১। মাটি ও মুখোশ
কুমোরের চাকায় আমরা
একদিন সব মুখোশ খসে পড়বে—শরতের শেষে গাছ তার শেষপাতাটিও ধরে রাখতে পারে না, যেমন শোকাতুর হাত শেষপর্যন্ত কফিনের ঢাকনা ছেড়ে দেয়। মিথ্যার যে-সেতু আমরা এতদিন যত্নে বানিয়েছিলাম—প্রতিটি ইটে আত্মপ্রতারণার চুন, প্রতিটি খিলানে অভিনয়ের ওজন—সেই সেতু ভাসিয়ে নেবে এমন এক স্রোত, যার তলায় জমে আছে আমাদেরই ফেলে-দেওয়া সত্যের পলি, প্রত্যাখ্যাত স্বীকারোক্তির নুড়িপাথর। কোন কুমোরের চাকায় ঘুরবে তখন আমাদের পরবর্তী প্রতিমা—ভাঙা টুকরোগুলো কি নতুন মাটিতে মিশবে, না কি জাদুঘরে সাজানো থাকবে?
কত মাটি ঘুরতে থাকে সৃষ্টির আঙুলে—কেউ হয় কলসি, জল ধরে রাখার ব্রত নিয়ে; কেউ প্রদীপ, অন্ধকারের বুকে একমুঠো আগুন বহন করে; কেউ শুধুই চাকার ওপর ঘূর্ণমান, আকৃতিহীন, সম্ভাবনায় পূর্ণ। ভেতরে জন্মের আগেকার কোনো স্মৃতি—অস্পষ্ট কিন্তু জেদি, শিলালিপির মতো ক্ষয়ে যায় না—হাতের রেখায় খোদিত, রক্তের ব্যাকরণে মুদ্রিত। মাটির দেহ তবু জেগে ওঠে—চৈত্রের রুক্ষ জমি ফেটে চৌচির, তবু প্রথম বর্ষায় সেই ফাটলের ঠোঁট থেকেই অঙ্কুর বেরোয়, যেন পৃথিবী নিজের ক্ষতস্থান থেকে সবুজ রক্ত ঝরায়।
আমরা মাটির প্রতিমা হব—তৃষ্ণার আদিম পরম্পরায় বুকে গোলাপ ফুটবে, যার শেকড় পাতালের অন্ধ জলস্তর ছুঁয়ে ফেলেছে, যার পাপড়িতে ভূগর্ভের লবণ চিকচিক করে। দুর্দিনের মানচিত্রে ঝড় আঁকা থাকবে—সাইক্লোনের কালো চোখ, ছিন্নভিন্ন উপকূলের রেখা—কিন্তু ঝড়ের সেই নিঃস্তব্ধ কেন্দ্রে, যেখানে বাতাসও স্থির, সেখানেই কেউ গড়বে আনন্দের ঘরবাড়ি, নিশ্চুপ ভিত্তিপ্রস্তর পুঁতবে।
স্বচ্ছতার ভেতরে যে-মুখ
মানুষের অবিকল মুখ এখনও খুঁজি—যে-মুখে কোনো প্রলেপ নেই, কোনো সামাজিক রঙের আস্তরণ নেই, প্রসাধনের প্রাচীর নেই। আশ্চর্য মুহূর্তে দেখি—তীব্র আনন্দে কিংবা অসহ্য যন্ত্রণায় কারও মুখোশ খসে পড়ে, বজ্রপাতের আলোয় যেমন একমুহূর্তের জন্য সমস্ত প্রান্তর দৃশ্যমান হয়—সত্যিকারের মানুষটি উঁকি দেয়, কাঁচের ওপারে বন্দি চোখের মতো। তারপর সঙ্গে সঙ্গে আবার পরে নেয়—শামুক খোলসে ঢোকে, কচ্ছপ পিঠের দুর্গে লুকোয়।
সহসা আঘাতে সরলরেখা বেঁকে যায়, সত্যের ওপর পড়ে মিথ্যার ছায়া—গ্রহণের কালো চাঁদ সূর্যকে গ্রাস করে। তবু জোয়ারের শেষধ্বনিতে—সমুদ্র ক্লান্ত হয়ে শান্ত হলে, ফেনা সরে গেলে—কখনো কখনো একটি স্বচ্ছ মুখ নেমে আসে জলের ওপরে, প্রবালের গভীর থেকে উঠে-আসা বুদ্বুদের মতো। সমস্ত আড়াল ভেদ করে, সমস্ত পর্দা পুড়িয়ে।
পুতুলখেলার রূপকথা
আমার ঘরের ভেতর অন্য এক ঘর গড়ে উঠছে—ছোট্ট মেয়েটি খেলা জুড়ে দেয় প্রতিদিন, ঈশ্বরের মতো একমনে। রান্নাবাটি, সংসার, কাদামাটির পায়েস—সে যে-জগৎ গড়ে, সেখানে পিঁপড়েও সিংহাসনে বসে, পাতাও পাল তুলে ভাসে, কাঁকরও মুদ্রা হয়ে বাণিজ্যতরী চালায়। বালিতে-আঁকা সীমানা—সাম্রাজ্যের মানচিত্র—পরের ঢেউয়ে মুছে যায়, কোনো ইতিহাসবিদ লিখে রাখে না।
আমরা মানুষেরা সবাই কারও বাগানো পুতুল—সময়ের, পরিস্থিতির, কিংবা এমন কোনো সুতো-ধরা শক্তির, যার নাম জানি না, মুখ দেখিনি। দলে কিংবা একা, পরস্পরের সামনে মঞ্চ গড়ি—ঢেউয়ের ওপর ভেলা বেঁধে, ভেলাকেই মহাদেশ ভাবি।
কত বার পরিবর্তিত সকালে শিশিরভেজা ছায়ায় আহত সংকোচ জমে ওঠে—ঝিনুকের নরম শরীরে মুক্তো জমে, আঘাতের চারপাশে স্তরে স্তরে, ধৈর্যের ভূতত্ত্বে। তবু তা ফুরোলে সবুজ পাতা আবার ডালে ফেরে, পোকায়-খাওয়া জায়গা থেকেই নতুন কুঁড়ি জাগে। অজান্তে অন্য কেউ আমাকেও খেলায় মেশাচ্ছে—কোন ভূমিকায় আছি জানিও না; সংলাপ কে লিখেছে, তা-ও না।
শেকলের বিবর্তন
শোনা যায়, পৃথিবীর কোথাও ক্রীতদাস পাওয়া যায় না আর। আসলে সংখ্যায় আরও বেশি, আরও সুলভ, আরও সহজলভ্য—শেকল বদলে গেছে শুধু; লোহার বদলে অভ্যেসের মখমল, চাবুকের বদলে প্রলোভনের মধুমাখা ফাঁদ। সেকালের দাসত্ব দেহের ছিল, চামড়ায় দাগ রেখে যেত, চোখে দেখা যেত; একালের দাসত্ব মনের, আত্মার—অদৃশ্য শেকল সবচেয়ে মজবুত, কারণ বন্দি নিজেই তালা পালিশ করে। ছেঁড়ার আগে দেখতে হয়, আর দেখতে পাওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন—চোখের সামনের চশমা চোখ দেখে না।
হাটে-বাজারে দেখা মেলে না এদের—কিন্তু স্ক্রিনের নীল আলোয়, ফিডের অন্তহীন স্রোতে, নোটিফিকেশনের ঘণ্টাধ্বনিতে, রঙিন মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায় তারা—মুখোশ এতটাই নিখুঁত, এতটাই চামড়ার কাছাকাছি যে, পরিধানকারী নিজেও ভুলে গেছে, আসল মুখ কেমন ছিল, সেই মুখ আদৌ কখনো ছিল কি না। দূরে খুঁজো না—ওরা দোরগোড়ায়ই আসবে, নিজেদের প্রয়োজনেই, হাসিমুখে।
ভাড়াটে মঞ্চ
আজকাল সর্বত্র শুধু উত্তেজনার ফসিল, ছলচাতুরির বাণিজ্য—শব্দের স্ফীতি, অর্থের দুর্ভিক্ষ। একই কথা বার বার নতুন মোড়কে, নতুন ফন্টে—প্লাস্টিকের ফুল, রং আছে, গন্ধ নেই, মৌমাছি বসে না। প্রাণের স্পন্দন নেই কোথাও, হৃদয়ের অভিঘাত নেই, ভালোবাসা নেই—শকুনের ছায়াময় ডানা শুধু চক্কর দেয়, ধৈর্যশীল, ক্ষুধার্ত, পেশাদার।
সুখের মুখোশে কিছু সাজানো সংলাপ—ফিসফিসে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, ঠোঁটের কোণে আটকে থাকে মেকি হাসির অবশেষ। বেঁচে থাকা আজকাল অন্য কিছু নয়—ভাড়া-করা ঘূর্ণমান মঞ্চে আদ্যোপান্ত নকল নাটক, দর্শকও নকল, হাততালিও রেকর্ডেড। আমিও টিকিট কেটেছি—সামনের সারিতে বসে আছি, অথচ মঞ্চের পেছনটা দেখা যাচ্ছে না।
২। তৃষ্ণার তীর্থ
যার নাম কেউ রাখেনি
চৈত্রের উত্তাপ এখন হাড়ে লাগে, মজ্জায় ঢোকে, রক্তকে বাষ্প করে। দেহজুড়ে মৃত্তিকার সেই ঘ্রাণ—প্রথম বৃষ্টিতে মাটি থেকে যা ওঠে, পেট্রিকোর, সৃষ্টির আদি সুগন্ধ, পৃথিবীর নিজস্ব ধূপ। পুরোনো খোলস ভাঙছে—কাঁকড়ার মতো, সাপের মতো—নতুন কিছু জন্ম নিতে চাইছে, যার নাম কেউ রাখেনি, যার জন্য কোনো ভাষায় শব্দ প্রস্তুত নেই। জল দাও—এই পিপাসা একটি ফাটলধরা মাঠের, একটি রুগ্ন গাছের শুকনো তালুর, একটি সভ্যতার তৃষ্ণার্ত জিহ্বার।
বাতাসে ভেসে আসে শাখার চন্দনগন্ধী মঞ্জরি—গাছের শিরায় শিরায় কেউ ধূপ জ্বালিয়েছে, উদ্ভিদের শিরদাঁড়ায় প্রবাহিত সুগন্ধী রক্ত। দূরে বেজে চলে পিঙ্গল মাদলের আদিম তাল—সেই তাল যেন ভূমিকম্পের পূর্বাভাস, যে-তালে একদা নেচেছিল আগুন আর জল, যে-তালে মাটি প্রথম ফুলকে জন্ম দিয়েছিল। উৎসব আসন্ন—শূন্যতার নির্যাস থেকে, বৃদ্ধের হাঁটুর ব্যথায়, কনুইয়ের জমাট যন্ত্রণায়, জন্ম নিচ্ছে অপরিচিত আগন্তুক, অন্য কোনো কালের বীজ বুকে নিয়ে, ভবিষ্যতের পাসপোর্ট পকেটে।
তৃষ্ণার পানীয় দাও—স্বচ্ছ মেঘের আড়ালে নির্জন ঋতুর রং হয়ে লুকিয়ে থাকে সে, অদৃশ্য কালিতে লেখা চিঠির মতো। ভোরের আলো কোনো অনুমতি নেয় না—দরজায় কড়া নাড়ে না, চুপচাপ ঢুকে পড়ে, অন্ধকারের বিছানায় হাত রাখে।
হিরণ্ময় পাথেয়
তোমার দুই চোখে তারার আকাশ জন্মেছিল একদিন—সেই রাতে জ্যোতিষীরা মানচিত্র নতুন করে এঁকেছিল, পুরোনো নক্ষত্রমণ্ডলী ভেঙে নতুন রাশি বসিয়েছিল। সেই আকাশ নিভলে মুছে যায় ঘনকৃষ্ণ আবেগের সব কবিতা; অক্ষরের আলো নিভে আসে শ্মশানের ঘাসে, যেখানে ছাই আর স্মৃতি পাশাপাশি শোয়—একই বালিশে, একই চাদরে। তবু তৃষ্ণার তীর্থযাত্রা থামে না—পৃথিবীর কোনো মরুভূমিই এতটা শুষ্ক নয় যে, তার তলায় জলের ধারা বইছে না; কোনো বালুকণা এতটা নির্জীব নয় যে, তার স্মৃতিতে সমুদ্র নেই। প্রথম স্মৃতিগুলো সাজানো আছে হিরণ্ময় আয়োজনে—হীরের মতো অবিনশ্বর, চাপে তৈরি, আলোয় ভাঙে না।
কালের মুঠোয় কিছু পাথেয় জমে আছে—হয়তো সেটাই তোমার বিষাদ, হয়তো সেটাই সম্বল। বিষাদ আর সম্বল—শেকড় আর শাখা—একই মুদ্রার দুই পিঠ, একই গাছের দুই দিক, একই নদীর উৎস আর মোহনা।
নক্ষত্রের চিরকুট
রাতের পথে চলো—নক্ষত্ররা গান গাইবে, গোয়ালঘরের ওপরে চাঁদ উঠবে তামাটে মুদ্রার মতো, রোদে-শুকোনো প্রান্তর ঢাকা পড়বে রুপোলি ছায়ায়। আত্মার গভীরে শব্দ মৃদু মৃদু বাজবে—জন্মের আগে যে-শব্দ শুনতাম গর্ভজলের ছন্দে, মৃত্যুর পরে আবার শোনা যাবে মাটির নিচের নীরবতায়। মৃত্তিকায় প্রাচীন সুরের অনুরণন জাগবে—মাটি সব কিছু মনে রাখে, প্রতিটি পায়ের চাপ, প্রতিটি বীজের প্রার্থনা, প্রতিটি কবরের ঠিকানা।
তুমি এসো—উৎসবমুখর, উন্মত্ত, গ্রামের কবিতা বুকে নিয়ে, কার্ত্তিকের বিগলিত সন্ধেয় যখন আকাশ গলিত তামার রং ধরে। কোনো বিকেলে তোমাকে চিনতে পারব—শান্ত সমুদ্রের মতো, যার উপরিতল আয়নার মতো স্থির, কিন্তু তলদেশে প্রবালের শহর জেগে আছে। গভীরতম জিনিসগুলোই সবচেয়ে শান্ত—ভূমিকম্পের কেন্দ্র নিঃশব্দ, হৃৎযন্ত্রের মূল কক্ষ অন্ধকার। তোমাকেই খুঁজছিলাম—হৃদয়ের অক্ষয় ছবি, নক্ষত্রের হাতে লেখা চিরকুট, মহাজাগতিক ডাকবাক্সে-ফেলা।
দুপুরের যে-মুখ ধরা দেয় না
তোমার সম্পূর্ণ মুখ ফোটাতে গিয়ে কত বার ক্যানভাস বদলেছি—সমুদ্র প্রতিটি ঢেউয়ে নিজের তীরকে নতুন করে আঁকে, তীর তাই কখনও চূড়ান্ত হয় না। হয়ওনি। কৈশোরের সেই প্রখর দুপুরে—যখন ছায়া সবচেয়ে খাটো, যখন সব কিছু নিজের আসল মাপে দাঁড়ায়—রোদে-ওড়ানো মুখটি অন্ধকারে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। প্রজাপতি ধরতে গেলে উড়ে যায়, কিন্তু চুপ করে বসে থাকলে নিজেই আসে কাঁধে—সৌন্দর্যের শিকার ধৈর্যে ধরতে হয়, জালে নয়।
মুহূর্তের আলোর সঙ্গে আমার কান্না মিশে যায়, বুকের নবজাত কম্পন মিশে যায়—বৃষ্টি আর নদী মিশে একই জল হয়, লবণ আর মিষ্টি একই স্রোতে গলে। তোমার সেই পূর্ণ মুখ কেবল ক্ষণিকের দুপুরে মধুর হয়ে জ্বলে—তারপর নেভে, জোনাকির মতো। নেভা আর জ্বলার মাঝখানেই সমস্ত সৌন্দর্য—শ্বাস আর প্রশ্বাসের ফাঁকে যেমন জীবন বাস করে।
দৃশ্যের অন্তরালে
আকাশের ওপার বিমুগ্ধ করে—আয়নার ওপারে আরেকটি ঘর, সব কিছু চেনা অথচ উলটো, ডান-হাত বাঁ-হাতে; দরজা যেদিকে খোলে, সেদিকে বন্ধ। মেঘমাটির নরম সবুজে পরিপূর্ণ সে জগৎ—ক্লোরোফিলের স্বপ্নে ভেজা। হাতে তুলে দাও মৃত্তিকার সম্বল—একমুঠো মাটিতে লুকিয়ে সভ্যতার সমগ্র ইতিহাস, শহরের ধ্বংসাবশেষ, ডাইনোসরের হাড়গোড়, পুরোনো প্রেমপত্রের কালি। পিপাসায় বুক উজ্জ্বল হোক—উজ্জ্বলতম তারাও তো সবচেয়ে তৃষ্ণার্ত, সবচেয়ে ক্ষুধার্ত আগুনেই সবচেয়ে বেশি আলো। জমাট অন্ধকারের ভাঁজে ভাঁজে আলো নামুক—শীতের রাতে জানালার ফাঁক দিয়ে একটুকরো চাঁদ ঘরে ঢোকে, চোরের মতো নিঃশব্দে, কিন্তু কিছু নেয় না—শুধু রেখে যায়।
রক্তের স্রোতে বার বার তার পায়ের শব্দ শুনি—সে কে, জানি না; কিন্তু তার হাঁটার ছন্দ আমার হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে মেলে, দুটো ঘড়ি একই সময় দেখায়। জনতার ভিড়ে বাঁচার বাতাস নিয়ে মিছিল চলে—ঢেউয়ের মতো, একের পর এক, প্রতিটি ঢেউ নিজেকে তীরে বিলিয়ে দেয়। পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে ডেকো—গোধূলির বুকে, যেখানে দিন আর রাত মিলিত হয়ে তৃতীয় একটি সময় তৈরি করে, সোনালি আর বেগুনির অনামা সন্তান। তারপর নক্ষত্রের নিঃশব্দ আলোয় প্রদীপ জ্বালাও—সেই প্রদীপ, যার জ্বালানি অন্ধকার নিজেই, যার সলতে শূন্যতায় পাকানো।
তবুও গান: এক
লেখাটি শেয়ার করুন