গল্প ও গদ্য

ছায়াবীজ: ২



৯। প্রস্থানের রেখাচিত্র

নরম রোদ যখন বিকেলের স্মৃতিমাখা মায়ায় আবির ছিটিয়ে দিল—যেভাবে কেউ প্রিয়জনের শেষযাত্রায় ফুল ছড়ায়—ঠিক তখনই তোমার যাওয়ার মুহূর্ত ঘনিয়ে এল। উঠোনে গাড়ি প্রস্তুত, ইঞ্জিনের গুমগুম শব্দে অস্থির; এই যে তাড়াহুড়ো—আসলে এর কোনো অর্থ নেই। অহেতুক ব্যস্ততা, নিরর্থক আনুষ্ঠানিকতা—যেমন মৃতদেহের পাশে বসে লোকে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অকারণে, কিছু-একটা করতে চায়, কারণ স্থিরতা অসহ্য—তবু সবাই ছুটছে।

কিছু বলার ছিল কি? বুকের কোন তলায় সেই গোপন কম্পন লুকিয়ে ছিল, কোন স্তরে চাপা ছিল সেই উচ্ছ্বাস, যা মুখ দিয়ে বেরোতে চেয়েও বেরোল না? জিভের ডগায় এসে ফিরে গেল কোন শব্দটি—কেউ জানল না, আমিও না। গাড়ি চলে গেল—তড়িঘড়ি করে, নিষ্ঠুর গতিতে, পেছনে ধুলোর পর্দা ফেলে—আর রয়ে গেল শুধু শূন্যতার প্রতিধ্বনি, মুখের সামনে উবে-যাওয়া ধুলোর গন্ধ, আর বিকেলের আবির-মাখা সেই রোদ—যা এখন শুধুই বিদায়ের রং।

১০। সন্ধের অবশেষ

তোমার পাশে পাশে হেঁটে যাচ্ছি—ছুঁই না; শরীরের তাপ অনুভব করি, কিন্তু ছুঁই না। তোমার শরীর থেকে ভেসে-আসা স্মৃতির সুবাসটুকু আলো-আঁধারিতে বাতাসের হাতে ছেড়ে দিই—নিক বয়ে নিক, কোথায় যায় যাক। মায়াবিনী কোনো প্রাচীন নর্তকীর পায়ের ঘুঙুরের মতো বাতাস আমাকে স্পর্শ করে যায়; আমি সচকিত হই—জলে-ভাসা কাঁটার মতো টলমল করি, ডুবি না, ভাসিও না—মাঝামাঝি কোনোখানে ঝুলে থাকি।

শ্রান্তির ধারণাগুলো বাতাসের মতোই অলীক মনে হয়; হালকা বাতাসে ফুলের রেণু আমার চেতনাকে ঘিরে ধরেছে—যেমন কুয়াশা ধীরে ধীরে গ্রাস করে রাস্তার বাতি—দূরত্ব মুছে যাচ্ছে, স্বাধীনতা বিলীন হচ্ছে। তাকিয়ে দেখি—তোমার অতলান্ত চোখ থেকে অভিকর্ষ নামছে, যেমন গ্রহের টানে আছড়ে পড়ে উল্কা। জোর করে চেপে-রাখা অস্তিত্বের এই বোধ—মাথায় পোষা আঘাতের মতো—চুপ করে আছে, স্তরে স্তরে জমে আছে ক্ষত।

১১। পুনরাবৃত্তির পুরাণ

সকালের খাবার টেবিলে জেলি-মাখা পাউরুটিতে কামড় দিতেই—এই নিতান্ত গার্হস্থ্য মুহূর্তে—কোনো প্রাচীন নাবিকের সাহসী সমুদ্রযাত্রা আর পৌরাণিক পাখির ভুলে-যাওয়া কিংবদন্তি মনে পড়ে গেল, যেমন ঘুমের মধ্যে হঠাৎ আগুনের গন্ধ পেলে চমকে জেগে ওঠা যায়। আর অবাক ব্যাপার—তোমার মুখে আমি সবসময় এক পুরোনো প্রতিকৃতি দেখতে পাই, যেন দুটো মুখ স্বচ্ছ কাচের ওপরে রাখলে যেমন একটা অপরটার ভেতরে ঢুকে পড়ে—ঠিক তেমনই। সেই থেকে সেই প্রাচীন নাবিক আর আমি, সেই প্রতিকৃতি আর তুমি—দু-জোড়া ছায়া পরস্পরের সঙ্গে বেশ গলায় গলায়, বেশ অচ্ছেদ্য।

ভাড়া-গাড়িতে উঠেই তুমি বললে, জানালাটা তোলো। জানালা তুলতে গিয়ে রাস্তার মোড়ে তোমার নকল হিরের কানের দুলটা দোকানের আলোয় ঘণ্টার মতো ফুলে উঠল—মিথ্যে হিরেতেও আলো ধরে, এ-ই তো জীবনের রসিকতা। ক্লান্ত আমি তখন সমুদ্রের কথা ভাবছিলেম—দূরে কোথাও বাতিঘরের রাত্রিকালীন ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেম; ক্রমশ ঘন-হয়ে-আসা চিন্তার জালে জড়িয়ে পড়ছিলেম—জড়িয়ে পড়ছিলেম—যেমন মাকড়সা নিজের জালে নিজেই আটকায়।

১২। অপ্রচলিত হাসি

দেখতে মোটেও অসাধারণ নয়—রাস্তায় হাজারো মেয়ের ভিড়ে তাকে আলাদা করে চেনা যাবে না। তবু সে যেভাবে হাসল—সেই হাসিতে ছিল প্রচলিত জীবনের বেড়াজাল ডিঙিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর দুঃসাহস, বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষার এক উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা—যেমন পোড়ো বাড়ির জানালা দিয়ে হঠাৎ সূর্যের আলো এসে পড়ে ধুলোর কণাকে সোনার টুকরো বানিয়ে দেয়।

প্রতিদিনের বিচিত্র সংঘর্ষে জীবনের নানামুখী স্রোতধারা একটি মাত্র কেন্দ্রে মিলিত হতে চায়—যেমন নদীরা সাগরে গিয়ে পড়ে, যেমন ধর্মীয় উৎসবে বিভিন্ন পথের মানুষ এক মন্দিরের চাতালে মেলে। যখন দরকার পড়ে, তখন প্রথাকে লাথি মেরে সরিয়ে দিতে হয়; আটকে-থাকা জলাশয়ের বদ্ধ জল থেকে বাঁধ ভেঙে মুক্তি দিতে হয়। এই যে অনাবিষ্কৃত, সমান্তরাল, সহজাত দিক—অন্তরের এক বিশিষ্ট, স্বতঃস্ফূর্ত অভিমুখ—এর কী নাম দেবো?

সহসা—এই আবিষ্কার, এই উত্তরণ, এই অপ্রত্যাশিত সুখ—এসবে মেয়েটির মুখ অপরূপ আলোয় ভরে উঠল, যেন গ্রহণমুক্ত চাঁদ।

১৩। পাইনবনের আশ্রয়

পাইনগাছের সারির মধ্যে লুকিয়ে-থাকা সেই ছোটো বাংলো-ঘর—যেখানে স্বপ্ন সত্যি হয়ে ওঠে, যেখানে কুয়াশা নিজেই কবিতা লেখে। আমরা কয়েকজন আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে, শেষমেশ গাড়ি থামিয়েছিলেম সেই আশ্রয়ের দোরগোড়ায়।

কাঠের আগুনের চারপাশে আমরা ক-জন উষ্ণতার ভিখিরি—সভ্যতার সব মুখোশ সরিয়ে রেখে। বাইরে প্রকৃতি পাহাড়ি মদ বানাচ্ছে—কুয়াশায়, বাতাসে, শিশিরে; কিশোরীর প্রথম প্রেমের মতো কুসুমকোমল উত্তাপে সেই বাংলো-ঘরটিও কেঁপে কেঁপে উঠছে, যেমন শীতের রাতে পাখি গুটিয়ে বসে কাঁপে।

বৃষ্টি নামল হঠাৎ—পাইনবনের সুচালো পাতায় পাতায় অজস্র জলধারা। আমরা ক-জন ছিলেম তাদের মনেও—বৃষ্টির মনেও, পাহাড়ের মনেও, কুয়াশার মনেও। আমরা ক-জন যদিও নিজের নিজের গন্তব্যে মগ্ন—যে যার ভাবনার গুহায় ঢুকে পড়েছি। কিন্তু একটা কথা আমরা সকলেই জানি, যেমন জানি, ভোরে সূর্য উঠবে: এই মায়া থাকবে না, এই আশ্রয় মিলিয়ে যাবে—প্রভাত এলেই।

পাহাড়ি মেয়ের হাসির উৎসমুখ বেয়ে বিষণ্ণ এক রাত্রি চেয়ে রইল—চেয়েই রইল—যেমন স্টেশনে দাঁড়িয়ে-থাকা মানুষ ট্রেন চলে যাওয়ার পরেও তাকিয়ে থাকে শূন্য লাইনের দিকে।

১৪। দহনের বীজগণিত

বাঘের থাবার মতো প্রবল মুষ্টিমেয় আগ্রহে নিত্যনতুন ছাঁচে জীবনকে বিস্ময়কর করে তোলার চেষ্টা—যেমন ভাস্কর একই পাথর থেকে বার বার নতুন মূর্তি খোদাই করে, বার বার ভেঙে ফেলে, বার বার শুরু করে। অভিজ্ঞতা ক্রমে ভাষার তীব্র তৃষ্ণায় রূপান্তরিত হয়—শব্দ খুঁজি, শব্দ পাই না, শব্দের অভাবে দমবন্ধ হয়ে আসে। গতিশীল দ্বন্দ্বসংগীতে আমার অন্তর পূর্ণ—যেমন ঝড়ের রাতে সমুদ্র নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করে।

আমার ব্যর্থতারা চারপাশে অট্টহাসি হাসছে—প্রেক্ষাগৃহের দর্শকের মতো, যারা নায়কের পতনে আনন্দ পায়। সাধারণ নিয়মকানুন—যাদের আমি ঘৃণা করতেম, যাদের পায়ে মাড়িয়ে হেঁটে যেতে চেয়েছিলেম—সেগুলোই এখন জালের মতো পেঁচিয়ে ধরেছে আমাকে; নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ক্রমে—যেমন দড়ি ধীরে ধীরে শক্ত হয়।

ভালোবাসতে পারি না—এ কথা মিথ্যে; কিন্তু ভালোবাসায় ছায়া দীর্ঘতর হয়। যত গভীরে নামি, ততই নতুন সত্তার নিগূঢ় সন্ধান পেয়ে ভবিষ্যতের কাছে ক্রমশ ভীরু হয়ে পড়ি—বার বার, বার বার—যেমন প্রতিটি নতুন আবিষ্কারের সঙ্গে বিজ্ঞানী আরও বেশি করে বুঝতে পারেন, তিনি কতটা কম জানেন।

১৫। বসন্তযাপনের কথকতা

সবুজের ঢেউ যেন যৌবনের জোয়ার এনেছে—গাছে গাছে নতুন পাতা, মাটিতে ঘাসের গালিচা, বাতাসে ফুলের ভারী গন্ধ। অনেক সংস্কৃতির অনেক ধারক আর বাহক—কিন্তু আমার বেদনার মধ্যেও পুলক জেগে আছে, যেমন শীতের গাছে বসন্তের কুঁড়ি। আত্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে, পলাশের রক্তিম শিখার বহু ঊর্ধ্বে বাসা বেঁধেছে কোনো অচেনা পাখি—যার ডাক শুনলে মনে হয়, পৃথিবী এখনও নতুন, এখনও প্রথম।

সারি সারি সুকুমারী নর্তকী চিন্তার মতো দুলছে, নড়ছে—তাদের শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি যেন একেকটি প্রশ্নচিহ্ন। তাদের উচ্ছল ছোঁয়ায় যৌবনের ঘুমন্ত শিলাখণ্ড জেগে উঠছে—যেমন পুরাণের কথিত প্রস্তরীভূত রমণী ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পায়—বাঁধ ভাঙছে, মুক্তি ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র, বাইরে এবং অন্তরে—যেখানে সবচেয়ে বেশি দরকার।

১৬। পাঁচফুট তিনের মহাসাগর

পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি—এটুকুমাত্র উচ্চতায় সে দাঁড়িয়ে আছে; অথচ তার ভেতরে অতলান্ত সমুদ্রের গভীরতা—যেখানে আলো পৌঁছোয় না, যেখানে অচেনা প্রাণীরা চোখ ছাড়াই দেখতে পায়। তার সমস্ত অস্তিত্ব যেন কোনো স্বপ্নালু কুয়াশায় মোড়া নির্জন প্রহর—জনপদের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, মানচিত্রের বাইরে।

আসলে সে এক অদ্ভুত ফুল—গোলাপের কোমলতা আর যূথিকার বন্য সুবাসের মিশ্রণ; বাগানে ফোটে না, ফোটে পথের ধারে, নিজের ইচ্ছেয়। জীবনপথে বাতাসের স্পর্শ তার গায়ে দাগ কাটে—কিন্তু মনের কোণে কোনো বইয়ের পাতায় চাপা-পড়া ফুল নেই—কোনো দার্শনিকের জীর্ণ মলাটে বন্দি নয় তার স্থূল অস্তিত্ব। সে নিজেই তার দর্শন, নিজেই তার ব্যাখ্যা।

পাড়ার ছেলেদের শিস, গানের টুকরো, জীবনের যাবতীয় কালিমা আর পৌরুষের অপচয়—সব কিছু সাম্প্রতিক উদাসীনতায় ঢেউয়ের মতো এসে যায়, চলে যায়; কোনো দাগ ফেলে না, কোনো চিহ্ন রাখে না। তার সাদামাটা কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে কী-এক গোপন রহস্য লুকিয়ে—প্রকৃতির সম্পদে লালিত, ক্রমবর্ধমান এক হৃদয়—যা প্রতিদিন একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে, যেমন হয় নদীর ব-দ্বীপ।

১৭। নিধনের স্থাপত্য

আমার সত্তা—তুমি যে-মুহূর্তে অন্যের সাথে মিশিয়ে ফেললে, সহজে, অনায়াসে, যেমন জলে লবণ গোলে—সেই মুহূর্তেই আমার ভেতরে কিছু-একটা মরতে শুরু করল। ধীরে, নিঃশব্দে—যেমন দেয়ালের ভেতরে ইঁদুর মরে, কেউ জানতে পারে না, শুধু একসময় দুর্গন্ধ ছড়ায়। এটা হত্যা—তবু এই হত্যার কোনো রক্তপাত নেই, কোনো চিৎকার নেই; শুধু এক দীর্ঘ, ক্লান্ত, অনন্ত শূন্যতা—যেমন শীতের ভোরে কুয়াশা সরে গেলে দেখা যায়, মাঠ ফাঁকা, কেউ নেই।

তবু ছদ্মবেশে তোমার সামনে দাঁড়াইনি। যা হারিয়েছে, তা নিয়ে মিথ্যে নাটক করতে আমার ঘৃণা হয়; বরং খোলা মুখে, খোলা ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি—শত শত বছরের রক্তমাখা ঠোঁটের সেই বাঁকা, বিষাক্ত হাসি মুখে নিয়ে। আমার বেঁচে-থাকার চেষ্টা এক পরাজিত, অক্ষম প্রয়াস—এ যেন ডুবন্ত জাহাজ থেকে বালতি দিয়ে জল সেঁচা।

১৮। জলপথের দর্শন

শুভ্র কুয়াশায় মোড়া চাঁদনি-রাতে নৌকো ধীরে ধীরে মাঝনদীতে এসে পৌঁছেছে। গোটা পৃথিবী এখন এক চীনামাটির বাসনের মতো—ম্লান, ধূলিমলিন, অর্থশূন্য; সাদা কারুকার্যের ওপর ভর করে পাথরের থালা সাজানো—কৃত্রিম, প্রাণহীন, যেন জাদুঘরে সাজানো প্রাচীন সভ্যতার ভাঙা বাসনকোসন।

স্বেচ্ছায় পরিত্যক্ত চারিদিক; আকাশেও তারারা উঠছে যেন বাধ্য হয়ে—কর্তব্যপালনের ক্লান্তিতে। আত্মার চারপাশে কারাগার; যে-শৃঙ্খলা ছিল, যে-মিলন ছিল—সব ভেঙে পড়েছে, ঠিক যেমন পুরোনো বাড়ির ছাদ একদিন ধসে পড়ে। দূরে কোনো মন্দিরের চূড়া দেখা যায়—ছবির মতো স্থির, নিজেও জানে না, কার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে আছে সে। অসীম শূন্যতায় সব কিছুর মানে হারিয়ে গেছে। বাতির নিচেই আঁধার; পরোপকারিতা? নিছক প্রতারণা—নিজেদের কথাই কি আমরা বুঝি?

এক নৌকোয় তবু কথা চলে—দু-জন যাত্রী মুখোমুখি বসে। মিলন, জীবনের যোগ আর বিয়োগ, ভ্রমণ, তৃপ্তি, ক্ষোভ—সব কিছু ভেসে যাচ্ছে জলের ওপর দিয়ে। সব কিছু ছবি—সবই, সবই—ফ্রেমে আটকানো, নিথর, নির্বাক।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *