গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: ছাব্বিশ



ঘুমের ঠিক আগের মুহূর্তটিতে দর্শক হেরে যায়। তখনই তার আঁকড়ে ধরা আলগা হয়ে আসে। যে-চোখ সকাল থেকে ধূসরের ওপর নত হয়ে পৃথিবীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংবাদ বহন করছিল, তোমাকে দেখাচ্ছিল, জানাচ্ছিল, ধরে রাখছিল, সেই চোখ অবশেষে বন্ধ হয়ে আসে; আর তখনই, বহু ঘণ্টার টানটান প্রহরার শেষে, দর্শক তার দখল হারায়। তুমি ধীরে ধীরে পিছলে যেতে থাকো জানার সীমানার বাইরে। এমন এক অঞ্চলে, যেখানে দর্শক আর পৌঁছতে পারে না, যেখানে জ্ঞানের আলো গিয়ে নিজেই নিভে যায়, যেখানে কোনো ভাষা আর তোমার পিছু নিতে পারে না। তখন তুমি আর দৃশ্য নও, আর সংবাদ নও, আর ধরা-পড়া কোনো অবয়ব নও; তুমি সরে যাও সেই গভীর অদেখায়, যেখানে দেখা শেষ হয়, জানা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে, আর চেতনা কেবল দূর থেকে টের পায়, কিছু-একটা ছিল, কিছু-একটা চলে গেল, কিন্তু তাকে আর কোনো নামে ডাকা যায় না।

এমন সময়ে ঘর অন্ধকার হয়ে আসে। তবে যে-ঘরে তুমি শুয়ে আছ, সে ঘর নয়; তারও পেছনে আরেক ঘর, আরও অন্তর্গত, আরও হাড়ের মতো নীরব। খুলির ঘর। সেই ঘরে দর্শক সারাদিন বসে থাকে তার হাড়ের সিংহাসনে, কপালের আড়াল থেকে তোমার হয়ে জগৎকে দেখে, জগতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংবাদ গ্রহণ করে, ছেঁকে রাখে, তোমার দিকে ঠেলে দেয়। এখন সেই সিংহাসন ধীরে ধীরে কাত হয়ে আসে। দর্শক পিছলে যেতে থাকে। চোখ, যা ধূসর শুরু হবার প্রথম মুহূর্ত থেকে অবিরাম খোলা ছিল, এখন নিজেরই ভারে নুয়ে পড়ে। ঝিমোয়। ঢুলে পড়ে। আর এক ক্ষণমাত্রের জন্য। জাগরণ ও নিদ্রার মাঝামাঝি, সীমানার সেই সবচেয়ে সূক্ষ্ম, সবচেয়ে অরক্ষিত রেখায় তুমি মুক্ত হয়ে ওঠো। দেখা থেকে মুক্ত। জানা থেকে মুক্ত। ফাঁক থেকে মুক্ত। যেন এতক্ষণ যে অদৃশ্য ব্যবধান তোমাকে তোমার কাছ থেকেই আলাদা করে রেখেছিল, যে-দর্শক তোমার ভেতর বসে তোমাকেই দূরবর্তী দৃশ্য বানিয়ে রেখেছিল, সে হঠাৎ তার দখল ছেড়ে দেয়; আর তুমি, দীর্ঘ প্রহরার পর, নিজেরই অন্ধকারে সামান্য ঢলে পড়ো।

একটি মুহূর্ত মাত্র। তবু সেই মুহূর্তে ফাঁক বন্ধ হয়। যেমন একদিন হয়েছিল নৌকোয়, নলবনের ভেতরে, মেয়েটির সঙ্গে। মিলনে নয়, আত্মসমর্পণে। সেখানে যেমন, এখানেও তেমনি: দর্শক আত্মসমর্পণ করে, মন আত্মসমর্পণ করে, জানা আত্মসমর্পণ করে শরীরের কাছে। যে-শরীরটি সারাদিন অপেক্ষা করছিল এই ঘড়ির জন্য, এই ক্ষুদ্র পলকের জন্য, তোমাকে ফিরিয়ে নেবার জন্য সেই অন্ধকারে, যেখানে শরীরই প্রকৃত মালিক, আর মন কেবল একদিনের ভাড়াটে।

ঘুম। কী বলবে তাকে? শরীরের জেতা, ধরো। মনের ওপর তার নীরব বিজয়। যে-মন তোমাকে জাগিয়ে রাখত, পারলে দেখতই দেখত, পারলে জানতই জানত, কোনোদিন নিজে থেকে থামত না, সেই মনকে শরীর একসময় এসে চোখ বুজিয়ে দেয়। সে কোনো যুক্তি দেয় না, কোনো ঘোষণা করে না, কোনো অধিকার দাবি করে না; শুধু নিঃশব্দে এসে আলো কমিয়ে দেয়, দৃষ্টি সরিয়ে দেয়, পাহারাদারকে তার আসন থেকে নামিয়ে দেয়। আর দর্শক, যে সারাদিন সিংহাসনে বসেছিল, সে সরে যায়। কোথায়, জানো না। জানার উপায়ও নেই। কারণ জানার যন্ত্রটিই তখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যে-প্রহরীকে জিজ্ঞেস করবে, সে-ই তখন দুর্গ ছেড়ে অন্ধকারে নামছে।

শুধু এতটুকু বোঝো, সে থাকে না। আর কয়েক ঘণ্টার জন্য তুমি নেই। শরীর আছে, তুমি ছাড়া। নিজের দেশে, নিজের আইনে, নিজের নিঃশব্দ গোপন শাসনে। তোমার কাছে জবাবদিহি না করেই। এটাই দয়া। সেই পুরোনো শব্দ। কবিরা একসময় যার ওপর ভরসা করত। এখন আর কেউ করে না। দয়া এখন অচল মুদ্রা; বাজারে তার চল নেই। তবু তুমি সেটিকে পকেটে রেখে দিয়েছ, পুরোনো অভ্যাসে আঙুলে ঘোরাও, কখনো কখনো তার ধাতব ঠান্ডা ছুঁয়ে ভাবো, আছে কি এখনও? রাতের দয়া এইরকম। তুমি জানো না, কারণ তা ঘটে তোমাকে ছাড়া। তুমি থাকো না তখন। দয়া তোমাকে পাশ কাটিয়ে ঘটে। হয়তো দয়ার আসল স্বভাবই এ-ই। তোমার অনুমতি ছাড়া, তোমার জ্ঞানের বাইরে, তোমার উপস্থিতিরও অতীত কোনো অন্ধকারে চুপচাপ ঘটে যেতে পারা।

বাম হাত। ধরো, বাম হাত। চাদরের ওপর শুয়ে আছে নিজের মতো। তুমি তাকে টের পাও, ডান হাত দিয়ে ছুঁয়ে নয়, ভেতর থেকে; যেমন দূরের কোনো প্রদেশকে টের পাও। একই সাম্রাজ্যের অংশ, তবু আলাদা, নিজের নিয়মে, নিজের আবহাওয়ায়। বাম হাতের নিজের ওজন আছে, নিজের তাপমাত্রা আছে, নিজের ক্ষুদ্র জীবন আছে। তোমার থেকে আলাদা, তবু তোমার সঙ্গে যুক্ত। কীসে? কোনো সেতুতে, ধরো। কেন্দ্র আর প্রান্তের মাঝখানে যে দীর্ঘ, নির্জন রাস্তা, যেদিকে যাওয়া প্রায় হয়ই না, তবু আছে। যাও বা না যাও, সে সংযোগ থেকে যায়।

পা আরও দূরে। প্রান্তে। কোনো সাম্রাজ্যের শেষ চৌকির মতো। পায়ের কথা প্রায় ভুলেই গেছ। এত দূরে ওরা যে, প্রায় আর তোমার রাজ্যের ভেতরেও পড়ে না। খবর পাঠায় না। দাবি করে না কিছু। শুধু আছে। চুপচাপ, স্থির, সীমানায়। যেখানে শরীর না শেষ হয়, না শুরু হয়। যেখানে চাদরের শুরু, তোমার শেষ। পা-ই তোমার আর বাকি পৃথিবীর মাঝখানের সীমারেখা টেনে দেয়। পা তোমার শেষপ্রান্ত। তোমার শেষ ভূমিখণ্ড। তার পরে শুরু হয় পৃথিবী, যা তুমি নও, কোনোদিন ছিলে না, তোমার হতে চায়ও না, তোমাকে নিয়ে তার বিশেষ কিছু আসে যায়ও না।

পা আর হাতের মাঝখানে বাকি যে-ভূখণ্ড, সেটাই চেনা। পেট, বুক, গলা, মাথা। এরা তোমার রাষ্ট্রের পুরোনো জেলাগুলোর মতো। বছরের পর বছর এদের মধ্যেই থেকেছ। যেমন কেউ ঘর ছাড়ে না, তেমনি তুমি এই অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যেই থেকে থেকে প্রতিটি কোনা, প্রতিটি ফাটল, প্রতিটি দাগ চিনে ফেলেছ। মানচিত্রবিদের মতো। নিজের দেশের পুরোনো, বহুবার ব্যবহৃত একটি মানচিত্রের মতো। পেট তার কারখানা-সমেত চলছে, অন্ধকারে, থেমে না থেকে; তার কাজের শব্দ তুমি শুনতে পাও না, তবু সে চলছে অবিরাম। বুকটা জোরে জোরে ওঠানামা করছে। শ্বাস ঢুকছে, বেরোচ্ছে, আবার ঢুকছে, আবার বেরোচ্ছে, একটানা। গলা সরু পথ, ওপর আর নিচের মাঝের সেই চিরব্যস্ত সীমানা। খাবার নামে, বাতাস ওঠে-নামে, আর মাঝেমধ্যে এক অদ্ভুত শব্দ উঠে আসে, যা কথা হতে পারে, আবার না-ও পারে; উচ্চারণ হতে পারে, আবার নিছক আওয়াজও হতে পারে।

আর মাথা তো রাজধানী। তুমি বসে আছ সেখানে, হাড়ের সিংহাসনে। দুটো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছ। চোখ। ওরা যা দেখায়, তা-ই দেখো। সব কিছু নয়, বেশিরভাগও নয়। অগণিতের মধ্যে এক ক্ষুদ্র অংশ, বেছে নেওয়া, ছেঁকে আনা, অজ্ঞাত কোনো নিয়মে নির্বাচিত। কী মাপকাঠিতে, জানো না। চোখেরও পছন্দ আছে, হাতের মতো, পায়ের মতো। সবার পছন্দ আছে। শুধু তোমার নেই। তোমার কিছু নেই। না বাছাই, না রুচি, না অধিকার।

হৃদয়। মাঝামাঝি কোথাও। ধুকপুক। তোমার জন্য নয়, নিজের জন্য। হৃদয় এক স্বার্থপর অঙ্গ। সবচেয়ে স্বার্থপর। সে শুধু নিজের নিয়ম মানে। আর হয়তো এই কারণেই সে টিকে আছে। বেশি দয়া করলে আগেই ভেঙে পড়ত। সে চলে, চলে, চলেই যায়। থামে না। জিজ্ঞেস করে না। পরামর্শ করে না। চলবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সভা বসায় না। অনুমতি চায় না। ব্যাখ্যাও দেয় না। শুধু চলে।

হৃদয় এক স্বৈরশাসক। শরীরের ভেতরে একমাত্র যার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। নির্দয়ভাবে চালায়। ধুকপুক। তোমাকে ভেতরে টানে, বাইরে ঠেলে দেয়, আবার টানে, আবার ঠেলে। শরীরের মধ্য দিয়ে, রাতের মধ্য দিয়ে, ঘরের মধ্য দিয়ে, জীবনের মধ্য দিয়ে, এক অবিরাম পাম্পের মতো তোমাকে বয়ে নিয়ে যায়। যে-জীবন তুমি চাওনি, যা ফেরত দেবারও কোনো জায়গা নেই। কাউন্টার নেই, রসিদ নেই, ফেরতের দপ্তর নেই, সেই জীবনও হৃদয় তোমার হয়ে টেনে নিয়ে চলেছে। হৃদয় চলে। তুমি চলো সঙ্গে। না চেয়ে। না চাইতে। তবু চলো।

আর ঠিক সেই চলার ভেতরেই, সেই ধুকপুকের অন্তর্গত ফাঁকে, কোনোদিন কি শুনেছ মাঝের নীরবতাটুকু? এক ধুক আর পরের পুকের মাঝখানে যে ক্ষুদ্র স্তব্ধতা, যেখানে হৃদয় যেন সামান্য থামে একবিন্দু অন্ধকারের জন্য, একফোঁটা নীরবতার জন্য, সেই ফাঁকের ভেতরে হঠাৎ যেন পুরো মহাবিশ্ব শূন্য হয়ে যায়। সব শব্দ জিভ গুটিয়ে নেয়, সব গতি নিজের পা থামিয়ে ফেলে, সব আলো একমুহূর্তের জন্য ভাঁজ হয়ে যায়। বিরতিটা ক্ষুদ্র, অথচ তার ভেতরে এক অদ্ভুত অসীমতা আছে; দমবন্ধ, অথচ প্রশস্ত; কিছু নয়, অথচ সেই ‘নয় কিছু’-র ভেতরেই যেন সব কিছু গোপনে জমা আছে।

প্রতিটি ধুক আর পুকের মাঝখানে একটি ক্ষুদ্র মৃত্যু ঘটে, আর তার পরেই ক্ষুদ্র পুনর্জন্ম। মৃত্যু তাড়াহুড়ো করে না; মৃত্যুর কোনো অস্থিরতা নেই। সে ধৈর্যশীল, কারণ সে জানে তোমার ঠিকানা। সে জানে, শেষপর্যন্ত তুমি কোথাও পালাবে না, লুকোবে না, অস্বীকার করলেও তার নাগালের বাইরে যেতে পারবে না। তাই সে প্রতিটি স্পন্দনের ফাঁকে শুধু নীরব মহড়া চালিয়ে যায়। দেখিয়ে দেয়, এভাবেও থামা যায়, এভাবেও শূন্য হওয়া যায়, এভাবেও সমস্ত আলো একমুহূর্তের জন্য গুটিয়ে নেওয়া যায়।

সেই ক্ষণিক থামায় তুমি মরো। বড়ো মৃত্যু নয়, ছোটো মৃত্যু। ক্ষুদ্র, অনুশীলিত, প্রায় অদৃশ্য মৃত্যু। মিনিটে সত্তর বার, বা তার কাছাকাছি, এই গোপন রিহার্সাল চলতেই থাকে। একমুহূর্তের জন্য তুমি নেই; পরের মুহূর্তে আবার ফিরে আসো। মৃত। জীবিত। মৃত। জীবিত। যেন শরীর নিজেই নিজের রিহার্সাল-রুম, যেখানে মরা আর বাঁচা পালা করে মঞ্চে ওঠে, আর তুমি চেয়ারে বসে ভেবে যাও, তুমি একই আছ।

কিন্তু তুমি একই নও। মিনিটে সত্তর বার তুমি বদলে যাচ্ছ। যে-তুমি একমুহূর্ত আগে ছিলে, পরের মুহূর্তে সে আর নেই; তার জায়গায় আরেকজন এসে দাঁড়িয়েছে, এত দ্রুত, এত নিঃশব্দে যে, পার্থক্যটি ধরা পড়ে না। ধারাবাহিকতা বলে যাকে তুমি বিশ্বাস করো, তা হয়তো আসলে দ্রুত প্রতিস্থাপন। একটির পর আরেকটির এসে দাঁড়ানো, এত ঘন, এত মসৃণ যে, ভাঙনটাকেই তুমি একটানা বলে ভুল করো।

ধুক। মৃত্যু। পুক। জীবন। ধুক। মৃত্যু। পুক। জীবন। তারপর বাক্য আটকে যায়। কারণ ভাষা ধারাবাহিকতার ভাষা; আর তুমি বাস করছ বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রে। ভাষা বলে, “আমি” যেন একটি রেখা, একটি জিনিস, একটি অবিচ্ছিন্ন সত্তা; অথচ শরীর বলে, না, তুমি টুকরো, স্পন্দনে স্পন্দনে পুনর্গঠিত, বিরতিতে বিরতিতে মুছে যাওয়া এক ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা।

তুমি ঘরে বসেই মরছ। আলো বদলায়, তার চেয়েও ঘন ঘন তুমি মরছ, জন্মাচ্ছ, আবার মরছ। আর তুমি চেয়ারে বসে ভাবছ, তুমি এক, অবিচ্ছিন্ন, স্থির সত্তা। অথচ একটানা নও তুমি। ঘরে সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন জিনিস তুমিই। টেবিলের দাগও তোমার চেয়ে বেশি ধারাবাহিক, ধূসরও তোমার চেয়ে বেশি স্থির, সমুদ্রের ওপর ছায়া বদলালেও তার বিস্তার অন্তত একটানা মনে হয়। সবচেয়ে টুকরো, সবচেয়ে ভাঙা, সবচেয়ে খণ্ডিত সত্তা তুমি। পাম্পে চালিত শরীরের স্বাভাবিক নিয়মেই, যে নিজেকে অবিচ্ছিন্ন বলে ভেবেছিল, অথচ যার অন্তর্গত কোথাও সত্যিকারের অবিচ্ছিন্নতা নেই।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *