গল্প ও গদ্য

নীরের তৃষ্ণা: ৩



: নীরা, জোস তো অফিসটা, আর তোর রাহাতও। হি হি হি…।
: অ্যাই, চুপ। বাজে কথা বলবি না। কাজ করতে এসেছিস, মন দিয়ে কাজ কর।
: খুব লাগল বুঝি?
: …………………………………...
: বিয়েটা কবে তোদের?
: জানি না।

লাঞ্চের সময় রাহাত কথা শুরু করার আগেই নীরা বলল—
: রাহাত, আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাই কিছুদিন।
: তোমার শরীর খারাপ নাকি? কী হয়েছে?
: আরে, না না, আমি মনের সাথে জোর করে এতদিন অনেক কাজ করেছি। প্লিজ, আমি কিছুদিন বাসায় থাকতে চাই।
: না, তুমি আসবে। আরে, তোমাকে ছাড়া তো তমা আনইজি ফিল করবে।

আসলে রাহাত চাইছিল, নীরা অফিসে আসুক। ও অফিসে না এলে ওকে দেখবে কী করে?
: প্লিজ, রাহাত, মাত্র তিনটা দিনের ব্রেক নিই। মামা ফোন করলে একটু মিথ্যে বলে দিয়ো, প্লিজ।
: আচ্ছা, তিন দিনই কিন্তু, মনে থাকে যেন।
: থ্যাংকস।

অফিস থেকে বেরোনোর পরে সিএনজিতে বসে তমা নীরাকে টিপ্পনি কেটে বলল— বাব্বা, তোকে ছাড়া বেচারা বাঁচেই না দেখছি।
নীরা কিচ্ছু বলল না, মিটিমিটি হাসল শুধু।

: সেই মাল পটিয়েছিস, নীরা!
: তমা, সুন্দর করে কথা বলা শিখতে হবে। এলোমেলো ভাষায় এখানে কারও সাথে কথা বলা যাবে না।
: ও বাবা, রাহাতের কাছে তো তুই ভালো শেখাই শিখেছিস, দেখছি। হা হা হা।
: ‘রাহাত ভাইয়া’ বল। আর ওকে অফিসে 'স্যার' ডাকতে হবে। আমিও শুরুতে তা-ই ডাকতাম।

এই বলে নীরা গুনগুন করতে লাগল— 'Baho mein chali aao...hum se sanam kya parda...o...hum se sanam kya, parda...'

: রাহাতের প্রিয় গান, নীরা?
নীরা একটু লজ্জা পেয়ে বলল—
: কী করে বুঝলি?
: আরে, তোর চোখে তো রাহাতকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রে!
: যাহ্‌! কীসব বলিস না তুই!
: চোখে চোখেই রাখিস কিন্তু, আড়াল হতে দিলেই বিপদে পড়বি!
: কীরকম?
: পরে বুঝবি। জীবনে যে-নীরাকে কোনো ছেলের সাথে কথাই বলতে দেখলাম না, সেই নীরাই কিনা প্রেমিককে চোখের ভেতরে আগলে রেখেছে?
: তমা, ভালোবাসা জিনিসটা এমনই রে, মানুষকে দিয়ে যে কী কী করিয়ে নেয়! তুইও কাউকে ভালোবাসবি যেদিন, সেদিন তুইও বদলে যাবি।
: হা হা...ভালোবাসা...জাস্ট অ্যা ফাকিং লাই...
: তুই না কখনও পজিটিভলি কিছু ভাবতে পারিস না।

: অ্যাই তমা, বাসায় এসে গেছি। চল, আমার বাসায় চল, গল্প করব।
: আজকে না রে। আজ আমার খুব ধকল গেছে।
: তা ঠিক অবশ্য। আচ্ছা, যা। এর মধ্যেই কিন্তু বাসায় আসতে হবে, মামা নেই। আমি একাই আছি এই ক-দিন।
: আচ্ছা, আসব। যাই।

নীরা বাসায় ফিরে দুই ঘণ্টা ধরে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করে। ভাত খেয়ে একটা ঘুম দেয়। একদম সন্ধ্যায় ওঠে। উঠেই দেখে রাহাতের ফোন আর মেসেজে ওর ফোন আর ফেইসবুক ভর্তি হয়ে আছে।

: হ্যালো রাহাত, বলো। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম গো।
: অ্যাই, তুমি ফোন করবে না আর আমাকে। তোমার মতো সেলফিশ মানুষের সাথে আমি কথা বলব না।
: আমি সেলফিশ?
: হ্যাঁ। বাড়ি পৌঁছে ফোন দাওনি, দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি কোনো খবর নেই। আমার যে দুশ্চিন্তা হতে পারে, তুমি তো সেটা ভাবোই না।
: সরি বললাম তো! ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উম্মাহ...আর হবে না এরকম, প্রমিজ।
: যাও, ক্ষমা করলাম। একটু বিজি আছি, সোনা। পরে কল করছি।

নীরা ফোনটা নামিয়ে রেখে কফি হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। রাহাতের কথা ভাবে আর নিজেই একা একা হাসে। এত অল্প সময়ে ওরা দু-জনে কতটা কাছে এসে গেছে! সত্যিকারের ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়? ও এসব ভাবতে ভাবতে টিভির সামনে গিয়ে বসে।

মানুষ অবসরে থাকলে ভাবতে থাকে এটা-সেটা, নানান কিছু। অথচ সে ভাবে, সে অবসর সময় কাটাচ্ছে। মানুষ সবচেয়ে বেশি চিন্তা, দুশ্চিন্তা এবং এলোমেলো চিন্তা করে তার অবসর সময়ে। সেজন্যই একজন চাকরিজীবী মানুষ চাকরি করার সময় হাজারটা ব্যস্ততার মাঝেও সুস্থ থাকে, অথচ ওই মানুষটাকেই দেখা যায় রিটায়ারমেন্টে গেলে হুট করে একদিন মরে যায়।

কাজ ছাড়া মানুষ আর জীবজন্তুর মধ্যে তেমন কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই, একটা জায়গা ছাড়া। মানুষ কাজ ছাড়া থাকলেও তার মস্তিষ্ক কাজ করে; অবসরে মানবমস্তিষ্ক সাধারণত খারাপ কাজই বেশি করে। তবে জন্তুজানোয়ারের মস্তিষ্ক উন্নত না হওয়ার ফলে তাদের ব্যস্ততা এবং অবসর দুটো একই রকম।

টিভির সামনে বসলেও টিভি অন করে না নীরা, জীবন নিয়ে এটা-সেটা গভীরভাবে ভাবতে থাকে। আবার রুমে গিয়ে খাটে গা এলিয়ে দেয়। একটু পরেই তমার টেক্সট আসে ফোনে— "অফিসে ভালো লাগে না তোকে ছাড়া।"

নীরা ছুটিশেষে যেদিন অফিসে যায়, গিয়ে দেখে, রাহাত আর তমার মধ্যে বেশ ভাব হয়ে গেছে। অথচ সেদিনও রাহাতের কত জড়তা ছিল তমার সাথে কথা বলতে। রাহাত কী সুন্দর দ্রুতই মিশে যেতে পারে। কত দ্রুত বন্ধুত্ব করে ফেলতে পারে।

অথচ নীরা এরকম হুট করে কাউকেই বন্ধু বানাতে পারবে না। স্কুল, কলেজ—কোথাও তার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কিছু ছিল না। ছিল না বলতে, একটা খাঁটি বন্ধুত্ব তৈরি করতে যতটা সময় লাগে, অতটা সময় নিয়ে কাউকে পাশে পাওয়াই যায়নি। অত অল্প সময়ে কি বন্ধু হওয়া যায়?

যায় হয়তো, না হলে তমা পারল কীভাবে? আর রাহাতই-বা পারছে কী করে? আচ্ছা, সে এত ভাবছে কেন? ওরা দু-জনে তো নীরার কাজটা সহজ করে দিয়েছে। এখন তমা, রাহাত আর নীরা মিলেমিশে বন্ধুর মতো থাকতে পারবে। এখন আর অফিসে এত বোরিং লাগবে না। এটা ভেবে ভীষণ খুশি খুশি লাগছে।

নীরা শুরুতেই তমার রুমে ঢুকে। অনলাইন থেকে তিনটা অ্যান্টিক বুদ্ধমূর্তি আনিয়েছে—রাহাত, তমা আর নিজের জন্য। ভাবল, তমাকেই আগে গিফটটা দেওয়া যাক।

: কী রে নায়িকা, তিন দিনের কথা বলে তো প্রায় পনেরো দিন পার করে ফেললি?
: আমার একটা ব্রেকের খুব দরকার ছিল রে। খুব ফ্রেশ লাগছে কিছুদিন গ্যাপ দিয়ে।
: সত্যিই? তাহলে একেবারে ছুটিতে চলে যা। মানে, এই চাকরিটার কথা ভুলে যা।
: মাঝেমধ্যে এমন সব ঠাট্টা করিস না তুই, হা হা…!
: ঠাট্টা কেন হবে? তুই-ই তো এসব চাকরি করতে চাইতিস না কখনও।
: হ্যাঁ, কিন্তু আমি এটা ছেড়ে দিলে রাহাতের ভালো লাগবে না।
: কেন লাগবে না?
: ওমা, দেখিসনি যখন ছুটিতে যেতে চাইলাম, কেমন করল। আর সারাদিন ফোন, মেসেজ দিতে দিতে পাগল করে দিত।

তমা একটু অদ্ভুতভাবে হাসল। কেমন যেন টিটকারি-দেওয়া হাসি।
: হাসছিস কেন?
: নীরা, জানিস, বোকা মানুষেরা জীবনে সুখী হয়।
: তুই তখন থেকে কীসব বলছিস, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কী হয়েছে তোর? আগে এই গিফটটা নে।

নীরা প্যাকেট থেকে মূর্তিটা বের করতে করতে বলে—
: রাহাতকেও দিয়ে আসি, দাঁড়া।
: এগুলো তো ওর পছন্দ না, কেন শুধু শুধু কিনেছিস এসব?
: হা হা! তুই কী করে জানলি?
: আমি সব জানি।

এটা বলে শেষ করতে না করতেই রাহাত রুমে ঢুকে পড়ে।
: কী…নীরা? এসেছ?

নীরার উত্তরের আগেই তমাকে বলে—
: তুমি দেখেছ তো? সব ঠিকঠাক আছে? তোমার বুদ্ধিতেই কিন্তু আমি সব করেছি।
: ভরসা করতে পারছ না?
: পারছি, খুব পারছি।
: তাহলে যাও, সব ঠিকঠাকই আছে।
রাহাত দ্রুত বেরিয়ে গেল।

নীরা বুঝতে পারছে না কিছুই। ওর মাত্র ক'টা দিনের অনুপস্থিতিতে কী এমন হয়েছে? সব কিছু যেন কেমন এলোমেলো লাগছে। রাহাতকে কেন এমন অচেনা লাগছে ওর? এতটা সময় ধরে অফিসে এসেছে, অথচ রাহাত ওর দিকে ভালো করে তাকিয়ে পর্যন্ত দেখেনি। আর তমা? ওকেই-বা এমন অন্যরকম লাগছে কেন? ওর কাটা-কাটা কথাও নীরা আর নিতে পারছে না। তমার চোখের ভাষায় তীব্র আক্রমণ—মনে হচ্ছে, আমি চলে আসায় ওদের খুব সমস্যা হচ্ছে।

নীরা ধীরপায়ে উঠে ক্যান্টিনে যায়। একটা ব্ল্যাককফি নিয়ে এককোণায় বসে যায়।

তাহলে কি তমা আর রাহাত…? না না, সে কী ভাবছে! এত অল্প সময়ে এটা কী করে সম্ভব?

তমা তাহলে রাহাতকে কেড়ে নিল? এভাবে? কিন্তু রাহাতও তো কোনো ছেলেমানুষ নয়, ওকে তো ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, যদি না ও নিজেই যেতে চায়।

তাই বলে নীরার বান্ধবী! এত মেয়ে ছিল আশেপাশে। নীরা হিসেব মেলাতে পারে না।

তমা নীরাকে খুঁজতে খুঁজতে ক্যান্টিনে চলে আসে।
: ওঃ নীরা, এখানে তুই!
: কোথায় থাকব নয়তো?
: রাহাতের রুমে যাবি বলছিলি?
: তুই বললি, রাহাতের ওসব পছন্দ না; তাই ভাবলাম, তোর থেকে জেনে নিই, ওর কী কী পছন্দ।
: হ্যাঁ, তা জিজ্ঞেস করতে পারিস। ও একটু পাগলাটে ধরনের। বাইরে থেকে খুব পরিপাটি দেখালেও ভেতরটা ফাঁপা, বুঝলি? আর...

নীরা উঠে দাঁড়াল। ওর আর কিছু শুনতে ইচ্ছে করছে না। তমার কি কোনো লজ্জা নেই? ও নিজের মনেই সব বলে যাচ্ছে।

: কী রে, উঠছিস কেন?
: আমি যাব এখন।
: রাহাতের সম্পর্কে আরও কিছু বলতে চাই, তোর জানা উচিত।
: জানতে চাই না।
: তোকে জানতে হবে।

: আমি রাহাতকে ভালোবেসে ফেলেছি, নীরা।
: হা হা। সে আর বলার কী আছে? বোঝাই তো যাচ্ছে। তোর কোনো গিল্টি ফিলিংও নেই?
: না, কেন থাকবে? তোদের মধ্যে কোনো ভালোবাসা ছিল না কখনও।
: রাহাত তা-ই বলল?
: না, ও বলেনি কিছু। আমি নিজেই বুঝতে পেরেছি।
: অনেক বুঝে গেছিস তাহলে।

: একটা হেল্প করবি?
: কী?
: রাহাত জানে না আমার অতীত। আমি ভয় পাই, যদি ও সব জানলে আমাকে অ্যাক্সেপ্ট না করে?

নীরা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। তমাকে কিছুই না বলে প্রায় দৌড়ে চলে আসে বাইরে। রিকশায় উঠে বসে।

: কই যাবেন, আপা?

আচ্ছা, কোথায় যাবে নীরা? কেন উঠে বসল রিকশায়? তার তো কোনো মানুষ নেই। যাবার কোনো জায়গা নেই।

: গোরস্থানের দিকে যান, ভাই।

মায়ের কবরের কাছে তো যাওয়াই যায়। কেউ তো ফিরিয়ে দেবে না সেখান থেকে। বহুদিন মায়ের কাছে যায় না। আজ সারাদিন নাহয় সেখানেই বসে থাকবে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *