সংযুত্ত নিকায়ে (SN 5.10, ভিক্খুনীসংযুত্ত) একটি ছোটো কিন্তু অসামান্য সুত্ত আছে। ভিক্ষুণী বজিরা সাবত্থীর অন্ধবনে (অন্ধদের বন—একটি নির্জন উদ্যান, যেখানে ভিক্ষু-ভিক্ষুণীরা দিবাকালীন ধ্যানে বসতেন) বৃক্ষমূলে ধ্যানে বসেছিলেন। মারদেব—বৌদ্ধ পুরাণে যিনি বিভ্রমের প্রতীক, সাধকের মনে সংশয় ও ভয় জাগানোর রূপক—এসে তাঁকে প্রশ্ন করলেন: “এই সত্ত্বকে কে সৃষ্টি করেছে? সত্ত্বের স্রষ্টা কোথায়?” প্রশ্নটি গভীর, কারণ এটি ধরে নিচ্ছে যে, 'সত্ত্ব' বা 'প্রাণী' বলে একটি সত্যিকারের জিনিস আছে, যাকে কেউ-না-কেউ 'তৈরি' করেছে। বজিরা মারের কৌশল বুঝলেন এবং এই সত্যটিকে এক বাক্যে ধরলেন: “যেমন অংশগুলো একত্র হলে রথ শব্দ চলে, তেমনি স্কন্ধগুলো একত্র হলে সত্ত্ব শব্দ চলে।” অর্থাৎ 'প্রাণী' বা 'আমি' কেবল একটি ব্যাবহারিক নাম—স্কন্ধগুলোর পেছনে কোনো আলাদা 'আমি-সত্তা' লুকিয়ে নেই, ঠিক যেমন চাকা-অক্ষ-ফ্রেমের পেছনে কোনো আলাদা 'রথ-সত্তা' লুকিয়ে নেই। বিশুদ্ধিমার্গ (Visuddhimagga, XVIII.28) এবং মিলিন্দপঞ্হ (Mil 27–28) উভয়েই এই শ্লোকটিকে অনাত্মতত্ত্বের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী প্রকাশ হিসেবে উদ্ধৃত করেছে।
কয়েক শতাব্দী পরে গ্রিক দার্শনিক প্লুটার্ক (প্রথম শতক খ্রিস্টাব্দ) তাঁর 'থিসিউসের জাহাজ' (Ship of Theseus) চিন্তা-পরীক্ষায় একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন—একটি জাহাজের সব তক্তা যদি একে একে বদলে যায়, তাহলে সেটি কি আর 'একই' জাহাজ? বজিরার উত্তর হতো: জাহাজ কখনোই 'একটি জিনিস' ছিল না—সে সবসময়ই কেবল তক্তাগুলোর একটি সাময়িক বিন্যাস ছিল, এবং 'জাহাজ' শব্দটি সেই বিন্যাসের একটি সুবিধাজনক নাম মাত্র।
বুদ্ধঘোষের বিশুদ্ধিমার্গ (Visuddhimagga, পঞ্চম শতক)—থেরবাদ অভিধর্মের সবচেয়ে বিস্তৃত ও কঠোর ভাষ্যগ্রন্থ, যেখানে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার সম্পূর্ণ পথ সুসংহতভাবে বর্ণিত—এই সমস্ত ধর্মতত্ত্বকে একটি সুসংহত কাঠামোতে বেঁধেছে। এই দর্শনে মুক্তির পথ বেদান্তের ঠিক উলটো। সংসার থেকে মুক্তি কোনো শাশ্বত সত্তায় ফিরে যাওয়া হতে পারে না—কারণ সেই সত্তাকে তো স্বীকারই করা হয়নি। যেখানে কোনো 'ঘর' নেই, সেখানে 'ঘরে ফেরা' কথাটাই অর্থহীন। মুক্তি তাই 'ফেরা' নয়—মুক্তি হলো সেই সমস্ত শর্তের নির্বাপণ (নিভিয়ে দেওয়া), যা অস্তিত্বের চাকাকে ঘুরিয়ে চলেছে। বৌদ্ধ নির্বাণ তাই উপনিষদের ব্রহ্মের মতো সব কিছুর আদিভিত্তি নয়—বরং আমাদের চেনা সব কিছুর বিপরীত। জগতের মাপকাঠিতে একে 'শূন্য' বলা যায়—কারণ জগতে যা কিছু আছে (রূপ, অনুভূতি, চিন্তা, ইচ্ছা, চেতনা) তার কিছুই সেখানে নেই। কিন্তু যারা সেখানে পৌঁছেছেন, তারা একে পরম সুখ বলে জেনেছেন—অঙ্গুত্তর নিকায়ে (নবক-নিপাত ৩৪) সারিপুত্ত বলেছেন: 'অনুভূতি নেই, এটাই সুখ'—অর্থাৎ যেখানে সংসারের কোনো অনুভূতিই অবশিষ্ট নেই, সেটাই পরম শান্তি।
এই বিরোধ কোনো আধুনিক পণ্ডিতের আবিষ্কার নয়—মূল গ্রন্থেই দুই পক্ষ একে অপরকে সরাসরি ভুল বলেছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেকে মনে করেন, বেদান্ত-বৌদ্ধ বিরোধটি পরবর্তী পণ্ডিতদের অতিরঞ্জন—গ্লাজেনাপ দেখাচ্ছেন, বিরোধটি মূল গ্রন্থেই স্পষ্ট এবং ইচ্ছাকৃত।
বৌদ্ধ পক্ষে, মজ্ঝিম নিকায়ের আলগদ্দূপম সুত্তে (MN 22, 'সাপের উপমা' সুত্ত) বেদান্তের কেন্দ্রীয় দাবি—'জগৎ ও আত্মা অভিন্ন, মৃত্যুর পরেও আমি অবিনশ্বর ও শাশ্বত থাকব' (তুলনীয়: বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৪.৪.১৩, যেখানে আত্মাকে অজর, অমর, অক্ষয় বলা হয়েছে)—এই মতবাদকে বুদ্ধ সম্পূর্ণ মিথ্যা (পালি: মুসা, অর্থাৎ অসত্য, ভিত্তিহীন) বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই একই সুত্তে বুদ্ধ একটি অমর উপমা দিয়েছেন: ধর্মকে ভুলভাবে আঁকড়ে ধরা হলো বিষাক্ত সাপের লেজ ধরে তোলার মতো—সাপকে ঠিকভাবে (মাথার কাছে) না ধরে লেজ ধরলে সে ঘুরে কামড় দেবে। ঠিক তেমনি, ধর্মের শিক্ষাকে ভুলভাবে বুঝলে (যেমন 'বুদ্ধও আসলে আত্মবাদী ছিলেন' বলে ভুল করলে) সেই ভুল বোঝাই ক্ষতির কারণ হবে। বুদ্ধ বেদান্তিক অবস্থানকে ভিন্নমত হিসেবে সম্মান দেননি—সরাসরি ভ্রান্তি বলেছেন।
বেদান্তিক পক্ষে, কঠ-উপনিষদ (২.১.১৪) বৌদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিকে—যেখানে জগৎ কেবল ক্ষণস্থায়ী নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়ার সমষ্টি, কোনো স্থায়ী সত্তা নেই—পথহারা দর্শন বলে খারিজ করেছে। মৃত্যুদেবতা যম নচিকেতাকে বলছেন: যে-ব্যক্তি বহুত্বের মধ্যে সত্য খোঁজে—অর্থাৎ, যে মনে করে, এই পৃথক পৃথক ধর্মগুলোই শেষ কথা, এদের পেছনে কোনো একত্ব নেই—সে পাহাড়ের ঢালে-পড়া বৃষ্টির জলের মতো: চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, কোনো নদীতে পৌঁছায় না, কোনো সমুদ্রে মেশে না, শুধু মাটিতে হারিয়ে যায়। অর্থাৎ উপনিষদ বলছে: একত্বকে না চিনলে জ্ঞান বিক্ষিপ্ত হয়, মুক্তি আসে না।
সারকথা: বুদ্ধ বলেছেন, শাশ্বত আত্মায় বিশ্বাস মূর্খতা—এটি সেই শেকল, যা মানুষকে সংসারে বেঁধে রাখে। উপনিষদ বলেছে, শাশ্বত আত্মা ছাড়া মুক্তি অসম্ভব—এটি সেই একমাত্র সত্য, যা মানুষকে মুক্ত করে। দু-জনেই অপরের অবস্থান জানতেন এবং জেনেশুনেই প্রত্যাখ্যান করেছেন—এটি ভদ্রোচিত মতপার্থক্য নয়, পারস্পরিক সচেতন প্রত্যাখ্যান। এই প্রত্যাখ্যানই, যাঁরা দুই দর্শনকে 'একই সত্যের ভিন্ন ভাষা' বলে মেলাতে চান (যেমন জেনিংস, গুন্টার, বা পরবর্তীকালে অলডাস হাক্সলি), তাঁদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: দুটি মুক্তির ধারণা—মোক্ষ ও নির্বাণ
দুই দর্শনের এই মৌলিক অধিবিদ্যিক পার্থক্য থেকে মুক্তির ধারণায় যে-বিভেদ সৃষ্টি হয়, তা কেবল তাত্ত্বিক মতপার্থক্য নয়—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গন্তব্য, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ।
বেদান্তে মুক্তিকে বলা হয় মোক্ষ। মোক্ষ মানে এমন একটি অবস্থার উন্মোচন, যা অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান, কিন্তু অবিদ্যার (avidyā) আবরণে ঢাকা। 'অবিদ্যা' বলতে সাধারণ না-জানা বোঝাচ্ছে না—এটি সেই মৌলিক বিভ্রম, যা ব্যক্তিকে তার আসল পরিচয় সম্পর্কে অন্ধকারে রাখে। শঙ্করের প্রিয় উপমায়: রাতের অন্ধকারে দড়িকে সাপ মনে হয়—দড়ি সাপ হয়ে যায়নি, শুধু আলো কম বলে চোখের ভুল হচ্ছে। আলো জ্বাললেই সাপ উধাও—কারণ সাপ কখনও ছিলই না, শুধু দড়ি ছিল। অবিদ্যাও তেমনি—আত্মা বদলায়নি, শুধু আমরা চিনতে পারছি না। তাই মোক্ষ কোনো নতুন জিনিস তৈরি হওয়া নয়—যা চিরকাল ছিল, তার ওপর থেকে পর্দা সরে যাওয়া। মেঘ সরলে সূর্য নতুন করে আসে না—যা ছিল, তাই দেখা যায়। বেদান্তী সাধক তাই বাইরের দিকে নয়, ভেতরের দিকে তাকান—সেই অমর বীজের দিকে, যা থেকে সব কিছুর উদ্ভব। ছান্দোগ্যে (৬.৮.৭) উদ্দালক আরুণি তাঁর পুত্র শ্বেতকেতুকে নয় বার বলেছেন: 'তত্ত্বমসি'—'তুমিই সেই।' এই উপলব্ধিই মোক্ষ—নিজেকে নিজে চেনা।
বৌদ্ধধর্মে মুক্তিকে বলা হয় নির্বাণ (nibbāna)। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ 'নির্বাপণ' বা 'নিভে যাওয়া'—যেমন প্রদীপের শিখা নিভে যায়। কী নেভে? তৃষ্ণার আগুন, অজ্ঞানতার আগুন, ক্রোধের আগুন—যা সংসারচক্রকে ঘুরিয়ে চলে। নির্বাণ এমন এক বাস্তবতা, যা সংসারের কোনো কিছুর সাথে তুলনীয় নয় এবং কেবল সমস্ত শর্তযুক্ত ধর্মের অবসানেই কার্যকর। এটি কোনো উন্মোচন নয়—কারণ উন্মোচন করার মতো কোনো লুকানো সত্তা বৌদ্ধ দর্শনে স্বীকৃত নয়। বেদান্ত বলে: পর্দা সরাও, ভেতরে আত্মা আছে। বৌদ্ধধর্ম বলে: পর্দা সরালে ভেতরে কেউ নেই—এবং 'কেউ নেই' বুঝতে পারাটাই মুক্তি।
উদান গ্রন্থে (Ud 8.1–4) বুদ্ধ চার বার—চারটি পৃথক অনুচ্ছেদে, যেন জোর দিয়ে বার বার বলছেন—ঘোষণা করেছেন: 'অত্থি, ভিক্খবে, অজাতং অভূতং অকতং অসঙ্খতং'—'ভিক্ষুগণ, এমন কিছু আছে, যা জন্মায়নি, হয়ে ওঠেনি, তৈরি হয়নি, শর্তযুক্ত নয়।' এবং তিনি যোগ করেছেন: এই অজাত-অভূত-অকৃত-অসংস্কৃত না থাকলে জাত-ভূত-কৃত-সংস্কৃত থেকে নিষ্কৃতি সম্ভব হতো না। অর্থাৎ নির্বাণ 'আছে'—কিন্তু আমরা 'আছে' বলতে যা বুঝি, সেভাবে নয়। এটি অস্তিত্বও নয়, অনস্তিত্বও নয়—সমস্ত বিভাগের অতীত। এই বর্ণনা ভাষার সীমানায় এসে দাঁড়িয়ে যায়—এবং সেটাই হয়তো এর সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা।
এখন প্রশ্ন: এই নির্বাণ কি আসলে উপনিষদের ব্রহ্ম বা আত্মনেরই অন্য নাম? গ্লাজেনাপ চারটি সুনির্দিষ্ট কারণ দেখান, কেন তা অসম্ভব:
প্রথমত, বেদান্তের আত্মন জগতের আদিকারণ। ঐতরেয় উপনিষদে (১.১) বলা হয়েছে: সৃষ্টির আগে কেবল আত্মাই ছিলেন—অন্য কিছুই ছিল না, চোখ মেলে দেখার মতো কিছুই ছিল না—এবং তিনিই সিদ্ধান্ত নিলেন: 'আমি জগৎ সৃষ্টি করি।' নির্বাণ কোনো কিছুর কারণ নয়—নির্বাণ থেকে কিছু 'বেরিয়ে আসে' না।
দ্বিতীয়ত, আত্মন বিশ্বশৃঙ্খলার ধারক ও নিয়ন্ত্রক। বৃহদারণ্যকে (৩.৮.৯) যাজ্ঞবল্ক্য গার্গী বাচক্নবীকে বলেছেন: এই অক্ষরের (অবিনশ্বরের, অর্থাৎ ব্রহ্মের) আদেশেই সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ স্থানে স্থিত, আকাশ ও পৃথিবী পৃথক, মুহূর্ত-দিন-রাত-পক্ষ-মাস-ঋতু-বছর নিয়মিত, শ্বেত পর্বতমালা থেকে প্রবাহিত নদীসমূহ পূর্বে ও পশ্চিমে প্রবাহিত। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের সমস্ত নিয়ম এই অক্ষরের শাসনে চলে। নির্বাণ এই ধরনের কোনো মহাজাগতিক নিয়ন্ত্রক নয়।
তৃতীয়ত, আত্মন সকল পদার্থের অন্তরতম সার—সব কিছুর ভেতরে, সব কিছুর মধ্যে, সব কিছু হয়ে তিনি আছেন। নির্বাণ কোনো কিছুর 'ভেতরে' নেই—নির্বাণ সংসারের কোনো অংশ নয়।
চতুর্থত, আত্মন চিৎ—অর্থাৎ শুদ্ধ চেতনা, খাঁটি জানা, নিজেই নিজেকে জানা। নির্বাণকে 'সচেতন' বা 'চেতনাময়' বলে বর্ণনা করা যায় না—কারণ বৌদ্ধ দর্শনে চেতনা (বিঞ্ঞাণ) নিজেই একটি শর্তযুক্ত স্কন্ধ, নির্বাণে যার অবসান ঘটে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে: বেদান্তী সাধক চান অন্তরের শাশ্বত সারসত্তায় পৌঁছাতে—যা চিরকাল ছিল, আছে, থাকবে—এবং উপলব্ধি করতে: আমিই সেই। বৌদ্ধ সাধক চান সমস্ত দৈহিকতা, অনুভূতি, প্রত্যক্ষণ, সংকল্প ও চেতনা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে সংসারের সব কিছু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশান্ত অবস্থা উপলব্ধি করতে—এবং উপলব্ধি করতে: 'আমি' বলে কেউ কখনও ছিলই না।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ: পারস্পরিক প্রভাব—মহাযান, পরবর্তী বেদান্ত ও তথাগতগর্ভ
বেদান্ত ও বৌদ্ধধর্ম একই মাটিতে পাশাপাশি প্রায় দেড় হাজার বছর বেড়ে উঠেছে—একই রাজসভায় তর্ক করেছে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ে (নালন্দা, বিক্রমশীলা) পড়িয়েছে, একই গ্রামে ভিক্ষা করেছে। এত দীর্ঘ সহাবস্থানে পারস্পরিক প্রভাব অনিবার্য। ভারতীয় মনের গভীরে একটি একত্ববাদী (monistic) টান আছে—সব কিছুকে একসূত্রে গাঁথার প্রবণতা, বহুত্বের মধ্যে একত্ব খোঁজার আকাঙ্ক্ষা। এই টানই মহাযান বৌদ্ধধর্মের কিছু প্রতিনিধিকে সংসার ও নির্বাণকে একই অদ্বিতীয় সত্যের দুটি দিক হিসেবে ভাবতে প্ররোচিত করেছে—যা প্রাচীন থেরবাদের দৃষ্টিতে একটি বিপজ্জনক বিচ্যুতি।
নাগার্জুনের মধ্যমক দর্শন ও দ্বি-সত্য তত্ত্ব
নাগার্জুন (আনু. দ্বিতীয় শতক) তাঁর মূলমধ্যমককারিকায়—মাত্র সাতাশটি অধ্যায়ে, প্রায় সাড়ে চারশো পঙ্ক্তিতে—বৌদ্ধ দর্শনের এক যুগান্তকারী পুনর্ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর কেন্দ্রীয় ধারণা শূন্যতা (śūnyatā)। শূন্যতা নিয়ে সবচেয়ে বড়ো ভুল বোঝাবুঝি হলো: অনেকে মনে করেন, শূন্যতা মানে 'কিছুই নেই'—একটি দার্শনিক শূন্যবাদ (nihilism)। নাগার্জুন নিজেই এই ভুল বোঝাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। শূন্যতা মানে: কোনো কিছুরই নিজস্ব, স্বতন্ত্র, অপরিবর্তনীয় সারসত্তা (সংস্কৃত: svabhāva, intrinsic nature) নেই। সব কিছুই অন্য কিছুর ওপর নির্ভর করে আছে—তাই কোনো কিছুই 'নিজে নিজে' সত্য নয়। একটি টেবিল কাঠ ছাড়া নেই, কাঠ গাছ ছাড়া নেই, গাছ মাটি-জল-আলো ছাড়া নেই—কোথাও থামার জায়গা নেই, কোথাও 'এটাই শেষ, এটাই মূল' বলার জায়গা নেই। এটিই স্বভাবশূন্যতা (svabhāva-śūnyatā)।
আলো ও নৈঃশব্দ্য: ২
লেখাটি শেয়ার করুন