আমি এখন সেই ভার বুঝি। সকালে উঠে আয়নায় যে-মুখ দেখি, তার চোখের নিচে যে-ছায়া—ওটা ঘুমের অভাব নয়, ওটা জমে-থাকা বিকেলের রং, জমে-থাকা রাতের নীলচে অন্ধকার, জমে-থাকা এমন সব সন্ধে, যখন কাউকে বলতে চেয়েছি—থাকো, আর-একটু থাকো, এই চায়ের কাপটুকু শেষ করো অন্তত, এই গানটা শেষ হোক, এই বৃষ্টিটুকু থামুক, এই সিগারেটটুকু শেষ হোক—কিন্তু বলিনি। সিগারেট শেষ হয়েছে, ছাই পড়েছে অ্যাশট্রেতে, আর সেই ছাই দেখে ভেবেছি—এভাবেই তো যায়, জ্বলতে জ্বলতে খাটো হয়, আলো দেয় একটু, ধোঁয়া দেয় একটু, তারপর ছাই—আর সেই ছাইও ঝেড়ে ফেললে কিছু থাকে না, শুধু গন্ধ থাকে বাতাসে, শুধু হলুদ দাগ থাকে আঙুলে, শুধু সেই অভ্যেস থাকে ঠোঁটে—খালিহাতেও মাঝে মাঝে ঠোঁটের কাছে নিয়ে যাই আঙুল, যেন ধরে আছি এমন কিছু, যা নিভে গেছে, কিন্তু ছাড়তে পারছি না।
বলিনি, কারণ ধরে রাখা সহজ, ছেড়ে দেওয়া কঠিন, আর কঠিন কাজই করেছি বার বার…যেন কাঠিন্যই আমার ধর্ম, যেন ত্যাগই আমার অলংকার—এমন অলংকার, যা কেউ দেখে না, যা কোনো আয়নায় ধরা পড়ে না, শুধু বুকের ভেতর একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি করে—গোল, গভীর, প্রতিধ্বনিময়—বাতাস বইলে শব্দ হয়, বাঁশির মতো, কান্নার মতো, আর সেই শব্দকেই আমি আমার সংগীত বলি, আমার একমাত্র সংগীত, যা কেউ শোনে না, কিন্তু আমি বাজাই প্রতিরাতে, ঘুমের আগে, এই বন্ধ ঘড়ির তিনটে সাতের ঘরে—যেখানে সময় থেমে আছে, কিন্তু আমি থামিনি, শুধু ঘুরছি সেই থেমে-যাওয়া মুহূর্তের চারদিকে, যেমন ঘোরে মথ আগুনে, যেমন ঘোরে তসবির দানা আঙুলে, যেমন ঘোরে ঘুড়ির সুতো নাটাইয়ে, প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে টানটান, টানটান, যে-কোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে, কিন্তু ছেঁড়েনি, এখনও ছেঁড়েনি।
৪। নদীর দিকে হাঁটা কিংবা কোনো চিরকুট
নদী পেরিয়ে গেলে অন্য দেশ—এমন বিশ্বাস, শৈশবে ছিল। নদীর ওপার মানেই রহস্য, নদীর ওপার মানেই সম্ভাবনা, নদীর ওপার মানেই সেই সব কিছু, যা এপারে নেই, কিন্তু থাকা উচিত ছিল। ওপার থেকে যে-বাতাস আসত, তার গায়ে লেগে থাকত অচেনা গন্ধ—হয়তো অন্য মাটির, যে-মাটিতে অন্য ফসল ফলে; হয়তো অন্য রান্নার, যে-রান্নায় অন্য মশলা পড়ে; হয়তো অন্য জীবনের, যে-জীবনে অন্য স্বপ্ন দেখা যায়—আর সেই গন্ধই ছিল বিদেশ, সেই গন্ধই ছিল আকাঙ্ক্ষা, সেই গন্ধই ছিল সেই টান, যা পায়ে দেয় না, কিন্তু বুকে দেয়, মাথায় দেয়, সেই জায়গায় দেয়, যেখানে স্বপ্ন জন্মায়—হাড়ের মজ্জায়, রক্তের স্রোতে, কোষের সেই অন্ধকার কারখানায়, যেখানে তৈরি হয় আকাঙ্ক্ষা, যেখানে তৈরি হয় অতৃপ্তি, যেখানে তৈরি হয় সেই অদ্ভুত প্রবৃত্তি, যা মানুষকে ঘর ছাড়ায়, পথে নামায়, নদী পেরোতে শেখায়।
এখন জানি—নদীর ওপারে একই মাটি, একই ধান, একই ক্লান্ত মানুষেরা একই সন্ধেয় একই রকম হারিকেনের আলোয় বসে একই রকম ভাত খায় একই রকম নীরবতায়, একই রকম দাঁত দিয়ে একই রকম হাড় চোষে, একই রকম হাত দিয়ে একই রকম ঘাম মোছে, আর একই রকম রাতে একই রকম অন্ধকারে একই রকম স্বপ্ন দেখে—ওপারে কিছু আছে, নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু জানা সত্ত্বেও—এই জানা, যা মস্তিষ্কে আছে, কিন্তু হৃদয়ে পৌঁছায়নি, যেমন পৌঁছায় না চিঠি, যদি ঠিকানা ভুল হয়—এসব কিছু জানা সত্ত্বেও, নদীর দিকে তাকালে এখনও মনে হয়, ওপারে অন্য কিছু আছে। হয়তো আছে। হয়তো সেটা কোনো জায়গা নয়, কোনো মানুষ নয়, কোনো বস্তু নয়—হয়তো সেটা শুধু ওপার হওয়ার ইচ্ছেটুকু, শুধু পেরোনোর স্বপ্নটুকু, আর সেটাই যথেষ্ট, সেটাই নদীর আসল উপহার—নদী পার করিয়ে দেয় না, নদী পার হওয়ার ইচ্ছে দেয়, আর সেই ইচ্ছেতেই বেঁচে থাকা, সেই ইচ্ছেতেই কৈশোর, সেই ইচ্ছেতেই সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠা, যখন উঠতে ইচ্ছে করে না, জীবন টেনে নিতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু নদী ডাকছে, ওপার ডাকছে, সেই অচেনা গন্ধ ডাকছে।
জল ঘোলা আজ—ছাইরঙা, যেন কেউ উজানে অনেক কিছু পুড়িয়েছে আর তার ভস্ম ভাসিয়ে দিয়েছে স্রোতে। বর্ষায় পাহাড় থেকে নেমে এসেছে কত কিছু—গাছের শেকড়, যা আঁকড়ে ধরতে পারেনি আর; মরা পাখির পালক, যা একসময় বাতাসে ভেসেছিল; কারও ভাঙা সানকির টুকরো, যার গায়ে এখনও নীল ফুলের আঁকা; কারও স্বপ্নের টুকরো, যা দেখতে শ্যাওলার মতো—ছুঁলে পিছল, ধরতে গেলে হাত ফসকে যায়, আর স্রোতে ভেসে যায় এমন জায়গায়, যেখানে আর কেউ খুঁজবে না। স্রোতের মাঝখানে একটা নৌকা ভাসছে—কাঠের, পুরোনো, রং-ওঠা, তলায় জল ঢুকছে ধীরে ধীরে, কিন্তু ভাসছে। এইটুকুই তো কৃতিত্ব—ডুবে না যাওয়া। এইটুকুই তো বীরত্ব—তলায় জল ঢুকছে জেনেও সেঁচতে থাকা, আর সেঁচতে সেঁচতে এগিয়ে যাওয়া, আর এগোতে এগোতে বিশ্বাস করা যে, ঘাট আছে কোথাও, তীর আছে কোথাও, শুকনো মাটি আছে কোথাও, যেখানে নৌকা বাঁধা যাবে, পা রাখা যাবে, দাঁড়ানো যাবে।
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে বালিশে মুখ চেপে পাঁচটা মিনিট শুয়ে থাকা—সেই পাঁচমিনিট, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—উঠব কি উঠব না, আরেকটা দিনকে মানব কি মানব না—তারপর ওঠা, তারপর মুখ ধোওয়া ঠান্ডা জলে, আয়নায় নিজেকে দেখা একবার, তারপর চা বসানো—এটাই তো নৌকার ভাসা, এটাই তো স্রোতের বিরুদ্ধে থাকা, এটাই তো সেই মৌন বিদ্রোহ, যা কোনো ইতিহাস-বই লেখে না, কিন্তু প্রতিটি মানুষ প্রতিটি সকালে করে—চোখ খুলে আরেকটা দিনকে মেনে নেওয়া, আরেকটা দিনকে নিজের বলে স্বীকার করা, যদিও সেই দিনে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো পুরস্কার নেই, কোনো উপহার নেই, শুধু সময় আছে—কাটানোর জন্য, সহ্য করার জন্য, বয়ে যেতে দেওয়ার জন্য, কখনো কখনো ভালোবাসার জন্য—হ্যাঁ, কখনো কখনো ভালোবাসার জন্যও, যদিও সেটা কোনো নিশ্চয়তা নয়, শুধু সম্ভাবনা, শুধু হয়তো, শুধু সেই দূরের ওপার যা, গন্ধ পাঠায় বাতাসে, কিন্তু নিজে আসে না কাছে, কখনও আসে না।
কিন্তু নদী তো থামে না। নদীর কোনো শোক নেই, কোনো স্মৃতি নেই, কোনো তিনটে সাতে আটকে-থাকা ঘড়ি নেই। নদী এই মুহূর্তেও বয়ে যাচ্ছে—ঘোলা জলে মাছ উঠছে, লাফ দিচ্ছে, রুপোলি পেট দেখাচ্ছে একমুহূর্তের জন্য, আর তারপর ডুব—আর সেই লাফ দেখে নদীর ধারের ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল, হাততালি দিল, যেন মাছের লাফ তার জন্যই, যেন পৃথিবী তাকে দেখাতেই এত আয়োজন করেছে। ছেলেটা জানে না, আমি দেখছি। আমিও জানতাম না, কেউ দেখছে—সেই বয়সে, যখন মাছের লাফই ছিল যথেষ্ট, যখন নদী মানেই আনন্দ, জল মানেই খেলা, আর সন্ধের আলো নদীর গায়ে পড়লে জল সোনা হয়ে যেত—ঠিক সোনা নয়, ছাইরঙা সোনা, পোড়া সোনা, এমন আলো, যা দিনের শেষ আলো—তারপর অন্ধকার, তারপর জোছনা—আর জোছনায় নদী সম্পূর্ণ বদলে যায়, অচেনা হয়ে যায়, রুপোলি হয়ে যায়, যেমন অচেনা হয়ে যায় চেনা মানুষ কখনো কখনো, ঘুমের মধ্যে, যখন তার মুখের ওপর জানালা-দিয়ে-আসা জোছনা পড়ে আর মনে হয় এ কে, একে চিনি কি, এর কাছে কি আমি নিরাপদ—আর তারপর সে নড়ে, ঘুমের মধ্যেই হাত রাখে তোমার বুকে, আর তুমি জানো—চিনি, নিরাপদ, এখনও নিরাপদ।
৫। যে-নারী ছাদে দাঁড়িয়ে তারা গোনে
সারাদিন সে রান্না করে—ভাতের ফ্যান ছাঁকতে গিয়ে আঙুল পোড়ে, পুরোনো ক্ষত শুকোনোর আগেই নতুন ক্ষত, হাতের তালুতে একটা মানচিত্র তৈরি হচ্ছে পোড়া দাগে পোড়া দাগে—কিন্তু সেই মানচিত্র কেউ পড়ে না। কাপড় কাচে—সাবানের ফেনায় হাত সাদা হয়ে যায়, নখের কিনারা ফাটে, আর কাপড়ে যে-দাগ লাগে, তা ওঠে, কিন্তু তার হাতের দাগ ওঠে না কোনোদিন। সন্তানের জ্বর মাপে থার্মোমিটারে—সেই পারদের লাল রেখা, যা ওপরে উঠলে বুকে চাপ বাড়ে, নামলে নিজের জ্বর টের পায়—সেই জ্বর, যা থার্মোমিটারে ওঠে না, যা শরীরের নয়…মনের, যা ওষুধে সারে না। স্বামীর রাগ সামলায়—সেই রাগ, যা আসে বিনা কারণে আর যায় বিনা ক্ষমায়, যা ঘরে ঢুকে আসে জুতোর কাদার মতো, আর সে মুছে রাখে নিঃশব্দে, যেমন রাখে সব কিছু—গোছানো, পরিষ্কার, জায়গামতো—কিন্তু নিজে কোথায়, নিজের জায়গা কোথায়, এই ঘরে তার জায়গা কোনটা—রান্নাঘরের মেঝে? না, ওটা তার কর্মক্ষেত্র। শোয়ার ঘরের বিছানার এইটুকু অংশ? না, ওটা তার ঘুমের ভাড়াবাসা। তাহলে? তাহলে ছাদ। শুধু ছাদ।
সে-ও কালোমেঘ—যদিও জানে না সেই নাম। তার কথাও তেতো, তার সত্যও তেতো, তার হাতের রান্নাও তেতো মশলায় ভরা, যা খেলে শরীর সারে, কিন্তু কে সারাবে তাকে, কে জোর করে খাওয়াবে তাকে চা-চামচে ঢেলে বলে—গিলে ফেলো, পরে ভালো হবে? কেউ নেই। তাই সে নিজেই নিজের ওষুধ—প্রতিরাতে—ছাদে ওঠে, আকাশ গেলে। রাতে, সবাই ঘুমোলে—স্বামী ডান-কাতে, মুখ দেয়ালের দিকে, সন্তান তার ছোট্ট বিছানায় হাঁটু মুড়ে, শাশুড়ি ওষুধ খেয়ে নাক ডাকছে পাশের ঘরে—সে চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে ছাদে ওঠে। খালি পায়ে। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ চেনা—কোনটায় শব্দ হয়, কোনটায় হয় না, সে জানে, কারণ প্রতিরাতে এই যাত্রা, প্রতিরাতে এই গোপন তীর্থ।
ছাদের দরজা খুললেই বাতাস—সেই বাতাস, যা কারও দখলে নয়, যা কারও অনুমতিতে বয় না, যা গায়ে লাগলে শাড়ির আঁচল ওড়ে আর মনে হয়, পাখা আছে; মনে হয়, ওড়া যায়; মনে হয়, এই ছাদের ওপাশে আরেকটা পৃথিবী আছে, যেখানে সে শুধু মা নয়, শুধু বউ নয়, শুধু মেয়ে নয়—সে একটা নাম, একটা ইচ্ছে, একটা গান, যা কেউ গায়নি এখনও, কিন্তু সুর তৈরি আছে বুকের ভেতরে, কথা তৈরি আছে ঠোঁটের ওপরে, শুধু দরকার একটু নিরিবিলি, একটু আকাশ, একটু সেই মুক্তি, যা কোনো আদালত দেয় না, কোনো আইন দেয় না, শুধু অন্ধকার আর নক্ষত্র দেয়—কোনো শর্ত ছাড়া, কোনো আবেদনপত্র ছাড়া, কোনো সাক্ষী ছাড়া।
ছাই ও জোছনার ব্যাকরণ: ২
লেখাটি শেয়ার করুন