শ্বাসের ভূগোল
জন্ম আর মৃত্যুর মাঝে ঈশ্বর আমাদের ধার দেন—কিছু বাতাস; তারপর ফেরত চান।
একটি নিঃশ্বাস—কেবল একটি মাত্র। এইটুকু সুতোয় ঝুলে আছে সমস্ত স্মৃতি, সমস্ত পাপ, সমস্ত প্রার্থনা। এইটুকু কুয়াশার ওপর দাঁড়িয়ে আছে মানুষের গোটা সভ্যতা—তার যুদ্ধ, তার মন্দির, তার প্রেম। ভাবলে অবাক লাগে—এত বিশাল সব কিছুর ভিত্তি এত ভঙ্গুর!
পৃথিবীতে আসার মুহূর্তটি ভেবে দেখো—একটি আর্তনাদ। ফুসফুসের অন্ধকার গহ্বরে প্রথম বার বাতাস ঢোকার রক্তাক্ত উৎসব। সেই প্রথম কান্নার অর্থ কেউ কোনোদিন অনুবাদ করেনি—সেটা কি আসার আনন্দ ছিল, না কি পূর্বজন্মের কোনো বিচ্ছেদের অসমাপ্ত শোক? কেউ জানে না। শিশু ভুলে যায়, আর বড়োরা জিজ্ঞেস করার কথা মনে রাখে না।
আর প্রস্থান? প্রস্থান আর্তনাদ নয়। প্রস্থান হলো মাধ্যাকর্ষণের কাছে সমর্পণ—যেন ঝরে-পড়া পাতা বাতাসকে বলছে, আর ধরে রেখো না, এখন আমি ক্লান্ত। প্রস্থানে কোনো শব্দ নেই। শব্দ জীবিতদের বিলাসিতা—মৃত্যু সেই বিলাসিতা কেড়ে নেয়, বিনিময়ে দেয় এক অখণ্ড নৈঃশব্দ্য, যা থেকে আর কোনো প্রত্যাবর্তন নেই।
ফুসফুসের গহ্বরে প্রতিটি শ্বাসে ঈশ্বর একটি করে দেশলাই জ্বালান। ক্ষণিকের আলো, তারপর অন্ধকার। আবার দেশলাই, আবার আলো। আমরা ভাবি—এ তো চিরকালের। আমরা ভুলে যাই—বাক্সে দেশলাই সংখ্যাতীত নয়। আর যেদিন শেষকাঠি জ্বলে ওঠে, সেদিন আমরা সেই আলোর দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে তাকাই—কিন্তু ততক্ষণে অন্ধকার ইতিমধ্যে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সে ধৈর্যশীল। সে জানে—এটা তারই ঘর, আলো শুধু অতিথি।
দেহ পড়ে থাকে—নদীতীরে উপুড়-হওয়া নৌকার মতো, যার খোলে একদিন দাঁড়ের শব্দ ছিল, জলের গান ছিল, দিগন্তের প্রতি মুগ্ধ ও অবিশ্বাস্য তাড়না ছিল। এখন শুধু শ্যাওলা, আর কাঠের শরীরে সময়ের ধৈর্যশীল ক্ষয়। জীবন আর মৃত্যু একই শয্যায় শোয়, একই চাদর টানাটানি করে রাতভর। মাঝখানে শুধু একটি নিঃশ্বাস—তসবিহ্র শেষদানার মতো আঙুলের ডগায় কাঁপে। পড়ে গেলেই গণনা শেষ। আর আমরা সারাজীবন সেই দানাটিকে শক্ত করে ধরে রাখি—এটাই মনে হয় না যে, হাত কাঁপছে।
নৈঃশব্দ্যের অভিধান
যা বলা যায়, তা হালকা। ভারী কথাগুলো বুকের নিচে পাথর হয়ে শুয়ে থাকে—কেউ কোনোদিন তোলে না।
সেই কাঁপতে-থাকা সীমানায় দাঁড়িয়ে একদিন আবিষ্কার করলাম—নৈঃশব্দ্যেরও একটা মাতৃভাষা আছে, এবং সেই ভাষায় আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি প্রতিটি নিঃশ্বাসে। মুখ দিয়ে নয়—রক্তের স্পন্দন দিয়ে, পাঁজরের কম্পন দিয়ে, শিরায় শিরায় যে অদৃশ্য স্রোত বয়ে যায়, তার ভাষায়।
শরতের ভোরে শিউলি ঝরে—কোনো শব্দ হয় না। অথচ সারাউঠোন-জুড়ে একটা সুগন্ধি বিদ্রোহ টিকে থাকে। ঝরে-পড়াও যে একরকম রয়ে-যাওয়া—ফুল জানে, মাটি জানে, আমরা জানি না, কারণ আমরা ঝরে-পড়াকে শুধু পরাজয় ভাবতে শিখেছি। রাতের গভীরে চাঁদ ওঠে—কোনো ঘোষণা নেই। অথচ সমুদ্র হাড়ে হাড়ে টের পায়—সেই টান, যা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু যুক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় না। জোয়ার আসে, সাগর ছুটে যায় তীরের দিকে। কোনোদিন স্থির থাকতে পারে না। কোনোদিন থামেও না। হয়তো পৌঁছোনো কখনোই উদ্দেশ্য ছিল না—ছোটাটাই ছিল।
ঠিক তেমনি—আমার সমস্ত নৈঃশব্দ্যের ভেতরে তুমি সেই চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ, যা টানলে আমার ভেতরের সমুদ্র নিজের তীর ভুলে যায়, নিজের গভীরতা ভুলে যায়, শুধু ছুটে যায়—অর্থহীনভাবে, অনিবার্যভাবে। আমি নীরব—তুমি কথা বলো। রক্তের শিরায় তোমার কণ্ঠ বাজে, যেন কেউ পরিত্যক্ত ঘরে একতারা বাজাচ্ছে। কেউ শোনে না। কিন্তু দেয়ালগুলো শোনে, এবং কাঁদে—ফাটল ধরে, চুন খসে পড়ে, অমনই তাদের অশ্রু। আমি ভুলে যেতে বসি—তুমি এসে স্মৃতির পরিত্যক্ত দেয়ালে তাজা রং লাগাও। শত বছর পর কেউ অন্ধকার মন্দিরে প্রদীপ জ্বালালে পাথরের মূর্তির চোখেও জল আসে—সেটা অলৌকিক নয়, সেটা কৃতজ্ঞতা; অন্ধকারে এতদিন একা ছিল বলে।
তোমার মুখের ভূগোল
কিছু মুখ দেখার জন্য নয়—বোঝার জন্য যে, পৃথিবীতে এখনও কিছু অনির্বচনীয় সৌন্দর্য দেখার বাকি আছে।
তোমাকে দেখি—আর মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা সেদিন সব সৃষ্টি ফেলে রেখে শুধু তোমাকে নিয়ে বসে ছিলেন। পাহাড়ের কাছ থেকে ধৈর্য নিয়েছিলেন, নদী থেকে গতি, শিশিরবিন্দু থেকে ক্ষণস্থায়িত্বের সৌন্দর্য, আর সন্ধের আকাশ থেকে সেই রং—যা লাল নয়, কমলা নয়, যার কোনো নাম মানুষের ভাষায় নেই—কারণ কিছু জিনিস নামকরণের আগেই সম্পূর্ণ। তারপর তুলি রাখলেন। চুপ করে তাকিয়ে রইলেন। শিল্পীর সেই নীরবতা—যখন তিনি জানেন, এটাই শেষকাজ; এরপর আর সৃষ্টি নয়, শুধুই পুনরাবৃত্তি।
সুন্দর বড়ো আদরের—হ্যাঁ। কিন্তু সূর্যাস্ত প্রতিদিন আসে, আর পৃথিবী তাকে অভ্যেসে পরিণত করেছে। অভ্যেস পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর অস্ত্র—সে যে-কোনো সৌন্দর্যকে সাধারণ করে দিতে পারে, যে-কোনো বিস্ময়কে ক্লান্তিতে বদলে দিতে পারে। তোমার সৌন্দর্য সূর্যাস্ত নয়—তোমার সৌন্দর্য ধূমকেতু। শতাব্দীতে একবার আসে। যে দেখে, তার চোখে সেই আলোর ক্ষতচিহ্ন থেকে যায় আমৃত্যু। সে ভোলে না, ভুলতেও পারে না—কারণ ভোলা তো সেখানেই সম্ভব, যেখানে কিছু অসম্পূর্ণভাবে দেখা হয়। তোমাকে আমি দেখেছি সম্পূর্ণভাবে। তাই ক্ষতটাও সম্পূর্ণ।
তোমার চোখের পেছনে একটা সমুদ্র আছে—আমি জানি, কারণ আমি ডুবেছি সেখানে। সবাই তোমার ঢেউ দেখে—উপরিতলের সৌন্দর্য, রোদে ঝিকমিক। আমি দেখি তলদেশ—যেখানে আলো পৌঁছোয় না, যেখানে প্রবালের কঙ্কালে ডুবে-যাওয়া জাহাজ শুয়ে আছে, মাস্তুল ভাঙা, পাল ছেঁড়া, কিন্তু ভেতরে একটা সিন্দুক, যা কেউ কোনোদিন খোলেনি। তোমার ভাঙা জায়গাগুলো, তোমার চেপে-রাখা ঝড়, তোমার লুকোনো ক্ষত—সব সোনা হয়ে জমে আছে সেখানে। আর সোনা তো তারাই চেনে, যারা অন্ধকারে নামতে ভয় পায় না।
হয়তো ভাবছ, তোমার ভেতরটা পুরো চিনি কি না? জানি না। মহাকাশের শেষ কোথায়, কে জানে। কিন্তু মানুষ তো না-জানাকে ভয় পেয়ে থেমে যায়নি—না-জানাকে সে জ্বালানি বানিয়েছে, আলোকবর্ষকে পদচিহ্ন বানিয়েছে। তুমি আমার সেই মহাকাশ—চিনতে সারাজীবন লাগবে হয়তো। লাগুক। আমি রওনা দিয়ে ফেলেছি, ফেরার টিকিট কাটিনি—কারণ ফেরা বলে কিছু নেই, যখন গন্তব্যই ঘর হয়ে যায়।
নিঃশ্বাসের সন্ধিতে: ১
লেখাটি শেয়ার করুন