দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

প্রেমাকাঙ্ক্ষায় প্রেমের বীজ

তুমি আমার কাছে যেমনভাবে প্রকাশিত হয়েছ, আমি জানি না, এমনভাবে আর কারও কাছে প্রকাশিত হয়েছ কি না। তুমি আত্মা, আর এই আত্মা সর্বত্র, সর্বরূপী। অনন্ত আকাশে, অনন্ত কালে, এই আত্মা বিরাজিত। বিচিত্র তোমার রূপ, অসংখ্য তোমার রূপ, তুমি আত্মা, তুমি একমাত্র, অদ্বিতীয়, অথচ একাকী নও। তোমার আত্মত্বে আমার আত্মত্ব, অথচ আমি একাকী নই।




তোমার আত্মত্বের এক কণা পেয়ে আমি আত্মা, তুমি এই কণাকে অতিক্রম করে অনন্ত দেশে স্বপ্রকাশ রয়েছ, অনন্তকালে অসংখ্য লীলা করছ। আমি তোমার সে প্রকাশ, সে লীলা, আভাসে জানছি, আমি তা সম্যকরূপে ধারণা করতে পারছি না। আমি যে তা সম্যকরূপে ধারণা করতে পারছি না, এতেই তুমি আমার উপাস্য, আমার চিরকালের সম্ভজনীয়, চির সম্ভোগের বস্তু। আমি ক্ষুদ্র হয়েও তোমার অনন্ত স্বরূপের অংশ; অসংখ্য লীলার একটা লীলা, তোমার পূর্ণ প্রেমের পাত্র, তোমার অমরধামের বাসিন্দা। তোমার উপর আমার প্রেম এমন ক্ষুদ্র, এমন চঞ্চল যে তা আমার কাছেই গণনার অযোগ্য, তোমার কাছে এ আরও কত ক্ষুদ্র, উপেক্ষণীয়, তা জানিনে।




...কথাটা বলে থমকে গেলাম। আমার কাছে আমার প্রেম নগণ্য বলে কি তোমার কাছেও তা নগণ্য হতে পারে? তুমি আমার সারাজীবন‌ই আমাকে প্রেমে জাগাতে চেষ্টা করছ। সে চেষ্টার কী ফল হয়েছে, তা আমি জানি না। আমি তো কেবল আমার মধ্যে প্রেমের আকাঙ্ক্ষামাত্র দেখছি। আকাঙ্ক্ষা করতে গিয়ে বোধ হয় ক্ষণেকের জন্যে একটু প্রেমও জন্মে? আমি এই একবিন্দু ক্ষণিক প্রেমছাড়া আমার ভেতরে আর কিছু দেখছি না। কিন্তু তুমি যে আমাকে প্রেমিক করবার জন্যে অসংখ্য চেষ্টা করছ, সে চেষ্টা তো ক্ষণিক নয়, নগণ্য নয়, উপেক্ষণীয় নয়। আমার প্রেমিক হওয়া অসম্ভব হলে তুমি আমাকে কবে ছেড়ে দিতে!




ছেড়ে যে দাওনি, তাতেই বুঝছি, তুমি আমার আশা ছাড়োনি। তুমি যা ছাড়োনি, আমি তা ছাড়ছি কেন? আমার প্রেমাকাঙ্ক্ষার ভেতরে তুমি তোমার সমস্ত চেষ্টার সফলতা দেখছ। আমিও যেন একটু সফলতা দেখছি। প্রেমের আকাঙ্ক্ষাই কি প্রেমের বীজ নয়, বীজাকার প্রেম নয়? এই বীজাকার প্রেমকে তুমি ফুটিয়ে তুলবে। একে ফুল-ফল করে আমার জীবন ধন্য করবে। আমার এক এক সময় মনে হয়, সেদিনের আর বেশি দেরি নেই। আমি তোমাকে যেভাবে দেখি, তুমি আমার কাছে যেভাবে প্রকাশিত হও... আত্মারূপে, বিশ্বরূপে, সে প্রকাশের কথা আমি আর কারও কাছে শুনি না।




আমার মনে হয়, এই যে তোমার প্রেমাভাস, আমার মধ্যে তোমার প্রেমরূপে প্রকাশ, তা-ও একেবারে নতুন। আমি তো আর কোথাও এরূপ প্রকাশের কথা শুনি না। কোনও বইয়ে পড়ি না যে তুমি মানবজীবনের প্রতিস্পন্দনে তাকে নিয়ে ব্যস্ত। এই তো সে ব্যস্ততা আমি দেখছি, অনুভব করছি। তোমার প্রেমের ঢেউ এসে আমার গায়, আমার হৃদয়ে লাগছে। আমি এই ঢেউ ভোগ করি। তোমার এই ঢেউয়ের শব্দে তোমার আশ্বাসবাণী শুনি, তোমার প্রতিশ্রুতি শুনি যে, আমি আর কখনও ঘুমাব না, তুমি যেমন সর্বদা প্রেমে জেগে আছ, আমি তেমনি সর্বদা তোমার প্রেমে জেগে থাকব।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *