শৈব কালী: আটত্রিশ



পূর্ববর্তী শ্লোকে বলা হয়েছে—ক্ষর হল সমস্ত জীবসত্তা, যা পরিবর্তনশীল; অক্ষর হল কূটস্থ, অপরিবর্তনীয় সাক্ষীচেতনা। কিন্তু কৃষ্ণ এখানে বলেন, এই দুইয়েরও পরেই এক “উত্তম পুরুষ” আছেন—যিনি ক্ষর ও অক্ষর উভয়েরই আশ্রয়, উভয়েরও কারণ এবং উভয়ের মধ্য দিয়েই নিজেকে প্রকাশ করেন। তিনি হলেন পরমাত্মা, যিনি লোকত্রয়মাবিশ্য—অর্থাৎ তিনটি জগতে প্রবিষ্ট হয়ে—সকলকে ধারণ, পালন ও রক্ষা করেন। তিনি অব্যয়—অপরিবর্তনীয়, তবুও সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যে উপস্থিত; তিনি ঈশ্বর—যিনি চেতনার সর্বব্যাপী শক্তি।

“লোকত্রয়মাবিশ্য”—অর্থাৎ “তিনটি জগতে প্রবিষ্ট হয়ে” (গীতা, ১৫.১৭)—এই বাক্যাংশের মধ্যে এক গভীর অধিবিদ্যক অর্থ নিহিত আছে। এটি কেবল ভৌগোলিক বা পৌরাণিক ধারণা নয়; এটি চেতনার তিন স্তর, অস্তিত্বের তিন পরিসর এবং ব্রহ্মচেতনার তিন মাত্রাকে বোঝায়, যেখানে পরমাত্মা (অর্থাৎ উত্তম পুরুষ) সর্বব্যাপীভাবে প্রতিষ্ঠিত ও সক্রিয়।

প্রথমত, আধিভৌতিক জগৎ—এটি স্থূল বা দৃশ্যমান জগত, যা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধ হয়। এখানে ঈশ্বর বা পরমাত্মা প্রকৃতির রস, বায়ুর গতি, অগ্নির উষ্ণতা, জলের স্নিগ্ধতা, পৃথিবীর স্থিতি হিসেবে প্রকাশিত। কৃষ্ণ গীতায় বলেছেন—পুণ্যো গন্ধঃ পৃথিব্যাং চ তেজশ্চাস্মি বিভাবসৌ। জীবনং সর্বভূতেষু তপশ্চাস্মি তপস্বিষু।। (গীতা, ৭.৯) অর্থাৎ, "আমি পৃথিবীতে পুণ্য গন্ধ (স্বচ্ছতা) এবং অগ্নিতে তেজ (আলো/তাপ) হই। আমি সমস্ত প্রাণীর জীবন এবং তপস্বীদের মধ্যে তপস্যা হই।"—আমি পৃথিবীর গন্ধ, অগ্নির দীপ্তি।

এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ “অহং সর্বত্র” বা “আমি সর্বত্র আছি”—এই সত্যটি প্রকাশ করছেন। তিনি বলছেন—“আমি পৃথিবীর পবিত্র গন্ধ, অগ্নির তেজ, প্রাণের জীবনশক্তি এবং তপস্বীর তপস্যা”—অর্থাৎ, সব কিছুর মধ্যে যে-চেতনা বিদ্যমান, সেটিই পরমাত্মা বা ব্রহ্ম।

এখানে “গন্ধ”, “তেজ”, “জীবন” ও “তপস্যা”—এই চারটি উদাহরণ জগতের চার স্তরের প্রতীক: বস্তু (পৃথিবী), শক্তি (অগ্নি), প্রাণ (জীব) ও চেতনা (তপস্যা)। ভগবান দেখাচ্ছেন, এই সব স্তরের ভিতর দিয়ে একটিই চেতনা প্রবাহিত—ব্রহ্ম। পৃথিবীতে যে-সুবাস, অগ্নিতে যে-দীপ্তি, প্রাণে যে-জীবন, তপস্বীর অন্তর্গত যে-সাধনা—সবই সেই এক ব্রহ্মচেতনার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশমাত্র।

অদ্বৈতের দৃষ্টিতে এই উপলব্ধিই জ্ঞানের সারাংশ—যেখানে দেখার ও দেখা-যাওয়ার, কর্তা ও কর্মের, জগৎ ও ঈশ্বরের কোনো ভেদ থাকে না। সবই ব্রহ্মের অভিব্যক্তি, তাই শ্লোকটি আত্ম-উপলব্ধির ঘোষণা: “যা-কিছু দেখছি, যা-কিছু অনুভব করছি, সবই আমার নিজের পরম স্বরূপ।” অর্থাৎ, পরম চেতনা এই জগতে প্রতিটি উপাদানের মধ্যে কার্যশক্তি হিসেবে বিরাজমান। আমরা যা দেখি, স্পর্শ করি, ভোগ করি—সবই তাঁরই স্থূল প্রকাশ।

দ্বিতীয়ত, আধিদৈবিক জগৎ—এটি সূক্ষ্ম শক্তির স্তর, যেখানে দেবতাতত্ত্ব, তত্ত্বশক্তি এবং প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণনীতি সক্রিয়। এটি সেই স্তর, যেখানে শিব-শক্তির লীলা মহাজাগতিক শক্তি হিসেবে প্রকাশিত। কাশ্মীর শৈব দর্শনে এটিই স্পন্দক্ষেত্র—চেতনার কম্পন, যা প্রকৃতিকে সচল করে। অভিনবগুপ্ত বলেন, “দেবতা মানে চিদ্রূপ শক্তির কার্যপ্রকাশ।” ঈশ্বর এখানে স্রষ্টা নন, বরং অন্তর্নিহিত চেতনা, যিনি প্রতিটি গতি ও সৃজনের অন্তরে নিজেকে প্রতিফলিত করেন।

তৃতীয়ত, আধ্যাত্মিক জগৎ—এটি অন্তর্জগত, মানুষের মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার ও আত্মচেতনার ক্ষেত্র। এখানে ঈশ্বর পরম অন্তর্যামী—যিনি প্রত্যেক জীবের হৃদয়গুহায় বিরাজমান। ভগবান বলছেন, “ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি। ভ্রাময়ন্ সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।।” (গীতা, ১৮.৬১) অর্থাৎ, হে অর্জুন ! পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থান করছেন এবং সমস্ত জীবকে দেহরূপ যন্ত্রে আহরণ করিয়ে মায়ার দ্বারা ভ্রমণ করান।—প্রত্যেক হৃদয়ের মধ্যেই ঈশ্বর বসবাস করেন। তিনি চিন্তা, ইচ্ছা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সাক্ষী; তিনি কখনও পরিবর্তন হন না, কেবল পর্যবেক্ষণ করেন।

ঈশ্বর কোনো বহিরাগত “পরিচালক” নন, বরং প্রতিটি জীবের হৃদয়ে অবস্থানকারী পরম চেতনা স্বয়ং। “হৃদ্দেশে তিষ্ঠতি”—এর অর্থ, তিনি মন বা হৃদয়ের গভীরে “সাক্ষীচেতনা”রূপে বিরাজ করছেন, যিনি প্রত্যেকের চিন্তা, অনুভব ও কর্মের নীরব সাক্ষী।

“যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া”—এই অংশটি বোঝায়, দেহ, ইন্দ্রিয়, মন—এ সবই ঈশ্বরচেতনার উপর আরোপিত মায়াময় যন্ত্রমাত্র। জীব সেই চেতনারই বিকিরণ, কিন্তু মায়ার প্রভাবে নিজেকে পৃথক “আমি” বলে ভাবে। ফলে সে কর্মফল, আকাঙ্ক্ষা ও সংস্কারের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ভ্রমণ করে।

অদ্বৈতের দৃষ্টিতে, ঈশ্বর, জীব ও জগৎ—এই তিন ভিন্ন নয়। ঈশ্বরই নিজের মায়াশক্তির দ্বারা জগৎ সৃষ্টি করে, নিজের মধ্যেই জীবরূপে প্রকাশ পেয়ে আবার নিজের মধ্যেই লয়প্রাপ্ত হন। শঙ্করাচার্যের ভাষায়, “ঈশ্বরো জীব ইত্যেকং ব্রহ্মৈব নাপরঃ”—ঈশ্বর ও জীব উভয়ই ব্রহ্মচেতনার রূপান্তর।

ভগবান এখানে অর্জুনকে শেখাচ্ছেন—দেখো, তুমি আলাদা নও। তোমার অন্তরে যে-চেতনা, সেটিই সমগ্র বিশ্বে প্রবাহিত ঈশ্বরচেতনা। তুমি যন্ত্র নও, বরং যন্ত্রের ভিতর বসে-থাকা চৈতন্য। এই উপলব্ধি হলেই কর্মের বন্ধন ছিন্ন হয় এবং জীব নিজের অন্তর্গত ঈশ্বরত্ব উপলব্ধি করে। মায়া ভ্রমণ করায়, কিন্তু চেতনা কখনও ভ্রমণ করে না—সে সর্বদা স্থিত, সর্বত্র এক।

অদ্বৈত বেদান্ত এই তিন জগৎকে চেতনার তিন অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে—জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি। জাগ্রত অবস্থা অধিভৌতিক জগৎ, যেখানে মানুষ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে জগতকে উপলব্ধি করে; স্বপ্ন অবস্থা আধিদৈবিক স্তর, যেখানে চেতনা নিজের সূক্ষ্ম জগতে ক্রিয়া করে; এবং সুষুপ্তি অবস্থা আধ্যাত্মিক স্তর, যেখানে চেতনা নিজের মধ্যেই লীন। কিন্তু এই তিনেরও ঊর্ধ্বে আছে “তুরীয়”—চতুর্থ অবস্থা—যেখানে চেতনা জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তির সীমা অতিক্রম করে নিজের শুদ্ধ ব্রহ্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষ্ণের “উত্তম পুরুষ” আসলে এই তুরীয় স্তরেরই প্রতীক—যিনি এই তিন জগতে প্রবিষ্ট থেকেও তাঁদের অতীত, তাঁদের উৎস।

কাশ্মীর শৈব দর্শনে এই “লোকত্রয়” আবার ব্যাখ্যা করা হয় চেতনার তিন স্তর হিসেবে—শক্তি, শিব ও ঐক্য। শক্তি মানে বহির্মুখ প্রকাশ বা সৃষ্টি, শিব মানে নিস্তরঙ্গ স্থিতি, আর ঐক্য মানে প্রকাশ ও স্থিতির একত্ব। ঈশ্বর এই তিন স্তরেই বিরাজমান—সৃষ্টির রূপে বহির্মুখ, শক্তির রূপে সূক্ষ্ম, আর আত্মরূপে নিস্তব্ধ। অভিনবগুপ্ত বলেন, “লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্তি”—এই প্রবেশ মানে ঈশ্বরের “চিদানন্দ স্পন্দ”-এর সর্বত্র প্রসারণ।

“লোকত্রয়” কোনো স্থানিক ধারণা নয়; এটি অস্তিত্বের পূর্ণ পরিসর—বাহ্য, সূক্ষ্ম ও অন্তর—যেখানে ঈশ্বর সর্বত্র, সর্বকালে, সর্বভাবে অবস্থান করেন। আধিভৌতিক জগতে তিনি সত্তা, আধিদৈবিক স্তরে তিনি শক্তি, আর আধ্যাত্মিক স্তরে তিনি আত্মা। এই তিন স্তর মিলিয়েই পরম চেতনার লীলা, আর “উত্তম পুরুষ” হলেন সেই চিরন্তন আত্মা, যিনি তিন জগতের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেও তাঁদের সকলের ঊর্ধ্বে স্থিত। তিনি স্থির, কিন্তু গতি দেন; নির্লিপ্ত, কিন্তু পালন করেন; নীরব, কিন্তু প্রতিধ্বনিতে ভরে ওঠে সারা-সৃষ্টিজগৎ।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে, এই “উত্তম পুরুষ” বা পরমাত্মাই প্রকৃত ব্রহ্ম—যিনি ক্ষর ও অক্ষর উভয় অবস্থাকেই অন্তর্ভুক্ত করেন। শঙ্করাচার্য ব্যাখ্যা করেন, ক্ষর পুরুষ হল অহংকারবদ্ধ জীব, অক্ষর পুরুষ হল অব্যক্ত অবিদ্যা বা ‘মায়া-সংক্রান্ত সাক্ষীচেতনা’, আর উত্তম পুরুষ হল সেই ব্রহ্ম, যিনি এই দুই স্তরেরও অতীত—নিরুপাধিক, নিরবয়ব, শুদ্ধ চৈতন্য। তিনি একাধারে আত্মা ও ঈশ্বর—অদ্বৈতের একক বাস্তবতা। এই অবস্থায় কোনো দ্বৈততা থাকে না—না জ্ঞাতা, না জ্ঞান, না জ্ঞেয়; কেবল আত্মস্বরূপ চেতনারই দীপ্ত প্রকাশ। এই চেতনা মায়ার আচ্ছাদনে ক্ষররূপে প্রকাশিত হয়, মায়ামুক্ত অবস্থায় অক্ষররূপে স্থিত হয়, আর নিজের পূর্ণ চৈতন্যরূপে উত্তম পুরুষরূপে প্রকাশিত হয়।

কাশ্মীর শৈব দর্শনের ব্যাখ্যায়, এই উত্তম পুরুষই পরম শিব, যিনি একই সঙ্গে প্রকাশ (নিষ্ক্রিয়, স্থির চেতনা) ও বিমর্শ (গতি, শক্তি)-এর ঐক্যময় উৎস। অভিনবগুপ্ত এই স্তরকে বলেন “অনুত্তর”—যার ওপরে কিছুই নেই, যা সমস্ত অভিব্যক্তি ও নিস্তব্ধতার পরম ভিত্তি। এই পরম শিবই “লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্তি”—অর্থাৎ, তিন জগতে—আধিভৌতিক (বাহ্য জগৎ), আধিদৈবিক (শক্তির জগৎ) ও আধ্যাত্মিক (অন্তর্জগৎ)—একসাথে বিদ্যমান। তিনি কেবল পালন করেন না; তিনি নিজেই সব রূপে প্রবিষ্ট—প্রত্যেক আত্মা, প্রত্যেক স্পন্দ, প্রত্যেক ভাব, প্রত্যেক কণিকায় তাঁরই স্বরূপ প্রকাশিত। এই সর্বব্যাপ্ত উপস্থিতিই ঈশ্বরত্ব।

শাক্ত দর্শনে, এই “উত্তম পুরুষ” রূপেই কালী বা মহাশক্তির পরম ঐক্য প্রকাশ পায়। ক্ষর পুরুষ হল তাঁর লীলাময় সৃষ্টি—চলমান জগৎ; অক্ষর পুরুষ হল তাঁর স্থির চেতনা—শিবতত্ত্ব; আর উত্তম পুরুষ হল সেই পরম ঐক্য, যেখানে শিব ও শক্তি অবিচ্ছেদ্য। কালী এখানে কেবল ধ্বংসকারিণী নন; তিনি পরমাত্মা—যিনি সৃষ্টির মধ্য দিয়েই চেতনার সর্বব্যাপ্ত ঐক্য প্রকাশ করেন। তাঁরই অন্তরলীলায় “ক্ষর” (প্রকাশ), “অক্ষর” (স্থিতি) ও “উত্তম পুরুষ” (অদ্বৈত ঐক্য)—এই তিন স্তর অবিচ্ছিন্ন ধারায় প্রবাহিত।

মনস্তাত্ত্বিক স্তরে, এই তত্ত্ব মানুষকে শেখায়, জীবনের পরিবর্তনশীলতা (ক্ষর) ও আত্মার সাক্ষিত্ব (অক্ষর) উভয়ই এক পরম ঐক্যচেতনার প্রকাশ। মানুষের অস্তিত্বে যেমন চিন্তা ও অনুভূতি পরিবর্তনশীল, তেমনি তার গভীরতম স্তরে এক অপরিবর্তনীয় সচেতনতা সর্বদা উপস্থিত থাকে। “উত্তম পুরুষ” মানে সেই অবস্থা, যেখানে মানুষ এই দুই স্তরকেও অতিক্রম করে—নিজেকে আর কেবল মন বা আত্মার সীমায় নয়, সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম বলে অনুভব করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে যাকে বলে “peak experience” বা “cosmic consciousness”—গীতার এই পরমাত্মা-চেতনা ঠিক সেই উপলব্ধিরই শাস্ত্রীয় রূপ।

“উত্তমঃ পুরুষঃ” আসলে সেই চেতনা, যিনি ক্ষর ও অক্ষর উভয়কেই ধারণ করেন, কিন্তু তাতে আবদ্ধ নন। তিনি একাধারে শিব ও কালী, ব্রহ্ম ও মায়া, প্রকাশ ও প্রতিসংহৃতি। তিনি সব জগতে প্রবিষ্ট, তবু সব জগতের অতীত; তিনি কর্মেও আছেন, আবার কর্মের ঊর্ধ্বেও। তাঁরই কণ্ঠে যেন গীতার পরম সত্য উচ্চারিত হয়—“আমি ক্ষর, আমি অক্ষর, আমি তৎসর্বোত্তম—যিনি মৃত্যুতেও অমৃত।” এই পরমাত্মাই শিব, কালী বা ব্রহ্ম—যিনি একসঙ্গে চলমানও, স্থিরও; সৃষ্টিকর্তাও, সংহারকারিণীও; ক্ষরও, অক্ষরও—তবুও সব দ্বৈততার অতীত।

যা সৃষ্টি হয়েছে, তার লয়ও নিশ্চিত; আর সেই লয়েই শান্তি। কালীর হাসি সেই চূড়ান্ত নিশ্চয়তার প্রতিধ্বনি—যেখানে ধ্বংস কোনো আতঙ্ক নয়, বরং শুদ্ধ চেতনার উদ্‌ভাস। কাশ্মীর শৈব দর্শন-মতে, এই ভঙ্গি “প্রকাশ” ও “বিমর্শ”-এর ঐক্যরূপ প্রতীক। শিবের নিস্তরঙ্গ স্থিতি (প্রকাশ) ও শক্তির স্পন্দমান গতি (বিমর্শ) যখন একত্রে মিলিত হয়, তখনই ঘটে “ভয়ঙ্কর লীলা”—যেখানে চেতনা নিজের মধ্যেই সৃষ্টি ও সংহারের খেলা খেলে। এই “ভয়ঙ্কর লীলা” আসলে মহাসৌন্দর্যের প্রকাশ, কারণ ধ্বংসই নবসৃষ্টির প্রস্তুতি। শৈব দর্শনের “স্পন্দতত্ত্ব” বলছে—“যত্র বিশ্বং ভবতি এক নিঃশ্বাসে”—যে এক নিঃশ্বাসে বিশ্ব সৃষ্টি ও লয় লাভ করে, সেই এক স্পন্দই কালীর নৃত্য। তাঁর ভঙ্গি তাই মহাকাশের ছন্দে কম্পমান চেতনার প্রতীক—যেখানে শিবের নীরবতা ও শক্তির নৃত্য এক অখণ্ড ঐক্যে মিশে যায়।

তাঁর কপালে রক্তবিন্দু বা ত্রিপুণ্ড্র—এই দুই প্রতীক—সংহার ও সৃষ্টির চিরন্তন চক্রকে নির্দেশ করে। রক্তবিন্দু মানে জীবনের উৎসশক্তি, প্রজননের ও চেতনার একত্রিত কেন্দ্র—যেখানে মৃত্যু ও জন্ম একাকার। এটি শক্তির বীজ (bindu), যেখান থেকে বিশ্ব-লীলার উন্মেষ ঘটে। ত্রিপুণ্ড্র, অর্থাৎ তিনটি অনুভূমিক রেখা, প্রতীক তিনগুণ—সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ—যার দ্বারা জগতের সমস্ত ক্রিয়া পরিচালিত হয়। কিন্তু তাঁর কপালে এই তিনরেখা আসলে “অতিক্রম”-এর প্রতীক—যেখানে দেবী নিজে এই তিন গুণের ঊর্ধ্বে অবস্থান করছেন।