মানুষ যখন পরিবর্তনশীল জগৎকে স্থায়ী বলে ধরে, তখনই সে ভীত হয়, কারণ অনিত্যর মধ্যে স্থায়িত্বের প্রত্যাশা সর্বদাই ভঙ্গুর। “মা ভৈঃ” এই স্থিতি থেকে জাগরণের আহ্বান—“ভয় কোরো না, কারণ তুমি যা ভাবছ, তা তুমি নও; তুমি সেই চিরন্তন ব্রহ্ম, যা কখনও জন্মায় না, কখনও মরে না।” কঠ উপনিষদ (২.১৮)-এ বলা হয়েছে, “ন যঃ চন্যমানো ন হন্যতে”—আত্মা কখনও জন্মায় না, কখনও নাশ পায় না। তাই আত্মজ্ঞান লাভই প্রকৃত অভয়প্রাপ্তি। অদ্বৈতে এই অভয়মুদ্রা হলো জ্ঞানের প্রতীক—যে জানে, “আমি কর্তা নই, আমি সাক্ষী,” তার জীবনে আর কোনো ভয় থাকে না। এই অবস্থাকেই বলা হয় অভয়পদ—যেখানে দ্বৈততার অন্ধকার লুপ্ত হয়ে এক অনন্ত ঐক্যবোধ জেগে ওঠে।
অদ্বৈত বেদান্তে “মুদ্রা” (mudrā) কোনো বাহ্যিক হাতের ভঙ্গির সীমাবদ্ধ প্রতীক নয়; এটি চেতনার অভ্যন্তরীণ অবস্থার এক প্রতিফলন—একধরনের “চিহ্নিত দেহী ভাষা” (embodied symbol of realization)। মুদ্রা মানে বন্ধন বা স্থিতি—অর্থাৎ, চেতনা যখন নিজের স্বরূপে স্থিত হয়, তখন সেই অভ্যন্তরীণ ঐক্যের অভিব্যক্তি দেহের মাধ্যমে মুদ্রা রূপে প্রকাশিত হয়। অদ্বৈতের মূল লক্ষ্য যেহেতু জীব ও ব্রহ্মের ঐক্য উপলব্ধি, তাই প্রতিটি মুদ্রাই এই একত্ববোধের এক রূপান্তরিত প্রতীক।
অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনে চিন্মুদ্রা একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক, যা জীবাত্মা ও পরমাত্মার অভেদত্বকে দৃশ্যমান করে তোলে। এটি কেবল একটি শারীরিক অঙ্গভঙ্গি নয়, বরং গভীর দার্শনিক উপলব্ধির একটি প্রতিচ্ছবি।
চিন্মুদ্রায় তর্জনী (আঙুলের মধ্যমা) এবং অঙ্গুষ্ঠ (বৃদ্ধাঙ্গুলি) একত্রিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বৃত্ত তৈরি করে। এই বৃত্তটি "জীব ও ব্রহ্মের অভেদ" বা একত্বকে নির্দেশ করে।
তর্জনী: এই আঙুলটি 'আমি' বা সীমিত আত্মার প্রতীক। এটি আমাদের ব্যক্তিগত সত্তা, অহংকার এবং জাগতিক অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে, যা মায়ার প্রভাবে পরমাত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে প্রতীয়মান হয়।
অঙ্গুষ্ঠ: এটি পরম আত্মা বা ব্রহ্মের প্রতীক। এটি অসীম, সর্বব্যাপী এবং অপরিবর্তনীয় সত্তাকে বোঝায়, যা সকল সৃষ্টির উৎস এবং ধারক।
যখন তর্জনী এবং অঙ্গুষ্ঠ একত্রিত হয়, তখন এটি জীবাত্মার পরমাত্মার সাথে মিলন, অর্থাৎ 'অহং ব্রহ্মাস্মি' (আমিই ব্রহ্ম) এই মহাবাক্যের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার প্রতীকী প্রকাশ। এই মিলন নির্দেশ করে যে, ব্যক্তিগত সত্তা যখন তার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে, তখন তা পরম সত্তার সাথে একীভূত হয়।
চিন্মুদ্রায় বাকি তিনটি আঙুল (মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠা) আলাদা অবস্থায় থাকে, যা আরও গভীর অর্থ বহন করে—
ত্রিগুণ: এই তিন আঙুল সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এই ত্রিগুণের প্রতীক। এই গুণগুলি আমাদের জাগতিক অভিজ্ঞতা, কর্ম এবং মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে।
জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি: এই আঙুলগুলি জাগ্রত (সচেতন অবস্থা), স্বপ্ন (অচেতন অবস্থা) এবং সুষুপ্তি (গভীর নিদ্রা বা অজ্ঞান অবস্থা) এই তিনটি অবস্থারও প্রতীক। জ্ঞানী ব্যক্তি এই তিন অবস্থার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেন এবং এগুলিকে অতিক্রম করে যান।
তুরীয় অবস্থা: যখন জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন ঘটে এবং ত্রিগুণের প্রভাব শিথিল হয়ে যায়, তখন ব্যক্তি চতুর্থ অবস্থা, অর্থাৎ 'তুরীয়' অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়। তুরীয় অবস্থা হলো চেতনার এক উচ্চতর স্তর, যা জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তির ঊর্ধ্বে। এই অবস্থায় ব্যক্তি পরম শান্তি, আনন্দ এবং আত্মোপলব্ধির অভিজ্ঞতা লাভ করে। চিন্মুদ্রা এই তুরীয় অবস্থায় স্থিতির একটি দৃশ্যরূপ, যা 'অহং ব্রহ্মাস্মি'—এই উপলব্ধিকে মূর্ত করে তোলে।
জ্ঞানমুদ্রা হলো চিন্মুদ্রারই একটি প্রায়োগিক এবং আরও সহজবোধ্য রূপ। এক্ষেত্রেও তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠের মিলন ঘটে, কিন্তু তাদের সংযোগটি তুলনামূলকভাবে ঢিলে বা শিথিল থাকে। এর প্রতীকী অর্থ হলো:
দেহে ও জগতে অবস্থান: এই ঢিলে সংযোগ নির্দেশ করে যে, একজন জ্ঞানী ব্যক্তি জাগতিক জীবনে, দেহে ও সমাজে অবস্থান করেও তার মন সর্বদা ব্রহ্মবোধে স্থিত থাকে। তিনি জাগতিক কর্ম সম্পাদন করেন, কিন্তু তার চেতনা পরমাত্মার সাথে অবিচ্ছিন্ন থাকে।
জ্ঞানের স্থায়িত্ব ও স্বাভাবিক অবস্থা: জ্ঞানমুদ্রা জ্ঞানে স্থায়িত্ব এবং স্বাভাবিক অবস্থাকে নির্দেশ করে। এর অর্থ হলো, আত্মজ্ঞান একবার অর্জিত হলে তা ব্যক্তির সহজাত প্রকৃতিতে পরিণত হয়, যা কোনো বিশেষ প্রচেষ্টা ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি কর্মের মধ্যেও নিষ্ক্রিয়তা এবং জাগতিকতার মধ্যেও আধ্যাত্মিক সংযোগ বজায় রাখেন।
চিন্মুদ্রা ও জ্ঞানমুদ্রা উভয়ই অদ্বৈত বেদান্তের মূল শিক্ষা—জীব ও ব্রহ্মের অভেদত্বকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে। এই মুদ্রাগুলি কেবল হাতের অঙ্গভঙ্গি নয়, বরং আত্মোপলব্ধি ও পরম সত্যের প্রতি ধ্যানের এক নীরব আহ্বান।
অদ্বৈত বেদান্তের গভীর দর্শনে অভয়মুদ্রা ও বরমুদ্রা কেবল হাতের ভঙ্গি নয়, বরং পরম চেতনার দুটি অবিচ্ছেদ্য দিক। এই দুই মুদ্রা আত্মিক উপলব্ধির উচ্চতম স্তর এবং তার বাহ্যিক প্রকাশের প্রতীক।
অভয়মুদ্রা সেই আত্মজ্ঞানের স্থির অবস্থা, যেখানে কোনো ভয় নেই, কোনো উদ্বেগ নেই। অদ্বৈত বেদান্তের মূল শিক্ষা হলো—ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা, জীব ব্রহ্মই। অর্থাৎ, যখন ব্যক্তি নিজের আত্মাকে ব্রহ্ম থেকে অভিন্ন বলে উপলব্ধি করে, তখন তার কাছে কোনো দ্বিতীয় সত্তা থাকে না, যার থেকে ভয় উৎপন্ন হতে পারে। এই অবস্থায় দ্বৈতত্বের বিলোপ ঘটে এবং "অন্য কেউ নেই" এই গভীর উপলব্ধির জন্ম হয়। ভয় মূলত দ্বৈততা থেকে উদ্ভূত হয়—একটি "আমি" এবং একটি "অন্য", যা থেকে বিপদ বা আঘাত আসার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু অভয়মুদ্রা সেই অদ্বৈত অবস্থা নির্দেশ করে, যেখানে এই বিভেদরেখা মুছে যায়।
এটি অভ্যন্তরীণ শক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং ব্রহ্মের সঙ্গে একত্বের বোধকে প্রতীকায়িত করে। ঋষিরা যখন গভীরভাবে ধ্যানে মগ্ন থাকেন, তখন অভয়মুদ্রার মাধ্যমে এই আত্ম-প্রত্যয় এবং আত্মজ্ঞানের স্থিতি প্রকাশ পায়। অভয়মুদ্রা জ্ঞান এবং চৈতন্যের প্রতীক, যা ব্যক্তির অন্তরে পরম সত্যের উপলব্ধি ঘটায়। এটি সেই নীরব ঘোষণা যে, যিনি নিজেকে জানেন, তিনি সব ভয় থেকে মুক্ত।
বরমুদ্রা সেই আত্মজ্ঞানের করুণাময় প্রকাশ। যখন একজন মুক্ত আত্মা অদ্বৈতের আনন্দ এবং শান্তি লাভ করেন, তখন তিনি কেবল নিজের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রাখেন না। বরমুদ্রা সেই উদারতার প্রতীক, যেখানে মুক্ত আত্মা নিজের অর্জিত জ্ঞান, আনন্দ এবং আশীর্বাদ অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেন। এটি নিঃস্বার্থ সেবা, সহানুভূতি এবং বিশ্বজনীন প্রেমের প্রকাশ। এই মুদ্রা দেখায় যে, আত্মজ্ঞান কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং তা অপরের মঙ্গলের জন্যও ব্যবহৃত হয়। আত্ম-প্রসারণের এই প্রক্রিয়ায় মুক্ত আত্মা কেবল নিজেকে নয়, সমগ্র সৃষ্টিকে নিজেরই অংশ হিসেবে দেখেন এবং তাদের দুঃখমোচন ও আনন্দবৃদ্ধিতে সচেষ্ট হন।
দেব-দেবীর মূর্তিতে বরাভয়মুদ্রা একসাথে দেখা যায়, যা এই দুটি দিকের সমন্বয়কে নির্দেশ করে। অভয়মুদ্রা যেখানে আত্ম-প্রত্যয়, অর্থাৎ নিজের মধ্যে স্থিতিশীলতা ও নির্ভীকতা, সেখানে বরমুদ্রা হলো আত্ম-প্রসারণ, অর্থাৎ সেই স্থির জ্ঞানকে অপরের কল্যাণে প্রসারিত করা।
দেবমূর্তিতে বরাভয়মুদ্রার যুগলবন্দী অদ্বৈত বেদান্তের এক গভীর সত্যকে উদ্ভাসিত করে। দেবতারা শুধু সর্বশক্তিমান নন, তাঁরা করুণাময়ও। তাঁরা একদিকে যেমন ভক্তদের ভয় দূর করেন এবং আত্মিক সুরক্ষা প্রদান করেন (অভয়), তেমনি অন্যদিকে তাঁদের প্রতি আশীর্বাদ ও বরদানও বর্ষণ করেন (বর)। এই দুটি মুদ্রার সমন্বয় সেই আদর্শ অবস্থাকে প্রতিফলিত করে, যেখানে আত্মজ্ঞান এবং তার করুণাময় প্রকাশ অবিচ্ছেদ্য। একজন প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি কেবল নিজে শান্ত ও নির্ভয় হন না, তিনি তাঁর চারপাশের জগৎকেও শান্তি ও নির্ভীকতার পথে পরিচালিত করেন।
চিন্মুদ্রা যেমন আত্ম-প্রত্যয় বা অভ্যন্তরীণ স্থিতির প্রতীক, তেমনি বরাভয়মুদ্রা সেই প্রত্যয়কে বহির্মুখী করে সকলের কল্যাণে নিয়োজিত করার প্রতীক। এটি বোঝায় যে, মুক্তি কেবল নিভৃতে নিজের জন্য নয়, বরং তার আনন্দ ও জ্ঞান সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই তার সার্থকতা। এই মুদ্রাদ্বয় মানব চেতনার দুটি অপরিহার্য দিককে তুলে ধরে—একদিকে আত্মিক মুক্তি ও অভ্যন্তরীণ শান্তি, অন্যদিকে সেই মুক্তির দ্বারা সৃষ্ট পরোপকারী মনোভাব ও বিশ্বজনীন প্রেম।
অদ্বৈত দর্শনে ধ্যানমুদ্রা বা যোগমুদ্রা এক গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে। বিশেষ করে, যে-মুদ্রায় দুই হাত কোলে রাখা হয়, ডান হাতের উপর বাম হাত এবং অঙ্গুষ্ঠদ্বয় পরস্পরকে স্পর্শ করে থাকে, তা চেতনার নিজের মধ্যে বিশ্রাম এবং পরমাত্মার সঙ্গে একীভূত হওয়ার অবস্থাকে নির্দেশ করে। এই স্থিতিটি পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন বা শিব ও শক্তির একীভূত স্থিতি রূপে ব্যাখ্যা করা হয়।
এই ধ্যানাসনের ভঙ্গিটি কেবল একটি শারীরিক অবস্থান নয়, বরং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির একটি বাহ্যিক প্রকাশ। যখন একজন সাধক এই মুদ্রায় বসেন, তখন তার মন বাহ্যিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অভ্যন্তরীণ শান্তিতে বিলীন হয়।
ডান হাতকে প্রায়শই পুরুষ বা শিবের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, যা সক্রিয়তা, চেতনা এবং নির্গুণ ব্রহ্মের নির্দেশক। অন্যদিকে, বাম হাত প্রকৃতি বা শক্তির প্রতীক, যা সৃষ্টির শক্তি, মায়া এবং সগুণ ব্রহ্মের প্রকাশ। যখন এই দুটি হাত নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে মিলিত হয়, তখন তা দ্বৈততার বিলুপ্তি এবং অদ্বৈত অবস্থার প্রাপ্তিকে বোঝায়।
অঙ্গুষ্ঠদ্বয়ের স্পর্শ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অঙ্গুষ্ঠকে প্রায়শই আত্মা বা ব্রহ্মের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুটি অঙ্গুষ্ঠের মিলন ইঙ্গিত করে যে পৃথক আত্মা (জীবাত্মা) পরমাত্মার (ব্রহ্ম) সাথে একীভূত হয়েছে। এটি আত্ম-উপলব্ধি এবং নির্বাণ বা মোক্ষের প্রতীক। এই মিলন কেবল একটি ধারণা নয়, এটি এক গভীর অভিজ্ঞতা, যেখানে সাধক অনুভব করেন যে, তিনি সৃষ্টির সমস্ত কিছুর সাথে একাকার হয়ে গেছেন।
শিব ও শক্তির একীভূত স্থিতি, যা এই মুদ্রার মাধ্যমে প্রতীকায়িত হয়, তা অদ্বৈত দর্শনের একটি মূল ধারণা। শিব নিষ্ক্রিয় চেতনা এবং শক্তি সক্রিয় সৃষ্টি। যখন তারা একীভূত হয়, তখন সম্পূর্ণ সৃষ্টি প্রক্রিয়া এবং তার উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়। এটি মহাবিশ্বের দ্বৈত দিকগুলির সমন্বয়, যেখানে আলো এবং অন্ধকার, সৃষ্টি এবং বিনাশ, জ্ঞান এবং অজ্ঞানতা—সব কিছুই এক পরম সত্তার অংশ হিসেবে উপলব্ধি করা হয়।
এই ধ্যানমুদ্রা অনুশীলনকারীর জন্য মানসিক শান্তি, আত্ম-সচেতনতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ খুলে দেয়। এটি মনকে স্থির করে, উদ্বেগ দূর করে এবং গভীর ধ্যানের মাধ্যমে আত্ম-উপলব্ধির দিকে পরিচালিত করে। এই ভঙ্গিটি যোগ এবং তন্ত্র উভয় জগতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি সাধকের আধ্যাত্মিক যাত্রায় একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অদ্বৈত বেদান্তে মুদ্রা কেবল যোগ বা তান্ত্রিক আচার নয়—এটি “দেহরূপ বেদান্ত।” মুদ্রা হলো দেহের ভাষায় অদ্বৈত চেতনার অভিব্যক্তি—যেখানে প্রতিটি ভঙ্গি, প্রতিটি আঙুলের সংযোগ, প্রতিটি স্থিতি বলে—“আমি সেই এক, যিনি সর্বত্র।” চিন্মুদ্রা বলে “অহং ব্রহ্মাস্মি,” অভয়মুদ্রা বলে “ভয় নেই, কারণ অন্য কেউ নেই,” বরমুদ্রা বলে “আমার দীপ্তি সকলের মধ্যেই।” এইভাবে মুদ্রা অদ্বৈত উপলব্ধির দৃশ্যমান অনুবাদ—যেখানে জ্ঞান, দেহ ও ব্রহ্ম মিলিত হয় এক নীরব, চিরসচল সংবিতের নৃত্যে।
অদ্বৈত বেদান্তে “পদ” (pada) শব্দটির অর্থ কেবল শব্দাংশ নয়, বরং চেতনার অবস্থান, স্তর বা অভিজ্ঞতার ধাপ। এটি সেই চারটি মৌল স্তরকে বোঝায়, যার মাধ্যমে চেতনা নিজেকে প্রকাশ করে এবং পুনরায় নিজের মধ্যেই ফিরে যায়। “পদ” মানে “অবস্থান” বা “ধাপ”—যেমন পদক্ষেপ, পদার্থ, পদব্রহ্ম—সবক্ষেত্রেই পদ বলতে বোঝানো হয় কোনো অস্তিত্বের ধাপ বা অবতরণ। অদ্বৈতের প্রেক্ষিতে এই পদগুলি আসলে চেতনার আত্ম-অভিজ্ঞতার চারটি স্তর, যা মাণ্ডূক্য উপনিষদে “চতুর্পাদ ব্রহ্ম” নামে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।