দশ।
ভয়—গোপনে পোঁতা চারাগাছ
কিন্তু জানো, আমি তোমাকে একটুও বিরক্ত করতে চাই না। একদম না।
এই ভয়টা সারাক্ষণ আমার সঙ্গে হাঁটে—যেমন ছায়া হাঁটে। আলো থাকলেই ছায়া থাকবে, আর এই ভালোলাগাটা আলো—তাই ভয়ের ছায়াও সবসময় আছে। ভালোবাসা আর ভয় মায়ের জমজ সন্তান—একটাকে পেলে আরেকটাকে পাবেই। কারণ যাকে ভালোবাসো, তাকে হারানোর ভয়, তার বিরক্তির ভয়, তার দূরে সরে যাবার ভয়—এগুলো ভালোবাসারই প্রতিচ্ছবি, উলটোদিকের আয়নায়।
তারপরও, ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দেওয়াটা বোধ হয় আমার একটা অভিশাপ।
যতটা কাছে যেতে চাই, ততটাই কোথাও গিয়ে ব্যথা দিয়ে ফেলি—যেমন খুব জোরে জড়িয়ে ধরলে মানুষ শ্বাস নিতে পারে না। ভালোবাসা যদি শক্ত হাতে ধরো, পিষে যায়; যদি হালকা হাতে ধরো, উড়ে যায়। কতটা জোরে ধরবে—সেটা কোনো বই শেখায় না, সেটা শুধু ভুল করতে করতে শেখা যায়, আর প্রতিটা ভুলে কিছু একটা ভেঙে যায়। তোমাকে লিখছি আর ভয় পাচ্ছি—আমার এই জড়িয়ে ধরায় তোমার দম বন্ধ হচ্ছে না তো?
আমি তো সেই কবে তোমাকে প্রথম লিখেছিলাম।
তারপর প্রতিদিন অপেক্ষা করতাম—আজ হয়তো পড়বে, আজ হয়তো একটু চোখ বুলোবে, হয়তো একটা শব্দও লিখবে উত্তরে—একটা শব্দই যথেষ্ট, একটা বিরামচিহ্নই যথেষ্ট, একটা 'হুম'ও যথেষ্ট। দিন যেত, উত্তর আসত না। নীরবতা জমে উঠত—কিন্তু সেই নীরবতা ভারী ছিল না, বরং একটু হালকা ছিল, কারণ তার ভেতরে একটা সম্ভাবনা বেঁচে ছিল: যদি পড়ে বিরক্ত হও—তার চেয়ে না-পড়াই ভালো। নীরবতা অন্তত নিষ্ঠুর নয়।
লেখার পর প্রায় একটা চাঁদ ঘুরে গেল—আমি ভয়ে ভয়ে থাকি—যেমন কেউ গোপনে কারও বাগানে একটা চারাগাছ পুঁতে দিয়ে দূর থেকে দেখে, বুক ধড়ফড় করে—বাগানের মালিক কি দেখবে? দেখলে কি রাগ করবে? উপড়ে ফেলবে? না কি জল দেবে? তারপর একসময় বুঝলাম—সে হয়তো বাগানেই যায় না, চারাগাছটা একা একা বড়ো হবে কিংবা শুকিয়ে যাবে—দুটোই হবে আমার অজান্তে। তাতেও দুঃখ হলো না। শুধু ভয়টা কমে গেল, আর তার জায়গায় একটা নিরিবিলি গ্রহণ এসে বসল—জীবনের অনেক কিছুই তো এভাবে অসমাপ্ত থেকে যায়, আর সেটাও একরকমের সমাপ্তি। সব গল্পের শেষ হয় না—কিছু গল্প শুধু থেমে যায়, আর সেই থেমে যাওয়াটাই তাদের শেষ।
কিন্তু এই ভয় আর অপেক্ষার মধ্যেও একরকমের সুখ আছে, যেটা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
অপেক্ষা যে শুধু কষ্টের—এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মিথ্যে। অপেক্ষায় একটা মিষ্টি যন্ত্রণা থাকে, একটা কম্পন, একটা অপূর্ণতা—যেটা পূর্ণতার চেয়ে অনেক সুন্দর। কারণ পূর্ণতা স্থির—সে নড়ে না, কাঁপে না, অবাক করে না। পূর্ণতা একটা সমাপ্ত বাক্য—পড়া হয়ে গেলে আর কিছু নেই। কিন্তু অপূর্ণতা জীবন্ত—সে নড়ে, কাঁপে, শ্বাস নেয়, প্রশ্ন করে, উত্তর খোঁজে, কখনো পায়, কখনো পায় না—আর সেই না-পাওয়াটাও একটা পাওয়া, কারণ সে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখে, তোমাকে খোঁজার কারণ দেয়।
তোমাকে লেখার পর এই সত্যটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
এগারো।
অভিমান—রাগ যখন ভালোবাসার ছদ্মনাম
শুভ সকাল। কেমন আছ?
জানো, আমার খুব রাগ হচ্ছে।
পুরোনো একটা ভুল আজ সকালে উঠে আবিষ্কার করলাম—যেমন পুরোনো ক্ষতের ওপর থেকে কাপড় সরালে দেখা যায়, ক্ষতটা এখনও শুকোয়নি, রক্ত না জমলেও ব্যথাটা অক্ষত, চামড়ার নিচে লুকিয়ে আছে, ছোঁয়া লাগলেই জেগে ওঠে। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দৈনন্দিন জীবনে চলে যাচ্ছি—কেউ বলেনি অপেক্ষা করতে, নিজের মনেই করেছি, নিজেই হেরে গেছি—আর হারের কাছে কোনো অজুহাত নেই, কারণ খেলাটাই তো আমি একা খেলছিলাম, একা দাবার ছক সাজাচ্ছিলাম, একা চাল দিচ্ছিলাম, একাই হারছিলাম।
আমি কি একটুখানি মন খারাপ করব তোমার ওপর?
আমি আসলে বুঝতে পারছি না—এই অনুভূতিটা রাগ, না অভিমান, না ভালোবাসারই অন্য একটা ছদ্মনাম। যেমন জ্বর আসলে শরীরের লড়াই—রোগ না, প্রতিরোধ। হয়তো এই রাগটাও তেমন—ভালোবাসার শরীরে জ্বর উঠেছে, আর সে লড়ছে, বাঁচার জন্য, টিকে থাকার জন্য। রাগ করতে পারি তোমার ওপর—এটাই তো প্রমাণ যে, তুমি কতটা কাছের। যাকে চিনি না, তার ওপর কি রাগ হয়?
বারো।
শেষ চিঠি—বাতাসকে আটকানো যায় না
তোমাকে খুব, খুব বেশি মনে পড়ছিল।
এই 'খুব'-টা দু-বার বললাম—কারণ একবারে কুলোয় না। কিছু অনুভূতি একটা শব্দে ধরা যায় না—তাই মানুষ একই শব্দ দু-বার বলে, তিন বার বলে, যেন পুনরাবৃত্তি তীব্রতা আনবে। কিন্তু আসলে পুনরাবৃত্তিও যথেষ্ট না—সেই অনুভূতিটা শব্দের চেয়ে বড়ো, বাক্যের চেয়ে বড়ো, ভাষার চেয়ে বড়ো।
জানো, আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, তোমাকে আর কিছু বলব না।
চুপচাপ সরে যাব—যেমন বৃষ্টি থামলে মেঘ সরে যায়, কোনো বিদায় না নিয়ে, কোনো শব্দ না করে; আকাশ আবার নীল হয়ে যায়, আর কেউ জিজ্ঞেস করে না, মেঘটা কোথায় গেলো। মেঘের কোনো ঠিকানা নেই, মেঘের কোনো নাম নেই—সে শুধু আসে আর যায়, আর তার আসা-যাওয়ায় পৃথিবী একটু ভিজে যায়, একটু সবুজ হয়ে যায়, তারপর শুকিয়ে যায়, আবার অপেক্ষা করে। আমিও তেমন চলে যেতে চেয়েছিলাম—নীরবে, নিঃশব্দে।
কিন্তু পারলাম না।
আসলে কিছু চলে-যাওয়া সম্ভব নয়। কিছু মানুষকে ভোলা সম্ভব নয়। কিছু কথা না-বলা সম্ভব নয়। যতই চেষ্টা করো, শব্দগুলো গলায় এসে আটকে যায়, আঙুল চুলকোয় লিখতে, মন ছটফট করে—আর শেষমেশ হেরে গিয়ে আবার লেখো, আবার বলো, আবার ফিরে আসো—কারণ এটা সচেতন ইচ্ছেয় হয় না, এটা ঘটে।
খুব কাছের মানুষের ওপর যেমন অভিমান হয়—অধিকার না থাকলেও হয়, কারণ হৃদয় অধিকারের হিসেব বোঝে না, সে বোঝে শুধু টান—তোমার ওপরও তেমন অভিমান হচ্ছে।
কী আশ্চর্য! তুমি মানুষটাই কি এত আশ্চর্য? না কি আমিই পাগল? সবাই কি এভাবে তোমার আপন হয়ে যায়—না কি শুধু আমি একাই এই রোগে আক্রান্ত? এটা কি মহামারী—যেটায় সবাই আক্রান্ত, না কি বিরল রোগ—যেটা শুধু আমারই হয়েছে? কোনটা বেশি ভালো হতো—জানি না।
জানো, আমি অনেক মানুষের অনেক লেখা পড়ি। কিন্তু তাদের কাউকেই কিছু বলতে ইচ্ছে করে না—পড়ি, রেখে দিই, এগিয়ে যাই, যেমন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক দোকান পার হই, কিন্তু কোনোটায় ঢুকি না।
শুধু তোমার দোকানে ঢুকতে ইচ্ছে করে। শুধু তোমার দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে—ঢোকার জন্য না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। যেমন ভক্ত মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে—ভেতরে যাবার দরকার নেই, দেবতাকে চোখে দেখার দরকার নেই, শুধু কাছে থাকাটাই পুজো, শুধু সেখানে থাকাটাই প্রার্থনা।
তুমি এতটা দূরের—তারপরও আমার কল্পনায় যখন-তখন এসে পড়ো, আমন্ত্রণ ছাড়াই, নির্দ্বিধায়—যেমন বাতাস আসে। দরজা-জানালা বন্ধ করলেও কোনো-না-কোনো ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে, আর ঘরের সব কিছু একটু একটু নড়ে ওঠে—পর্দা নড়ে, কাগজ ওড়ে, মোমবাতির শিখা কাঁপে। তুমি সেই বাতাস—আমার ঘরে ঢুকে পড়ো, আর সব নড়ে ওঠে।
আর আমি সেই বাতাসকে আটকাই না। আসতে দিই। কারণ এই আসাটুকুই আমার। এটুকুই। এটুকুই যথেষ্ট।
এই পাণ্ডুলিপি কোনোদিন প্রকাশিত হয়নি। কিছু পাণ্ডুলিপি প্রকাশের জন্য লেখা হয় না—লেখা হয় জ্বলে থাকার জন্য।
আর যাকে লেখা হয়েছিল—সে কোনো নাম নয়, কোনো মুখ নয়, কোনো ঠিকানা নয়। সে শুধু সেই অন্ধকার—যা ছাড়া জোনাকির জ্বলে ওঠার কোনো অর্থ থাকে না।
আমি বরং আঁধার হয়েই বাঁচব। কিছু আঁধার সুন্দর।
জোনাকির পাণ্ডুলিপি: ৩
লেখাটি শেয়ার করুন