বাংলা কবিতা

একস্বরের বিশ্বস্ত কোরাস

  
 আমার একটা ব্যক্তিগত খাঁচা আছে। খুব শক্ত বুননের।
 সেখানে কোনও দরোজা নেই, গরাদগুলি ভীষণ মোলায়েম।
 ওটা অনেক দিন খালি পড়ে ছিল। এখন তুমি আছ।
  
 আমি বহুদিন ধরে সহস্র শূন্যতাকে ছুঁয়ে এসেছি।
 ভেবেছিলাম, ওটাই আমার নিয়তি। হঠাৎ তোমাকে পাওয়া!
 চোখ মেলে যদি আমার নিভৃত ভেতরটা কখনও দেখো,
 দেখবে, ওখানে কেবলই পোড়াঘ্রাণ। সাথে কিছু অঙ্গার, কিছু ছাই, আর কিছু নেই।
  
 আমি এখন একধরনের ভালো আছি। এখন কাঁদতে আর খারাপ লাগে না।
 কিছু কষ্ট এখন আর পোড়ায় না। যতদূর বুঝি, একে ভালোথাকা বলে।
  
 একটা অনুরোধ। অনুরোধটা রেখো।
 তুমি আমাকে আর কখনও অতীতের ক্ষতের কাছে ফিরিয়ে নিয়ো না।
 আমি সেখানে থেকেছি অনেক অনেক দিন। আর
 থেকেছি বলেই জানি, সেখানে কেবলই তপ্ত আগুনের আঁচ।
 অতটা আঁচ সহ্য করতে করতে আজ আমি ক্লান্ত।
  
 যদি সেখানে ফিরে যেতে হয় আবারও,
 আবারও যদি আরও একবার পুড়তে আরম্ভ করি,
 তখন তোমাকে ভালোবাসার সাহসটা সত্যিই আমি আর পাবো না।
  
 আমার কিছু কষ্ট আছে, ব্যক্তিগত।
 সে কষ্টগুলি অক্ষয়, অবিনাশী।
 ওদের সারিয়ে তুলতে আমি আজও পারিনি। আমি জানি,
 ওদের জন্মই হয়েছে আমার সাথে পুরোটা জীবন থেকে যাবার জন্য।
 ওদের ভাগ তোমাকে নিতে হবে না কখনও।
 তুমি শুধু আমার পাশে থেকো, ওতেই হবে।
  
 আজকাল আমার কী হয়েছে, জানো?
 প্রতিদিন চোখভরে, মনভরে
 একরাশ স্নিগ্ধতা, একমুঠো মুগ্ধতা সঙ্গে নিয়ে
 তোমার সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকি অপলক।
 মনে হয়, আহা, কত সুন্দর, কত সুন্দর!
  
 আমার ভীষণ ইচ্ছে করে,
 তোমার পাশে জেগে থাকি, বসে বসে তোমাকে দেখি,
 তোমার কোলে মাথা রাখি, নিজেকে উষ্ণ করে রাখি…
  
 তুমি আঁকছ, এঁকে চলেছ একের পর এক।
 নগর আঁকছ, নাগরিক আঁকছ, প্রেম আঁকছ, হৃদয় আঁকছ,
 কখনও ঘৃণা ছুড়ে দিচ্ছ, কখনওবা দ্রোহ…ওতে কার কী এসে যায়!
 …তা জেনেও তুমি আঁকছ, এঁকে চলেছ…তোমার কোনও বিরাম নেই,
 তোমার তুলি থামছে না, আমি কেবল প্রতীক্ষায় আছি…থেকে যাচ্ছি।
  
 আমি তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি…তোমার ব্যস্ততা তবু ফুরোচ্ছে না,
 আমি তোমার জন্য একপৃথিবী সময় হাতের মুঠোয় নিয়ে বসে আছি,
 তুমি কখন আসবে…তুমি কখন আসবে…
  
 এক এক সময় অধীর হয়ে এই ধূসর শহরজুড়ে
 আমার একা একা হাঁটতে ইচ্ছে করে,
 একা একা কাঁদতে ইচ্ছে করে…
  
 তুমি তখনও থেকে যাচ্ছ ক্যানভাসের সামনে,
 আমার কান্নার কথা, আমার দুঃখের কথা তোমার তুলি চিৎকার করে বলছে,
 তুমি শুনতে পাচ্ছ না, তুমি বধির হয়ে আছ, তুমি শুধুই ব্যস্ত থেকে যাচ্ছ…
  
 আমি ডাকলে আমার উঠোনে আকাশ এসে যায়,
 তবু তুমি আসছ না…এই পুরো একটা আকাশের চেয়েও
 বেশি দূরত্বে থেকে গিয়ে তুমি আমাকে আঁকছ, এঁকে চলেছ…
 আমি দেখছি, চুপচাপ কাঁদছি।
  
 আমার অভিমান দেখে তুমি এক নতুন ছবির জন্য তৈরি হচ্ছ,
 সে ছবির চোখফুঁড়ে কোনও মায়া নয়, বেরোবে কেবলই শ্লাঘা…
  
 তোমার ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে আমায় যতটা বোঝো,
 আমার সামনে দাঁড়িয়ে ততটা বুঝলে না আজও, দুঃখ এটাই।
  
 তোমার দরোজায় কড়া নেড়েছি বলে ভেবো না, এ কেবলই আমার নিঃসঙ্গতার দোষ।
 মনে রেখো, তোমার দরোজায় আমার যে বোধগুলো একের পর এক আসে,
 সেগুলো আমার শুদ্ধতম ভালোবাসা। সেখানে কোনও ভান নেই, কোনও খাদ নেই।
  
 আমার লাগামহীন যন্ত্রণার খবর নিতে তুমি কখনও এসো না।
 আমি তোমাকে শুধুই আমার স্বপ্নের কথা বলতে চাই।
 তোমাকে নিয়ে আমার টুকরো টুকরো কিছু স্বপ্ন আছে।
  
 তোমাকে দেখলে, আমার সব কিছু নতুন করে শুরু করতে ইচ্ছে করে,
 তোমাকে ভাবলে, তোমার সাথে অনেকটা সময় বাঁচতে ইচ্ছে করে।
   
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *