অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান (৭/১)


বিশ্ববিদ্যালয়ের রঙিন জীবনের প্রথম বছর আমার দুঃখ গুনে গুনেই কেটে গেল। দ্বিতীয় বর্ষে যখন উঠলাম, তখন ফলাফল বলছে, আমি আমার অবস্থান থেকে ক্রমশই ছিটকে পড়ে যাচ্ছি। ব্যাপারটা মেনে নেবার মতো নয়।

যারপরনাই অস্থিরতা নিয়েই পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। কিন্তু কিছুদিন পর মনে হতে লাগল, আমার সামনে যেসব বাঘা বাঘা ছাত্র আছে, তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে আমি তুলোধুনো হব। আমার আগে যে-ষষ্ঠপাণ্ডব রয়েছে, তাদের মধ্যে চার জনই আমার নটরডেমিয়ান বন্ধু। বাকি দুই জনের একজন ছিল বগুড়ার, অন্যজন সিলেটের। রসায়ন নিয়ে তাদের ভীষণ উচ্ছ্বাস; অক্সিজেনের মতো গেলে। এমনভাবে পড়াশোনা করে, মনে হয় যেন, কত বছরের পরিচিত পড়া, এখন শুধু রিভিশন চলছে। এসব দেখে আমি রীতিমতো ম্যালেরিয়া রোগী হয়ে গেছি। যতক্ষণ তারা চোখের সামনে থাকে, ততক্ষণ নিশ্চিন্তে থাকি, আড়াল হলেই মনে হয় যেন জ্বর এসে যাচ্ছে শরীরে!

বেশ কিছুদিন বিরতি দিয়ে তাদেরকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। কুয়াশা কেটে ধীরে ধীরে যেমন সূর্য বেরিয়ে আসে, তেমনি আমিও হতাশা থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলাম। জ্ঞানীর সান্নিধ্য প্রতিষেধকের মতো কাজ করে। সেকেন্ড সেমিস্টারে দু-জনকে টপকে গেলাম। দিশেহারা বকরি যেমন রাখালকে দেখে আত্মবিশ্বাস নিয়ে ছুটে আসে, আমিও তেমনি নিজের উপর বিশ্বাস করেই ছুটে চললাম আগামীর পথে। আমি বিশ্বাস করি, দেরি হয়ে যাওয়া মানেই পরাজিত হওয়া নয়, হয়তো আরও ভালো কিছু। জীবন যখন তোমাকে নিয়ে খেলতে চায়, তাকে খেলতে দাও। তুমি নিজের জন্য সময় নাও। একটু ধীরে এগোও। সব থেকে ভালো জবাব তুমি দিতে পারবে নিজের উপর ভরসা রেখে।

রেজাল্ট বেরোলে পরে আমার দুই বন্ধু, যাদের টপকে গেলাম, তারা যারপরনাই অবাক হলো। তাদের অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো, এখন যদি বলা হয় যে, রিভার গড টাইটা চারহাজার বছরের ইতিহাস ফুঁড়ে বের হয়ে এসেছে, তাহলেও বোধ হয় তারা বিশ্বাস করত, তবে এই ফলাফলটা বিশ্বাস করতে পারছে না। আনাফ তো সরাসরি জিজ্ঞেস করেই ফেলল, কী রে দোস্ত, এটা কেমনে কি করলি? ওর প্রশ্ন শুনে মনে হলো, আমি বোধ হয় সপ্তম না, ভর্তিযুদ্ধে সাত-শো-তম হয়েছিলাম! (হলেওবা কী হতো!) যা-ই হোক, ওর প্রতি আমার সারাজীবনের কৃতজ্ঞতা। তাই হেঁয়ালি করে বললাম, গোপন শিষ্য গুরুকে টপকে যায়, বন্ধু!

আমার প্রচণ্ড চেষ্টায় তৃতীয় স্থান অবধি পৌঁছুতে পেরেছিলাম। বাকি দু-জনকে টপকাতে পারলাম না। তারা সৃষ্টিকর্তার এক অপার বিস্ময় ছিল। যা-ই হোক, ইতোমধ্যে নিজের উপর যথেষ্ট পড়াত্যাচার করেছি, এখানেই ইস্তফা দিলাম। আরেকটা কথা, ‘পড়াত্যাচার’-এর ব্যাসবাক্য করার দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম…

এর পরের দিনগুলো খুব একটা হতাশ করেনি আমায়। বেরুনি হলের বকুলতলা, পুরাতন কলার বটতলা, টঙের দোকানে আড্ডা, লোডশেডিংয়ে লাইব্রেরিতে বসে ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় পড়া, কখনোবা বান্ধবীদের সাথে লেকে নৌকো নিয়ে বের হওয়া, কাঠগোলাপের বিনিময়ে প্রেমালাপ করা...ব্যস্! এভাবেই কেটে যাচ্ছিল বর্ণিল সময়গুলো। সেসময় আমাদের একটা ঝোঁক ছিল, সেটা হলো, নিজের ক্যাম্পাসের সাথে অন্যান্য ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের তুলনা করা আর এক্ষেত্রে নিজেদের ক্যাম্পাস নিয়ে বড়াই করা। তবে কাজটা করতে হলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখা জরুরি হয়ে দাঁড়াত। মাঝে মাঝেই আমরা বাক্সপেটরা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। ক্যাম্পাসগুলো ঘুরেফিরে দেখে দুয়েকজন চুক চুক করে সমবেদনা জানিয়ে বলত, এই হলের লোকেশনের সাথে বাগানটা ঠিক মানানসই হলো না। আমাদের জাহানারা ইমাম হলের দিকে তাকালেই এই হলের ত্রুটি বড্ড বেশি চোখে লাগে। জাহানারা হলটা ভাই এককথায় অদ্বিতীয়!

অন্যরা মুখটিপে হেসে তার সাথে আফসোসে যোগ দিতাম।

একদিন সবাই মিলে আমের রাজধানী রাজশাহীতে যাবার পরিকল্পনা করলাম। যেই ভাবা, সেই কাজ। বেরিয়ে পড়লাম মৌমাছির মতো সদলবলে।

উদ্দেশ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ঘোরা আর বিখ্যাত প্যারিস রোডে দৌড়োনো। একবারে পুরো ক্যাম্পাস চষে বেড়ানো সম্ভব ছিল না, তাই বিশেষ কিছু স্থান আর হল চিহ্নিত করলাম। প্রথম দিন আমরা বেরোলাম না, বিশ্রাম নিলাম আর সাথে টুকিটাকি প্ল্যান। রাজশাহীর আবহাওয়া ছিল বেশ। পরদিন মোটরসাইকেল, ক্যামেরা, গিটার আর ছবি আঁকার সরঞ্জাম-সমেত বেরিয়ে পড়লাম ভ্রমণে।

ক্যাম্পাসের কেন্দ্রে প্রশাসনিক ভবন। সেখান থেকে কিছুটা দক্ষিণ-পশ্চিমে সরে গেলে পড়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। লাইব্রেরিগুলো দেখলেই আমার মনে হতে থাকে, সান্টাক্লজের বিশাল এক ঝোলার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, জ্ঞানের এক-একটা মোড়ানো প্যাকেট আছে ওতে। কোনটা রেখে কোনটা যে নেব, দিশেহারা লাগে—অনেকটা দুধ খাব না দই খাব ব্যাপার। শেষে দুই হাঁড়ি নিয়েই বসতে হয়। অত ভেবে কাজ নেই, সদলবলে ঢুকে পড়লাম ঝোলায়। যা সামনে পড়বে, সমানে পকেটে পুরব। ওখানে সীমানা অতিক্রম হয়ে গেলে দু-চারটে গলায় আর পিঠেও বেঁধে নেব; আমি বাপু বাঙালিম্যান আছি! পেয়েছি তো ছেড়ে আসি না, তিলটুকও ঢুকতে না পারুক, যা দেখব স্রেফ পুরে যাব, বাঙালির এই এক জাতস্বভাব বুঝলেন!

তবে একটা ঘটনা বলি শুনুন। গাজীপুর থেকে উলটোপথে নটরডেমে যাবার জন্য বাসে উঠলাম। সেদিন ফিজিক্সের ক্লাসটেস্ট হবার কথা ছিল। বের হবার সময় জেলি দিয়ে দু-টুকরো পাউরুটি গিলে এলাম, ডিম খাওয়ার ইচ্ছে ছিল। মা দিল না, পরীক্ষায় যদি আবার ডিম-ফিম পেয়ে যাই, সেই ভয়ে। হালকা একটু অসন্তোষ নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম একের পাশে ডবল ডিম পাবার আশায়। সে যা-ই হোক, জ্যামের মধ্যে বাসে বসে এসব ভাবছিলাম।

পাশেই, আধপাকা বয়েসের মেছোগোঁফওয়ালা এক ভদ্দরনোক দুধে-কাটা ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবির পেট থেকে, তেল-ঝোল মাখা একের পর এক পুটুলি বের করে চললেন; বুঝলাম, নেমতন্ন খেতে গিয়ে মশাই পেটপুজো, পকেটপুজো দুটোই সেরে এসেছেন।

এ-ই হলো গিয়ে বাঙালির রসবোধ!