গল্প ও গদ্য

মৃত বিশ্বাসের মেঘ



কখনো কখনো নিজেকেই প্রশ্ন করি: তোমার জায়গায় আমি থাকলে কী করতাম! মেনে নিতে পারতাম? তুমি কী করে সহ্য করো আমায়? আর কতদিনই-বা করবে?—"যতদিন মৃত বিশ্বাসগুলো টুকরো টুকরো মেঘের মতো ভেসে আছে"... হ্যাঁ?

"মানুষ বড়ো কৃপণ, নিজের জীবন দিয়ে জীবনে সুন্দর সুন্দর রহস্য ও জটিলতা সৃষ্টি করে, কিন্তু সহজে কাউকে তা বলে না, রহস্যভেদের আনন্দ অন্যকে দিতে চায় না"—তোমার প্রিয় বইয়ের কোনো এক পাতায় এই কথাটি লেখা আছে।

আমি তোমাকে ছুঁয়ে প্রায়ই গল্প খুঁজতে থাকি, কিছুক্ষণ পর পেয়েও যাই—চমৎকার সব বিদ্যুৎঝলক থাকে গল্পের শরীরে, মুহূর্তেই কলমবন্দির চেষ্টা করি; কিন্তু, এখন পর্যন্ত তোমার আসল সৌন্দর্য সেই লেখায় আমি কতখানি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি জানা নেই। তবুও, তোমাকে ভীষণভাবে ভাবছি, শরীরটা আজ বড্ড ক্লান্ত! বিছানায় শুয়ে গল্প খোঁজাও সময়ক্ষেপণের এক প্রিয় অবলম্বন হয়েছে।

মাঝেমধ্যে অবাক তাকিয়ে থাকি তোমার চোখে, ভাবি... তুমি কতখানি সুখী, কতখানি তৃপ্ত?—সুখের কথা, দুঃখ ও বেদনার কথা যদি তোমাকে গুছিয়েই বলতে পারতাম... তাহলে, তোমার সম্পর্কে অনেক সঠিক সত্য সহজে জানা যেত।

মানুষের প্রকাশ কত সহজে হয়, তাই না?—কত স্বচ্ছন্দে রাগ-বিরাগ, আনন্দের অনুভূতি, অশ্রুর ভাষা প্রকাশ করতে পারে; আমি কি তবে এখন অবধি কোনো মানুষই নই?

রাহাতের চোখের আলো হঠাৎ নিভে গেছে... সে-ও কি দাম্পত্যজীবনে অতটা সুখী নয়? সম্পর্কের এইসব খুঁটিনাটি যাতনা, ঈর্ষা বোঝা যায় না ওভাবে, বোঝা যায় শুধু সরলভাবে প্রকাশিত হ্যাপিনেস বা হতাশা। এমন বিচক্ষণ একজন মানুষও সংসার জীবনের সমীকরণ মেলাতে পারে না।

যা হোক, রাহাতের ভারি সুদর্শন চেহারা, চেহারায় এক মায়াময় মাধুর্য ফুটে ওঠে, নিখুঁত সংযমে আবৃত রহস্যময় চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে। আনা ক্যারেনিনার প্রেমিকও ওর চাইতে সুশ্রী ছিল না নিশ্চয়ই?—আসলে, ওর সাথে বাড়াবাড়ি রকমের প্রেম শোভা পায়, ভালোবাসতে শেখাতে জানে ও... তবে, সংসারে আটকে থাকার মানুষ হয়তো নয়।

"তুমি আমায় কতখানি বুঝতে শিখেছ?"—সময়ের অভিধানে যা-কিছু জেগে আছে, তার সবটাই কি সত্য? কোনো এক ভয়াবহ বিপদ কোথাও লুকিয়ে আছে, সেই দৈত্যদানব হঠাৎ একদিন আমাদের আত্মায় ভর করে এসে; মায়াময় সম্পর্কে দুর্দিন ঘোষণা করে, মুহূর্তেই আড়াল হয়ে যায়... বিশ্বস্ত সঙ্গীটির তীব্র প্রতিশ্রুতি; শুভ্র পাখিরা অন্তিমে হারিয়ে যায়—দুঃখ, অভিমান ও বেদনার ভাষা কেউ বোঝে না।

প্রত্যাশা বাড়ে তাঁর মনে; এককোণে পড়ে থাকে কাঠের পেনসিল, সময়ের ভাঙা টুকরো, ভেজা একটা তোয়ালে... তাঁর দরজায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে কান্নাজড়িত মৃদুস্বর, মৃত্যুর স্তব্ধতা বয়ে যায় আশেপাশে।

তুমি কি অসুখী?—নিজস্ব সৌন্দর্য গ্রাসের ব্যাখ্যা দেওয়া আদপেই শক্ত।

তোমার শরীরকে গভীরভাবে ছুঁয়ে আছি আমি; একবার আমাকে জোরে তোমার কাছে টেনে নিলে দেখবে, হাত ও কপাল একটু ভেজা, বুকের দিকটা উষ্ণ! তোমার হাতদুটো আঁকড়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছি—মাথার দিকের জানালাটা অল্প খোলা, বাইরে মেঘলা আকাশ, খুব ঘোলাটে আলো আসছে; তুমি আমার দিকে একবারও তাকালে না—এই ব্যথাটা বুকে প্রচণ্ড আঘাত করছিল, তবে মুহূর্তকাল পরই তা সয়ে গেল।

আমার কোমরে তোমার হাতদুটো, শক্ত করে তোমার নিঃশ্বাসে আমাকে বেঁধে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা আমাকে দুর্বল করে দেয়। তোমার উষ্ণ নিঃশ্বাসে আমার চুলগুলো হালকা সরে গেল, এক দীর্ঘ চুম্বনে যেন শরীরটা অবশ হয়ে এল!

সেদিন তুমি আমাকে অসম্ভব ভালোবেসেছিলে। কেন বুঝতে চাও না—এটা কোনো সাধারণ অতীত নয় যে, এড়িয়ে যাব, বা ভুলে থাকব; আমাদের শারীরিক দূরত্বটা স্থায়ী করবার আর কোনো সুযোগ নেই—আমি আর এভাবে পারছি না... বলে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছিলে তোমার বুকে অনেকক্ষণ।

বড়ো দুশ্চিন্তা হয়... তোমাকে কাছে না-পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে আর কবে মুক্তি পাব? অথচ, তুমি ভাবছ... আমি কোনো চেষ্টাই করিনি।

বহুদিন পর, তোমার পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসলাম... চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে শান্তি খুঁজে নিলাম! ঠান্ডা বাতাসও বইছে, বৃষ্টির আয়োজন চলছে আকাশ জুড়ে; তোমার কাঁধে আলতো করে মাথা রাখলাম—সবটাই কল্পনা! অতঃপর একটা ঘুম... এই সপ্তাহে অনেক ঘুম পাওনা ছিল।

চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়েছে, আমাদের দূরত্বটাও হয়তো নিঃশব্দের মতো আমাদের ছোঁয় প্রতিরাতে। ব্যথা বাড়ে! তবু, আমি একটা সুন্দর সময়ের স্বপ্ন দেখি!

বহু বছর পরেও, তোমার ওয়ালে রাখা আমাদের লেখাগুলো কী ভীষণ যত্নে আছে। তুমি বেশ কয়েকটা বিজ্ঞপ্তি জুড়ে কেবল আমারই খোঁজ করেছ... কেউ সাড়া দেয়নি। ভাবতেও অবাক লাগছে, তুমি এমন প্রকাশ্যে আমার খোঁজ করেছ! তুমি মানুষটাই ছিলে বড়ো অদ্ভুত, তোমার ভালোবাসার পরিধি বোঝা সহজসাধ্য নয়। আচ্ছা, তুমি কি এখনও আগের মতোই আছ?

বেশ কিছুদিন আগে প্রকাশিত দেশীয় কবিদের একটি সংকলন গ্রন্থে তোমার কিছু লেখা চোখে পড়ল, কবিতাগুলো কী ভীষণ জ্যান্ত! তোমার লেখা আরও প্রাণবন্ত হয়েছে; বড়ো বড়ো অক্ষরে তোমার নাম লেখা...তোমার ছবি, অণুজীবনী ও কবিতা। একটা সময় তো বই ছাপতেও বড্ড দ্বিধা করতে! তবে, আজ বইয়ের পাতায় তোমার লেখা জ্বলজ্বল করছে দেখে বড়ো ভালো লাগছে। আমি অবশ্য বরাবরই চাইতাম, তোমার বই বেরোক।

আজ আমার সব আছে জানো... শুধু তুমি নেই, কোত্থাও নেই... বড্ড হাহাকার লাগে! বাইরে তুমুল বাতাস বইছে, বৃষ্টি পড়ছে সুঁচের মতো... একটা সিগারেট ধরালে মন্দ হয় না!

আবছা অন্ধকারে অনায়াসে বসে সিগারেট টানতে থাকলাম! তুমি আমার এই সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারটা যে মোটেও ভালোভাবে নিতে না—এটা অবশ্য অনেক পরে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। একবার হাস্যস্ফূরিত চোখে তাকিয়ে তুমি বলেছিলে—এসব খেয়ে কি সব স্বাভাবিক রাখতে চাইছিস? এই মুহূর্তে, তোমার পবিত্রতা মেশানো সেই হাসি হুট করে চোখের সামনে ভেসে উঠল! আহা, এত মায়া ছিল তোমার মধ্যে...আজও কি আছে?

আচ্ছা, আমি কি যথাসময়ে যেতে পেরেছিলাম তোমার জীবন থেকে?
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *