দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

শূন্যের সপ্তক: ২



দোঁহা: যে-প্রেমে নলখাগড়া কাঁদে, সেই প্রেমে চন্দ্র হাসে, একই আগুনে সবাই পোড়ে—কেউ ছাইয়ে, কেউ আলোর ভাষে।


একই আগুন। কিন্তু কেউ সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়—আর কেউবা সেই আগুনে জ্বলে আলো হয়ে যায়। পার্থক্যটা আগুনে নয়—পার্থক্যটা কে পুড়ছে, তাতে। অহং জ্বললে ছাই হয়—কারণ অহং জ্বালানি মাত্র, সে পুড়ে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আত্মা জ্বললে নুর হয়—কারণ আত্মা আগুনে শেষ হয় না, আত্মা আগুনে শুদ্ধ হয়, আরও উজ্জ্বল হয়। সোনা যেমন আগুনে গলে খাদ ফেলে, আত্মাও তেমন প্রেমের আগুনে গলে অহংকার ফেলে—আর যা থাকে, তা খাঁটি।


নলখাগড়া কাঁদে—সেটাও প্রেম। চাঁদ হাসে—সেটাও প্রেম। কান্না আর হাসি প্রেমের দুই মুখ—যেমন রাত আর দিন আকাশের দুই মুখ।


প্রথম পর্ব—ভ্রমণ


মাকাম-ই-তওবা: ফেরার আকুলতা


সুফি-পথে প্রথম ধাপের নাম তওবা।


সাধারণত তওবা মানে "অনুশোচনা"—পাপ করেছি, ক্ষমা চাই। কিন্তু সুফিরা তওবাকে আরও গভীরভাবে দেখেন। ইমাম গাজ্জালি তাঁর ইহ্‌ইয়া উলুম আদ-দীন-এ লিখেছেন—তওবার তিনটি শর্ত: অতীতের জন্য অনুশোচনা, বর্তমানে পাপ পরিত্যাগ, ভবিষ্যতে না-ফেরার সংকল্প। কিন্তু জুনায়েদ বাগদাদি—সুফি সম্প্রদায়ের অন্যতম পুরোধা—আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন: তওবা মানে পাপ ভুলে যাওয়া নয়, তওবা মানে আল্লাহ্‌কে এতটাই মনে রাখা যে, পাপের কথা আর মনেই থাকে না।


তাঁদের কাছে তওবা মানে—ফেরা। ঘরে ফেরা। সেই ঘরে, যেখান থেকে আত্মা একদিন বেরিয়ে এসেছিল।


তওবা হলো আত্মার সেই প্রথম কাঁপুনি—যখন সে হঠাৎ বুঝতে পারে: আমি কোথাও থেকে বিচ্ছিন্ন। আমি পূর্ণ নই। আমার ভেতরে একটা খালি জায়গা আছে—আর সেই খালি জায়গাটা কোনো জিনিস দিয়ে ভরবে না, কোনো মানুষ দিয়ে ভরবে না, কোনো সাফল্য দিয়ে ভরবে না। সেই খালি জায়গাটা শুধু একজনের—যিনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন।


সেই রাত


তুমি কি মনে করতে পারো সেই গানটি? সেই রাতের গান? যে-রাতে মাশুক—প্রেমাস্পদ, ঈশ্বর, আল্লাহ্—প্রথম বার তাঁর মুখ ফিরিয়েছিলেন আমাদের দিকে?


উত্তর আসে—না, আমি গানটি মনে করি না। আমি মনে করি শোনাটুকু।


গান হলো শব্দ—সুর, কথা, ছন্দ। কিন্তু শোনা হলো অভিজ্ঞতা—সেই মুহূর্তে তুমি কেমন ছিলে, তোমার বুকে কী হচ্ছিল, তোমার শ্বাস কেমন চলছিল। গান ভোলা যায়—কিন্তু শোনার অনুভূতি শরীরে গেঁথে থাকে। প্রিয় কারও কণ্ঠস্বর হয়তো ভুলে যায়—কিন্তু তার বলা একটি "আছ তো?" সারাজীবন ভেতরে বাজতে থাকে। শব্দ হারায়, কিন্তু কম্পন থাকে। ঠিক যেমন তুমি হয়তো ভুলে গেছ তোমার মা প্রথম কোন গান গেয়ে তোমাকে ঘুম পাড়িয়েছিলেন—কিন্তু সেই ঘুমের নিরাপত্তার অনুভূতিটা তোমার হাড়ে গেঁথে আছে। গান হারায়, শোনা থাকে।


সবচেয়ে গভীর মুহূর্তটা গানের মুহূর্ত নয়। সবচেয়ে গভীর মুহূর্ত হলো গানের ঠিক আগের মুহূর্ত—যখন সব চুপ, কিন্তু কিছু একটা আসতে চলেছে।


বৃষ্টির আগে আকাশ চুপ হয়ে যায়—মেঘ জমেছে, বাতাস থমকে গেছে, পাখি চুপ—সবাই জানে, বৃষ্টি আসবে, কিন্তু এখনও আসেনি। সেই "এখনও আসেনি" মুহূর্তটাই সবচেয়ে তীব্র।


সুবহে সাদিকের আগে—ফজরের আগে—রাত সবচেয়ে অন্ধকার হয়। আলোর ঠিক আগের অন্ধকারটাই সবচেয়ে ঘন। সুফিরা একে বলেন কাবদ—সংকোচন—হৃদয়ের সেই অবস্থা, যখন আল্লাহ্‌কে দূর মনে হয়। কিন্তু কাবদের পরেই আসে বাসত—প্রসারণ—আলো। সবচেয়ে ঘন অন্ধকারই ভোরের সবচেয়ে নিশ্চিত প্রমাণ।


মৃত্যুর আগে শ্বাস সবচেয়ে গভীর হয়—শেষশ্বাসটা সবচেয়ে বড়ো শ্বাস। শেষটাই সবচেয়ে তীব্র। সুফিরা বলেন—"মুতু ক্বাবলা আন তামুতু"—মরার আগে মরো। অহংকে মরতে দাও—তাহলে আত্মা জেগে উঠবে। শেষটাই শুরু।


ঠিক এরকম একটা মুহূর্ত ছিল। যেখানে সব কিছু সম্ভব ছিল, কিন্তু কিছুই ঘটেনি এখনও। আর সেই ফাঁকটুকু—সেই অপেক্ষাটুকু—সেটাই ছিল আসল গান। কারণ গান শব্দে থাকে না—গান থাকে শব্দের আগের নীরবতায়। মাণ্ডূক্য উপনিষদ বলে—ওঁকারের তিন মাত্রার (অ-উ-ম্‌) পরে যে-নৈঃশব্দ্য, সেটাই তুরীয়—চতুর্থ অবস্থা—সেখানেই আত্মার আসল বাস। শব্দে নয়, শব্দের পরের নীরবতায়।


দরজা


সেই রাতে বাতাস যেন খুলে গিয়েছিল।


বাতাস "খোলে" না সাধারণত—দরজা খোলে। কিন্তু এখানে বাতাসই যেন একটা দরজা হয়ে গেল। আর সেই দরজাটা এমন একটা দরজা, যেটায় কেউ কোনোদিন করাঘাত করেনি—অর্থাৎ কেউ টোকাও দেয়নি—অথচ দরজাটা চিরকাল এই একটা মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করছিল। গোলাপের কুঁড়ি জানে না ভোর আসবে কি না—কিন্তু সে সারারাত ফোটার প্রস্তুতি নেয়। সে বিশ্বাস করে—আলো আসবে। আর যখন আলো আসে, সে ফোটে—এমনভাবে ফোটে, যেন সে চিরকাল এই মুহূর্তের জন্যই ছিল।


বাউলেরা বলেন—মনের দরজা বাইরে থেকে খোলে না, ভেতর থেকে খুলতে হয়। কেউ এসে তোমাকে জাগাতে পারবে না—তোমাকে নিজেকে জাগতে হবে। কিন্তু কখনো কখনো এমন লাগে যেন দরজাটা দুই দিক থেকেই একসাথে খুলেছে। ভেতর থেকেও, বাইরে থেকেও।


সুফি দর্শনের একটা গভীর সত্য এটা—আল্লাহ্ও তোমার দিকে আসছেন, তুমিও আল্লাহ্‌র দিকে যাচ্ছ। তওবা দু-তরফা—তুমি ফিরছ, আর তিনি ডাকছেন। কুরআনে (সূরা আল-বাকারাহ ২:১১৫) আছে: "আইনামা তুওয়াল্লু ফাসাম্মা ওয়াজহুল্লাহ"—যেদিকেই তুমি মুখ ফেরাও, সেদিকেই আল্লাহ্‌র মুখ। তুমি তাঁর দিকে ফিরছ? তিনি আগে থেকেই তোমার দিকে ফিরে আছেন। দুটো নদী ভিন্ন পাহাড় থেকে নেমে একই সমতলে মেশে—কেউ কাউকে না চিনেও।


কুন


সেই রাতে একটি নিঃশ্বাস কেমন করে জানি দুটো হয়ে গেল।


এক ছিলাম, দুই হয়ে গেলাম। "আমি" ছিলাম একটা—তারপর "তুমি" এলে, আর "আমি" দুটো হয়ে গেল—"তুমি" আর "আমি।"


এই বিভাজন কেবল ভাঙন নয়—এই বিভাজনই সম্পর্কের জন্ম। "আমি" একা থাকলে প্রেম কোথায়? "তুমি" আসায় দূরত্ব হলো, আর সেই দূরত্বেই আকর্ষণ জন্ম নিল।


কুরআনে (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৮২) আছে—"কুন, ফা-ইয়াকুন"—হও, আর তা হয়ে যায়। এক শব্দে সৃষ্টি শুরু হলো। আলো আর অন্ধকার আলাদা হলো। কিন্তু সেই রাতে বিভাজন আলো আর অন্ধকারে হয়নি—হয়েছে তোমায় আর আমায়।


প্রশ্ন উপনিষদে (১.৪) বলা হয়েছে—প্রজাপতি সৃষ্টি করতে চাইলেন, তপস্যা করলেন, আর সেই তপস্যা থেকে দুটো জিনিস জন্মাল—প্রাণ আর রয়ি। জীবনীশক্তি আর জড় পদার্থ। এই দুইয়ের মিলনে সৃষ্টি।


কুরআন বলছে "কুন"—হও। উপনিষদ বলছে তপস্যা—ইচ্ছা। দুটোই একই কথা বলছে ভিন্ন ভাষায়—সৃষ্টি ইচ্ছা থেকে জন্মায়। আর সেই ইচ্ছার আরেক নাম? প্রেম। শুরুতে যে-বাণীটি পড়েছিলে—"কুনতু কানযান"—আমি ছিলাম গুপ্ত, পরিচিত হতে চাইলাম—এটাই সেই ইচ্ছা। সৃষ্টির মূলে শাস্তি নয়, ভয় নয়—প্রেম।


আর দেখার সাথে সাথে একটা জগৎ জন্ম নিল। সেই জগতে তুমি ছিলে, আমি ছিলাম—আর আমাদের দু-জনের মাঝখানে যে-শূন্যতা, সেটা ছিল আল্লাহ্‌র সবচেয়ে ব্যক্তিগত কবিতা।


শূন্যতাটুকু—তোমার আর আমার মধ্যে যে-দূরত্ব, যে-ফাঁক, যে-"না-পাওয়া"—তা ভুল নয়, তা ত্রুটি নয়—তা আল্লাহ্‌রই কবিতা। কারণ কবিতা শব্দের মধ্যে থাকে না—কবিতা থাকে দুটো শব্দের মাঝখানের নীরবতায়। প্রেম দু-জন মানুষের মধ্যে থাকে না—প্রেম থাকে দু-জনের মাঝখানের টানটুকুতে। প্রেমের গভীরতম কাজ অনেকসময় মিলনে নয়—মিলনের অসম্পূর্ণতার ভেতরেই তার তীব্রতা। ঈশ উপনিষদ বলে—"পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং"—সেই পূর্ণ, এই জগৎও পূর্ণ—পূর্ণ থেকে পূর্ণ বের হলেও পূর্ণই থাকে। শূন্যতা আর পূর্ণতা একই মুদ্রার দুই পিঠ।


চাবি আর তালা


তারপর। একজন অপরিচিত ঘরে ঢুকল। ঘরটা আর ঘর রইল না।


প্রেম যখন আসে, পুরো জগৎ বদলে যায়। ঘর আর চারদেয়াল থাকে না—ঘর হয়ে যায় এক বিস্তীর্ণ নলবন। আর সেই নলবনের প্রতিটি নলখাগড়া কাঁপতে থাকে এমন এক বাতাসে, যাকে দেখা যায় না—কিন্তু যার ছোঁয়ায় প্রতিটি তন্তু মনে করে, সে কোথায় ছিল, কার কাছে ছিল, আর কোন প্রেমের বাগান থেকে তাকে উপড়ে আনা হয়েছিল।


আবার রুমির নলখাগড়া। আবার সেই বিচ্ছেদের কান্না। কিন্তু এখন সেই কান্না একটা মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে জেগে উঠছে—কারণ সত্যিকারের প্রেমের মুখ দেখলে আত্মা হঠাৎ নিজের আদিনিবাসের গন্ধ পায়। সে বুঝতে পারে—আমি এ মুখকে আগে কোথাও চিনতাম। এই চেনা দেহের নয়, সময়ের নয়—এ এক রূহের চেনা।


আর এইখানেই প্রেমের মানুষ আর শুধু মানুষ থাকে না। সে হয়ে ওঠে একটা জানালা। সেই জানালা দিয়ে অনন্ত উঁকি দেয়। আমরা একটা মানুষকে ভালোবাসি—কিন্তু আসলে সেই মানুষের ভেতর দিয়ে আমরা অনন্তকে দেখি। মানুষটা আয়নাও বটে, জানালাও বটে—আয়না, কারণ সে আমাদের নিজেদের লুকানো রূপ দেখায়; জানালা, কারণ সে পার হয়ে যেতে দেয় এমন এক জগতে, যেখানে ভাষা পৌঁছায় না।


সুফিরা একে বলেন ফিতরা—আত্মার আদি প্রকৃতি—কুরআনে (সূরা আর-রূম ৩০:৩০) আছে, আল্লাহ্ মানুষকে একটা আদি ‘চেনা’ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি মানবশিশু জন্মগতভাবে আল্লাহ্‌কে চেনে—শুধু জগতের ধুলো সেই চেনাকে ঢেকে দেয়। তাই "চেনা" মানুষটিকে প্রথম বার দেখে যে-কাঁপুনি লাগে—সেটা ফিতরার কাঁপুনি—আত্মার মনে পড়ছে, সে আগে কোথায় ছিল।


তারপর আসে লালনের গান—"আমার ঘরের চাবি পরের হাতে, কেমনে খুলব তায়?" লালন বলছেন—আমার ঘর আমার, কিন্তু চাবি অন্যের হাতে। আমি নিজে নিজেকে খুলতে পারি না—অন্য কাউকে লাগে।


সেই রাতে মনে হলো, চাবি আর তালা আসলে একই জিনিস। আর সেই জিনিসটার নাম—তুমি।


যে-মানুষটা সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে-ই তোমার তালা, সে-ই তোমার চাবি। সে-ই তোমাকে বন্ধ করে রেখেছে, সে-ই তোমাকে খুলবে। প্রেম একই সাথে বন্ধন আর মুক্তি—একই সাথে প্রশ্ন আর উত্তর—একই সাথে ক্ষত আর মলম। রুমি ঠিক এই কথাই বলেছিলেন—যে তোমাকে পুড়িয়েছে, সে-ই তোমার মলম। কারণ মাশুক একজনই—আর তিনি ক্ষতও দেন, নিরাময়ও দেন।


তওবার জন্ম


এটাই মাকাম-ই-তওবার শুরু। আত্মা বুঝতে পেরেছে—সে বিচ্ছিন্ন। সে ফিরতে চায়। আর ফেরার প্রথম ইশারা এসেছে—একটা মানুষের মুখে, একটা অপরিচিতের চোখে, একটা রাতের নৈঃশব্দ্যে। কখনোবা একটা অকারণ কান্নায়। সেই অশ্রু থেকেই পথ জন্মায়। সেই পথেই যাত্রা শুরু হয়।


মানুষ তখন বুঝতে শেখে—আমি শুধু বাঁচতে আসিনি—আমি চিনতে এসেছি। আমি শুধু পেতে আসিনি—আমি ফিরে যেতে এসেছি। আমি শুধু দেহ নই—আমি এক স্মৃতি, যার গন্তব্য আবার তার উৎস।


আর এই বোঝার মুহূর্তেই প্রথম তওবা জন্মায়। ভয়ের তওবা নয়—প্রেমের তওবা। শাস্তির ভয়ে নয়—আদিম প্রিয়তমের টানে।


এই পার্থক্যটা বুঝতে পারলে সুফি-পথের পুরো মানচিত্র খুলে যায়। সাধারণ তওবা বলে—আমি ভুল করেছি, আমাকে শাস্তি দিয়ো না। সুফি তওবা বলে—আমি তোমাকে ভুলে গিয়েছিলাম, আমি ফিরে এসেছি। একটায় ভয় আছে, অন্যটায় প্রেম আছে। রাবেয়ার সেই প্রার্থনাটা মনে করো—জাহান্নামের ভয়ে নয়, জান্নাতের আশায় নয়, কেবল তোমার জন্যই। তওবাও তা-ই—শাস্তির ভয়ে নয়, তোমার কাছে ফেরার টানে।


সেখানেই আত্মার ভ্রমণ শুরু। যাত্রা শুরু হলো।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *