গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: চার



ঢাকার কথা, সেটা পরের ধাপ, শুরুর দিকে। মনে হয়েছিল, কেউ না দেখলে আমি নেই-ই। কোনো চোখ না পড়লে আমি মুছেই যাই, থাকাটা বন্ধ হয়ে যায় দেখা বন্ধ হলে। পর্দা টানলে, ভারী কাপড়, ধুলো ঝরে পড়ল হাতে-মুখে, শুকনো ঝাঁঝ গলায় ঢুকে কাশি উঠল, চোখ জ্বলল। অন্ধকার নামল ঘরে।

দুপুরের অন্ধকার, মিথ্যে রাত। অন্ধকারে চিৎ হয়ে বা কাত হয়ে ভাবছিলে, আমি যদি না দেখি, তাহলে আমি নেই বোধ হয়, কোনো চোখ না পড়লে মুছে যাই। চেষ্টা করেছিলে তো—অন্ধকারে চোখ বুজে, না দেখে, দেখা না হয়ে। মুছে যাবার চেষ্টা, শূন্য হবার চেষ্টা।

কিন্তু মুছে যাওনি, কিছুতেই না। অন্ধকারেও শরীর চলল, হৃৎপিণ্ড চলল, ফুসফুস চলল। আর দেখাটাও, চোখ বোজা সত্ত্বেও ভেতরের চোখ, চোখের পেছনের সেই চোখ, দেখে যেতে লাগল। তোমাকে, অন্ধকারে, না-থাকার চেষ্টায় হাতে-পায়ে ধরা-পড়া তোমাকে, কারণ দর্শক তো তখনও জেগে, তোমাকে দেখছে অন্ধকারেও, আর যতক্ষণ সে দেখে, ততক্ষণ তুমি আছ, দেখা হওয়া মানেই তো থাকা।

দর্শক দেখা বন্ধ করবে না। এই জানাটাই রাত তিনটেয় জাগিয়ে তোলে, ঘাম দিয়ে, বুক ধড়ফড় করে এই জানায় যে, তুমি হয়তো কোনোদিন শেষ হবে না, চোখ বন্ধ হবে না কোনোদিন, অন্ধকারেও পর্দা টানা থাকলেও ভেতরের চোখ জেগে থাকবে। তোমাকে ধরে রাখবে থাকায়, হাত যেমন ধরে রাখে পাথর, যা তোলার ইচ্ছে ছিল না।

দেখা হচ্ছ, সুতরাং আছ, ইচ্ছের বিরুদ্ধে। চোখ ধরে আছে তোমাকে, থাকায়, ছাড়বে না।

চেষ্টা তো করেছ, চোখের হাত থেকে বাঁচতে, পালিয়েছ—ঘর থেকে নয়, ঘরের ভেতরেই, দেখা থেকে পালানো। আয়না তোয়ালে দিয়ে ঢেকেছ, যা শুকোতে শুকোতে শক্ত হয়ে গেছে কাচের ওপর, কুকুরকে দেয়ালমুখো ঘুরিয়ে দিয়েছ, যাতে কাচের চোখে তোমাকে ধরতে না পারে।

পর্দা টেনেছ, যাতে জানালা তোমায় না দেখে, প্রতিটি তল ঢেকেছ, যেখানে তোমার ছবি ফিরে আসতে পারে, ধরা পড়তে পারে, আটকে গিয়ে দেখা হয়ে যেতে পারে, দেখার মধ্য দিয়ে থাকায় জিইয়ে রাখতে পারে তোমাকে।

ঘরময় ঘুরেছ। ঢাকতে ঢাকতে, ঘোরাতে ঘোরাতে, বন্ধ করতে করতে। কুকুর, টিয়া, কাচ, জানালা, কেটলি পর্যন্ত ঢেকেছ। কেটলিও সাক্ষী, কেটলিও দেখেছে। কেটলি, যার একমাত্র অপরাধ তার পেটে জল টগবগ করা, যার গায়ে একটা বাঁকানো মুখ ভেসে ওঠে তোমার, আবার তোমার নয়। সব ঢেকে শেষমেশ বসেছ চেয়ারে, ঢাকা ঘরে, যেখানে কোনো কিছু তোমায় দেখতে পারে না, চোখ পড়ার কোনো উপায় নেই।

একটা মুহূর্তের জন্য মনে হলো, হয়েছে, মুক্ত। কোনো চোখ নেই, দেখা থেকে ছাড়া পেয়েছ।

আর তখনই, সেই চোখ, ভেতরেরটা, যেটাকে কোনো তোয়ালে ঢাকতে পারে না, যেটার কথাই ভুলে গিয়েছিলে, যেটা তোমার নিজের চোখের পেছনে বসে ভেতর থেকে বাইরে চেয়ে আছে শুরু থেকে। ঢাকার পেছনে, বন্ধ করার পেছনে, পালানোর তলায়। যে-চোখ থেকে পালাচ্ছিলে, সেটা তো সবসময়ই ভেতরে ছিল, তোমার মধ্যেই, তুমি নিজেই, যাকে ঢাকা যায় না, দেয়ালে ঘোরানো যায় না, বন্ধ করা যায় না।

যে ভেতর থেকে দেখে আর যার কাছ থেকে পালানোর জায়গা নেই কোথাও, কারণ সে তুমিই আর তুমি সে-ই। পালানো আর দেখা একই জিনিস, যে পালাচ্ছে, সে-ই দেখছে, লক্ষ্য আর চোখ এক, হাসির মতো ব্যাপার, হাসতে পারলে ধাওয়া-করা আর ধাওয়া-খাওয়া এক।

নিজের কাছ থেকেই পালাচ্ছিলে ঘরময়, জিনিসপত্র ঢাকতে ঢাকতে, দেয়ালমুখো করতে করতে, আর যে-নিজটা থেকে পালাচ্ছিলে, সে তোমার সঙ্গে সঙ্গেই ছিল ভেতরে, বাইরে তাকিয়ে। দেখে যাচ্ছে, সে তোমাকে থাকায় ধরে রাখছে। সেই দেখা দিয়ে, যা তুমি নিজে, যা তুমিই, যা থামবে না।

একটা-কিছু চলছে নিজের গতিতে, এটুকু জানো, সবসময়ই চলছিল, চলবে। তোমার জানা আর পরোয়া-করা যেদিন শেষ হবে, তার অনেক পরেও কিছু-একটা চলতেই থাকবে নিজের মতো, তোমাকে না জানিয়ে, তোমাকে ছাড়া।

ফাঁকটাই তো অবস্থা, এর বাইরে কিছু নেই। ভাগ হয়ে থাকার অবস্থা, চিরকাল, নিজের থেকে নিজের দ্বারা। যে করে আর যে দেখে, চিরকাল আলাদা, চিরকাল একসঙ্গে একই খুলিতে। দু-জন যেখানে একজন হওয়া উচিত ছিল, বা একজন যেখানে কেউ-নয়।

থামার আগে কী ছিল? চাকরি ধরো, অফিস বা কাউন্টার বা ডেস্ক, খুঁটিনাটি ছাড়ো, এমন কিছু, যেখানে ঠিক সময়ে হাজির হতে হতো। অপরাধ ছাড়া শাস্তি।

আর অন্য সময়ে বেরোতে, মাঝখানে কাজ, কী ধরনের, তা এসে যায় না, ফাইল গোনা উত্তর দেওয়া চুপচাপ বসে থাকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিনের পর দিন। কাজ করতে আবার কাজ করতে, এরকম।

কাজের আসল কাজটা ছিল ফাঁক ভরানো। বাইরের কাজ নয়, গোপন কাজ, যে করে আর যে দেখে, তাদের মধ্যেকার ফাঁকটা ভরিয়ে রাখা, দর্শককে ব্যস্ত রাখা, ঘোরে রাখা, ভুলিয়ে রাখা, এতটাই ব্যস্ত করে রাখা যে, সে ভুলে যাবে, নিজেকে দেখতে দেখতে বসে আছে।

পুরোনো কৌশল। কাজ, উদ্দেশ্য, মানে। সবই এই ফাঁক-ভরানোর হাতিয়ার। আর তুমি থামলে, কাজ ফুরোল, দর্শকের দেখার কিছু রইল না নিজেকে দেখা ছাড়া। দেখছে নিজেকে দেখতে, দেখছে দেখতে, দেখছে…মাথা ঘোরে, নিচে আর নিচে নামতে থাকে ফাঁকে, যার তলা নেই, স্বপ্নের সেই অন্ধকার করিডোরের মতো, যা শেষ হয় না, যার দেয়ালে হাত ছোঁয়ালে ঠান্ডা লাগে, স্যাঁতসেঁতে।

যেদিন আর গেলে না, সেদিনটা বাকি দিনগুলোর মতোই ছিল, শুধু সেদিন গেলে না। পা ওঠেনি, বা পা ওঠার দরকার মনে হয়নি। পরের দিনও না, তার পরের দিনও।

দেখা গেল, কাজ তোমাকে চায়নি, কোনোদিনই চায়নি। অন্যরা করে ফেলল, ছিলই ওরা তোমার পাশে, তোমারটাও গিলে নিল সহজে, যেন ছিলেই না তুমি, খেয়ালও করেনি।

সমুদ্র যেমন চুপচাপ পাথর শুষে নেয়, মিলিয়ে যায় তার ওপর। চিহ্ন নেই, ঢেউ নেই, স্মৃতি নেই। সমুদ্র পাথর মনে রাখে না, কাজের জায়গা তোমাকে মনে রাখে না।

মিলিয়ে গেছ নিঃশব্দে না-থাকায়, চিরকালই তোমার এটাই ভাগ ছিল পৃথিবীতে। না-থাকার আকৃতির ভাগ তোমার ছায়ার মাপে কাটা জন্মের আগে থেকে তোমার জন্য রাখা। এখন সেটা পুরোপুরি দখল করেছ, যেমনটা সবসময়ই করার কথা ছিল।

আর ব্যাপারটা কী ছিল তাহলে? থামা? এটাকে কী বলবে? একটা মানুষের ভেঙে পড়া, যে আর পারছিল না, না কি একটা মানুষের সত্যিকারের প্রথম দেখা, যে এতদিন অন্ধ ছিল? ক্ষতি না আবিষ্কার? চলা কি সুস্থতা ছিল আর থামা অসুস্থতা, না কি চলাটাই রোগ ছিল আর থামাটা সুস্থ হওয়া? বলতে পারো না। চেষ্টা করেছ, চেয়ারে ধূসরে বসে বসে ঠিক করতে ঠিক কোনটা। পারো না, কারণ থামার মধ্যে দুটোই আছে। ক্ষতিও আবিষ্কারও, ভেঙে পড়াও দেখতে পাওয়াও, পতনও পৌঁছোনোও, একই মুহূর্তে একই শ্বাসে।

চেয়ারে এসে পড়েছিলে। পড়াটাই পৌঁছোনো ছিল। পতনই গন্তব্য; বাউলের সেই কথা, তলায় নামলে তবে তো মূল পাওয়া যায়। ভেঙেছিলে, আর ফাটল দিয়ে যেমন আলো ঢোকে, তেমনি করে দেখেছিলে ভাঙা জায়গা দিয়ে, যা আস্ত মানুষটা দেখতে পেত না। সেই শূন্য, সবসময়ই ছিল, কিছু-র তলায়, চলার তলায়, করার তলায়।

ভেঙে দেখাটা ভাঙার দামে কেনা কি না কে জানে! কোন ভাষায়, শুধু বসতে পারো ভাঙা জায়গায়, আর দেখতে পারো, এটুকুই তোমার।

জানান দাওনি, ঘোষণা করোনি, শুধু গেলে না একদিন সকালে। পাতা ঝরে যেমন, অ্যালার্ম ছিল, ধরো। বাজল কি বাজল না, ঘুমন্ত মানুষের কাছে ঘণ্টা বাজানো সমুদ্রে বাতিঘর জ্বালানোর মতো। কিছু এসে যায় না।

তুমি গেলে না, রয়ে গেলে ঘরে বিছানায়, কুঁকড়ে, চাদরের গন্ধ মুখে। দেয়াল বা ছাদ বা চোখের পাতার ভেতরটা দেখছিলে, সব একই ধূসর, আসলে দেখছিলেও না, কিছু করছিলে না, হাত নড়ছিল না, চোখ সরছিল না। করাটাই যেন উবে গেছে, করার জায়গাটাই ফাঁকা।

বিশ্রামের মতোও না, বিশ্রাম ক্লান্তির পরে আসে। তুমি তো ক্লান্ত ছিলে না, ক্লান্ত হবার মতো কিছু করোনি। শুধু ছিলে না, করছিলে না, যাচ্ছিলে না, যে-করে-আর-যায়, সে হচ্ছিলে না, হচ্ছিলে যে-করে-না, আর কোথাও যায় না।

আর মনে হয়েছিল সেই প্রথম দিনগুলোতে বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে যে, থামাটা নতুন কিছু নয়, থামা মানে ফিরে যাওয়া, আদি জায়গায়। চলা শুরু হবার আগে যেখানে ছিলে, যখন কোনো জায়গাতেই ছিলে না।

জন্মের আগে, ধরো, জন্ম, সেই শব্দ, সেই ঘটনা, যা তুমি বেছে নাওনি, কেউ নেয়ও না, তোমার ওপর আরোপিত হয় অন্যদের কারণে। তোমার কোনো কারণ ছিল না, কোনো তুমিও ছিল না। আর একদিন তোমার সম্মতি ছাড়া, জানা ছাড়া তুমি তুমি হলে, এখানে, আলোতে, চেঁচামেচিতে, ঠান্ডায়, ভয়ে। অন্ধকার থেকে বের করে আনা হলো, যেখানে তুমি কিছু ছিলে না। আলোতে, যেখানে তোমাকে কিছু হতে হবে, চলা-জিনিস করা-জিনিস জানা-জিনিস।

চেষ্টা করেছিলে বছরের পর বছর, ধরো, আলো যা চায়, তা হবার চেষ্টা। ব্যর্থ, নাটক করে নয়। বড়ো ব্যর্থতা, যা থেকে দয়া বেরোয়, তেমন নয়। ছোটো ব্যর্থতা, চুপচাপ, কেউ খেয়ালই করে না।

চলার মানেটা ধরতে না পারা, করার মানে, এখানে আলোতে থাকার মানে, যখন অন্ধকার কত সহজ ছিল, আর কত বেশি সৎ, সেই অন্ধকার; যেখানে তুমি কিছু ছিলে না, তোমার কাছে কিছু চাওয়াও হতো না, তুমিও কিছু চাইতে না।

জন্মের আগের অন্ধকার, উষ্ণ অন্ধকার। সেই উষ্ণতা, যা শুধু মায়ের কাছে পাওয়া যেত, শরীরের উষ্ণতা নয়, অন্যরকম, গভীরের, হাড়ের ভেতরের, ভেজা অন্ধকার, নরম গায়ে-লেপটানো অন্ধকার। যেখানে ভাসতে, ভারহীন, নামহীন, জানাহীন। যে-অন্ধকার তোমায় ধরে রেখেছিল, ঘর যেমন এখন রাখে, কিন্তু আরও ভালো করে আরও কাছ থেকে, ফাঁক ছাড়া, দর্শক ছাড়া।

সেই অন্ধকারে দর্শক ছিল না, শুধু অন্ধকার আর তুমি তার ভেতরে, আলাদা নও, তারই অংশ, জল যেমন সমুদ্রের। অন্ধকারে কোনো জিনিস নয়, থাকে অন্ধকারটাই নিজে, কিছু না জেনে কিছু না চেয়ে কিছু না হয়ে।

স্বর্গ। যদি বলো, ঠিক নয় শব্দটা, স্বর্গ বললে তো হারানোর কথা আসে, বের করে দেবার কথা, দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া আর কোনোদিন না খোলা। বোধ হয় তা-ই, জন্মটাই সেই দরজা, পেছনে-বন্ধ-হওয়া, আলোতে ঠেলে দেওয়া, যেখানে লাগে। শ্বাস নিতে হবে, কাঁদতে হবে, খেতে হবে, বড়ো হতে হবে, চলতে হবে, করতে হবে, জানতে হবে।

লাগে, শব্দটাই তো সাজা, উপহার নয়, স্বাগতসম্ভাষণ নয়। সাজা, যা পুরোটা কাটাতে হবে ছাড় ছাড়া, কারণ ভালো ব্যবহার বলে কিছু নেই, শুধু কাটানো আছে।

থাকা এটাই। চাপানো সাজা, ব্যাখ্যা ছাড়া, আপিল ছাড়া, অন্ধকার ফেরার আগে শেষ করতেই হবে, যদি ফেরে, আর যে অন্ধকার থেকে এলে আর যেটায় যাচ্ছ, সেটা একই কি না কে জানে, না-ও হতে পারে, হয়তো নয়ই।

প্রথমটা ধরেছিল তোমায়, দ্বিতীয়টা ধরবে না, প্রথমটা উষ্ণ ছিল, দ্বিতীয়টা ঠান্ডা হবে, প্রথমে দর্শক ছিল না, দ্বিতীয়ে জানো না, হয়তো দর্শক চলতেই থাকবে সেই দ্বিতীয় অন্ধকারেও, কিছু-না দেখতে থাকবে, অন্ধকারে, চিরকাল।

ভয়টা এটাই। মরা নয়, মরার পরেও দেখতে থাকা, যে-চোখ বন্ধ হবে না, দেখার কিছু না থাকলেও।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *