গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: ষোলো



ওটা বসে থাকা ছিল না, থেমে যাওয়া ছিল না, ধূসরও ছিল না। ছিল অন্য কিছু। মৃতপ্রায় মানুষের ভেতরে হঠাৎ জেগে-ওঠা জীবিত কোনো অণু। এমন কিছু, যা এত ছাঁটাইয়ের পরেও কাটেনি। তলারও তলায়, গভীরেরও গভীরে টিকে ছিল।

তখনই হাসি আসে, যখন হাসার কিছুই থাকে না। তখনই কান্না আসে, যখন কাঁদারও কোনো স্পষ্ট কারণ থাকে না। চোখ নিজেই কাঁদছে, মনকে না জানিয়ে। এগুলোই হয়তো শরীরের সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে সৎ সৃষ্টি। কথার চেয়ে সৎ। নীরবতার চেয়েও সৎ। কারণ এরা কোনো ব্যাখ্যা মানে না, কোনো অলংকার চেনে না, কোনো ভান জানে না।

হাসি আর কান্না একসঙ্গে আসে। এমন এক নামহীন জায়গা থেকে, যার ঠিকানা কেউ জানে না। সাধারণ নিয়মে। সেইসব জিনিসের নিয়মে, যারা একসঙ্গে এসে পৌঁছয় তখনই, যখন বাকি সব আলাদা হয়ে গেছে।

কষ্টেরও একটা সীমা আছে। যখন তা পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয়, যখন সহ্যের বাইরেও গিয়ে পৌঁছায়, তখন তা হালকা হয় না, মিটেও যায় না, বরং হঠাৎ উলটে যায়। যেন এতটাই নিচে নামে যে, তলটাই বাঁক খেয়ে যায়, আর নামতে নামতেই কোনো এক রহস্যময় বিন্দুতে নেমে-যাওয়া আরেক রকমের ওঠা হয়ে দাঁড়ায়। ভার তখন হালকা হয় না, কিন্তু ভারের ভেতরই এক অদ্ভুত হাওয়া জন্মায়।

এটা স্বস্তি নয়, আনন্দও নয়। শরীরের এক আদিম কৌশল মাত্র। কান্নার তলা থেকে হঠাৎ যে-হাসি বেরিয়ে আসে। কান্না এতদিন ধরে চলেছে, এত দীর্ঘ, এত নিরবচ্ছিন্ন যে, একসময় নিজেই ক্ষয়ে গেছে, ফুটো হয়ে গেছে, নিজের ভেতর দিয়ে অন্য কিছুর কাছে পৌঁছে গেছে।

তখন বোঝা যায়, আসল হাসি কেমন। সামাজিক নয়, ভদ্র নয়, কৌতুকের নির্দিষ্ট সমাপ্তিতে যার মানে বের হয়, তেমনও নয়। আসল হাসি আসে শুধু দুঃখ থেকে। অন্য কোথাও থেকে নয়। যখন দুঃখ এতটাই পূর্ণ হয় যে, তোমার মধ্যে আর এমন কিছু বাকি থাকে না, যা দুঃখময় নয়, তখন হাসি পায়। দুঃখ থেকে পালিয়ে নয়; দুঃখ নিজেই হাসতে শুরু করে। নিজের দিকে তাকিয়ে। নিজের পূর্ণতাকে দেখে।

দুঃখ যখন এতটাই সম্পূর্ণ হয় যে, নিজেই নিজের কমেডি হয়ে ওঠে, তখন ট্র্যাজেডি আর কমেডির ফারাক ঘুচে যায়। যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ, একই ধাতু, একই ওজন, একই ইতিহাস। মুদ্রা একবার উলটে পড়লেই দেখা যায়, অন্য পিঠে কমেডি অপেক্ষা করছিল চিরকাল। ট্র্যাজেডির পেছনেও সে ছিল। লুকিয়ে।

এই কারণেই, কষ্ট যখন একেবারে পূর্ণরূপে নিজের শেষ সত্যে পৌঁছায়, তখন তা নিজেই কমেডি হয়ে ওঠে। কারণ সত্যই শেষপর্যন্ত গভীরভাবে অদ্ভুত। আর অদ্ভুতের ভেতরেই একধরনের হাসি আছে। হা-হা করে নয়, বরং ভাঁড়ের মতো, যে পড়ে, ওঠে, আবার পড়ে, আবার ওঠে, এবং কখনও পুরোপুরি থামে না।

পড়া হলো দুঃখ। ওঠা হলো কমেডি। কিন্তু দুটো আলাদা গতি নয়, একই নড়াচড়ার দুই রূপ। যেমন এক জিনিসকে অন্য কোণ থেকে দেখলে তার অর্থ বদলে যায়। সেদিন রাস্তায় সেই ভাঁড় তা জানত। এক পায়ে জুতো, অন্য পা খালি, ফুটপাতের কিনারায় বসে, বৃষ্টির মধ্যে, আর সেই বৃষ্টি এক অর্থে রোদও হতে পারে। কারণ সে জানে, জুতো-পা যেখানে যাবে, খালি-পাও ঠিক সেখানেই যাবে। শেষপর্যন্ত তফাত এতটা নয়, যতটা দূর থেকে মনে হয়।

আর লোকে যে-আওয়াজ তুলেছিল তোমাকে দেখে, সেই ভাঁড়কে দেখে, ফুটপাতের কিনারার ধারে, বৃষ্টির মধ্যে, সেটা হাসি ছিল, না অন্য কিছু, তা ভেতর থেকে বোঝা যায় না। ওপরে তাকালে শুধু দেখা যায়, কিছু মুখ খোলা, তারা শব্দ করছে। সেটাকে হাসি বলা যেতে পারে। আবার না-ও যেতে পারে। কারণ শব্দের নাম জানা আর শব্দের সত্য জানা এক জিনিস নয়।

যেটা প্রায় হাসি, অথচ পুরো হাসি নয়, আরও গভীর কোনো স্থান থেকে উঠে আসে, বুকের সেই গহ্বর থেকে, যেখানে শ্বাস হঠাৎ আটকে যায়, আর কী ঘটছে, তা বোঝার আগেই ভেতরটা কেঁপে ওঠে। ফুটপাথের ধারের সেই ভাঁড় এ কথা জানত। তুমি এখন ধীরে ধীরে সব শিখছ, চেয়ারে বসে, অল্প অল্প করে।

তারপর তুমি ঘরে ফিরে আসো। শরীর খেয়েছে, জল পেয়েছে, এখন তার বিশ্রাম চাই। বিছানায়, কিংবা চেয়ারে, কিংবা মেঝেতে। তাতে বিশেষ কিছু এসে যায় না। শরীর যেখানে ভেঙে পড়ে, সেখানেই শুয়ে থাকে। এতে লজ্জার কিছু নেই।

কুকুরের সঙ্গে তোমার অন্তত এইটুকু মিল আছে, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলে বা বসে ছিলে, সেখানেই হঠাৎ শুয়ে পড়তে পারা; ক্লান্তির টানের কাছে কোনো শর্ত ছাড়া আত্মসমর্পণ করা। শরীরের স্বাভাবিক সত্য বোধ হয় এটাই। তোমারও। যতক্ষণ না চলার বিরুদ্ধে লড়াই থেমে যায়, আর তুমি ও পৃথিবী অন্তত এক বিষয়ে একমত হও; শুয়ে থাকা, স্থির থাকা, কিছুক্ষণের জন্য আর না-নড়া।

কিন্তু সে স্থিরতাও বেশিক্ষণ থাকে না। কারণ শরীর আবার ডাক দেয়। সেই একই শরীর, যে বিশ্রাম চেয়েছিল, আবার দাবি তোলে, ওঠো, গিয়ে পৌঁছে দাও, আবার শেষে কোথাও গিয়ে পড়ে থাকো।

এইভাবেই। বার বার। সাধারণ নিয়মে।

৯।

একটা মেয়ে ছিল। একসময়। ছিল, ধরে নিতে হয়, যদিও “ছিল” বলাটাও একধরনের নির্মাণ। স্মৃতি তো কখনও সম্পূর্ণ সত্য বলে না; যা ছিল, তাকে নয়, যা থাকলে ভালো হতো, তাকে সে বেশি যত্নে গড়ে তোলে। স্মৃতি সবসময় সামান্য মিথ্যে মিশিয়ে কথা বলে।

তবু স্মৃতি ছাড়া আর কোনো সাক্ষী নেই। সেই থামার আগের দিনগুলোতে, ঘরের আগের জীবনে। যখন যাওয়া ছিল, করা ছিল, চাওয়া ছিল, ইচ্ছে ছিল। সেই সময়ে একটি মেয়ে ছিল। ধরা যাক, ছিল। তার একটি নামও ছিল। নাম তো সবারই থাকে, ডাকার জন্য, কাছে টানার জন্য, কাউকে একক করে তোলার জন্য। কখনো কখনো একটি নামই যেন একটি মানুষের সমগ্র উপস্থিতি হয়ে ওঠে।

তারপর নামটি হারিয়ে গেল। আর তোমার ভেতরে একটি ঘর খালি হয়ে রইল।

সেই ঘরে এখন আর কেউ ঢোকে না। দরজা খোলা থাকে। বাতাস ঢোকে, আলো ঢোকে, কিন্তু মানুষ ঢোকে না। যেন চাঁদ ছিল একসময়, কিন্তু মেঘ এসে তাকে ঢেকে ফেলেছে। সাধারণত মেঘ সরে যায়, আর চাঁদ আবার দেখা দেয়। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে মেঘ আর সরে না। বরং দিনে দিনে আরও ঘন হয়। এমনও হতে পারে, একদিন তুমি ভুলেই যাবে, চাঁদ কোনোদিন ছিল কি না।

হয়তো প্রেমের শেষ পরিণতি শেষ হয়ে যাওয়া নয়; ভুলে যাওয়া। ভালোবাসা নেভে না, ধীরে ধীরে নামহীন হয়ে যায়। তোমারও তার জন্য একটি নাম ছিল, এখন তা আর নেই। ইচ্ছে করে ভোলোনি। তবু চলে গেছে। যেমন পাথর শব্দ না করে নদীর তলায় ডুবে যায়, তেমনি নামটিও ডুবে গেছে। স্বপ্নের নিচতলায়, যেখানে নেমে যায় ভাঙা জিনিস। নাম, মুখ, সম্পর্ক, যা আর উপরে ভেসে থাকতে পারেনি।

এই ডুবে যাওয়া, নামের তলিয়ে যাওয়া, একে কেবল ক্ষতি বললেই কি শেষকথা বলা হয়? চেয়ারে বসে বসে তুমি দীর্ঘদিন তাকে শুধু ক্ষতি বলেই ভেবেছ। কিন্তু এর জন্য আরেকটি শব্দও আছে, দয়া। পুরোনো শব্দ। কবিরা একসময় ব্যবহার করত। এখন আর কেউ প্রায় করে না। শব্দটি অচল মুদ্রার মতো, তবু তুমি সেটি ফেলে দাওনি; পকেটে রেখে দিয়েছ, মাঝে মাঝে আঙুলে ঘুরিয়ে দেখো।

ভাবো তো, যদি কিছুই না ভুলতে, যদি প্রতিটি মুখ, প্রতিটি উষ্ণতা, প্রতিটি বিকেল, প্রতিটি বলা কথা, প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি সরে-যাওয়া স্পর্শ, সব কিছুকে প্রথম জানার উজ্জ্বলতায়, অবিকৃতভাবে মনে রাখতে হতে। তবে কি তা সহ্য করা যেত? সমস্ত রোদ যদি একসঙ্গে মনে জ্বলে উঠত, তবে মন নিজেই ভেঙে পড়ত না? জমে-থাকা আলোর চাপে গুঁড়ো হয়ে যেত না? অন্ধ হয়ে যেত না?

ভুলে যাওয়া জিনিসকে ম্লান করে। ঝাপসা করে। দূরে সরিয়ে দেয়। এতদিন তুমি ভেবেছ, এই ম্লান হওয়াই কেড়ে নেওয়া, এই ঝাপসা হয়ে যাওয়াই ক্ষতি। কিন্তু যদি…যদি এই ঝাপসা হয়ে আসাটাই মনের নিজের প্রতি শেষ দয়া হয়?

যেমন শরীর ঘুমের মধ্যে কুঁকড়ে শোয়। পছন্দ করে নয়, রক্ষা পাবার জন্য; পেটের নরম অংশ, বুকের নরম অংশ বাঁচিয়ে রাখার জন্য। তেমনি হয়তো ভুলে যাওয়াও মনের কুঁকড়ে যাওয়া। যে-স্মৃতি পোড়ায়, তাকে সরাসরি না রেখে, তার ওপর ছাই চাপা দিয়ে রাখা। যাতে আগুন থাকলেও তার দাহ অসহনীয় না হয়।

তাহলে যে-নাম ডুবে গেছে, তা কি নিছক হারানো? না কি মন নিজেরই ওপর একখানা কাপড় চাপা দিয়েছে, উজ্জ্বলতাটুকুকে বাঁচাবার জন্য?

তুমি জানো না। জানতে পারো না। ভুলে যাওয়া নিষ্ঠুরতা, না দয়া, এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। শুধু এটুকু বোঝা যায়, মনও শরীরের মতো কুঁকড়ে যায়। আর কুঁকড়ে যাবার মধ্যে কখনো কখনো রক্ষার এক গভীর কৌশল লুকিয়ে থাকে।

তুমি চাইলে হাত বাড়িয়ে সেই নাম খুঁজতে পারতে। বাড়াও না। কারণ খোঁজা নিজেই একধরনের চাওয়া, আর চাওয়া তুমি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছ।

সে কেমন ছিল? তুমি জানো না। অথবা জানো, কিন্তু জানাটাই ঘোলাটে হয়ে গেছে, কুয়াশা-ধরা জানালার ওপারের দৃশ্যের মতো। কাচের ওপারে কিছু-একটা আছে, তুমি বুঝতে পারো। তার আকৃতি আছে, হয়তো চলনও আছে, হয়তো উষ্ণতাও আছে। কিন্তু মুখ নেই, গলা নেই, স্পষ্ট রেখা নেই। আছে কেবল একটি ছায়া, এমন এক উপস্থিতি, যাকে আর নাম দেওয়া যায় না।

শুধু বোধটুকু রয়ে গেছে। কখনো একজন ছিল, কাচের ওপাশে। এখন কুয়াশা তাকে ঢেকে রেখেছে। তুমি কাচ মুছবে না। কারণ মোছা মানে যত্ন, আর যত্ন নেওয়া তুমি বহুদিন হলো বন্ধ করেছ।

তবু স্মৃতি তোমার নিয়ম মানে না। তার নিজের ইচ্ছে আছে। শরীরের মতো, হাতের মতো, পায়ের মতো। সে নিজের মতো কাজ করে, তোমার সম্মতি ছাড়া। তুমি যত্ন বন্ধ করেছ, কিন্তু স্মৃতি মনে রাখা বন্ধ করেনি। তুমি চাওয়া ছেড়েছ, কিন্তু স্মৃতি দেখানো বন্ধ করেনি। বিশেষ করে, যা তুমি দেখতে চাও না, তা-ই সে হঠাৎ সামনে আনে।

তার স্বভাবই হলো অতর্কিতে ফিরে আসা। সামনে থেকে নয়, পেছন দিক দিয়ে। সরাসরি নয়, হঠাৎ। ইচ্ছে করে স্মরণ করার মধ্যে একধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকে; তাতে প্রস্তুতি থাকে, নির্বাচন থাকে। তুমি তো এখন আর বেছে নাও না। ইচ্ছা-স্মৃতি তোমার মধ্যে মরে গেছে; সেই স্মৃতি, যাকে তুমি ডাকলে আসত, যাকে মনে করতে চাইলে মনে করতে পারতে। এখন স্মৃতি নিজেই আসে। তুমি না ডাকলেও।

সে কিছুই ফেরত দেয় না, নিজেকে ছাড়া। যাকে ডাকলে আসে, সে খালি হাতে আসে। স্মৃতি যেন এখন ভিখিরি, তার কাছে আর বস্তু নেই, শুধু উপস্থিতির ভঙ্গি আছে। মনে করার সিদ্ধান্তটুকুই শুধু হাতে থাকে; কিন্তু যে-জিনিস মনে করতে চাও, তা আর ফিরে আসে না। ফিরে আসে তার কেবল ক্ষয়িষ্ণু অনুলিপি, নকলের নকল, ছবির ছবি, যার রং প্রতিবার একটু একটু করে আরও উড়ে যায়, আরও ফ্যাকাশে হয়।

ইচ্ছে-স্মৃতি, যাকে একসময় ডাকতে পারতে, যদি ডাকতে চাইতে, এখন প্রায় মরে গেছে। সে আর অনুভূতি ফেরত দেয় না, শুধু তথ্যের কঙ্কাল ফেরত দেয়। দিনটা নয়, শুধু তারিখ। মুখ নয়, শুধু নাম। উষ্ণতা নয়, শুধু ঘটনাটির ঠান্ডা খোলস।

এই ইচ্ছে-স্মৃতি যেন মৃতদের আলমারি। লোহার, শীতল, ঘরভর্তি অনুপস্থিতির গন্ধে ভরা। তার ভেতরে পরপর সাজানো আছে মৃত জিনিস। সময়ের ক্রমে, শৃঙ্খলায়, অথচ প্রাণহীন। সব আছে, কিন্তু কিছুই আর বেঁচে নেই।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *