অচেনা মানুষ আমার ভয় করে। চেনা মানুষ যখন কঠিন স্বরে কথা বলে, তখন আমার তাকে অচেনা লাগে। কঠিন স্বর কানে এলে মনে হয় যেন কেউ একজন হাতুড়ি দিয়ে আমার চামড়া-মাংস-হাড় ফুটো করে নির্দয়ভাবে পেরেক ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমার ধমনী ফেটে চৌচির হয়ে চারিদিকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। সেই রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে আমার সমস্ত বোধ, সমস্ত অস্তিত্ব। আমি পাগল হয়ে যেতে থাকি, কঠিন কঠিন কথার কিছুই আমার কানে ঢোকে না; তবু আমি কিছু বলি না, চুপ করে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।
সেই তীব্র যন্ত্রণার সময়ে আমি অধীর হয়ে একজোড়া চোখ খুঁজতে থাকি, যে চোখদুটো আমাকে একটু হলেও স্বস্তি দেবে, আমার মনে হবে, কেউ যেন বলছে, ভয় নেই, আমি আছি। এই মেঘ কেটে যাবে, একটু স্থির থাকো। অপেক্ষা করলে কষ্ট কমে যায়। বোধশূন্যতাই বোধের জন্ম দেয়।
কেন এমন হয়? আমার আবেগ বেশি? না কি আমি খুব সংবেদনশীল? না কি আমি ভুল মানুষের কথাও মন দিয়ে শুনতে চাই বলেই অমন হয়? না কি যা নিয়ে ভাবতে হয় না, তা নিয়েও ভাবি বলেই অত কষ্ট হয়? আমার অচেনা মানুষ ভয় করে, চেনা মানুষ অচেনা মানুষের মতো আচরণ করলে আমার খুব ভয় করে।
যখন ওরকম অবস্থায় আমি ক্রমশ অন্ধকারে তলিয়ে যাই আর যেতেই থাকি, তখন আমার আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান সব এক এক করে হারিয়ে যেতে থাকে। ঠিক ওই মুহূর্তে কেউ যেন কাছে এসে কানে কানে বলে, তুমি যা ঘটছে বলে ভাবছ, তা ঘটছে না; তুমি যা শুনছ বলে ভাবছ, তা কেউ বলছে না; তুমি যা দেখছ বলে ভাবছ, তা আদৌ কোথাও নেই। দেরি হয়ে যাবার আগেই এইসব ভাবনা থেকে পালিয়ে যাও। না পালাও যদি, তবে তোমাকে সেই দানব এসে কিছু বুঝে ওঠার আগেই গ্রাস করে ফেলবে, যে দানবের জন্মই এখনও হয়নি।
বলেই সে বিকট শব্দে হাসতে থাকে। সেই হাসির শব্দে যেন কানে তালা লেগে যায়! আমি তাকে হাসতে দিই, থামাই না। এর নাম অনুশোচনা নয়, এর নাম নিজেকে চেনার চেষ্টা। ভয় যখন ছেয়ে ফেলে, তখন সেখান থেকে বেরোতে চাইলে ভয়কে নয়, বরং ভয়ের উৎস থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে হয়। ভয়ের উৎস চেনার জন্য আমি ভয় থেকে বেরিয়ে যাবার রাস্তা খুঁজি কিংবা ভয় সহ্য করে বাঁচতে শিখি।
আমি মানুষকে কঠিন স্বরে কথা বলতে দিই। আমি চেনা মানুষকে অচেনা হতে দিই। আমি কখনও কখনও ভয় পেতে ভালোবাসি। মানুষ চিনতে এবং নিজেকে বুঝতে আমার এই নীরব মৃত্যুর দরকার পড়ে। এই নীরবতার অর্থ দুর্বলতা নয়; বরং এর অর্থ, জিতিয়ে দিয়ে জিতে যাওয়া।
কঠিন স্বরের পেরেক
লেখাটি শেয়ার করুন