অদ্বৈত দর্শনের এই আলোয় শ্লোকটির সারমর্ম দাঁড়ায়—“কর্ম করো, কিন্তু কর্ম তোমার উপর কর্তৃত্ব আরোপ না করুক। কর্তার বোধ ত্যাগ করলেই কর্ম হয়ে যায় মুক্তির সেতু।” তখন কার্য আর কারণ, কর্তা আর ভোক্তা, আমি আর ঈশ্বর—সব একাত্ম হয়ে চৈতন্যে গলে যায়; আর সেই চৈতন্যই “পরম”—যাকে শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলেছেন “পরমাপ্নোতি পুরুষঃ।”
‘নিমিত্তমাত্র’ হওয়ার অর্থ তাই দ্বৈততা ও অহংকারের বিনাশ। মানুষ প্রায়ই ভাবে—“আমি করলে তবে কাজটি হবে, আমি না করলে কিছুই সম্ভব নয়।” এই ‘আমি’-বোধই আসলে অবিদ্যা বা অহংকারের মূল, যা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে পরম চেতনা থেকে। গীতার এই শিক্ষা সেই বিভ্রমকে ভাঙে। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন—যুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি বিজয় ইতিমধ্যেই ঈশ্বরের পরিকল্পনায় স্থির। তুমি কেবল সেই মহাযোগের সচেতন অঙ্গ, তাঁর ইচ্ছার বাহন। এই উক্তি মায়ার অন্তরালে ব্রহ্মচেতনার অনন্ত স্বয়ংক্রিয় গতির বোধ জাগিয়ে তোলে।
অদ্বৈতের মতে, ঈশ্বর কোনো ব্যক্তিসত্তা নন, যিনি বাইরে থেকে ঘটনাকে পরিচালনা করেন; তিনি সেই এক চেতনা, যার মধ্যেই সমস্ত ক্রিয়া, সৃষ্টি, ধ্বংস ও পরিবর্তন ঘটে। “ময়ৈবৈতে নিহতাঃ পূর্বমেব” অর্থাৎ “এই সকল কাজ ইতিমধ্যেই আমার দ্বারাই সম্পন্ন”—এই বাক্যটি নির্দেশ করে যে, বিশ্বপ্রবাহে যা ঘটছে, তা কাল, স্থান ও কার্যকারণ—সব সীমা অতিক্রম করে ব্রহ্মের অবিরাম প্রকাশ।
অর্জুন যখন “আমি কর্তা” এই অহংকারে জড়িয়ে পড়েছিল, কৃষ্ণ তাকে স্মরণ করালেন—তুমি কর্তা নও, তুমি কেবল নিমিত্তমাত্র, সেই চেতনার বাহন মাত্র। কর্ম তোমার দ্বারা নয়, তোমার মাধ্যমে ঘটছে। এই জ্ঞানই মুক্তির মূল—যেখানে কর্ম থাকে, কিন্তু কর্তার অহং থাকে না; যুদ্ধ থাকে, কিন্তু যুদ্ধের ফলের সঙ্গে আত্মার কোনো সম্পর্ক থাকে না।
কৃষ্ণের এই উপদেশ অদ্বৈতের মূল প্রতিপাদ্যকে প্রকাশ করে: জগতের প্রতিটি ঘটনা চেতনারই প্রকাশ, এবং মানুষ যখন এই উপলব্ধিতে পৌঁছায় যে, “আমি কিছুই করি না, সবই সেই এক চেতনার লীলা”—তখন সে জ্ঞানের ও শান্তির পূর্ণতায় স্থিত হয়। শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে (২.১.১৪) বলেন—“তদনন্যত্বমারম্ভণশাব্দাদিভ্যঃ”—অর্থাৎ, “কার্য (জগৎ) কারণ (ব্রহ্ম) থেকে ভিন্ন নয়।” অর্থাৎ, সমস্ত কর্ম ও ফল আসলে ব্রহ্মেরই প্রকাশ; মানুষ কেবল তার মধ্য দিয়ে সেই প্রকাশের গতিতে অংশ নিচ্ছে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্র তাই প্রতীক হয়ে ওঠে জীবনের মহাযুদ্ধের—যেখানে প্রত্যেক মানুষ একেক জন ‘অর্জুন’, আর প্রতিটি পরিস্থিতি একেকটি যুদ্ধ। শ্রীকৃষ্ণের “নিমিত্তমাত্রং ভব” বাণী তখন এক অনন্ত সত্যে পরিণত হয়: নিজের শক্তি, বুদ্ধি ও ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করো—কিন্তু মনে রেখো, তুমি সেই চেতনারই অঙ্গ, যিনি সমস্ত কর্মের চূড়ান্ত কর্তা। করো, কিন্তু অহংকার রেখো না; লড়ো, কিন্তু ‘আমি লড়ছি’ এই বিভ্রম ত্যাগ করে।
যে-মুহূর্তে মানুষ এই ‘নিমিত্তমাত্র’-বোধে পৌঁছে যায়, তখনই তার কর্ম যোগে পরিণত হয়, কর্তব্যসাধন পরিণত হয় উপাসনায়, এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ঈশ্বরীয় লীলার স্বচ্ছ অংশ হয়ে ওঠে। সেই অবস্থায় বিজয় বা পরাজয়—দুটিই সমান, কারণ তখন কর্মের মধ্যে আর কোনো ব্যক্তি-অহংকার থাকে না; থাকে কেবল ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রবাহ, যেখানে কর্মী ও কর্তা এক হয়ে যায়।
কৃষ্ণের গোবর্ধন পর্বতের কাহিনিটি ‘নিমিত্তমাত্র’-ভাবনার এক জীবন্ত প্রতীক, যেখানে ঈশ্বরীয় কার্য এবং মানবপ্রয়াস—এই দুইয়ের সম্পর্ককে কেবল যুক্তিসিদ্ধ নয়, অভিজ্ঞতাসিদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গোবর্ধন পর্বত উত্তোলন-এর ঘটনাটি বহিরঙ্গে এক অলৌকিক কাহিনি হলেও, অন্তর্নিহিত অর্থে এটি গীতার “নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্” (১১.৩৩) বাণীরই দৃষ্টান্ত।
যখন বৃন্দাবনে অঝোর বর্ষণে গোকুলবাসীরা বিপদের মুখে পড়লেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের রক্ষার জন্য কনিষ্ঠ আঙুলের নখে গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরলেন। কিন্তু তিনি কেবল নিজে পর্বত ধরে রাখলেন না; গোপবালকদেরও বললেন—“তোমরাও লাঠি ধরো, সাহায্য করো।” এই আহ্বান ছিল আসলে এক শিক্ষা। মানুষ যেন নিজের কর্ম থেকে বিরত না থাকে, যেন সে পূর্ণ শক্তি দিয়ে কাজে নিযুক্ত হয়। কিন্তু পাশাপাশি এই উপলব্ধিও জন্মায়—সেই কর্মের সফলতা কখনোই কেবল তার নিজের শক্তি বা বুদ্ধির ফল নয়।
গোপবালকরা যখন আনন্দে লাঠি ধরল, তাদের মনে অহংকার জাগল—“আমরাও তো তুলেছি।” সেই মুহূর্তে কৃষ্ণ আঙুল সামান্য নিচু করলেন; সঙ্গে সঙ্গে পর্বত নড়ে উঠল, আতঙ্কে তারা চিৎকার করল—“দাদা, মরলাম!” তখন ভগবান বললেন—“আরও শক্তি দাও।” তাঁরা সমস্ত শক্তি লাগালেও পর্বত একটুও নড়ল না। কৃষ্ণ আবার আঙুল তুলে দিলেন, পর্বত স্থিত হলো।
এখানেই নিহিত আছে গভীর তাত্ত্বিক ইঙ্গিত। মানুষের পরিশ্রম, বুদ্ধি, উদ্যোগ—এসব সবই প্রয়োজনীয়; কিন্তু এগুলি কখনোই চূড়ান্ত কারণ নয়। এগুলি কেবল নিমিত্ত—কার্য সম্পন্ন হওয়ার উপকরণমাত্র। প্রকৃত কর্তা হলেন পরম চেতনা, যিনি সমস্ত শক্তির উৎস। গীতা (৩.২৭)-তে কৃষ্ণ বলেন—“প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ। / অহংকারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহম্ ইতি মন্যতে॥” অর্থাৎ, “প্রকৃতির গুণই সমস্ত কর্ম সম্পন্ন করছে, কিন্তু অজ্ঞ মানুষ ভাবে—‘আমি কর্তা’।’’
“নিমিত্তমাত্র হয়ে কাজ করা” মানে নিজের প্রচেষ্টায় ঘাটতি রাখা নয়, বরং পূর্ণ সতর্কতা ও নিষ্ঠা সহকারে কাজ সম্পাদন করা, অথচ নিজের অহংকারকে একেবারে বিলুপ্ত করা। ভগবান নিজে যেমন গোপবালকদের লাঠি ধরতে বলেছিলেন, তেমনি গীতায়ও তিনি অর্জুনকে বলেছিলেন—“যুদ্ধ করো, কিন্তু জানো, আমি পূর্বেই সব নির্ধারণ করেছি; তুমি শুধু আমার ইচ্ছার বাহন।” এই শিক্ষাই কর্মযোগের মূলসার।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে, কর্মের মধ্যে অহংকারের এই অপসারণই আত্মসাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি। যতক্ষণ মানুষ ভাবে—“আমি করছি”—ততক্ষণ সে ঈশ্বর থেকে পৃথক থাকে; কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে—“আমি কেবল নিমিত্ত, কর্তা তিনি”—তখনই তার কর্ম উপাসনায় রূপান্তরিত হয়।
কঠোপনিষদের এই উক্তি—“নায়মাত্মা বালহিনেন লভ্যঃ... যমেবৈষ বৃত্তে তেন লভ্যঃ” (১.২.২৩)—আত্মপ্রাপ্তির প্রকৃত স্বরূপ নির্দেশ করে। এখানে ‘বালহিন’ মানে শারীরিক দুর্বল নয়, বরং মানসিক ও আত্মিক দুর্বলতা—যে-ব্যক্তি অদ্বৈত চেতনার উপলব্ধির সাহস রাখে না, যিনি অহং, ভয়, ও আসক্তির আবরণে আবদ্ধ, তাঁর কাছে আত্মা প্রকাশিত হয় না।
অদ্বৈত বেদান্ত বলে, আত্মা কোনো অর্জনযোগ্য বস্তু নয়; আত্মা স্বরূপেই নিত্যপ্রাপ্ত, সর্বব্যাপী। কিন্তু অজ্ঞান, অহং ও ভেদবুদ্ধির কারণে সেই আত্মার স্বপ্রকাশ ঢাকা পড়ে থাকে। তাই ‘লভ্যঃ’ বা “লাভ করা যায়”—এর অর্থ কোনো নতুন প্রাপ্তি নয়, বরং আত্মস্বরূপের স্মরণ বা প্রত্যভিজ্ঞা। উপনিষদ বলছেন, “যমেবৈষ বৃত্তে তেন লভ্যঃ”—অর্থাৎ, আত্মা নিজেই যাঁকে প্রকাশিত হতে চায়, কেবল তাঁর দ্বারাই তিনি ‘লভ্য’। এই ‘চয়ন’ কোনো বাহ্য ঈশ্বরের অনুগ্রহ নয়; এটি আত্মার নিজেরই প্রতিচ্ছবি, নিজেরই অনুগ্রহ—যখন প্রস্তুতি পূর্ণ হয়, তখন আত্মা নিজেই নিজের মধ্যে জেগে ওঠে।
আত্মা অর্জনযোগ্য নয়, কারণ আত্মাই সব কিছু। লাভ করতে হলে ‘আমি লাভ করছি’ এই ভ্রান্তি বিলুপ্ত হতে হয়। যখন সাধক সমস্ত বাহ্য নির্ভরতা ত্যাগ করে নিজের অন্তঃচেতনায় স্থির হয়, তখন সেই পরম চেতনা—যাকে উপনিষদ বলে “বৃহৎ, নিঃসঙ্গ, অবিকারী”—নিজেই নিজেকে প্রকাশ করে। সেই প্রকাশ কোনো ক্রিয়া নয়, বরং কর্তার বিলুপ্তির মুহূর্ত—যেখানে জ্ঞান, জ্ঞাতা, জ্ঞেয়—সব একাকার হয়ে যায় আত্মরূপ ব্রহ্মে। আত্মা কেবল সেই সাহসী ও প্রস্তুত চেতনার কাছে প্রকাশিত হন, যে ‘আমি’ নামক দুর্বলতাকে ত্যাগ করে নিজস্ব অনন্ত স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
গোবর্ধন-কথাটি সেই অনন্ত বরণের প্রতীক। ঈশ্বর নিজে আমাদের হাতে ‘লাঠি’ ধরিয়ে দেন, যাতে আমরা কর্মে যুক্ত থাকি; কিন্তু সেই কর্মের ভার আমাদের নয়, তাঁর। সাধক যতই নিজের শক্তিতে ভরসা করে, ততই সে ক্লান্ত হয়; কিন্তু যেই সে ঈশ্বরকে কর্তা মেনে কেবল নিমিত্তরূপে কর্ম করে, তখনই তার কর্ম সার্থক হয়, অহং বিলুপ্ত হয়, এবং চেতনা নিজের উৎসে ফিরে যায়।
এইভাবেই গোপবালকদের কাহিনির মধ্য দিয়ে গীতা-তত্ত্বের বাস্তব প্রতীক প্রকাশ পায়—পূর্ণ প্রয়াস করো, কিন্তু ফলের কর্তৃত্ব ঈশ্বরের; তোমার লাঠি দরকার, কিন্তু ভার বহন করছে তাঁর আঙুল। এই উপলব্ধিই মুক্তির সূচনা, আর সেই কারণেই ‘নিমিত্তমাত্র’ হওয়া মানে কর্ম ত্যাগ নয়—অহংকারত্যাগ।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই কাহিনির গভীর তাৎপর্য কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগের একাত্মতাকে প্রকাশ করে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের “গোবর্ধন পর্বত উত্তোলন”-এর রূপক আসলে বোঝায় যে, ঈশ্বর চান, মানুষ যেন তার কর্মে পরিপূর্ণতা আনুক, কিন্তু সেই পরিপূর্ণতায় অহংকার না থাকে।
অদ্বৈত দর্শনে কর্মের মূল রহস্য হলো—“কর্ম করো, কিন্তু কর্তার ভাবসম্পন্ন হয়ো না।” কর্মের মধ্যেই জ্ঞান স্থাপিত হয়, যখন জানা যায় যে, সমস্ত শক্তি, প্রয়াস ও ফল আসলে চেতনারই প্রকাশ। সাধক যখন পূর্ণ শক্তি, বুদ্ধি ও উদ্যোগ প্রয়োগ করে, তখন সে ‘গোপবালকের’ মতো; কিন্তু সেই কর্মের ফল নিজের বলে না ভেবে ঈশ্বরের কৃপা বলে মানলে, তার মধ্যে জ্ঞানযোগ হয়।
গীতার ভাষায় এটি সেই ‘নিমিত্তমাত্র’ ভাব—যেখানে কর্ম ঈশ্বরের লীলা, আর মানুষ সেই লীলার মাধ্যমমাত্র। কর্ম তখন না হয় পরিত্যাগ, না হয় আসক্তি; বরং হয় নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন।
অদ্বৈতের পরম দৃষ্টিতে কর্ম ও জ্ঞান বিরোধী নয়; কর্ম ঈশ্বরচেতনার বাহ্য প্রকাশ, জ্ঞান সেই চেতনার অন্তঃপ্রকাশ। যখন সাধক জানে যে, কর্মও ব্রহ্মেরই ক্রিয়া—“প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ” (গীতা, ৩.২৭)—তখন সে সমস্ত প্রচেষ্টা করেও অবিকৃত থাকে। ঠিক সেইভাবে কৃষ্ণ যেমন গোপবালকদের শক্তি চেয়েছিলেন, তেমনি ঈশ্বরও চান মানুষ যেন সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করুক, কিন্তু অন্তরে থাকুক সম্পূর্ণ সমর্পণের জ্ঞান—ভার, শেষপর্যন্ত, তিনিই বহন করছেন।
“সর্বকর্মাণ্যপি সদা কুর্বাণো মদ্ ব্যপাশ্রয়ঃ। মৎপ্রসাদাদবাপ্নোতি শাশ্বতং পদমব্যয়ম্।। (গীতা, ১৮.৫৬)
চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সংনস্য মৎপরঃ। বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব।। (গীতা, ১৮.৫৭)
মচ্চিত্তঃ সর্বদুর্গাণি মৎপ্রসাদাত্তরিষ্যসি। অথ চেত্বমহঙ্কারান্ন শ্রোষ্যসি বিনঙ্ক্ষ্যসি।। (গীতা, ১৮.৫৮)
গীতার এই তিনটি শ্লোক, অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে, গীতার চূড়ান্ত আত্মতত্ত্ব প্রকাশ করে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তিকে পৃথক পথ হিসেবে নয়, বরং এক মহা-চেতনার ধারাবাহিক প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন—যেখানে কর্তা ও ঈশ্বর, কর্ম ও জ্ঞান, ভক্ত ও ব্রহ্ম—সব ভেদ মিলেমিশে যায় এক অবিচ্ছিন্ন আত্মস্বরূপে। শঙ্করাচার্য এই অংশকে বলেছেন “জ্ঞানের পরিণতি রূপ কর্ম-অদ্বৈত”—অর্থাৎ, যখন জ্ঞান কর্মে রূপ নেয়, তখন সেই কর্মও অদ্বৈত উপলব্ধিরই প্রকাশ হয়ে ওঠে।
প্রথম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেন, যে-ব্যক্তি সর্বদা কর্মে নিযুক্ত থেকেও ঈশ্বরাশ্রিত, সে আমার কৃপায় চিরন্তন অব্যয় পদ লাভ করে। শঙ্করাচার্য “মদ্ ব্যপাশ্রয়” অংশটির ব্যাখ্যা করে বলেন—“মদ্ভাবমনুস্মৃত্য মদুপাশ্রয়ঃ”, অর্থাৎ ঈশ্বরাশ্রয় মানে নিজের অন্তঃস্থিত আত্মভাবের আশ্রয় গ্রহণ করা। ঈশ্বর ও আত্মা ভিন্ন নয়; সুতরাং ঈশ্বরাশ্রয় মানে আত্মাশ্রয়, নিজের ব্রহ্মচেতনায় স্থিত থাকা।
এই অবস্থায় কর্মফল থেকে মন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কারণ তখন কর্মের কেন্দ্রে ব্যক্তিগত “আমি” থাকে না—বরং সেখানে থাকে ব্রহ্মস্বরূপ চেতনা, যে কর্ম করে না, অথচ সমস্ত কর্মের সাক্ষী। “শাশ্বতং পদমব্যয়ম্” তাই কোনো স্থান নয়, এটি চেতনার সেই অবিকৃত অবস্থা, যেখানে দ্বন্দ্ব, হানি-লাভ, জন্ম-মৃত্যু বা সুখ-দুঃখের কোনো প্রভাব নেই। এই উপলব্ধিতেই কর্ম নিস্পৃহ ভক্তিতে রূপান্তরিত হয়, আর ভক্তি হয়ে যায় জ্ঞানের সেতু।