসতামও কখনো কখনো। কারণ ভেঙে পড়ারও তো একটি শিষ্টাচার আছে। সব ধ্বংস ধুলো উড়িয়ে আসে না; কিছু ধ্বংস নীরবে কাজ করে—মানুষের উচ্চারণে, হাঁটায়, হাসিতে, চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার অভ্যেসে। কিন্তু ভেতরে আমি জানতাম, আমার অনুভবের কেন্দ্র বদলে গেছে। আমার চিন্তার মধ্যে একটি অন্তঃস্রোত আছে, যা অনবরত তোমার দিকে বয়ে যায়। এই বয়ে যাওয়া কারও চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু আমার সমস্ত ভেতরকার আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।


তোমার অস্তিত্বে আমি এতটাই দ্রবীভূত যে, আলাদা করলে আমি বাষ্প হয়ে যাব—অদৃশ্য, কিন্তু প্রতিটি শ্বাসে উপস্থিত। লবণ যেমন দরিয়ায় মেশে—তারপর আর বলা যায় না কোনটা লবণ, কোনটা জল। তোমার নাম এত বেশি উচ্চারণ করেছি যে, নিজের নামটা গুলিয়ে ফেলেছি। এই বয়ে যাওয়াটা এখন আর কোনো আকস্মিক দুর্বলতা নয়—এটি আমার সত্তার জলবায়ু। আমি এতে অভ্যস্ত, আবার একে সম্পূর্ণ মেনেও নিতে পারিনি। এই দ্বিধাই আমার স্থায়ী ভূগোল।


অদ্ভুত বিষয় এই যে, তোমার ওপর আমার ক্ষোভ জন্মায় না। এই না-জন্মানো ক্ষোভও একধরনের যন্ত্রণা। কারণ রাগ থাকলে মানুষ সহজে বাঁচতে পারে—সে দূরত্ব তৈরি করে, অভিযোগ গড়ে তোলে, অপরকে অন্যায়ের আসনে বসিয়ে নিজেকে মুক্ত করে। কিন্তু যেখানে দোষারোপের অবকাশ নেই, সেখানে বেদনা অনেক বেশি শুদ্ধ, আর সেই কারণেই অনেক বেশি নির্মম। আমি জানি, জীবন সবসময় মানুষের ইচ্ছের অনুবাদ নয়। মানুষ অনেকসময় এমন পথে চলে যায়, যে-পথ সে নিজে পর্যন্ত বেছে নেয়নি পুরোপুরি; সময়, পরিস্থিতি, দায়, সংশয়—সব মিলিয়ে তাকে এক অদৃশ্য স্রোতে বয়ে নিয়ে যায়। তাই তোমাকে আমি কখনও বিচার করতে পারিনি। শুধু অনুভব করেছি। আর সেই অনুভব, বিচারহীন হওয়ার কারণেই, আমার ভেতরে তুমি আরও দীর্ঘজীবী হয়েছ।


যে-হৃদয় সকল রূপ ধারণ করতে সক্ষম—তা মাঠ হতে পারে, আশ্রম হতে পারে, দুয়ার হতে পারে—সে হৃদয় কি বিচার জানে? সে শুধু ধারণ করতে জানে।


তোমাকে আমি সম্পূর্ণ পাইনি, এ-কথা সত্য। কিন্তু না-পাওয়াও একধরনের প্রাপ্তি হয়ে ওঠে কখনো কখনো—যখন তার ফলে হৃদয়ের মধ্যে একটি স্থায়ী অনুরণন তৈরি হয়। তুমি অনুপস্থিত থেকেও আমার বর্তমানের অংশ। তোমার অনুপস্থিতি নিছক শূন্যতা নয়; সেটি একধরনের সক্রিয় উপস্থিতি, যা প্রতিদিন আমার ভেতরে নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করে। কারণ যাকে প্রতিদিন নতুন করে মনে হয়, তাকে প্রতিদিন নতুন করে হারাতেও হয়। আমি তোমাকে ভুলতে বসি না; আমি বরং তোমাকে বহন করতে শিখি। আর এই বহন—এটাই আমার অভ্যন্তরীণ জীবনযাপনের এক গোপন শিল্পে পরিণত হয়েছে।


কিছু কিছু অসমাপ্ত জিনিসই মানুষের ভেতরে সবচেয়ে প্রবলভাবে বেঁচে থাকে—একটি অর্ধলিখিত বাক্য, একটি থেমে-যাওয়া সুর, একটি দরজার কাছে গিয়ে আর না-ডাকা নাম। পূর্ণতা যেখানে শেষ হয়ে যায়, অসমাপ্তি সেখানে অনুরণনিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়। তুমিও আমার ভেতরে তেমন এক অনুরণন—শেষ করা যায় না, আবার নির্ভুল শুরু বলেও চিহ্নিত করা যায় না। খোঁজাটাই সম্ভবত আসল প্রাপ্তি—পাওয়া নয়, বরং খোঁজার ভেতর দিয়ে নিজেকে পরিবর্তিত হতে দেওয়া।


তোমাকে অন্য কোথাও মন দিতে দেখলে, তোমার স্বরকে দূরের দিকে বাঁক নিতে শুনলে, আমার ভেতরে যে মৃদু কিন্তু গভীর কাঁপন ওঠে, তার সহজ কোনো নাম নেই। তা ঈর্ষা নয়, কারণ অধিকারবোধের অহংকার নেই। তা অভিমানও নয়, কারণ আনুষ্ঠানিক দাবি কখনও জানাইনি। বরং মনে হয়, আমার ভেতরের যে নিভৃত কক্ষে তোমাকে স্থাপন করে রেখেছি, সেখানে হঠাৎ আলো কমে এসেছে—যেন একটি দীর্ঘদিনের অন্তর্গত ঋতু নিজেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তোমার জন্য আমার ভেতরে যে-টান, তা কোনো শোরগোলময় আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং গম্ভীর, গভীর, শিরার ভেতর বয়ে-চলা এক অনুচ্চ কম্পন। এ যেন এমন এক অদৃশ্য তার, যার এক প্রান্ত আমার বুকে বাঁধা, অন্য প্রান্ত তোমার অজ্ঞাত কোনো অঞ্চলে। তুমি জানো কি জানো না—সে-তারে টান পড়লে আমার ভেতরে তার রেশ লাগে।


তখন আমি নিজেকেই বোঝাই—মানুষ তো কারও একক সম্পত্তি নয়। তবু হৃদয়, তার নিজস্ব শৈশব না-ছাড়তে-পারা সরলতায়, আজও চায়—যার দিকে সে এতকাল নীরবে ঝুঁকে আছে, সে অন্তত একবার ফিরে তাকাক।


তুমি অন্যদিকে তাকালে আমার ভেতরে একটা ঋতু বদলায়। আমি বুঝি—তোমার চোখ আমার আবহাওয়া। তুমি না তাকালে—শীত। তাকালে—সব বসন্ত আমার।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *