১। মোহাবর্ত
রেশমের জালের মতো এই চাঁদনিরাতে আমার বুকের ভেতরটা আটকে গেল—যেভাবে মাকড়সার সুতোয় জড়িয়ে পড়ে প্রজাপতির শেষ-শ্বাস। আমার অশান্ত, ক্ষুব্ধ মন সেই জ্যোৎস্নার পাতলা আবরণটিকে ফুলিয়ে তুলছে, কাঁপিয়ে দিচ্ছে—যেমন সমুদ্রের তলদেশে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি জলের শান্ত চাদরকে ভেতর থেকে উত্তপ্ত করে তোলে। বেঁচে থেকে যা যা চেয়েছিলেম—সেসবের কোনো কিছুই পাইনি বলে আজ আর বুকের ভেতরে পাথরচাপা দুঃখ নেই; বরং সেই দুঃখ এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যেমন পচা-পাতার স্তূপ থেকে জন্ম নেয় সোনালি ছত্রাক। হে কামনা, হে উন্মত্ত বক্ষ—তুমি আজ কিংবদন্তি হয়ে গেছ; তোমাকে ছোঁয়া যায় না, তোমাকে নিয়ে শুধু গল্প বলা যায়।
আমার ভেতরে জমে-থাকা ঘৃণা আর তীব্র বিতৃষ্ণা—আতশবাজির রাতে আকাশে ফেটে-পড়া আলোর মতো একমুহূর্তের জন্য উদ্ভাসিত হয়ে মিলিয়ে-যাওয়া যন্ত্রণার উচ্ছ্বাস। স্ত্রী, সুরা, পুঁথি, ছন্দ আর রূপের নেশা—একটি ফুরোলে আরেকটি, আরেকটি শেষ হলে তৃতীয়টি; এই অদলবদলের খেলায় শবাধারের গভীরতার সঙ্গে রজনীগন্ধার তরতাজা সুবাসের যে অপবিত্র মিলন ঘটে—সেই মিলনে আজ রাতে প্রথম বারের মতো অর্থ খুঁজে পেলাম। রেশমের এই জালে, কুয়াশামাখা এই চন্দ্রালোকে—প্রথম বার।
এই প্রথম আমি জ্যোৎস্নার জালে বন্দি। নিচু গোঙানি যেন গজদন্তের বঁড়শি হয়ে আমাকে টেনে আনছে কাছে; চঞ্চল হাত, ব্যগ্র আঙুলের ডগা—মৃত্যুপথযাত্রী কোনো প্রাচীন সরীসৃপ যেমন জলের ওপরে শেষবারের মতো লেজ আছড়ায়, ঠিক তেমনি। আর আমি—পথভ্রষ্ট নাবিকের মতো এই স্বচ্ছ রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি: কাঁচা রক্তমাংসের ভিজে সোঁদা গন্ধের মতোই এই চাঁদনি—কী অপার্থিব এই মৃগয়া!
২। নির্জনতার ভূগোল
জনমানবহীন প্রান্তরে ঝুপ করে নেমে এসেছিল সন্ধে—বাদুড়ের ভাঙা ডানার ঝাপটানির শব্দের সঙ্গী হয়ে—সেদিনের অরণ্যে, পাহাড়ের গায়ে। সামনে চুপচাপ রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে—কিশোরী মেয়ের ছন্দে-ছন্দে হেঁটে যাওয়ার মতো; আর কুকুরের আর্তনাদটুকুও কুয়াশার আস্তরণে মুড়ে গিয়ে ঘোলাটে হয়ে যায়। সব কিছুই এখন স্মৃতির ভিড়—দরজায় দাঁড়িয়ে-থাকা অচেনা অতিথির মতো।
সেদিন প্রত্যেকেই ছিল; এই পরম সত্যটুকু মেনে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে—এটুকু জানি। সেদিনও নারীরা কুমকুমের ফোঁটা পরেছিল কপালে, অবগুণ্ঠন সরিয়ে এক অলৌকিক শোভাযাত্রায় শামিল হয়ে জীবনের নিথর দেহটিকে ঢেকেছিল সোনারঙা ঝালরে। তার পরে? দল বেঁধে লুণ্ঠন, রক্তপাত—যেন ধর্মযুদ্ধের ছদ্মবেশে ডাকাতি। ক্রমে সকলের ছাঁচ ভেঙে পড়ল—যা অবশিষ্ট থাকল, তা শুধু এক জীর্ণ নকশা, ভাঙাচোরা কাচের টুকরোর মতো।
আজ সেই কাচের টুকরোটাই হঠাৎ হাতে এসে ফুটল। দূরে দূরে—যোজন যোজন তফাতে—অক্লান্ত প্রহরায় দাঁড়িয়ে আছে অস্তিত্বের কঠিন সৈনিকেরা। সীমান্তরক্ষায় ব্যস্ত ওরা—ক্ষয়ে-যাওয়া অস্তিত্বের শেষ প্রাচীরটুকু ধরে রাখতে, নিরন্তর।
৩। অপেক্ষমাণ নক্ষত্র
পুরোনো বটগাছের কম্পমান পাতার গুঞ্জনে রাত গুনছি—প্রতিটি পাতায় কাঁপুনি, এই অমাবস্যা-কালো রাতে। অন্ধ আবেগ অসহায় যন্ত্রণা হয়ে প্রিয়তমার মতো জড়িয়ে ধরেছে আমার কঠিন, শীতল হাত। যত কোলাহল—সব সরে গেছে বহুদূরে; মিথ্যে ট্রামের ঘণ্টা, অর্থহীন গানের সুর—সব কিছু নৈঃশব্দ্যের গর্ভে তলিয়ে গেছে। শুধু পুরোনো গাছটির কম্পনে শিরীষের ডালে চাঁদনিমাখা শিশিরবিন্দু পড়ছে—কাছে, আরও কাছে।
একলা এই অপেক্ষা কতটা অসহনীয়, তা জানি; তবু হিসেবনিকেশ শেষ করতে গেলে ভালোবাসতেই হবে—এ ছাড়া পথ নেই। আমার বুক ধবধবে সাদা চাদরে মোড়া—সেই চাদরের নিচে কে জানে, কত রাতের ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে, কত জেগে-থাকা চাঁদের ক্ষয় লুকিয়ে আছে। আমার এই বুক নিয়ে যাবে কেউ—কেউ একজন—দূর থেকে এসে, অন্ধকার ভেদ করে, যেমন ভোরের প্রথম আলো ভেদ করে পুবের মেঘ।
৪। ধ্বংসনগরীর চিঠি
শীতের রাতে এই ক্লান্ত সড়কটিকে আমার নিজের মনের মতোই ফাঁকা, শূন্য আর উদ্দেশ্যহীন লাগল। হতাশার পাথর বুকে চেপে বসেছে, তবু অভ্যেসের টানে পা চলছে—যেমন নদী জানে না, কেন সাগরের দিকে যায়, তবু যায়। দূরে রাস্তার বাতিগুলো শীতে কুঁকড়ে গিয়ে তৈলাক্ত, ক্লান্ত হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে—বৃদ্ধা বেশ্যার মতো, যার দিন ফুরিয়েছে, কিন্তু অভ্যেস ফুরোয়নি। আলো আর আঁধারের মধ্যিখানে—অন্য যে-কোনো সন্ধের মতোই—সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, নির্বিকার।
আমার উতলা প্রাণ শাস্তি চায়। হে বিধাতা, মিনতি একটাই—আমাকে রাস্তার ওই নির্জীব বাতিদণ্ড বানিয়ো না। আর শোনো, হে বিধাতা, আমি কোনোদিন সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীতে যাব না—যেখানে সভ্যতা তার নিজের ভস্মে শুয়ে আছে। জীবন দেখেছি আমি—তার তুচ্ছতা, তার প্রতারণা, তার মলিন শিল্পকলা; স্বীকার করি, কখনো কখনো আমি নেশায় বুঁদ হই—তবু সচেতন থাকি।
জানি, জীবন কোনো পদোন্নতির সনদপত্র নয়, কিংবা নয় কোনো পরিত্যক্ত রাজনৈতিক জোটের দলিল। অতএব, হে বিধাতা, আমি সেই ধ্বংসনগরীতে যাব না। নর-নারী প্রেমের সাজসজ্জায় মিলনগাথা গায়—তবু, হে বিধাতা, আমি সেই পোড়ো শহরে পা রাখব না।
৫। কালবিচ্যুত
একদিন কোনো এক রুচিশীল, সুশিক্ষিত সারথি আমাকে বলেছিল, “যা-কিছু আছে, সব সংরক্ষণ করে রাখছি কেবল।” কিন্তু বাপু, তুমি তো কোনো মহর্ষি নও—যার তপস্যায় অগ্নি জ্বলে, যার সংযমে দেবতারা কম্পিত হয়; কিংবা এত যুদ্ধ করেও নিতান্তই সাধারণ কোনো কঠোর তপস্বী, যে মোহিনীর আঁচলের গিঁটে বাঁধা পড়ে অমর সন্তানের জন্ম দিল, আর সেই সন্তান এখন আধুনিকতার ঝকমকে মলাটে বন্দি।
কোথায় সবুজ? কোথায় ঋতুর চক্র? বসন্ত কোথায়? বর্ষা কোথায়? হেমন্তের সোনালি ধানক্ষেত কোথায়? এই নিরাশ্রয় প্রশ্নটি আমার চেতনার মজ্জায় গেঁথে আছে—গন্ধহীন, স্বাদহীন, যেমন শুকনো কাঠে আর আগুনের স্মৃতি থাকে না। উপায়হীন—কেননা যন্ত্রণা যখন অবিশ্রান্ত হতে হতে অভ্যেসে পর্যবসিত হয়, তখন তাকে আর যন্ত্রণা বলা যায় না, তখন সে হয়ে ওঠে দৈনন্দিন—শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো অনিবার্য, ক্ষুধার মতো চিরন্তন। তখন ঋতু বলে আর কিছু থাকে না—শুধু একটানা, বিরামহীন, ধূসর সময়।
৬। নিমজ্জনের ইতিবৃত্ত
প্রথমত আবহাওয়া—দুঃস্বপ্নের ভিজে নিঃশ্বাসের মতো; বৃষ্টির পূর্বাভাস যেন এক অদৃশ্য জন্তুর শ্বাসপ্রশ্বাস। গাছের পাতারা স্থির, তৃপ্ত; কিন্তু হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় সাপের চামড়ার মতো সোঁদা, শীতল স্পর্শ এসে গায়ে লাগল—শিরদাঁড়া বেয়ে কাঁপুনি নামল। সারাটা দিনের বিরামহীন পরিশ্রমের পরে শরীরের প্রতিটি খাঁজে, প্রতিটি ভাঁজে ঘামের একটা নোনতা আস্তরণ জমেছে—যেমন পুরোনো দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে লবণের দাগ পড়ে। চোখের পাতা সীসার মতো ভারী, তবু ঘুম আসবে না আজ—এটুকু নিশ্চিত।
দূর থেকে ভেসে আসছে কামারশালার শব্দ—লোহার ওপরে হাতুড়ির ঘা; হাপরের ফুঁ হাঁপানি রোগীর বুকের ওঠা-নামার মতো। শরীরে আর মনে একটা অব্যক্ত, বোবা অস্বস্তি জেঁকে বসেছে—পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে-থাকা কোনো মেয়ের কপালে মেটে-সবুজ টিপের মতো জ্বলছে-নিভছে, জ্বলছে-নিভছে।
আমার স্বপ্নগুলো, আমার নিরীহ ছোটো ছোটো স্বপ্ন আজ রাতে অনুপস্থিত—পলাতক। দূরে কোথাও আদিবাসী নাচ হচ্ছে; ঢোলের বাদ্যি ভেসে আসছে রক্তে-মাংসে-মজ্জায়। সেই নাচে আমার প্রবেশাধিকার নেই—আমি সভ্যতার খোলসপরা এক পরগাছা—তবু এক অপূর্ণ ইচ্ছের পাগলামি, এক অসমাপ্ত তৃষ্ণার মদ আমার ভেতর গুমরে উঠছে—যোগ দিতে চাই, মিশে যেতে চাই।
ছুড়ে ফেলে দিই সভ্যতার অপ্রয়োজনীয় বোঝা, শিষ্টাচারের কেতাবি সৌন্দর্য! মনে হচ্ছে, যদি কয়েক চুমুক তাড়ি গিলে কালো মেয়ের পাগল-করা বুকের কান্নায় কান পাতি—তবে কি বুকের গভীরে কোনো আদিম বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠবে?
আমার অক্ষমতা নানান কুঠারের মতো মনের দেয়ালে দেয়ালে গেঁথে আছে—নিয়ন-আলোর স্বপ্নেও। একাকিত্ব এখন অসহ্য। বাদুড়ের ডানার ঝাপটা, পাড়ার সংকীর্তন, আমার মনের নিঃশব্দ অন্ধকার, সুন্দরীর হাসিটাও এখন এক বিকৃতি—রকবাজ ছেলের শিস, হিন্দি গান, দোলায়িত নিতম্ব, পর্দায় পর্দায় উচ্ছ্বসিত অরণ্য, একজাতের কান্না, ভোরের বৃষ্টিভেজা ফুল, কোমল মাংসের উষ্ণতা—আহা, নারী আর মদ—এ-ই আমার স্বপ্নের কুলকুচি, এ-ই আমার নিমজ্জন!
৭। অস্তিত্বের আর্জি
তোমার দিকে তাকিয়ে আছি অপলক—এতটুকু ভিক্ষে চাই: তুমিও একবার আমার দিকে তাকাও। নর্দমার পাইপ, পলেস্তারা-খসা দেয়াল আর বিধাতার সত্তা—এ সবই একই অস্তিত্বের যন্ত্রাংশ, জানো? একই কারখানায় তৈরি—নর্দমা যেমন সত্য, বিধাতাও তেমনই; পলেস্তারার ফাটলে যে-অন্ধকার উঁকি দেয়, সেই অন্ধকারেও প্রাণ আছে।
তোমার চোখের একপলকেই আমাকে ঘিরে চেয়ার-টেবিল-আসবাবের জগৎ তৈরি হয়ে যায়—যেন তোমার দৃষ্টিই সেই কারিগর, যে কাঠে প্রাণ দেয়। বিধাতার আসবাব হতে চেয়েছিলেম আমি—নিশ্চল, নিরুপদ্রব, ঘরের কোণে পড়ে-থাকা। তবু জগৎ আমার শিরায় শিরায় বইছে, থামানো যাচ্ছে না—রক্তের ভেতরে যে-স্রোত, তাকে ইচ্ছে করলেই বন্ধ করা যায় না। জোর করে চেপে-রাখা অস্তিত্বের এই বোধ—কুকুরের মাথায় লাঠির ঘায়ের মতো পোষমানা, বাধ্য। কিন্তু ভেতরে? ক্রোধ—খাঁটি, বিশুদ্ধ, নির্ভেজাল ক্রোধ!
হে নারী, আমার এই থাকার মধ্যেও একটু সম্মান মেশাও—শুধু এক বার পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাও। তুমি স্বাধীন, মানি; কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে স্বীকার করেও ভেবে দেখো—কতদূর একা একা যেতে পারো, এই শূন্য, শীতল, জানালাবিহীন যানবাহনে।
৮। শেকলভাঙার পুজো
উত্তাপের মধ্য দিয়ে যে-অঙ্গীকার জন্ম নেয়—আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে পায়ের তলায় যে-দৃঢ়তা তৈরি হয়—ক্রমান্বয়ে উত্তরণের সিঁড়ি বেয়ে তার সৃষ্টি হয়। নারীকে তীব্র, গাঢ়, নিবিড় করে তোলো পরাজয়ের আগুনে—যেভাবে কামার লোহাকে পেটায়, যেভাবে কুমোর মাটিকে চাকায় ঘোরায়—যেন অন্তত প্রেমের ভোগ এক উদ্দাম উৎসবে পরিণত হয়, বৈভবের শিখায়।
নারীকে সমুদ্র ভাবি—অতলান্ত, অগাধ, একইসঙ্গে ধ্বংসকারী আর জীবনদাত্রী—তাই মন্দিরে ঘণ্টা বাজে অবিরত। আত্মনিমজ্জন যদি মুক্তির একমাত্র পথ হয়, তবে সেই ঘণ্টাধ্বনি, সেই নারী, সেই নানাবিধ উপচার আর পুজোর আয়োজন—ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, ফুল—সবই আত্মহননের সুচিন্তিত প্রস্তুতি। যেমন যজ্ঞের আগুনে আহুতি দেওয়ার আগে পুরোহিত মন্ত্র পড়ে, তেমনি।
হে নারী, তোমাকে ভালোবাসি বলেই ধ্বংস করি—যেমন শিল্পী তার অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে আবার গড়ে। হে নারী, তোমাকে ভালোবাসি বলেই গহন অরণ্যের অন্ধকারে রাত কাটাই—নিরুদ্দেশের দিকে মুখ করে। শেকল ভাঙার বাসনায়ই নতুন শেকল পরি—এই পরম বিড়ম্বনা জেনেও, হে নারী, আজ তোমাকে দরকার—আগের চেয়ে বেশি দরকার।
ছায়াবীজ: ১
লেখাটি শেয়ার করুন