বীজমন্ত্র হলো সেই পবিত্র শব্দবিন্দু, যার মধ্যে দেবতার পরিপূর্ণ উপস্থিতি নিহিত থাকে। এটি উচ্চারণে নয়, অনুভবে জাগ্রত হয়—যখন মন নিঃশব্দ হয়ে সেই নাদের সঙ্গে একাত্ম হয়। তখন শব্দ আর শব্দ থাকে না; তা পরিণত হয় শক্তিতে, এবং শক্তি পরিণত হয় আত্মচেতনার দীপ্তিতে।
“শব্দব্রহ্মণি নিষ্ঠা”—এই উক্তিটি এসেছে শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের ১১তম স্কন্ধ, ২১তম অধ্যায়ের ৩৩তম শ্লোক থেকে। এটি সেই গভীর তাত্ত্বিক মুহূর্ত, যেখানে ভগবান কৃষ্ণ স্বয়ং উদ্ধবকে উপদেশ দিচ্ছেন—কীভাবে মানুষ মায়া ও কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে সত্যচেতনার পথে অগ্রসর হতে পারে। শ্লোকটি—
শব্দব্রহ্মণি নিষ্ঠায়া ন শ্রমো ভবতি প্রিয়ঃ।
মায়াব্রহ্মণি নিবিষ্টস্য ন শ্রমো ভবতি প্রিয়ঃ।। (Bhāgavata Purāṇa, 11.21.33)
আক্ষরিক অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়—“হে প্রিয় (উদ্ধব), যে-ব্যক্তি শব্দব্রহ্মে নিষ্ঠাবান, অর্থাৎ যিনি বৈদিক মন্ত্র, দেবনাম বা পবিত্র শব্দরূপে ব্রহ্মচেতনায় স্থিত, তাঁর সাধনায় কোনো কষ্ট থাকে না; তেমনি, যে-ব্যক্তি মায়াব্রহ্মে নিবিষ্ট, অর্থাৎ জাগতিক জগতে আসক্ত, তিনিও নিজের আসক্তির পথে সহজভাবে চলে, এবং তারও সাধনা তাকে কোথাও না কোথাও পৌঁছে দেয়।”
এখানে ‘শব্দব্রহ্ম’ বলতে বোঝানো হয়েছে সেই পরম চেতনা, যিনি শব্দরূপে প্রকাশিত—যেমন বেদ, মন্ত্র, ওঁকার, ঈশ্বরনাম বা পবিত্র নাদ। শাস্ত্র বলে—“বেদা নাদব্রহ্মরূপা”—বেদ কেবল গ্রন্থ নয়; এটি পরম ব্রহ্মের ধ্বনি-প্রকাশ। যিনি সেই শব্দের মধ্যে ঈশ্বরচেতনাকে অনুভব করতে পারেন, তিনিই শব্দব্রহ্মে নিষ্ঠাবান।
“বেদা নাদব্রহ্মরূপা” অর্থাৎ “বেদসমূহ নাদব্রহ্মস্বরূপ”—এটি ভারতীয় দর্শনের এক গভীর দার্শনিক ঘোষণা, যার দ্বারা বোঝানো হয় যে, বেদ কেবল কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং চেতনার আদি ধ্বনির প্রকাশ, ব্রহ্মের নিজস্ব শব্দরূপ। এখানে ‘নাদব্রহ্ম’ মানে হলো সেই অনাদি ও সূক্ষ্ম স্পন্দন বা শব্দচেতনা, যা থেকে সমস্ত সৃষ্টি, ভাষা ও চিন্তার উদ্ভব। “নাদ” অর্থ স্পন্দন বা ধ্বনি, আর “ব্রহ্ম” অর্থ পরম চেতনা; সুতরাং নাদব্রহ্ম মানে সেই পরম চেতনা, যিনি নিজের মধ্যেই ধ্বনিত হয়ে প্রকাশমান।
বেদের প্রকৃতি সম্পর্কিত এই ধারণা খুব প্রাচীন। শাস্ত্র অনুযায়ী বেদ অপৌরুষেয়—অর্থাৎ মানুষের রচিত নয়, অনাদি ও নিত্য। বেদ জন্ম নেয়নি কোনো কালপর্বে; তারা পরম চেতনার নিঃশ্বাসের মতো, নিজে থেকেই স্পন্দিত। এই কারণেই বলা হয়, “ব্রহ্মের শ্বাসই বেদ”—যেমন শ্বাস স্বাভাবিকভাবে ধ্বনি তোলে, তেমনি ব্রহ্মচেতনা নিজেই ধ্বনিতে রূপ নেয়। সেই ধ্বনি-প্রবাহই নাদব্রহ্ম, যার প্রতিধ্বনি বেদরূপে প্রকাশিত হয়েছে।
ভারতীয় চিন্তাধারায় শব্দকে শুধু ভাষার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সত্তার মূলতত্ত্ব হিসেবে দেখা হয়েছে। ভর্তৃহরি তাঁর বাক্যপদীয়ম্-এ বলেছেন, “শব্দতত্ত্বমিদং ব্রহ্ম”—শব্দই ব্রহ্মতত্ত্ব। তাঁর মতে, চেতনা, ভাষা ও বাস্তবতা আলাদা নয়; চেতনা যখন প্রকাশিত হয়, তখন সে ভাষার রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ, “বাক্ই চেতনা”—চেতনার প্রথম অভিব্যক্তি হলো শব্দ। এই ধারণাই পরে তন্ত্র ও শৈব দর্শনে “নাদব্রহ্ম তত্ত্ব” নামে পরিচিত হয়।
“শব্দতত্ত্বমিদং ব্রহ্ম”—এই বাক্যটির অর্থ, “শব্দই ব্রহ্মতত্ত্ব”, অর্থাৎ শব্দ বা ধ্বনি নিজেই সেই চূড়ান্ত সত্য, সেই পরম চেতনা, যিনি সর্বব্যাপী, অনাদি ও অনন্ত। এই ধারণাটি ভারতীয় ভাষাদর্শন ও আধ্যাত্মিক দর্শনের এক মৌলিক স্তম্ভ, যার মূল উৎস ভর্তৃহরির রচিত বাক্যপদীয়ম্ (Vākyapadīya)।
ভর্তৃহরি, যিনি সংস্কৃত ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে পরিচিত, তাঁর বাক্যপদীয়ম্-এ বলেছেন—“শব্দব্রহ্ম তত্ত্বমিদং” (ব্রহ্মকাণ্ড, কারিকা ১)। তিনি এখানে শব্দকে কেবল উচ্চারিত ধ্বনি হিসেবে নন, বরং চেতনার মৌলিক কম্পন বা স্পন্দনরূপ ব্রহ্মচেতনা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, শব্দ, চিন্তা ও বাস্তবতা—এই তিনটি পৃথক নয়; তারা এক ও অভিন্ন। চেতনা যখন নিস্তব্ধ থাকে, তখন তিনি পরব্রহ্ম; যখন কম্পিত হন, তখন তিনি শব্দব্রহ্ম। এইভাবে, শব্দই চেতনার প্রথম প্রকাশ, আর সেই চেতনা থেকেই জগৎ ও ভাবের জন্ম।
ভর্তৃহরি তাঁর অমর গ্রন্থ 'বাক্যপদীয়ম্'-এ (১.১.১২৩) ঘোষণা করেছেন—"শব্দাত্মা হি পরো ব্রহ্ম, তেনাসৌ সর্বগো হ্যজঃ।" এই গভীর উক্তির মাধ্যমে তিনি শব্দকে কেবল ধ্বনিগত অভিব্যক্তি হিসেবে না দেখে, বরং পরম ব্রহ্মের সারসত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মতে, শব্দাত্মাই হলেন সেই পরম ব্রহ্ম, যিনি সর্বব্যাপী, অর্থাৎ যিনি স্থান-কালের উর্ধ্বে সকল কিছুতে বিদ্যমান। তিনি জন্মহীন, কারণ তাঁর কোনো আদি বা অন্ত নেই; তিনি নিত্য, অর্থাৎ চিরন্তন এবং অক্ষয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে শব্দকে কোনো মানবসৃষ্ট বা যান্ত্রিক উপাদান হিসেবে দেখা হয় না। বরং, এটিকে চেতনার এক মৌলিক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শব্দ কেবল ভাষার মাধ্যম নয়, এটিই সেই জীবন্ত সত্তা, যিনি নিজেকে নানা রূপে প্রকাশ করেন। চিন্তা, ভাষা এবং বস্তু— এই তিনটির মধ্য দিয়েই শব্দ তার অস্তিত্ব জানান দেয়। আমাদের ভাবনাগুলো প্রথমে শব্দরূপেই মস্তিষ্কে জন্ম নেয়, তারপর তা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং অবশেষে বস্তুজগতে তার প্রভাব বিস্তার করে। এক অর্থে, শব্দই আমাদের বাস্তবতার নির্মাতা। ভর্তৃহরির এই দর্শন ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্বের এক অমূল্য রত্ন, যা শব্দকে এক আধ্যাত্মিক ও সৃষ্টিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরে।
এই দর্শনের গভীরে আছে নাদব্রহ্ম ও শব্দব্রহ্ম তত্ত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক। তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রে বলা হয়—নাদব্রহ্ম হলো চেতনার অনাহত, অব্যক্ত স্পন্দন, আর শব্দব্রহ্ম হলো সেই স্পন্দনের ব্যক্ত প্রকাশ। যখন চেতনা প্রথম কম্পিত হয়, তখন তা হয় নিঃশব্দ নাদ; সেই নাদই ধীরে ধীরে শব্দে রূপান্তরিত হয়, ভাষায় রূপ নেয়, এবং শেষে জগৎ হয়ে ওঠে। অভিনবগুপ্ত তাঁর তন্ত্রালোক (১.৮৭)-এ এই ধারণাকে ব্যাখ্যা করেছেন—“নাদঃ কুণ্ডলিনী শক্তিঃ প্রণবস্বরূপিণী”—নাদই কুণ্ডলিনীশক্তি, যিনি ওঁকারধ্বনির রূপে প্রকাশিত। অর্থাৎ, শব্দ নিজেই জীবন্ত শক্তি, আর সেই শক্তিই চেতনার রূপ।
এই ভাবধারা উপনিষদগুলিরও মৌলিক শিক্ষা। তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হয়েছে—“শব্দো বৈ ব্রহ্ম”—শব্দই ব্রহ্ম। আবার মাণ্ডূক্য উপনিষদে বলা হয়েছে—“ওঁ ইতি এতদক্ষরং ব্রহ্ম”—ওঁকারই ব্রহ্ম। এই ওঁ-ই সেই আদি নাদ, যেখান থেকে সমগ্র বেদের জন্ম, এবং যেখানে ফিরে গিয়ে সমস্ত শব্দ মিলিয়ে যায়। তাই, ভর্তৃহরির দর্শন আসলে উপনিষদের এই শিক্ষারই দার্শনিক রূপান্তর—যেখানে শব্দই চেতনার উৎস ও গন্তব্য উভয়।
এইভাবে “শব্দতত্ত্বমিদং ব্রহ্ম” কোনো অলংকারিক উক্তি নয়; এটি এক সম্পূর্ণ অদ্বৈত দর্শনের ঘোষণা। এখানে শব্দ ও নীরবতা, চিন্তা ও চেতনা, ভাষা ও বাস্তবতা—সব এক মহা-ঐক্যে গলে যায়। ব্রহ্ম যখন নিঃশব্দ, তখন তিনি অনন্ত; আর যখন নিজেকে প্রকাশ করেন, তখন তিনি শব্দরূপে প্রবাহিত। এই কারণেই ভারতীয় দর্শনে শব্দকে ব্রহ্মরূপে মানা হয়েছে—কারণ শব্দই সৃষ্টি, শব্দই জ্ঞান এবং শব্দই মুক্তি।
“শব্দতত্ত্বমিদং ব্রহ্ম” ঘোষণার মাধ্যমে ভারতীয় চিন্তা জানিয়ে দেয় যে, বাস্তবতা শব্দময় এবং শব্দ চেতনারই দেহ। চেতনা থেকে ভাষা, ভাষা থেকে ভাব, ভাব থেকে জগৎ—এই পুরো প্রবাহের কেন্দ্রে আছে শব্দ, সেই শব্দ যিনি একই সঙ্গে নাদব্রহ্ম ও শব্দব্রহ্ম, অনাহত ও অনাহত, সৃষ্টি ও নীরবতার এক অবিচ্ছেদ্য পরম ঐক্য।
নাদব্রহ্ম ও শব্দব্রহ্ম—এই দুই তত্ত্ব ভারতীয় চেতনা-দর্শনের অন্তর্গত, যেখানে “ব্রহ্ম” বা পরম চেতনা ধ্বনি ও কম্পনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। উভয়েই বলে যে, সৃষ্টির আদি হলো চেতনার কম্পন, কিন্তু এই দুই ধারণার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে—নাদব্রহ্ম হলো সেই আদিস্পন্দন, যেখানে চেতনা প্রথমবার নিজেকে অনুরণিত করে, আর শব্দব্রহ্ম হলো সেই স্পন্দনের প্রকাশিত, অর্থপূর্ণ ধ্বনি-রূপ, যা সৃষ্টিকে ধারণ ও পরিচালনা করে।
নাদব্রহ্ম তত্ত্ব অনুযায়ী, সমগ্র সৃষ্টি এক অনন্ত ধ্বনির তরঙ্গ—যাকে বলা হয় “অনাহত নাদ,” অর্থাৎ অপ্রকাশিত, আঘাতহীন ধ্বনি। এই নাদ কোনো বাহ্যিক শব্দ নয়; এটি চেতনার অন্তর্গত অনুনাদ, সেই মৌলিক স্পন্দন যা “ওঁ” মন্ত্রে প্রতীকীভাবে ধরা পড়েছে। নাদ মানে কম্পন, ব্রহ্ম মানে চেতনা—অতএব নাদব্রহ্ম মানে চেতনার স্পন্দনাত্মক স্বরূপ। যেখানে কোনো ভেদ নেই, কোনো অর্থ বা ভাষা নেই, কেবল চেতনার ধ্বনি-সত্তা, যা সমস্ত জীব ও জগতের অন্তরে অনন্তভাবে প্রবাহিত।
অন্যদিকে শব্দব্রহ্ম তত্ত্বে এই নাদই বহির্মুখ হয়ে ভাষা ও ধ্বনির জগতে প্রকাশিত হয়। শব্দব্রহ্ম মানে চেতনার প্রকাশমান শক্তি, যা নাদের অন্তর্নিহিত কম্পনকে অর্থবোধক শব্দে রূপান্তরিত করে। এখানে চেতনা কেবল নীরব অনুরণন নয়, বরং সক্রিয় প্রকাশ; শব্দব্রহ্ম তাই “অর্থবহ নাদ”—যেখানে স্পন্দন ভাষা, চিন্তা ও রূপে পরিণত হয়।
দার্শনিকভাবে বলা যায়, নাদব্রহ্ম হলো চেতনার কারণরূপ স্তর, আর শব্দব্রহ্ম হলো তার কার্যরূপ স্তর। নাদব্রহ্ম অদৃশ্য, বীজতুল্য, অনুভবযোগ্য কিন্তু অউচ্চারিত; শব্দব্রহ্ম দৃশ্যমান, প্রকাশিত, উচ্চারিত ও কার্যক্ষম। নাদব্রহ্ম যেমন সম্ভাবনা, শব্দব্রহ্ম তেমন বাস্তবায়ন।
উপনিষদ ও তন্ত্র উভয়েই এই দুই স্তরকে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। শিবসূত্র বলে—“নাদান্তরবিন্দু-শক্তি-সৃষ্টি”—চেতনার অন্তর্নিহিত নাদই বিন্দু হয়ে শক্তি সৃষ্টি করে। এই শক্তিই পরে শব্দব্রহ্মে বিকশিত হয়। অর্থাৎ, নাদ হলো ব্রহ্মের নিঃশব্দ নিঃশ্বাস, আর শব্দব্রহ্ম হলো সেই নিঃশ্বাসের উচ্চারিত সুর।
মনোবৈজ্ঞানিকভাবে নাদব্রহ্ম মানে সেই অন্তর্গত ধ্বনি, যা মানুষ গভীর ধ্যানে অনুভব করে—অচিন্ত্য নীরব অনুরণন, যা চিন্তা বা ভাষার আগের স্তরে ঘটে। শব্দব্রহ্ম মানে সেই অবস্থায়, যখন মন সেই অন্তর্নিহিত অনুরণনকে রূপ, ভাব ও ভাষায় প্রকাশ করে। ইউং-এর বিশ্লেষণে নাদব্রহ্ম চেতনার “unmanifest archetypal field”। এটি চেতনার সেই গভীরতম, সুপ্ত স্তর, যা সমস্ত সৃষ্টির আগে থেকেই বিদ্যমান। এটি হলো সেই সম্ভাবনার ভাণ্ডার, যা থেকে সমস্ত দৃশ্যমান বস্তু ও ধারণা উদ্ভূত হয়। এটি সামূহিক অচেতন (Collective Unconscious)-এর সেই স্তর, যেখানে সমস্ত মৌলিক মানবীয় আদিম ছবি বা প্রত্নরূপগুলি (Archetypes) অপ্রকাশিত (unmanifest) বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এটিকে অব্যক্ত প্রকৃতি বা মূল প্রকৃতির সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা পরম শিব (Parama Śiva) বা চৈতন্য (Caitanya)-এর গভীরে নিহিত এবং যা সৃষ্টির উপাদান হিসেবে কাজ করে।
আর শব্দব্রহ্ম সেই ক্ষেত্রের “symbolic articulation”—অচিন্ত্য অনুভবের বোধগম্য প্রকাশ। এখানে "সেই ক্ষেত্র" বলতে বোঝানো হচ্ছে চূড়ান্ত, পরম, এবং অব্যক্ত চেতনার স্তর (unmanifest archetypal)। এই স্তরটি এতই গভীর ও সূক্ষ্ম যে, তা চিন্তার অতীত (Acintya), অর্থাৎ সাধারণ বুদ্ধি বা মনন দ্বারা সরাসরি উপলব্ধি করা যায় না। এই "অচিন্ত্য অনুভব"-কে যখন প্রকাশ করতে হয়, তখন তা "শব্দব্রহ্ম"-এর মাধ্যমে হয়। অর্থাৎ,শব্দব্রহ্ম হলো সেই পরম, অতীন্দ্রিয় (অচিন্ত্য) অনুভূতির একটি প্রতীকী অভিব্যক্তি (symbolic articulation), যা মানুষের বুদ্ধি বা মনের কাছে বোধগম্য করে তোলে।
যেহেতু পরম চৈতন্য (ব্রহ্ম) স্বয়ং অসীম ও উপাধিহীন (অনির্বচনীয়), তাই সাধারণ মানুষের কাছে তা উপলব্ধি করা কঠিন। তাই শব্দব্রহ্ম (যেমন—বেদ, মন্ত্র, প্রণব বা ওঁ-কার) একটি সেতু হিসেবে কাজ করে। এই শব্দগুলি প্রতীকীভাবে সেই অসীম এবং অব্যক্ত সত্যের ইঙ্গিত বহন করে, যার ফলে তা আমাদের চেতনা বা বোধের স্তরে ধরা দেয়।প্রণব (Oṁkāraḥ)-কে এই "symbolic articulation"-এর শ্রেষ্ঠতম রূপ বলে গণ্য করা হয়, কারণ এটি আদিম স্পন্দন রূপে ব্রহ্মকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে।
তত্ত্বগতভাবে নাদব্রহ্ম নিস্তব্ধতার কাছাকাছি, শব্দব্রহ্ম ক্রিয়াশীলতার কাছাকাছি। নাদ হলো অমূর্ত চেতনা, শব্দ হলো সেই চেতনার দৃশ্যমান গতি। নাদব্রহ্মে চেতনা নিজেকে অনুভব করে—“আমি আছি”; শব্দব্রহ্মে সেই চেতনা বলে ওঠে—“আমি প্রকাশিত।”