শৈব কালী: তেত্রিশ



কালীর ডানহাতে বরাভয় ও বামহাতে খড়গ-ছিন্নমুণ্ডু—এই বিন্যাসটি আসলে সমগ্র তান্ত্রিক দার্শনিক রচনার হৃদয়বিন্দু। এটি কেবল প্রতীকচিত্র নয়; এটি চেতনার গতিবিধির এক মরমী ভাষা। তন্ত্র, কাশ্মীর শৈব এবং অদ্বৈত বেদান্ত—তিন ক্ষেত্রেই এই রূপকে পড়লে বোঝা যায়, কীভাবে কালী নিজে চেতনার অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ, যিনি একই সঙ্গে করুণা, জ্ঞান ও প্রলয়ের একক প্রকাশ।

তন্ত্রে ডানদিককে ‘দক্ষিণা-পক্ষ’ বলা হয়, যা এক গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে। এটি কেবল একটি দিক নির্দেশ করে না, বরং সূর্য, আলো, পুরুষ, স্থিতি এবং অনুগ্রহের মতো মৌলিক মহাজাগতিক ধারণাগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এই ডানদিক শিবতত্ত্বের প্রকাশ, যেখানে চেতনা স্থির, অচঞ্চল এবং আশ্রয়দায়ক রূপে বিদ্যমান। শিবতত্ত্ব হলো পরম চেতনার সেই দিক, যা সমস্ত সৃষ্টির মূল ভিত্তি এবং যা অবিচল শান্তি ও ভারসাম্যের প্রতীক।

কালীর ডানহাতে যে-বরাভয়মুদ্রা দেখা যায়, তা এই শিবতত্ত্বের করুণা ও স্থায়িত্বের এক মূর্ত প্রতীক। এই মুদ্রায় দুটি অংশ রয়েছে: এক হাতে ‘বর’ এবং অন্য হাতে ‘অভয়’। ‘বর’ হলো দানশীলতার প্রতীক, যা জীবনের পরিপূর্ণতা এবং আকাঙ্ক্ষা পূরণের নির্দেশক। এটি বোঝায় যে, সৃষ্টির মধ্যে যা-কিছু কাম্য, তা আমাদের নিজেদের মধ্যেই নিহিত। অন্যদিকে, ‘অভয়’ হলো ভয়হীনতার প্রতীক, যা ব্রহ্মরূপ ধারণ করে সকল ভয় থেকে মুক্তি দেয়। ‘অভয়’ মুদ্রা ঘোষণা করে যে, তুমিই ব্রহ্মস্বরূপ, তাই কোনো কিছুই তোমার বিপক্ষে নয়। এই দুটি মুদ্রা সম্মিলিতভাবে জীবনের দুটি মৌলিক আকাঙ্ক্ষার উত্তর দেয়: নিরাপত্তা এবং পরিপূর্ণতা।

এই বরাভয়মুদ্রা কেবল একটি শারীরিক ভঙ্গি নয়, এটি মুক্তির প্রতীক। এটি বোঝায় যে, পরম চেতনা তার নিজের মধ্যে শান্ত, অনাহত এবং অনবচ্ছিন্ন (বিরামহীন বা অবিরাম)। শিবতত্ত্বের করুণা এই মুদ্রার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যেখানে ব্যক্তি তার আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করে এবং সকল পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করে। এই মুক্তি কোনো বাহ্যিক উপায়ে আসে না, বরং আত্ম-অনুসন্ধান এবং আত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়। তন্ত্রের এই দর্শন আত্মিক উন্নতির পথে এক গভীর নির্দেশনা প্রদান করে, যেখানে ভয়কে জয় করে এবং আত্মিক পূর্ণতাকে উপলব্ধি করে একজন সাধক পরম শান্তি লাভ করতে পারে।

