গল্প ও গদ্য

শেকড়হীন মৃতপত্র



আমার আর নিজের বলে কেউই র‌ইল না...ইচ্ছে হলেও আর বলতে পারব না—'কাছে আয়'। আজকাল খুব কান্না পায়, নিজেকে সামলে নিতেও বেগ পেতে হয়।

আমি যেন নিজেই নিজেকে ঠকিয়েছি এতদিন; তোমায় ভুলে থাকি কিছুক্ষণ? সুন্দর ভাবনাগুলো যেমন সবসময় অনুভূতিকে ছোঁয় না—তেমনি আমিও তোমাকে কাছে পাবার চেষ্টা খুব-একটা করি না।

আমার গার্ডেনিং-এর শখ ভীষণ। এই যে চারাগুলো দেখছ...এর সব কয়টিই আমার সন্তানের মতো। এই সারিতে যে কয়টা ফুলের গাছ দেখছ—সবগুলোর পাতা অত্যন্ত উজ্জ্বল, রঙিন।

চলো, তোমাকে ওই দিকটায় নিয়ে যাই—
সুধীর, এই গাছগুলোর প্রতি আমার অনেক মায়া, এদের কখনও ফুল হয় না, এরা ফুল ফোটাতে অক্ষম। পাতাগুলোর রং ফ্যাকাশে হয়ে আছে কেমন, দেখেছ? তবুও প্রাণশক্তি প্রচণ্ড। রাতের শেষ প্রহরে এই পাতাগুলো ওদের রং ফিরে পায় ও ভারি তরতাজা হয়ে ওঠে।

একবার তো আমি ভীষণ পাগলামি করে বসলাম—কনকনে শীতের রাতে পাকা দুই ক্রোশ হেঁটে এক নার্সারিতে গিয়েছিলাম বিরল বিদেশি অর্কিডের কিছু চারা আনতে—ওরা অবশ্য বলেছিল, বাসায় এনে পৌঁছে দেবে, তবু আমি দেরি করিনি—নিজেই গিয়েছিলাম। এই বার্ড অব প্যারাডাইস ফুল গাছটি সংগ্রহ করতে আমার সময় লেগেছিল মাত্র তিনদিন, যদিও এটা খুব সাধারণ কোনো উদ্ভিদ নয়—কিন্তু, সেই দিনগুলোতে আমি প্রতি পঞ্চাশ মিনিট পরপর একটা করে পরগাছা উপড়ে ফেলেছি—অপেক্ষা আমার সহ্য হয় না—একজীবনে আর কত অপেক্ষা করে মানুষ, বলো? ক্লান্ত লাগে না?

এই গাছটি আমার বিশেষ পছন্দের। সত্যিকারের স্বর্গীয় পাখি ফুলও বলা হয় একে, গাছ লাগানোর পর তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ফুল ফোটা ছাড়াই গাছ বাড়তে থাকে। এরপর বসন্তের শুরুতে ফুল ফোটে।

হলুদ ফুলের একটি হাইব্রিড জাত রয়েছে, নাম Mandela's Gold। বার্ড অব প্যারাডাইস লস এঞ্জেলসের অফিসিয়াল ফ্লাওয়ার। এছাড়াও, এই ফুলের প্রতীকী অর্থ স্বাধীনতা, বিশালতা এবং ভালো দৃষ্টিকোণ। কফি খাবে? ব্ল্যাক কফি? আমি জানি, তোমার খুব পছন্দ। একটু বসো।

তুমি আমায় এক-শো চারটি ফুলের গাছ পাঠাবে? যে-ফুলের ঘ্রাণ হালকা মিষ্টি, কিন্তু সুতীব্র; তবে খেয়াল রেখো—তোমার শরীরের ঘ্রাণের চেয়ে নিখুঁত যেন না হয়।

বড়ো বাদুড়ের মতো এই কালো রঙের ফুলটি খুব সুন্দর; এর অস্বাভাবিক আকৃতির কারণে একে 'ব্ল্যাক ব্যাট ফ্লাওয়ার', 'ক্যাটস হুইস্কার্স' বা 'ডেভিল ফ্লাওয়ার' নামেও ডাকা হয়। ভারি অদ্ভুত ও রহস্যময়, তাই না?

আজকাল শুধু মনে হয়, জীবন্ত কিছু চোখের সামনে বেড়ে উঠতে দেখি। যত্ন এবং অবহেলায় দুই ভিন্ন সারিতে থাকা গাছগুলোর পার্থক্য ঠিক কতখানি হয়, তা নিজের চোখে দেখব, প্রতি মুহূর্ত গুনে। এত ভালোবেসে যাতে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করেছি, চোখের সামনে সেই ফুলগাছগুলোর মৃত্যু কি আমাকে এতটুকুও ব্যথিত করবে না?

আমার মনটাকে সারিয়ে দাও দেখি—হুঁ, তোমাকেই বলছি। তুমি ছাড়া কাউকে সুযোগ দিয়েছি বলে মনে পড়ে না।

শোনো, যে-চারাগুলো অযত্নে বেড়ে উঠবে, ওদেরকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখব কী করে? ওদের আয়ুষ্কালও কি সামান্য? আমাদেরই মতো? ওরা কেন প্রতিনিয়ত আমার করা অবহেলাটুকু এভাবে সহ্য করে নিচ্ছে? পথ নেই বুঝি?—মানুষের ক্ষেত্রে তো আর এমন হয় না, তাই না? মানুষ হয়তো চাইলেই পালাতে পারে—সত্যিই পারে তো? মানুষের মনের ভেতরটাও অনেকটা এই চারাগাছগুলোর মতো—তুমিই বলেছিলে।

আচ্ছা সুধীর, তুমি কখনো বাগানে মধ্যরাতে হাঁটাহাঁটি করেছ? আমি করি আজকাল, বেশ ভালো সময় কাটছে—আজ বাগানের মৃত-চারাগুলো দাফন করে দিলাম, সাথে তোমার দেওয়া পত্রগুলো। আজ থেকে তোমাকে আর কিছু লিখব না ভাবছি—ভাবনার কি আর তল আছে, বলো?

তোমার শরীরটা আমার আর স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে না। দূর থেকেই ঠিক আছ। অমন দূরে থাকলে, তাকে কল্পনায় আনতেও কষ্ট হয়। আহ্, বিচলিত হয়ো না। আমি অদৃষ্ট মেনে নিয়েছি—আমার একজন অন্ধ ব্যক্তির সাথে সংসার হবে। তোমায় নিয়ে লিখতে চাই না আর—যদি কান্নায় বুকের ভেতরটা ভেঙে আসে, কে সামলাবে, বলো?

সুধীর, আমার দিকে একবার তাকাবে? তোমার চোখে তাকিয়ে এক সুগভীর তৃপ্তি পাই আমি, তুমি ছিলে আমার ভীষণ আদরের। শুনছ! তোমার কেমন চোখ-জোড়া পছন্দ? জানো, আমি মৃত-মানুষের চোখ খুউব কাছ থেকে দেখেছি—বড়ো কাছের মানুষের। সেই দৃশ্য আমার কল্পনায় প্রায়ই আসে। চোখের পাতা শ্বেতবর্ণ, ঠোঁট এবং চোয়ালের একপাশটা নীলাভ-সাদা—যদি গভীর মনোযোগে তাকিয়ে দেখো কিছুক্ষণ...ঠান্ডা আবেগে হৃৎস্পন্দন ক্ষীণ হয়ে যায়, এক শীতল অনুরণনে পুরো শরীর অবশ হয়।

আমার বিদায়ের দিনে—তুমি আমাকে এতখানি কাছে থেকে দেখবে, সুধীর? লাশের গন্ধের তীব্র ভাবটা আমার মস্তিষ্কে সয়ে গেছে, প্রথম প্রথম খুব হতবিহ্বল আর দুর্বল লাগত...এখন আমি নিজেকে বেশ শক্তপোক্ত করে নিয়েছি। তুমি যাবে আমার সাথে আজ? শ্মশানে—তোমার ভালো লাগবে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *