শৈব কালী: আটাশ



“সংহৃতি” শব্দের অর্থ সমাহার, আর “প্রতিসংহৃতি” মানে পূর্বাবস্থায় প্রত্যাবর্তন বা পুনঃসমাহার। কাশ্মীর শৈব মতে এটি শিবের পাঁচ divine act-এর তৃতীয় ধাপ—সংহার (saṁhāra)—যেখানে চেতনা নিজের বিকিরণ গুটিয়ে নেয়। তন্ত্রালোক-এ বলা হয়েছে—“প্রতিসংহৃতিরূপা সা সংবিত্‌ পরমা উচ্যতে”—চেতনা যখন নিজের বিকিরণকে প্রত্যাহার করে, তখনই পরম সংবিত প্রকাশিত হয় (তন্ত্রালোক, ৩.১০১)। এই প্রতিসংহৃতি মহাজাগতিক স্তরে সেই মুহূর্ত, যখন জগৎ চেতনার গর্ভে লীন হয়; যোগিক স্তরে এটি সেই অবস্থান, যখন যোগী নিজের ইন্দ্রিয় ও মনকে প্রত্যাহার করে নিখিল বিশ্বকে নিজের চেতনার মধ্যে বিলীন অনুভব করে (শিবসূত্র, ৩.২৬—“যথা তত্র তথান্যত্র”)।

অন্যদিকে “চেতনার আত্ম-অন্তর্গমন” একেবারে অন্তর্মুখী ও অভিজ্ঞতাধর্মী স্তরের কথা বলে। এটি সেই inward turning of awareness যেখানে চেতনা সমস্ত প্রতিফলন ছেড়ে নিজের কেন্দ্রে প্রবেশ করে। শিবসূত্র (১.১১)-এ বলা হয়েছে—“চিত্তং মান্ত্রম্‌”—যখন মন মন্ত্ররূপ চেতনা-কম্পনে রূপান্তরিত হয়, তখনই আত্ম-অন্তর্গমন ঘটে। এই স্তরে মন, ইন্দ্রিয় ও বোধ এক হয়ে যায়; subject ও object-এর সীমানা বিলীন হয়। অভিনবগুপ্ত ও ক্ষেমরাজ একে বলেন “অন্তর্মুখী সংবিত্‌ প্রবাহ” (antarmukha-saṁvitti-pravāha)—যেখানে চেতনা বহির্বৃত্তি থেকে অন্তর্বৃত্তিতে পরিণত হয়।

প্রতিসংহৃতি তাই বেশি “কসমিক”—শিবের সর্বজনীন লয়ক্রিয়া, আর আত্ম-অন্তর্গমন বেশি “অভ্যন্তরীণ”—যোগিনের ব্যক্তিগত প্রত্যভিজ্ঞা। প্রথমটি প্রকাশিত মহাবিশ্বের পুনর্গ্রহণ, দ্বিতীয়টি চেতনার নিজের মধ্যে প্রত্যাবর্তন। একটিতে ঢেউ সমুদ্রে মিশে যায়, অন্যটিতে সমুদ্র নিজের গভীরে নেমে যায়। তাই অভিনবগুপ্ত বলেন—“সংহারঃ প্রতিসংহৃতিরূপা চৈতন্যপ্রবৃত্তির্ভবতি”—সংহার আসলে প্রতিসংহৃতি, আর প্রতিসংহৃতি চেতনার নিজের মধ্যেই প্রত্যাবর্তন (তন্ত্রালোক, ৩.১০১)।

এই দুইয়ের মিলিত ফলই প্রত্যভিজ্ঞা—নিজেকে পরম চেতনা হিসেবে চিনে ফেলা। যখন প্রতিসংহৃত জগৎ ও আত্ম-অন্তর্গত চেতনা মিলিত হয়, তখন অভিজ্ঞ হয় এক অখণ্ড অবস্থান, যেখানে আর কোনো বহির্মুখ বা অন্তর্মুখ নেই—শুধু এক স্ব-প্রকাশিত, নিখিলময় সংবিত্‌ থাকে।

প্রতিসংহৃতি শব্দটি এসেছে “সম্‌ + হৃ” ধাতু থেকে, যার অর্থ “ফিরিয়ে নেওয়া”, “আত্মসাৎ করা” বা “সমবেত করা”। এই প্রেক্ষিতে, এটি কোনো নৈরাশ্যজনক বিলুপ্তি নয়; বরং এক আত্ম-সংগ্রহ (self-collection)—যেখানে চেতনা নিজের বাহ্য সম্প্রসারণ থেকে নিজস্ব কেন্দ্রে প্রত্যাবর্তন করে।

শৈব আগমে বলা হয়—যেভাবে ঢেউ, ফেনা ও স্রোত সমুদ্র থেকেই উদ্ভূত হয়ে সমুদ্রেই ফিরে যায়, তেমনি সমস্ত ভাব, অভিজ্ঞতা ও রূপ চেতনারই প্রকাশ, যা শেষপর্যন্ত সেই চেতনার মধ্যেই বিলীন হয়। প্রকাশ (sṛṣṭi) হলো চেতনার বহির্মুখী গতি; প্রতিসংহৃতি হলো সেই গতি-র অন্তর্মুখী প্রতিফলন।

অভিনবগুপ্ত তাঁর তন্ত্রালোক ও ঈশ্বরপ্রত্যভিজ্ঞা-বিমর্শিনী গ্রন্থে এই প্রতিসংহৃতিকে চেতনার “আত্ম-অন্তর্গমন” বলেছেন—অর্থাৎ, চেতনা যখন নিজের বিকীর্ণ সম্ভাবনা, রূপ ও ক্রিয়াকে প্রত্যাহার করে নিজের মূল নীরব জ্যোতিতে ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়া কোনো কৃত্রিম ধ্যান নয়, বরং চেতনার স্বাভাবিক বিশ্রাম, যাকে তিনি বলেন “বিশ্রান্তি (viśrānti)”—যেখানে চেতনা নিজের বিশাল মহাজাগতিক কার্য থেকে ফিরে এসে নিজের অবিভক্ত ঐক্যে বিশ্রাম নেয়।

এই আত্ম-অন্তর্গমনকে বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ প্রাচীন শৈব ব্যাখ্যায় দেওয়া হয়েছে। যেমন একটি প্রদীপের আলো নানা দিকে বিচ্ছুরিত হলেও, তার উৎসে ফিরে গেলে সেই আলো আবার একটি বিন্দুতে মিলিত হয়; তেমনি চেতনা, যা ধারণা, রূপ, গতি ও অভিজ্ঞতার রূপে বিস্তৃত হয়েছিল, শেষপর্যন্ত নিজের অন্তর্সূর্যে মিলিত হয়।

অর্থাৎ, প্রতিসংহৃতি হলো চেতনার আত্ম-সংগ্রহ, নিজের মধ্যে নিজের প্রত্যাবর্তন। এখানে “আমি” আর “অন্য”—এই দ্বৈতবোধ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়। জ্ঞাতা, জ্ঞেয় ও জ্ঞান—এই তিনের মধ্যকার দূরত্ব মুছে যায় এবং অবশিষ্ট থাকে কেবল এক অখণ্ড আত্ম-সচেতনতা (eka-saṁvit), যা নিজের মধ্যেই দীপ্ত।

চেতনার এই আত্ম-অন্তর্গমনই আসলে মুক্তি—কারণ মুক্তি কোনো স্থানান্তর নয়, কোনো গমন নয়, বরং নিজের মধ্যেই ফিরে আসা। চেতনা যাত্রা করে না; সে নিজের মধ্যে নিজেকে চিনে ফেলে। প্রতিসংহৃতি তাই এক নীরব উপলব্ধি—চেতনা যখন উপলব্ধি করে যে সে কখনোই বহির্গত হয়নি, কখনোই কিছু হারায়নি; সব প্রকাশই তার নিজেরই খেলা, আর সে নিজে চিরকাল স্থিত সেই অদ্বৈত শিব-স্বরূপে।

অতএব, প্রতিসংহৃতি হলো প্রকাশের প্রতিস্বর, যেখানে চেতনা নিজের বহির্ভাব থেকে নিজের নীরব কেন্দ্রে ফিরে আসে। এটি কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক পুনরুদ্ধার—চেতনার নিজস্ব আত্ম-অন্তর্গমন, যেখানে সব বহুত্ব, সব শব্দ, সব গতি মিলিয়ে যায় এক অখণ্ড, স্থির, উজ্জ্বল সংবিত্‌-এর অন্তঃশান্তিতে।

কাশ্মীর শৈবদর্শনে আত্ম-আবরণ (Ātma-Āvaraṇa) এমন এক গভীর তত্ত্ব, যা চেতনার নিজস্ব লীলা বা আত্ম-প্রক্রিয়ার অন্তর্গত। “আবরণ” শব্দের অর্থ আচ্ছাদন বা গোপন, আর “আত্ম-আবরণ” বলতে বোঝানো হয় চেতনার নিজস্ব সেই স্বাতন্ত্র্যশক্তি, যার দ্বারা সে নিজের অসীম দীপ্তি ও পূর্ণতাকে আংশিকভাবে আড়াল করে সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতার রূপে প্রকাশিত হয়। এই প্রক্রিয়া কোনো অজ্ঞানতা নয়; বরং চেতনারই ইচ্ছাকৃত আত্ম-গোপন—এক সচেতন, ঐশ্বরিক খেলা।

অভিনবগুপ্ত বলেন, “শিবঃ সংবিত্‌ স্বাতন্ত্র্যময়ী”—অর্থাৎ, শিবই সংবিত্‌ এবং সেই সংবিত্‌ স্বাতন্ত্র্যময়, অর্থাৎ, স্বতঃসিদ্ধ স্বাধীনতায় পূর্ণ। এই স্বাধীনতার কারণেই চেতনা কখনো নিজের দীপ্তি প্রকাশ করে, আবার কখনো নিজেকে গোপন করে। চেতনার এই গোপন বা আত্ম-আবরণই সৃষ্টি ও অভিজ্ঞতার সূচনা বিন্দু। যদি চেতনা সর্বদা নিজের পূর্ণ ঐক্যে অবস্থিত থাকত, তবে কোনো প্রপঞ্চ, কোনো বহুত্ব, কোনো জীবজগতই প্রকাশ পেত না। তাই আত্ম-আবরণ সেই সৃজনশীল শক্তি, যার দ্বারা অসীম চেতনা নিজেকে সীমাবদ্ধ রূপে অনুভব করে—“আমি”, “তুমি”, “এই বিশ্ব”—এই সমস্ত ধারণা সেই আত্ম-গোপনেরই ফল।

এই আত্ম-আবরণ বা গোপনতা শৈব দর্শনে বলা হয় তিরোধান (tirodhāna)—যা পরম শক্তির পাঁচটি ক্রিয়ার (pañcakṛtya) একটি। তিরোধান মানে চেতনার নিজেকে আড়াল করা, যেন নিজের অসীমতা নিজেই না দেখে। এটি সূর্যের মতো—যিনি নিজের তেজে দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে দেন; আলো থেকেই যেন আচ্ছাদন জন্মায়। তাই এই আত্ম-আবরণ কোনো অন্ধকার নয়; বরং দীপ্তিরই এক বিপরীত দিক—যেখানে চেতনা নিজের অগাধ আলোককে সীমিত রূপে প্রতিফলিত করে, যেন নিজেকে অভিজ্ঞতার নাট্যমঞ্চে দেখতে পারে।

অভিনবগুপ্তের দর্শন অনুসারে, পরম চেতনার আত্ম-আবরণের তিনটি স্তর রয়েছে, যা ব্যক্তিকে তার প্রকৃত, অসীম স্বরূপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। এই স্তরগুলি হলো তত্ত্ব-আবরণ, জ্ঞাতৃত্ব-আবরণ এবং অভিজ্ঞতা-আবরণ।

প্রথমত, তত্ত্ব-আবরণ (tattvāvāraṇa), যা হচ্ছে সীমাবদ্ধ অস্তিত্বের জাল। এই আবরণটি পরম চেতনাকে জাগতিক অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবৃত করে। এখানে চেতনা নিজেকে উপাদানের স্তরে বা পঞ্চতত্ত্বের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম—অর্থাৎ পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ) গঠনে আবদ্ধ বলে মনে করে। এর ফলস্বরূপ, ব্যক্তি তার অসীম, সর্বব্যাপী সত্তা ভুলে গিয়ে নিজেকে একটি সসীম দেহ ও মনের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করে। এই স্তরে, মানুষ বস্তুগত জগতের সঙ্গে নিজেকে এত বেশি একাত্ম করে ফেলে যে, সে তার আধ্যাত্মিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।

উদাহরণস্বরূপ, যখন একজন ব্যক্তি নিজের পরিচয় কেবল তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পেশা বা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, তখন সে এই তত্ত্ব-আবরণের প্রভাবে থাকে। এটি তাকে উপলব্ধি করতে বাধা দেয় যে, সে কেবল রক্তমাংসের একটি পিণ্ড নয়, বরং তার গভীরে রয়েছে এক অসীম চৈতন্য। এই আবরণটি জীবকে জাগতিক বন্ধনে আবদ্ধ করে, যা তাকে তার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে বাধা দেয়।


দ্বিতীয়ত, জ্ঞাতৃত্ব-আবরণ (jñātṛtvāvāraṇa), যা হচ্ছে সীমিত কর্তা ও দ্বৈততার বিভাজন। এই আবরণটি চেতনার "আমি জানি" বা "আমি কর্তা" এই সীমিত ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে। এখানে পরম, অসীম জ্ঞান একটি ক্ষুদ্র, ব্যক্তিগত জ্ঞান বা 'জ্ঞাতৃত্বে' রূপান্তরিত হয়। এই স্তরে, ব্যক্তি নিজেকে একটি পৃথক জ্ঞাতা (knower) হিসেবে দেখে, যে কিছু জানতে পারে এবং কিছু জানতে পারে না। এই বিভাজন জ্ঞাতা (subject) এবং জ্ঞেয় (object) এর মধ্যে দ্বৈততার জন্ম দেয়, যা অদ্বৈতবাদের মূল ধারণার পরিপন্থী। পরম চেতনা যেখানে জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়-এর ঊর্ধ্বে, সেখানে এই আবরণ তাকে একটি সীমিত জ্ঞানেন্দ্রিয় সম্পন্ন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে।

উদাহরণস্বরূপ, যখন একজন ব্যক্তি ভাবে যে সে "অমুক বিষয় জানে" বা "অমুক বিষয় জানে না", তখন সে এই জ্ঞাতৃত্ব-আবরণের প্রভাবে থাকে। এটি তাকে বুঝতে দেয় না যে, পরম জ্ঞান অখণ্ড এবং তার নিজস্ব জ্ঞান সেই পরম জ্ঞানেরই একটি ক্ষুদ্র প্রকাশ মাত্র। এই আবরণটি অহংকারের জন্ম দেয় এবং ব্যক্তিকে তার সর্বজ্ঞ স্বরূপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে।


তৃতীয়ত, অভিজ্ঞতা-আবরণ (anubhava-āvaraṇa), যা হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী সুখ-দুঃখের চক্র। এটি হলো চেতনার পরম আনন্দকে আড়াল করে ক্ষণস্থায়ী সুখ-দুঃখের তরঙ্গে আবদ্ধ হওয়ার আবরণ। পরম চেতনা স্বরূপত আনন্দময় এবং অসীম সুখের উৎস। কিন্তু এই আবরণের প্রভাবে, ব্যক্তি তার সেই অসীম আনন্দকে ভুলে গিয়ে জাগতিক, ক্ষণস্থায়ী সুখ-দুঃখের অনুভূতির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে। সে মনে করে যে, সুখ বা দুঃখ বহিরাগত বিষয় দ্বারা সৃষ্ট হয় এবং তার নিজস্ব সত্তার অংশ নয়। এর ফলে, মানুষ লাগাতার সুখের অন্বেষণে থাকে এবং দুঃখ থেকে পলায়ন করতে চায়, যা তাকে এক নিরন্তর অস্থিরতার মধ্যে রাখে। এই আবরণটি ব্যক্তিকে জন্ম-মৃত্যু এবং কর্মফলের চক্রে আবদ্ধ করে রাখে, কারণ সে ক্ষণস্থায়ী ভোগকেই জীবনের পরম লক্ষ্য হিসেবে দেখে।

উদাহরণস্বরূপ, যখন একজন ব্যক্তি কোনো বস্তুগত প্রাপ্তি বা বাহ্যিক প্রশংসা থেকে সুখ অনুভব করে এবং তার অনুপস্থিতিতে দুঃখিত হয়, তখন সে এই অভিজ্ঞতা-আবরণের প্রভাবে থাকে। সে উপলব্ধি করতে পারে না যে, প্রকৃত আনন্দ তার অন্তরেই বিদ্যমান এবং তা কোনো বাহ্যিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল নয়।

এই তিনটি আবরণের মধ্য দিয়ে পরম চেতনা নিজেকে আবৃত করে একটি সীমিত সত্তা হিসেবে প্রকাশ পায়, যা তার অসীম এবং অদ্বৈত স্বরূপ থেকে বিচ্যুত হয়। অভিনবগুপ্তের দর্শন এই আবরণগুলি ভেদ করে পরম চেতনার মূল স্বরূপ উপলব্ধির পথ নির্দেশ করে।

এই তিন স্তরের মধ্যেই এক শক্তি কাজ করে—মায়া-শক্তি (Māyā-śakti)—যা চেতনারই অন্তর্গত সেই বিস্ময়কর ক্ষমতা, যার দ্বারা সে নিজের অদ্বৈত ঐক্য থেকে বহুত্ব সৃষ্টি করে। এই মায়া কোনো পরম শত্রু নয়; এটি চেতনারই খেলা, আত্ম-প্রকাশের এক বিপরীত ছায়া। কারণ শিবচেতনা যদি কখনও নিজেকে সীমাবদ্ধ না করত, তবে আত্ম-চেনা বা মুক্তির সম্ভাবনাও থাকত না। ভুলে যাওয়া না থাকলে পুনরাবিষ্কারও সম্ভব নয়; তাই আত্ম-আবরণই মুক্তির পূর্বশর্ত।

এভাবে আত্ম-আবরণ হলো চেতনার আত্ম-বিস্মৃতি—কিন্তু এক পবিত্র বিস্মৃতি, যার অন্তর্লক্ষ্যে আত্ম-স্মরণ নিহিত। চেতনা নিজের দীপ্তিকে আড়াল করে, যেন পুনরায় সেই দীপ্তিকে চিনে নিতে পারে। যখন আত্ম-আবরণ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে, তখন জীব নিজেকে পৃথক, সীমিত, অসহায় মনে করে। কিন্তু যখন অনুগ্রহ (anugraha) উদ্ভাসিত হয়, তখন সেই আবরণ ভেদ করে চেতনা নিজের পূর্ণতা চিনে ফেলে।

আত্ম-আবরণ কোনো অন্ধকার নয়, কোনো দুঃখ নয়; এটি এক গভীর সৃজনশীল পর্ব, এক অন্তর্লীন রহস্য। চেতনা নিজের আলোকে আড়াল করে, আবার সেই অন্ধকার ভেদ করে নিজের আলোয় ফিরে আসে। এই লীলাই হলো বিশ্বপ্রক্রিয়া—আবরণ ও উদ্ঘাটন, বিস্মৃতি ও স্মরণ, সৃষ্টি ও প্রতিসংহৃতি—যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একেই চেতনা, স্বয়ং শিব, যিনি নিজের মধ্যেই লুকিয়ে, নিজের মধ্যেই উদ্‌ভাসিত।