এখন বামদিক—তন্ত্রে এটি বামা-পক্ষ, অর্থাৎ চন্দ্র, রাত্রি, রূপান্তর, গতি ও শক্তির দিক। এটি কালী-শক্তির প্রকৃত প্রকাশ, যিনি করুণাময়ী, কিন্তু একাধারে কঠোর শিক্ষকও। তন্ত্রের এই বাম-মার্গ কেবল একটি দিকনির্দেশনা নয়, এটি আত্ম-অনুসন্ধানের এক গভীর পথ, যেখানে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জগতের দ্বৈততা বিলীন হয়। এই পথেই সাধক অন্ধকার এবং আলোর, জন্ম এবং মৃত্যুর, সৃষ্টি এবং বিনাশের অভিন্নতা উপলব্ধি করেন।

এখানে তাঁর হাতে খড়গ, যা জ্ঞানের প্রতীক। এই জ্ঞান কোনো তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নয়; এটি “বিবেক-খড়গ”—যা সত্য-অসত্য, স্থায়ী-অস্থায়ীর পার্থক্য ঘটায়। এই খড়গ প্রতীকী অর্থে সেই ধারালো বিচারবুদ্ধি, যা জাগতিক মায়াজাল ছিন্ন করে এবং আত্মাকে ভ্রম থেকে মুক্ত করে। যেমন একজন দক্ষ শল্যচিকিৎসক নির্ভুলভাবে রোগাক্রান্ত অংশ অপসারণ করেন, তেমনই বিবেক-খড়গ অবিদ্যার আবর্জনা দূর করে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। এটি কেবল পুথিগত বিদ্যা নয়, বরং অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞার এক দিব্যপ্রকাশ।

ব্রহ্মসূত্র-এর ভাষায়, “তদনন্যত্বমারম্ভণশাব্দাদিভ্যঃ”—কার্য ও কারণ অভিন্ন; খড়গ সেই অভিন্নতার অনুভব ঘটায়, মায়ার দ্বৈত বিভ্রম কেটে ফেলে। এই শাশ্বত সত্যের উপলব্ধির মাধ্যমে সাধক বুঝতে পারেন যে, দৃশ্যমান জগৎ এবং এর সৃষ্টিকর্তা আসলে এক এবং অভিন্ন। যেমন একটি স্বর্ণালঙ্কার স্বর্ণ থেকে ভিন্ন নয়, বা একটি মৃৎপাত্র মাটি থেকে পৃথক নয়, তেমনই জগৎ ব্রহ্ম থেকে ভিন্ন নয়। এই দ্বৈতহীনতার জ্ঞানই চূড়ান্ত মুক্তি এনে দেয়, যেখানে ব্যক্তি অহংকারের সীমা অতিক্রম করে মহাবিশ্বের সাথে একাত্ম হয়। কালী সেই পরম শক্তি, যিনি এই গভীরতম সত্যের দ্বার উন্মোচন করেন, এবং তাঁর খড়গ সেই পথকে আলোকিত করে।

অন্য হাতে ছিন্নমুণ্ডু। এটি মৃত নয়; এটি মৃত অহংকার। মুণ্ডু মানে মস্তিষ্ক, যা চিন্তার কেন্দ্র; তার ছেদন মানে মিথ্যা “আমি ভাব”-এর অবসান। কাশ্মীর শৈবদর্শনে এটিকে বলা হয় অহংকার-ক্ষয়—যখন ব্যক্তি “আমি কর্তা, আমি ভোক্তা” এই ভ্রম থেকে মুক্ত হয়। অভিনবগুপ্ত তন্ত্রালোক-এ বলেন, “অদ্বয়ং তু দ্বয়াভাসং স্বক্রীড়ারূপতাং গতম্‌”—অদ্বৈত চেতনা নিজের লীলায় দ্বৈততার ভান সৃষ্টি করে; কালী সেই লীলার মধ্যেই আবার দ্বৈততার অবসান ঘটান। ছিন্নমুণ্ডু তাই চেতনার সেই মুহূর্তকে প্রকাশ করে, যখন “আমি” ভ্রমটি কেটে যায়—আর বাকি থাকে কেবল শুদ্ধ উপস্থিতি।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই দুটি দিক এক চেতনার দুই কর্মরূপ। ডানদিকের বরাভয় হল সত্তা-চৈতন্য-আনন্দের আশ্রয়; এটি আত্মার স্থায়ী প্রকৃতি। বামদিকের খড়গ-মুণ্ডু হল বিবর্তমান মায়ার অপসারণ-প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অদ্বৈত সত্য উপলব্ধি হয়। গীতার এই শ্লোকটি দিয়ে কালীর খড়গের মহিমার ব্যাখ্যাযোগ্য—যথৈধাংসি সমিদ্ধোহগ্নির্ভস্মসাৎ কুরুতেহর্জুন। জ্ঞানাগ্নি সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা।। (৪.৩৭) অর্থাৎ, যেমন প্রবলভাবে জ্বলন্ত অগ্নি কাঠকে ভস্ম করে ফেলে, তেমনি জ্ঞানরূপ অগ্নি সমস্ত কর্মকে দগ্ধ করে ফেলে।

অদ্বৈত বেদান্ত ও কাশ্মীর শৈব দর্শনের দৃষ্টিতে, এই শ্লোক কেবল কর্মনাশ বা নিষ্ক্রিয়তার কথা বলে না, বরং চেতনার নিজস্ব অগ্নিশক্তি, অর্থাৎ আত্মসচেতনতার দহন ও শুদ্ধি-ক্রিয়ার কথা বলে—যা মহাকালীর খড়্গর প্রতীকী অর্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

অদ্বৈত বেদান্তে “জ্ঞানাগ্নি” মানে আত্মজ্ঞানের অগ্নি—যে-অগ্নি মায়ার সমস্ত আচ্ছাদন, অহংকার ও কর্মফলকে পুড়িয়ে দেয়। শঙ্করাচার্য তাঁর ভাষ্যে বলেন, “জ্ঞানপ্রকাশেন হি অজ্ঞাননাশঃ”—জ্ঞানই অজ্ঞানকে দগ্ধ করে, যেমন সূর্যোদয়ে অন্ধকার বিলীন হয়। এই অগ্নি কোনো বাহ্যিক আগুন নয়, এটি সেই বোধ—যেখানে জানা যায় যে, “আমি কর্তা নই, আমি সাক্ষীচেতনা”—এই উপলব্ধিতেই সমস্ত কর্মের বন্ধন ভস্ম হয়ে যায়।

কাশ্মীর শৈব দর্শনে একই তত্ত্ব স্পন্দ বা উন্মেষ-নিমেষ প্রক্রিয়ায় প্রকাশ পায়। চেতনা যখন নিজের গভীরে প্রবলভাবে প্রজ্জ্বলিত হয়—যেখানে সমস্ত ভেদ, কর্ম ও সংকল্প চেতনার দীপ্তিতে দগ্ধ হয়ে যায়—তখন সেই চেতনা-অগ্নিই “জ্ঞানাগ্নি।” অভিনবগুপ্ত এই অবস্থাকে বলেন—“স্ববিমর্শাত্মনা দহতি পুরুষমলম্‌”—চেতনা নিজের আত্মবিমর্শনের দ্বারা সমস্ত সীমাকে দগ্ধ করে (তন্ত্রালোক, ৬.২৭)।

মহাকালীর খড়্গ এই জ্ঞানাগ্নিরই দৃশ্য প্রতীক। খড়্গ কোনো সহিংস অস্ত্র নয়; এটি চেতনার বোধখড়্গ—যা অজ্ঞতার গ্রন্থি ছিন্ন করে। কালী যেমন দেহধারী চেতনার মস্তকচ্ছেদ করেন, তেমনি জ্ঞানাগ্নি কর্মবদ্ধ অহংকারকে দগ্ধ করে দেয়। উভয়ই একই ক্রিয়া—একদিকে দহন, অন্যদিকে মুক্তি।

খড়্গের ধার হলো “বিবেক”—যা সত্য ও মায়ার পার্থক্য নির্ণয় করে; তার ঝলক হলো “জ্ঞানপ্রকাশ”—যা অন্ধকার দগ্ধ করে। তাই কালী যখন খড়্গ ধারণ করেন, তখন তিনি জ্ঞানাগ্নির রূপ নেন। তাঁর হাতে খড়্গ আর তাঁর জ্বলন্ত নীলবর্ণ রূপ গীতার “জ্ঞানাগ্নি”-র জীবন্ত প্রতিমূর্তি—যেখানে চেতনা অজ্ঞানকে ভস্ম করে, কিন্তু কোনো কিছু ধ্বংস করে না; বরং সব কিছুকে তার মূল স্বরূপে—শিবে—রূপান্তরিত করে।

অদ্বৈত বেদান্তে যেমন বলা হয়, কর্ম দগ্ধ হলেও কর্তা অক্ষত থাকে—তেমনি কাশ্মীর শৈব মতে খড়্গধারিণী কালী সব কিছু ছেদন করেও নিজে অক্ষয়, কারণ তিনিই সেই চেতনা, যিনি দগ্ধও করেন, দগ্ধও হন না। তাঁর জ্ঞানাগ্নি “মালাবদ্ধ চেতনা”-র সমস্ত অন্ধকার পুড়িয়ে দেয়, কিন্তু চেতনা নিজে থাকে নির্ভয়, অমল, পরমপ্রকাশ।

গীতার “জ্ঞানাগ্নি” এবং কালীর “খড়্গ”-এর মধ্যে কোনো ভেদ নেই—দুটিই সেই চেতনার দাহশক্তির প্রতীক, যা অজ্ঞতা, অহংকার ও কর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মুক্তির দীপ্তি জ্বালায়। গীতার অগ্নি ও কালীর খড়্গ—উভয়ই একই সত্যের দুই রূপ: একটিতে জ্ঞান অগ্নিরূপে প্রকাশিত, অন্যটিতে শক্তি অস্ত্ররূপে। কিন্তু উভয়েরই উদ্দেশ্য এক—অজ্ঞানরূপ কাষ্ঠকে ভস্মসাৎ করা, যাতে আত্মা প্রকাশিত হয় নিজের স্বরূপে—শিবস্বরূপে, অদ্বৈত চেতনার দীপ্তিতে।

কাশ্মীর শৈবদর্শনে কালী কেবল এক দেবী নন, তিনি পরম সত্তার এক গভীর দার্শনিক প্রকাশ। তাঁকে 'চিত্‌-বিমর্শ-মিশ্র রূপা সংবিত্‌' হিসেবে দেখা হয়, যা চেতনা এবং আত্ম-প্রতিফলনের এক অখণ্ড মিশ্রণ। এই ধারণায়, কালী বিশ্বজগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মূল শক্তি এবং পরম জ্ঞান ও পরম আনন্দের প্রতীক।

তাঁর দক্ষিণ হস্তের 'বরাভয়' মুদ্রা 'চিত্‌' বা বিশুদ্ধ নিষ্ক্রিয় সচেতনতার প্রতীক। এটি সেই অবস্থা, যেখানে কোনো ক্রিয়া নেই, কেবল স্বতঃস্ফূর্ত অস্তিত্বের প্রকাশ। এটি পরম সত্য, যা নিজে থেকেই প্রকাশিত এবং যা সমস্ত কিছুর উৎস। এই চিত্‌ অসীম এবং শান্ত, মহাবিশ্বের মৌলিক ভিত্তি।

অন্যদিকে, তাঁর বাম হস্তের 'খড়গ-মুণ্ডু' 'বিমর্শ' বা চেতনার স্বাতন্ত্র্য এবং সক্রিয়তার প্রতীক। বিমর্শ হলো সেই শক্তি, যা নিজেকে চিনতে এবং প্রকাশ করতে ক্রিয়াশীল হয়। এটি আত্ম-সচেতনতার দিক, যা ব্রহ্মাণ্ডের গতিশীলতা, সৃষ্টি এবং লয়ের কারণ। খড়গ অবিদ্যা বা অজ্ঞানতাকে ছিন্ন করার প্রতীক, আর মুণ্ডু অহংকার ও দ্বৈতবাদের বিনাশকে বোঝায়। এই বিমর্শের মাধ্যমেই চেতনা নিজের অসীম সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করে এবং বিশ্বকে প্রকাশ করে।

এই 'চিত্‌' ও 'বিমর্শ'-এর মিলনেই পরম 'পূর্ণতা' প্রকাশ পায়। এই পূর্ণতা এমন এক অবস্থা, যেখানে কোনো দ্বৈততা নেই, সব কিছুর মধ্যে একাত্মতা বিরাজ করে। এখানে বিপরীত ধারণাগুলো যেমন—করুণা ও ক্রোধ, সৃষ্টি ও লয়, প্রেম ও বিনাশ—সব একাকার হয়ে যায়। এটি পরম সত্তার অদ্বৈত রূপ, যেখানে সব শক্তি মিলিত হয়ে এক সর্বজনীন সচেতনতা তৈরি করে।

কাশ্মীর শৈবদর্শনে কালী এই চূড়ান্ত উপলব্ধিরই মূর্ত প্রতীক, যেখানে পরম শিব (চেতনা) এবং পরম শক্তি (শক্তি) অবিচ্ছেদ্য। এই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং এটি জীবন ও অস্তিত্বের গভীর অর্থ বোঝার একটি পথ, যা আত্ম-উপলব্ধি এবং পরম মুক্তির দিকে পরিচালিত করে।

তাই কালী-রূপের ডানহাত শান্তির দিক—যেখানে তিনি বলেন, “মা ভৈঃ” (“ভয় পেও না”), আর বামহাত হলো জাগরণের দিক—যেখানে তিনি অহংকার ছিন্ন করে বলে ওঠেন, “জাগো, তুমি শুদ্ধ চেতনা।” এই দুই বিপরীত ধারা—করুণা ও কঠোরতা, প্রেম ও প্রলয়—একত্রে মিশে যায় এক অদ্বৈত স্রোতে। শিব ও কালী তখন এক; শিব হলেন চেতনার স্থিত নীরবতা, কালী সেই নীরবতার জাগ্রত রূপ। একহাতে তিনি আশ্রয়, অন্যহাতে মুক্তি—একদিকে মায়ার অন্ত, অন্যদিকে চেতনার উন্মোচন।

এইভাবেই কালী-রূপ মানুষের অন্তরে ঘটে চলা চেতনার পরিশুদ্ধির প্রতীক: ডান হাতে তিনি আত্মাকে আশ্বস্ত করেন—“ভয় নেই, তুমি চিরন্তন,” বাম হাতে তিনি অহংকে কেটে দেন—“তুমি সেই চিরন্তন ছাড়া আর কিছু নও।”

“মা ভৈঃ (mā bhaiḥ)”—এই দুটি অক্ষরের মন্ত্রই সমগ্র তন্ত্র, অদ্বৈত, কাশ্মীর শৈব এবং শাক্তদর্শনের হৃদয়তত্ত্ব। এর সাধারণ অর্থ “ভয় কোরো না”, কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি কোনো সান্ত্বনাবাক্য নয়, বরং এক দার্শনিক আত্ম-জাগরণের আহ্বান। এটি এমন এক অন্তর্গত মন্ত্র, যা মানুষকে শেখায়—ভয়, দ্বৈততা, ও অজ্ঞান কেবল মনের ছায়া; আত্মচেতনা সেই সব সীমা অতিক্রম করে।

অদ্বৈত বেদান্তে “ভয়” জন্ম নেয় ব্রহ্মের অদ্বিতীয় সত্য থেকে বিচ্যুতির কারণে। বৃহদারণ্যক উপনিষদ (১.৪.২)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“দ্বিতীয়াদ্বৈ ভয়ং ভবতি”—অর্থাৎ, দ্বিত্ব থেকেই ভয়ের উদ্‌ভব। যতক্ষণ “আমি” ও “অন্য” এই বিভেদবোধ থাকে, ততক্ষণ ভয় অবশ্যম্ভাবী। শঙ্করাচার্য এই ভয়কে ব্যাখ্যা করেছেন অবিদ্যা-জনিত অস্থিরতা হিসেবে—যে-অজ্ঞান আমাদের মিথ্যা সত্তার সঙ্গে আঁকড়ে রাখে।