মেঘের পুরাণ
দু-চোখে ঘুম এনে দাও—সেই ঘুম, যেখানে স্বপ্ন আসে রঙিন নয়, স্বচ্ছ হয়ে; যেখানে দেখা যায় ভেতরটা, এক্স-রে’র মতো, হাড় পর্যন্ত। শ্যামল রোমন্থনের সুখ ছড়িয়ে পড়ুক—গোরুর চোখে যে-সুখ দেখা যায় বিকেলে, ধীরে ধীরে ঘাস চিবোতে চিবোতে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে, সেই চোখে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, শুধুই উপস্থিতি। মেঘ আনো—ধ্বংসস্তূপে ধারাপাতের মতো, ভস্মের ওপর বর্ষণ; ধ্বংসের ওপর যে-বৃষ্টি পড়ে, তা-ই মাটিকে সবচেয়ে উর্বর করে, যুদ্ধক্ষেত্রের ঘাস সবচেয়ে সবুজ।
ইতিহাস ধুলোয় মেশে—রাজা, রানি, উজির, নাজির সবাই-ই শেষে একমুঠো ধুলো, একচামচ ক্যালসিয়াম। সময়ের ঝাঁটানো উঠোনে সব শাস্ত্র মুছে যায়, সব দীর্ঘশ্বাস, সব ফরমান। কিন্তু সময় নিজে কোথাও যায় না—সে শুধু দাঁড়িয়ে দেখে, নিরপেক্ষ সাক্ষী, ইতিহাসের একমাত্র নিরক্ষর পাঠক।
কবরের পাড় সময় তুলে নেয় বুকে—মৃত্যুর মাটি জীবনের বুকে চাপা পড়ে। অন্য কোনো হৃদয়ের শেকড়ে নতুন সংলাপ গজায়—মৃতের ভাষায়, জীবিতের কান্নায়, দুইয়ের সংকর ভাষায়। তুমি এসো উজ্জ্বল উন্মাদনায়—নীলকণ্ঠের দীপ্তিতে, বিষ গিলেও নীল হয়ে, ভালোবাসা নিয়ে। মেঘ আনো—পৃথিবীর সমস্ত পরাগ নিয়ে, সমস্ত অপ্রকাশিত বীজ নিয়ে, সমস্ত অলিখিত কবিতা নিয়ে।
৫। সময়ের হিসাব
কুয়াশার চিঠি
কত রূপকথা শুনেছি তোমার—বিলে, বাদলে, নানারকম ছবিতে, নানা ঋতুর ফ্রেমে। নদীর দুই পাড়ে বনস্পতির ছায়া পড়ে—সে ছায়া জলে কাঁপে, স্মৃতিতেও তেমন, কখনও স্থির হয় না, কখনও মুছেও যায় না। দিন ফুরোলে অন্ধকার ঘনায় ধীরে—চুলে পাক ধরে শীতের প্রথম কুয়াশার মতো, দেয়ালে ফাটল আসে নদীর শাখানদীর মতো। পরিবর্তনশীল আকাশ প্রণামের ভঙ্গিতে মাথা নোয়ায়—ওপারের চর থেকে হাটুরেরা পাখির মতো ঘরে ফেরে, ঝোলায় সারাদিনের ক্লান্তি, পিঠে সন্ধের ছায়া। মৌসুমি জোয়ার বুক ডোবায় ভালোবাসার ভবিতব্যে—ভরা কোটালে যেমন নৌকার পাটাতন জলে ডোবে।
একদা তোমার উঠোনে সুখ হেসে ফিরত—খালিপায়ে, ময়লা জামায়, কিন্তু তার হাসি ছিল খাঁটি সোনার। রাতভোরের গল্প হতো পেটপুরে—রথ, রাস, উৎসবের সরল আনন্দ, যার কোনো শর্ত ছিল না, মূল্য দিতে হতো না, টিকিট কাটতে হতো না।
এখন শহরের নির্মম চাপে দুঃখের দিন গুনি—প্রতিটি দিন এক-একটি দানা, জপমালায় গাঁথা। অফিসের টিউবলাইটের সাদা আলোয়—যে-আলোয় কোনো ছায়া পড়ে না, কোনো রহস্য থাকে না—কেরানির টেবিলে ফাইলের পাহাড়ে বসে শুনি মরা মাঠ, খরা, বন্যার কথা; বাতাসের নিদারুণ চাপ, যে-চাপে গাছের শাখা ভাঙে, মানুষের মেরুদণ্ড বেঁকে যায়। শুনি, তোমার অসুখ ভীষণ।
সময় নেই। তবু ছোটোবেলার মিষ্টি গল্প মাসে মাসে এসে দাঁড়ায়—পূর্ণিমার চাঁদ মেঘ সরিয়ে বার বার উঁকি দেয়, জেদি শিশুর মতো। অস্থির হয়ে উঠি—কিছুই ভালো লাগে না, শহরের বাতাসে গ্রামের গন্ধ খুঁজি, কংক্রিটে মাটির স্বাদ। পারলে চিঠিদুটো ফেরত পাঠাও—কুয়াশার ভেতর দিয়ে; ডাকপিয়নের হাতে নয়, বাতাসের হাতে, শিশিরের কালিতে লেখা সেই দুটো চিঠি।
হারানো ডাকটিকিট
কোনো এক আবিষ্কারের সকালে খবর এল—বৃষ্টির চিঠি হারিয়ে গেছে পথে, খামও নেই, ডাকটিকিটও নেই। সেই চিঠি, যাতে লেখা ছিল পৃথিবীর প্রথম প্রেমের কথা—মেঘ কীভাবে প্রথম কেঁদেছিল মাটির জন্য, কীভাবে আকাশ প্রথম নিচু হয়েছিল পৃথিবীকে চুমু খেতে। চেনা সম্পর্কের পাতা নতুন করে লেখা হচ্ছে পুরোনো বন্ধন ভেঙে—দেয়ালে চুন মারলেও পুরোনো ছবি ফুটে ওঠে বর্ষায়, নতুন রঙের তলায় আগের রং শ্বাস নেয়।
তবু ভেতরে একটি স্বপ্ন বেঁচে আছে—যে একবার মেঘকে ডেকেছিল, তাকে ভুলব কী করে? হাতে-লেখা চিরকুট, কম্পিত হৃদয়ের বাক্য—বারোমাসের গান নয়, চিরকালের স্তোত্র, সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে-থাকা সুর। আমার সব আবিষ্কার ম্লান হোক—যন্ত্রে মরচে ধরুক, তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হোক—শুধু ওই একটি চিঠি ফিরে আসুক, ভাঁজের দাগ-সহ।
মৃত্যুর পরাজয়
প্রশান্ত সকাল থেকে কত কিছু চুরি হয়—পোড়ামাটির ঘোড়া, গর্ভবতী বধূর স্বপ্নে-দেখা অলংকার, শিশুর প্রথম হাসির ছবি, যা কোনো ক্যামেরায় ওঠেনি, চায়ের কাপে ঠোঁটের দাগ, যা ধুয়ে গেছে, ভুলে-যাওয়া পাসওয়ার্ডের মতো কারও ডাকনাম। কত শিল্প এভাবে হারায়—বালির ছবি ঢেউয়ে মুছে যায়, মান্দালা সম্পূর্ণ হলে ভেঙে ফেলা হয়। সময় সবচেয়ে দক্ষ তস্কর—নিঃশব্দে ঢোকে, নিঃশব্দে নেয়, পায়ের ছাপও রাখে না, সিসিটিভিতেও ধরা পড়ে না।
কিন্তু প্রিয়তমের বুক, চোখ, মুখ—অবিচ্ছেদ্য স্পর্শের স্রোত—চুরি হলেও শেষ হয় না, কারণ যা অনুভূত, তা অভেদ্য। মৃত্যু শরীর নেয়, স্মৃতি নেয় না—হাড় নেয়, হাসি রেখে যায়। মৃত্যু তাই সবচেয়ে পরাজিত, সবচেয়ে ব্যর্থ চোর—সব কিছু নিয়ে যায়, শুধু যেটা সত্যিই দরকার, সেটা ফেলে রেখে যায়, ভুলে নয়, অক্ষমতায়।
জানালার বাইরে সময়
চলন্ত ট্রেনের জানালায় সব কিছু পেছনে সরে—মাঠ, গ্রাম, পানার পুকুর, দোলানো গাছ, বিদ্যুতের তার, গোরুর পাল—সব ছুটছে উলটোদিকে, না কি আমিই ছুটছি? জীবনও একটি চলন্ত ট্রেন—আমরা জানালায় বসে দৃশ্যপট বদলাতে দেখি, স্টেশনের নাম পড়ার আগেই পেরিয়ে যাই।
শুধু কি ওরাই ছোটে? অধীর, অশান্ত আমি নিজে—অবিরাম তৃষ্ণায় গন্তব্যহীন, টিকিটে কোনো স্টেশনের নাম লেখা নেই। কৈশোর আসে ফুলের মতো, এক সকালে হঠাৎ ফোটে; যৌবন আগুনের মতো, সব কিছু আলোকিত করে সব কিছুই পোড়ায়; ক্রমশ শুকিয়ে যায় সব মাধুরী—নদী শুকিয়ে নালা, নালা শুকিয়ে ফাটল, ফাটল শুকিয়ে ধুলো।
যতই এগোই, ততই ফিরে আসি নিজের কাছে—গোলকধাঁধা এটাই, প্রস্থান আর প্রত্যাবর্তন একই দরজা দিয়ে। দিনশেষে ধুলোমাখা হাতে শুধু হিসাবের খাতা—লাভ-ক্ষতির অঙ্ক, যার যোগফল সবসময় শূন্য। তারপর অন্ধকারের যবনিকা—মৃত্যু আনে দেহহীন বিস্মৃতি। বিস্মৃতিও একরকম মুক্তি—ভারহীনতা, ওজনহীনতা, নামহীনতা।
ঘাসের পুরাণ
একদিন স্মৃতি হয়ে যাব—তুমি, আমি, ঘরভরা অ্যালবাম, হলুদ-হয়ে-যাওয়া ছবি। সুন্দরের সংসার ঘুমিয়ে পড়বে—দীর্ঘ, গভীর, স্বপ্নহীন, শীতঘুমের ভালুকের মতো। প্রভাতী গান থামবে, কিছুই থাকবে না—মন্দির, মিনার, বন্দিশালা, আকাশে বাড়ানো হাত—সব সরে যাবে, বালির দুর্গের মতো।
শুধু কিছু ভাগ্যবান মাটি থাকবে, এলোমেলো রঙের ঘাস—রোদে, হিমে, দিনরাত ধরে রাখবে আকাশের লীলাময়ী ছবি, প্রতিটি ঋতুর ফিল্টারে। ঘাস—যাকে সবাই পায়ে দলে, যার কোনো নাম নেই, ইতিহাসের বইয়ে স্থান নেই, জাতীয় সংগীতে উল্লেখ নেই—সে-ই হয়তো পৃথিবীর শেষ সাক্ষী, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, কারণ তার কোনো পক্ষ নেই। সব সাম্রাজ্য ভাঙবে, সব ভাষা হারাবে, সব পতাকা পচবে—শুধু মাটি, ঘাস, আর উদাস আকাশ, তিনজন চুপচাপ বসে থাকবে।
মৌচাকের অর্থনীতি
সময়ের হিজিবিজি হিসেব কোথাও লেখা আছে—গাছের বলয়ে, পাথরের স্তরে, মুখের বলিরেখায়—প্রতিটি ভাঁজে এক-একটি বছরের খতিয়ান। ভাঙা হালের পাশে নরম সবুজ, কোনো গ্রামের বিকেলে ভালো লাগার উষ্ণতা—এই উষ্ণতার কোনো একক নেই, কোনো থার্মোমিটারে মাপা যায় না। কুয়াশা ভেঙে উঁকি দেয় সকালের মুখ—কান্না, ঘাম, রক্ত, আর চায়ের কাপে জমানো সুখ—দুইআঙুলে তোলা যায়, তবু তা সাম্রাজ্যের চেয়ে ভারী, কারণ সাম্রাজ্য ভাঙে, চায়ের স্বাদ থেকে যায়।
সন্তোষ চলে গেলে বুকের অন্ধকার মৌচাকে মধু জমে—যে-মধু মৌমাছি বানায়নি, ফুল দেয়নি—তৈরি হয়েছে শুধু অপেক্ষায়, ধৈর্যে, নিঃসঙ্গতায়, রাত জাগায়। তুচ্ছ হলেও জীবন চিরন্তন—ঘাসের শেকড়ের মতো, ছিঁড়লেও জোড়া লাগে। ‘ভালোবাসা’ এক অর্থহীন নাম হতে পারে—সময়ের খেয়ালি হিসেবে তবু তা-ই জীবনের সর্বোচ্চ দাম, যা কোনো মুদ্রায় পরিশোধ করা যায় না।
চাবি যে হারাল
অনেক খুঁজলাম—ট্রাঙ্ক, আলমারি, পকেটের তলা, বইয়ের পাতার ফাঁক, পুরোনো কোটের ভেতরের পকেট। পেলাম না। কোথায় হারাল সেই চাবি—যা দিয়ে খুলতাম শৈশবের দরজা, যার হাতলে লেগে ছিল মায়ের হাতের ছোঁয়া? ছোটোবেলায় ওই চাবি হাতে পেলেই শিরায় শিরায় ঘুড়ি উড়ত, স্মৃতি নামত তরঙ্গে তরঙ্গে—শিশু সিঁড়ি বেয়ে নামে যেমন, এক ধাপ এক ধাপ, পিছলে গেলেও হাসতে হাসতে, কারণ পড়ে যাওয়া তখনও শেখা হয়নি। দূর সমুদ্র থেকে কেউ হাতছানি দিত, ইচ্ছের নৌকা ভাসাত…পাল বাতাসে ভরে—হাল কল্পনায় ঘোরে, মানচিত্রে শুধু রামধনু আঁকা। সেই চাবিতে অমর্ত্যের পাখি ডানা মেলত—যে-পাখির পালক রোদে সাতরঙা।
এখন সংশয়ে সব নিভছে—সন্ধেয় একটি-একটি করে জানালায় আলো নেভে, পাড়ার বাড়িগুলো চোখ বোজে। বেলা যাক, দিনও যাক। তারপর মৃদুপায়ে বিগলিত রাতেরা নামুক—সেই রাত, যেখানে চাবি ছাড়াই সব দরজা খোলে, কারণ দরজাই নেই, দেয়ালই নেই, শুধু দিগন্ত।
৬। ঘাস ও ভূগোল
অঙ্কুরের জেদ
অঙ্কুরে জড়িয়ে থাকে মাটির উৎসুক আবেগ—সেই আবেগ, যা পাথর ভেদ করে, কংক্রিট ফাটায়, অসম্ভবকে সম্ভব বলে বুকের জোরে। তুমি থেকো আত্মার গভীরে, স্নেহাতুর হয়ে—স্ফুরিত, উচ্ছল, দীপ্ত আনন্দের সম্ভার, ভরা নদীর মতো কূল ছাপিয়ে। ভারী বৃষ্টিতেও যে-প্রদীপ জ্বলে—যার শিখা জল ছুঁলেও নেভে না, কারণ তার আগুন তেলের নয়, প্রত্যয়ের—সেটা তুমি।
অঙ্কুর মানা শোনে না—কে কবে অঙ্কুরকে থামাতে পেরেছে? যে-শক্তি বীজের খোলস ভাঙে, সে শক্তি সাম্রাজ্যও ভাঙতে পারে। উৎসাহী আকাশে তা পল্লবের ডানা মেলে ধরে—সমস্ত উচ্ছ্বাস, সমস্ত বর্ণের ভার রৌদ্রে ও শিশিরে তুলে দেয়, কিছুই লুকোয় না, কারণ লুকোনোর কিছু নেই। আর মাটি নিঃশব্দে সব কিছু বেঁধে রাখে—যে ধরে রাখতে পারে, সে-ই ছেড়ে দিতে পারে, যে আঁকড়ে ধরে, সে ধরে রাখতে পারে না।
সবুজের পুনর্জন্ম
আশ্বিন শুরু হয়েছে—মেঘের চারা আকাশে ও মাটিতে বিছিয়ে পড়ছে, অদৃশ্য হাতে কেউ নরম কার্পেট বিছিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবীর ড্রয়িংরুম সাজাচ্ছে। পথের দু-পাশে লতারা লাবণ্যের মতো চুইয়ে নামে—সময় যেমন, ধীরে কিন্তু অবিরাম, জলের ফোঁটা পাথর ক্ষয় করে তেমন। গাছের পাতায় বৃদ্ধের কম্পন, কাশবনে শতনারীর সাদা পতাকা, মাঠজুড়ে নিষ্পাপ ফসল—প্রতিটি দানায় সূর্যালোক, বৃষ্টির জল, কৃষকের ঘামের লবণ—তিন উপাদানে রান্না।
এরই সঙ্গে—হয়তো এর চেয়েও মূল্যবান, হয়তো এর চেয়েও জরুরি—দুঃখের মাটি থেকে পুনর্জন্ম নিচ্ছে সবুজ জীবনী। সবুজ কখনও হারে না—শুধু অপেক্ষা করে, শীতের নিচে, তুষারের নিচে, পাথরের নিচে—ধৈর্যের ভূগর্ভে শুয়ে—যতক্ষণ না একটুকরো আলো পায়, যতক্ষণ না একফোঁটা জল পায়, ততক্ষণ নিঃশব্দে প্রস্তুত হয়।
ধান আর ধ্বনির মাঝখানে
এখনও শস্যের মাঝে আকাশ দোলে—মাটিমাখা রৌদ্রগন্ধে ডানার মিছিল, বলাকার চারুশীল আকুলতায় আকাশ ভরপুর। নদী নয়, নাম নয়—একবুক ধ্বনিময় জনতা, যার ভাষা বাতাস, যার গান পাখি, যার ব্যাকরণ ঋতুচক্র। ধানসিঁড়ি একরাশ কথা বলে—যে-কথা শুধু নদী জানে, শত বছর ধরে একই শ্রোতাকে বলে চলেছে—মাটিকে—আর মাটি প্রতিবার নতুন করে শোনে, প্রতিবার অবাক হয়।
কখনো শিশিরের শব্দ ছুঁয়ে ছুঁয়ে বুকের নিভৃত কোণে অচেনা কিছু জাগে—তার পরিচয় নেই, নাম নেই, পাসপোর্ট নেই; সে শুধু আছে, মাধ্যাকর্ষণের মতো—অদৃশ্য, অনুভবযোগ্য, অস্বীকারের অযোগ্য। নতমুখে কিছুটা সময় কাটে—প্রার্থনার ভঙ্গিতে, না কি ক্লান্তির, তফাৎ করা কঠিন। কোনো বিহ্বল সকালে হঠাৎ দেখি—শিমুলের ডালে সব কিছু আবার নতুন, লাল ফুলের বিস্ফোরণ, গাছ নিজেই আগুন, কিন্তু পোড়ায় না—আলো দেয়।
নির্জনতার ব্যাকরণ
থাকুক—এই ক্ষেত, ডোবা-নালা, দূরের গ্রাম, ঝাপসা দিগন্তে গাছের সারি। ঘন গাছপালা একটুও না নড়ুক—তারা ইতিমধ্যেই যেখানে থাকা উচিত সেখানে আছে, তাদের জিপিএস-এর দরকার নেই। দীর্ঘদেহ তালগাছ মায়ের স্নেহে পাখা নাড়ে—দাম চায় না, ধন্যবাদ চায় না, শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, উচ্চতার নিঃসঙ্গ সাধক সে। ধুলোর আবরণে মেঘ উড়ে যায়, মৌসুমি সংলাপ আনে—মাঠময় হরিয়াল, টিট্টিভ, ধনেশ, প্রত্যেকের গলায় আলাদা সুর, আলাদা অভিযোগ। এতেই সুখ—সরল সুখ, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, কোনো মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ নেই।
এই নির্জনতা ভেঙো না তীক্ষ্ণ কোলাহলে—নির্জনতা ভঙ্গুর, একবার ভাঙলে জোড়া লাগে না, কাচের মতো, বিশ্বাসের মতো। কখনো সময় পেলে একা এসো, চুপচাপ—এক বিরতি থেকে অন্য ভূমিকায়, এক শ্বাস থেকে অন্য জীবনে।
তবুও গান: তিন
লেখাটি শেয়ার করুন