দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

সব নাম ঝরে গেলে: ছয়



বিচ্ছেদের ব্যথা সবসময়ই এই গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। আমরা পৃথিবীতে এসে হাজারো রূপে নিজেকে খুঁজতে শুরু করি—বন্ধুত্বে, সৌন্দর্যে, সাফল্যে, নতুনত্বে, অন্তর্ভুক্তিতে, প্রশংসায়, জ্ঞানে, উচ্চাশায়, প্রেমে। প্রতিটি আবিষ্কার কিছু-না-কিছু দেয়—একটু তৃপ্তি, একটু আলো, একটু উষ্ণতা। প্রতিটি আবিষ্কারই কিছু-একটা অসম্পূর্ণ রেখে যায়, যেন জিগস পাজলের একটা টুকরো পাওয়া গেল, কিন্তু ছবি এখনও সম্পূর্ণ হলো না। এই অস্থিরতা অর্থহীন নয়। এটি পবিত্র আহ্বান। আত্মার সেই কণ্ঠ, যা চিরকাল মূল-থেকে-সরে-যাওয়া কিছু মেনে নিতে অস্বীকার করে, আর বলে—এটা নয়, ওটাও নয়, আরও কিছু আছে। পার্থিব পুনরাবৃত্তির চেয়ে বেশি জরুরি কিছু, ওপরের সুখের চেয়ে গভীর কিছু নিয়ে থাকে।

তুমি হয়তো জীবনের প্রতিটি পেয়ালা থেকে চুমুক দেবে—সম্পর্ক, ক্যারিয়ার, ভ্রমণ, সৃজনশীলতা, তবু একটা তেষ্টা থাকবে, যা মেটে না। সেই তেষ্টা শেখায়, আত্মা অগভীর সান্ত্বনার জন্য তৈরি হয়নি, সে সাগরের গভীরতা চায়। এমন বিশালতার কাছে নিজেকে দিতে চায়, যা তাকে পুরোপুরি ধরতে পারে, যেমন নদী সাগরে মিশতে চায়, কারণ পুকুরে তার কুলায় না। এই জ্বলন্ত টান অনুসন্ধানীকে টেনে নিয়ে যায়, আকর্ষণ আর আতঙ্কের মাঝখানে, পতঙ্গ আর আগুনের মতো। তোমার কোনো একটা অংশ জানে, তুমি আসলে পৃথিবীর কোনো একটা জিনিসকে নয়, সেই উৎসকে ভালোবাসো, যেখান থেকে পৃথিবী তার আলো পায়।

তারপর আসে অহমের মুখোমুখি। শুধু আকুলতা তাকে মুক্ত করে না। আত্মরক্ষার পাথর আত্মা আর সমর্পণের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে—অহংকার, ভয়, তুলনা, নিয়ন্ত্রণ, প্রতিচ্ছবি, মর্যাদা, এসব মিলে এমন শক্ত মাটি তৈরি করে, যেখানে কমই ফসল জন্মায়। অহম ফিসফিস করে বলে—ছেড়ে দিলে বিলীন হয়ে যাবে, শেষ হয়ে যাবে, কেউ থাকবে না। কঠোরতাকে নিরাপত্তা ভাবে। কিন্তু পাকা ইটের ওপর ঘাস গজায় না। তোমার ভেতরের কিছু অংশকে মাটি হতে হবে—নরম, ভেজা, ভাঙতে রাজি, যাতে যেখানে এতদিন দেয়াল ছিল, সেখানে জীবন ফুল ফুটতে পারে।

এটাই মিথ্যা সত্তাকে আলগা করার কাজ। এ আত্মঘৃণা নয়। গভীরতম সত্যকে ধ্বংস করা না। বরং যা কঠিন, ধার-করা, অভিনয়ের মঞ্চে দাঁড়ানো, আত্মরক্ষায় শক্ত-হয়ে-যাওয়া, এ হচ্ছে তার ভেঙে পড়া। প্রশংসার ওপর দাঁড়ানো তোমাকে মরতে হবে, মাটিতে মিশতে হবে। ভয়ের ওপর দাঁড়ানো তোমাকেও। তুলনার, আঘাতের ওপর দাঁড়ানো তোমাকেও। প্রতিটি ছেড়ে দেওয়া প্রথমে ক্ষতির মতো লাগে, যেন কিছু-একটা হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই ছোটো ছোটো মৃত্যুর ভেতর দিয়েই বড়ো একটা স্বাধীনতা দেখা দেয়। একটা একটা করে স্তর ঝরাও, আর নিচে জীবনের আরও আনন্দ খুঁজে পাও। যা মনে হয়েছিল ক্ষয়, দেখা যাচ্ছে, সেটাই সুন্দর রূপান্তর।

অহম প্রতিরোধ করে নানাভাবে, প্রায়ই—খুব সাধারণ মুহূর্তে, রোজকার জীবনে, মামুলি মুহূর্তে। কেউ তোমার চেয়ে ভালো করলে হিংসা। কেউ ভুল ধরলে আত্মরক্ষা—আমি ঠিকই করেছিলাম, আমি ঠিকই বলেছিলাম! নিশ্চয়তা হারালে আতঙ্ক। প্রশংসা পেলে ফুলে ওঠা। পুরোনো ক্ষতে হাত পড়লে লজ্জা। এই মুহূর্তগুলোতেই মিথ্যা সত্তা নিজের মুখ দেখায়। এই কাজটা ঘৃণা করা নয়, চিনতে পারা। আহা, এ-ই তুমি? চিনলাম! আর চেতনার আলোয় এনে ছেড়ে দেওয়া। সময়ের সাথে যা পাথর ছিল, তা মাটি হতে শুরু করে। যেখানে কিছু জন্মাত না, সেখানে একটু একটু করে সবুজ দেখা দেয়।

তারপর আত্মসমর্পণ। নিষ্ক্রিয়তা নয়, হাল ছেড়ে দেওয়া নয়, ধসে পড়া নয়; বিশ্বাস। কথাটা সহজ, করাটা পাহাড়সম, জানি। মনের সেই আঁকড়ে ধরার অভ্যেস, সব কিছু বুঝতে হবে, সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেই অভ্যেসটাকে ছেড়ে দেওয়া। নিজের চেয়ে বড়ো কিছুর হাতে হাত রাখতে রাজি হওয়া—সব বোঝা, উদ্বেগ, চাহিদা সরিয়ে দেওয়া। প্রতিটি ছোটো ছোটো সরে দাঁড়ানোর গুরুত্ব আছে: আঘাতকে ক্ষমা করে দেওয়া, প্রতিক্রিয়ার আগে একটু বিরতি নেওয়া, না-জানাকে জায়গা দেওয়া, ভয়ের বদলে বিশ্বাসকে বেছে নেওয়া—একটা ক্ষুদ্র শ্বাসের মুহূর্তে। প্রতিটি ছোটো ছোটো সরে দাঁড়ানো ভেতরের দরজাটা আরেকটু চওড়া করে, যেখান দিয়ে আলো ঢুকতে পারে।

ভালোবাসা, তারপর যা ছোঁয়, তাকে বদলে দেয়। তিক্ততা মিষ্টিতে রূপ নেয়, আক্ষরিক নয়, কিন্তু তুমি বোঝো। ব্যথা ওষুধ হয়, শোক গানে রূপান্তরিত হয়। যে-হৃদয় জীবনের ধাক্কায় ভেঙেছিল, সে-ই পরে এমন পাত্র হয়ে ওঠে, যার ভেতর দিয়ে জীবন আরও গভীর সুরে গাইতে পারে। কিছু সাক্ষাৎ আছে জীবনে—পবিত্র বন্ধুত্ব, মানবিক আয়না, যা আত্মাকে জাগিয়ে দেয়, কারণ তাদের ভেতর দিয়ে মুহূর্তের জন্য অন্য আলো ঝলকে ওঠে। এমন নিবিড় দেখা পুরো একটা পুরোনো জীবন ভেঙে দিতে পারে। জ্ঞানীকে প্রেমিক বানাতে পারে। শৃঙ্খলাপ্রিয় মানুষকে এলোমেলো করে দিতে পারে। সুরক্ষিত বর্মে ফাটল ধরাতে পারে। কিন্তু যে তোমাকে জাগাল, সে সবসময় একই রূপে থাকে না। বিচ্ছেদ আসে। ক্ষতি আসে। অনুপস্থিতি আসে। আর তখন আত্মাকে আবিষ্কার করতে হয়, যাকে সে অন্যের ভেতরে ভালোবেসেছিল, সেই আলো আসলে তার নিজেরই ভেতরে আছে, আগুন হয়ে জ্বলছে।

শোক তাই পথকে আটকায় না। গভীর করে। বাইরের প্রিয়জন সরে যায়, আর ভেতরের সূর্যকে উঠতেই হয়, কারণ আর কোনো উপায় নেই। ভালোবাসা বিচ্ছেদ সহ্য করে, রূপের প্রতি আসক্তি কমিয়ে, সারাংশের প্রতি আরও বিশ্বস্ত হয়ে। ঘূর্ণন শুরু হয়, ভক্তি শুরু হয়, আত্মসমর্পণের নৃত্য দেহ পায়।

শেষপর্যন্ত পথ মিলনের দিকে পাকে। বিজয় হিসেবে নয়, সমস্ত বিচ্ছিন্নতা মুছে যাওয়া হিসেবে। ফোঁটা সাগরে মেশে, তীর ধুয়ে যায়, প্রেমিক আর প্রিয়তমের ভাগটা স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। শূন্যতায় বিলীন হওয়া নয়, বিভাজনের ওপারের পূর্ণতা। সেই মিলনে ছোটো জিনিসগুলি জ্বলে ওঠে—রোদে ধুলোকণা, ভাগ-করা হাসি, একটা নিঃশ্বাস, বিনা কারণে কারও প্রতি দয়া দেখানো। দিন নিজেই হয়ে ওঠে উন্মোচনের জায়গা।

মরার আগে মরা মানে, এখনও বেঁচে থাকতে থাকতে মিথ্যাকে ঝরতে দেওয়া, যাতে ভয় তার সিংহাসন হারায়। স্বাধীনতা তখন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। অস্তিত্বের ক্ষুদ্র অংশগুলি ফুলতে পারে, কারণ শেকড় জীবন্ত জলে পৌঁছে গেছে। কিন্তু মিলনও স্থির গন্তব্য নয়, গ্রহণ আর দানের নাচ। এক হাত আকাশে, আরেক হাত মাটিতে। একহৃদয় আলো নিচ্ছে, সেই হৃদয়ই মানুষের রূপে তা ফিরিয়ে দিচ্ছে।

আর আহ্বান খোলাই থাকে। তুমি যত বারই ভোলো, যত বারই ভয়ে বা কঠোরতায় বা শব্দে বা ঘুমে ফিরে যাও, ডাক থেকেই যায়। আবার এসো। ক্লান্ত হয়ে এসো। আহত হয়ে এসো। নিজেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেলার পর এসো। শোকে এসো, বিভ্রান্তিতে এসো, খালি হাতে এসো। দরজা থেকে যায়। নীরবতা থেকে যায়। প্রিয়তম থেকে যায়।

এই স্মরণটুকু সকালে নিয়ে যাও। কথায় নিয়ে যাও, শ্রমে আর শোকে আর বিরতিতে আর দোরগোড়ায়ও। ভোরের হাওয়া মনে করিয়ে দিক, তুমি যে-সত্তাটার অভিনয় করো, তার নিচে আরেকজন অপেক্ষা করছে। যে-শব্দকে ভয় পাও, তার নিচে স্বস্তিকর নীরবতা আছে। শূন্যতার নিচে পারাপার আছে। বিচ্ছিন্নতার নিচে উপস্থিতি আছে। আকুলতার নিচে ভালোবাসা আছে। ভ্রমণের নিচে ঘর আছে।

বার বার ফিরে এসো। দিন তোমাকে গিলে নেবার আগে, হৃদয় কঠিন হলে, পৃথিবী অসহনীয় হলে। শোকে ফেরো, আনন্দেও ফেরো, কিছুতে অর্থ না পেলেও ফেরো। এমনকি নিজের নাম ভুলে গেলেও।

বসো। শ্বাস নাও। শোনো। এটুকুই। মুখোশ আলগা হোক, গল্প থামুক, নীরবতা যতটুকু চায়, ততটুকু জায়গা নিক। হৃদয় নরম হোক। যা মিথ্যা, তা ঝরে পড়ুক নিজে থেকেই। আর যদি কিছু একটা উঠে আসে, উপস্থিতি বা প্রেম বা এমন কিছু, যার নাম দেওয়া যায় না, তাকে আসতে দাও।

তারপর পৃথিবীতে ফিরে এসো, পালিয়ে গিয়েছিলে বলে নয়, বরং আত্মাকে না হারিয়ে কীভাবে এই পৃথিবীতে বাঁচতে হয়, তা আবার মনে পড়েছে বলে। হেঁটো এমন কারও মতো, যে জানে, একাকিত্ব সুস্থ করতে পারে আর নীরবতা এমন কিছু খুলে দিতে পারে, যা শব্দে কখনও খোলে না। আর ভালোবাসা এমন কিছু নয়, যা তোমাকে তৈরি করতে হবে, বরং এমন কিছু, যাকে তোমাকে জায়গা করে দিতে হবে।

তুমি এই রহস্যের বাইরে নও।
তুমি এখন এর ভেতর দিয়েই চলেছ।
তুমি পথ হারাওনি।
তুমিই সেই পথ, যা রূপ নিচ্ছে।
তুমি দূর থেকে ভালোবাসাকে তাড়া করছ না।
তুমিই সেই ভালোবাসা, যা ঘুম থেকে জাগছে।

আর যদি কোনোদিন ভুলে যাও, ভোর তা-ও আবার ফিরবে। সেই বাতাস আবার বইবে। ভেতরের ঘর তখনও দাঁড়িয়ে থাকবে। নীরবতা কোনো অভিযোগ ছাড়া অপেক্ষা করবে, কারণ তার অভিযোগ করার কিছু নেই, সে তো সবসময়ই ছিল। গভীরের সত্তা ধৈর্য ধরে থাকবে। তুমি যখন তার সামনে দাঁড়াতে প্রস্তুত, বিশালতা আবার খুলবে। উপস্থিতি আবার জাগবে, সেখান থেকে যা পরিষ্কার হয়ে গেছে—সব ফিরবে। প্রতিটি ঋতুর নিচে ভালোবাসা থেকে যাবে, গ্রীষ্মেও, শীতেও, শোকেও, আনন্দেও।

বার বার ডাকা হবে। বার বার আমন্ত্রণ জানানো হবে শুরু করতে। আর সেই শেষহীন শুরুর মধ্যে তুমি হয়তো ধীরে ধীরে আবিষ্কার করবে যা সবসময়ই সত্য ছিল:

কোনো মূল বস্তু কখনও হারায়নি।
যে খুঁজছিল আর যাকে খোঁজা হচ্ছিল, ওরা কখনও আলাদা ছিল না। এটা শুনতে সহজ লাগে, তা ঠিক। কিন্তু একবার টের পেয়ে গেলে সব বদলে যায়।
ব্যথাটাই দিক দেখাচ্ছিল।
ভেঙে পড়াটাও প্রকৃতির একরকম দয়া ছিল।
নীরবতা কখনও ফাঁকা ছিল না।
শূন্যতা কখনও অর্থহীন ছিল না।
ভালোবাসা কখনও চলে যায়নি।
আর তোমার সব নামের তলায়, সব ভয় আর সব বছর আর সব গল্পের তলায়, সবসময় ছিল এক স্থির, ধীর সত্য, তোমার ফেরার অপেক্ষায়।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *