ভেদ-অভেদ তত্ত্ব: তিন




এখন কথা হচ্ছে, জ্ঞেয়-জ্ঞান-জ্ঞাতা কেন ক্ষণস্থায়ী? জ্ঞেয় বদলায়: ফুলটি শুকিয়ে যায়, শব্দ থেমে যায়, চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়। জ্ঞান বদলায়: সন্দেহ → নিশ্চয়তা → ভুলে যাওয়া → আবার মনে পড়া। জ্ঞাতা-ভাবও বদলায়: ঘুমে/স্বপ্নে/জাগরণে “আমি”-র রূপ পালটায়—কখনো স্বপ্ন-আমি, কখনো জাগ্রত-আমি; গভীর ঘুমে তো “আমি-ভাব”ই থাকে না। এদের কেউই নিজের জন্ম-মৃত্যু দেখতে পারে না। আমরা—“এইমাত্র আমার মনে ‘ভাবনা’ জন্মাল”—এটা ভাবনার পরে বুঝি; কিন্তু জন্ম-মুহূর্তটি দেখতে পাই না—তেমনি “আমি-ভাব”টার আসা-যাওয়া আমি-ভাব দিয়ে ধরা পড়ে না; কারণ জন্মেই সে “আমি”-তে জুড়ে যায়। তাই এই তিনে—কেউই নিজের উৎপত্তি-ক্ষয় সাক্ষ্য দিতে পারে না।

যেহেতু এরা সবই বদলায়, এবং কেউই নিজেকে প্রমাণ করতে পারে না, তাই এদের বাইরে এমন এক অপরিবর্তনীয় উপস্থিতি থাকা চাই—যে সব কিছুর সাক্ষী। এটাই সাক্ষী আত্মা।

“সাক্ষী” মানলেই কি অন্তহীন সাক্ষীর (Infinite regress) দরকার? মনে আসতে পারে, যদি ‘সাক্ষী’ থাকে, তবে তারও তো আরেক ‘সাক্ষী’ লাগবে—এভাবে অনন্তে যাবে! প্রকৃত ব্যাপারটা এমন নয়, কারণ সাক্ষী নিজ-প্রকাশমান (self-evident, স্বয়ং-প্রকাশ)। আলোর আলোকিত হতে আবার আলোর দরকার হয় না—আলো নিজেই উজ্জ্বল। সচেতনতার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে আরেকটি সচেতনতার প্রয়োজন হয় না—সন্দেহ করতেও যে-সচেতনতা লাগে, সেটাই তার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি। তাই ধারা থেমে যায় স্বয়ং-প্রকাশমান সাক্ষীতে; আর কোনো “সাক্ষীর সাক্ষী” দরকার হয় না। “আমি কি আছি?”—এই প্রশ্ন উঠলেই “আছি” বলে যে-সচেতন উপস্থিতি ধরা পড়ে, সেটাই সাক্ষী-স্বরূপের আভাস। প্রশ্নটিই তার আলোতে উঠতে পারে।

এখন “জ্ঞাতা” আর “সাক্ষী”-র মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যাক। জ্ঞাতা (I-thought): “আমি দেখি/শুনি/ভাবি”—এটা মন-ইন্দ্রিয়-দেহের সঙ্গে লেগে-থাকা ‘আমি’; সে বদলায়, ক্লান্ত হয়, ঘুমে ডুবে যায়। সাক্ষী: যে জাগরণ-স্বপ্ন-সুষুপ্তি—সব অবস্থায় উপস্থিতির ধারাবাহিকতা দেয়—ঘুমের মধ্যেও…“আমি ছিলাম”—এই দৃঢ়তা এখান থেকেই। জ্ঞাতা কর্ম-ফল দ্বন্দ্বে ঢোকে; সাক্ষী কর্ম-অকর্মে অনাসক্ত—কেবল প্রকাশ ঘটায়।

‘আয়না ও মুখ’-এর উপমা ভাবা যাক। আয়নায় নানা মুখ (জ্ঞেয়), নানা ভঙ্গি (জ্ঞান), “আমি তাকালাম”-ভাব (জ্ঞাতা) দেখা যায়। এখানে আয়না নিজে কোনো মুখ নয়—তবু সব মুখকেই প্রকাশ করে—সাক্ষীর মতো।

অভ্যাসে এটা বোঝার জন্য ছোটো দুইটি অনুশীলন কল্পনা করা যাক।

অনুশীলন ১: “নেতি–নেতি” (এ নই, সে নই)—চোখ বন্ধ করে বলি: “রং-শব্দ-গন্ধ—আমি নই; ভাবনা-স্মৃতি—আমি নই; আনন্দ-বেদনা—আমি নই।” সব বাদ দিতে দিতে যে নিরাবরণ উপস্থিতি টিকে থাকে—“আমি আছি”—ওটাই সাক্ষী-চৈতন্য।

অনুশীলন ২: নিঃশব্দ সাক্ষী—একমিনিট চুপচাপ বসে শুধুই লক্ষ করি: শব্দ উঠছে…থামছে, শ্বাস চলছে, মনে ভাবনা আসছে…যাচ্ছে। আমি কিছু করছেন না; শুধু টের পাচ্ছি। এই শান্ত-সৌম্য টের-পাওয়া—সাক্ষীর স্বভাব।

জ্ঞেয়: যা দেখা-শোনা-ছোঁয়া যায় (বস্তু/ঘটনা)। জ্ঞান: মনে জানা, ধরা পড়া (সন্দেহ-স্মৃতি-নিশ্চয়তা)। জ্ঞাতা: “আমি”–যে জানি (মন-ইন্দ্রিয়-সংযুক্ত ‘আমি’)। সাক্ষী (আত্মা): সব কিছুর অপরিবর্তনীয় উপস্থিতি, যা নিজে স্বয়ং-প্রকাশমান, প্রমাণের প্রয়োজন নেই; জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তি—সব কিছুর নির্বিকার সাক্ষী।

এবার আকাশ ও মেঘের দৃষ্টান্ত নিচ্ছি। মেঘ (জ্ঞেয়), বাতাসের হাওয়া-বৃষ্টি-রোদ (জ্ঞান), আবহাওয়াবিদের “আমি দেখছি”-র ‘আমি’-ভাবনা (জ্ঞাতা)—সবই আকাশে বা আকাশকে কেন্দ্র করে ঘটে। আকাশ নিজে অকলুষ, বিস্তৃত, অনড়—তবু সব ধরে রাখে—এটাই সাক্ষী-আত্মার ভূমিকা। এভাবে দেখলে বোঝা যায়—জ্ঞেয়-জ্ঞান-জ্ঞাতা সবই বদলায়, তাই স্বতন্ত্র প্রমাণ দিতে পারে না; তাদের বাইরে যে অপরিবর্তনীয়, স্বয়ং-প্রকাশমান উপস্থিতি, তাকেই বলা হয় সাক্ষী-আত্মা—যার নিজের কোনো বাহ্য প্রমাণ লাগে না, বরং অন্য সব কিছুর প্রমাণ তার বদৌলতেই সম্ভব হয়।

অজ্ঞতার (avidyā) একটা আধার (āśraya, support) লাগে—অজ্ঞতা শূন্যে থাকতে পারে না। সবসময় কারও (একটি সচেতন সত্তার) অজ্ঞতা থাকে এবং কিছু বিষয়ের ওপরেই সেই অজ্ঞতা কাজ করে। তাই অজ্ঞতা মানে সবসময় দুইটি বিষয়: আধার —যে-চেতনার মধ্যে অজ্ঞতা টিকে আছে। বিষয় (viṣaya)—যে সত্য বা জ্ঞানকে এটি আড়াল করছে।

শাস্ত্র অনুযায়ী, কেবল দুইটি শ্রেণি আছে—আত্মা: চেতনা, জ্ঞাতার মূল। অনাত্মা: যা জড়, চেতনার অভাব। এখন প্রশ্ন হলো—অজ্ঞতার আধার হবে কোনটা?

অনাত্মা কি অজ্ঞতার আধার হতে পারে? অনাত্মার প্রকৃতিই অজ্ঞতা। অনাত্মা মানে যা জড়, যেখানে চেতনা নেই। এখন যদি বলি, অনাত্মাই আবার অজ্ঞতার আধার, তবে দাঁড়ায়—অজ্ঞতার মধ্যে আবার অজ্ঞতা। এটা অকল্পনীয়। কারণ, “অজ্ঞতা আছে”—এমন বলার জন্যও কোনো সচেতন সত্তা থাকা চাই, যে উপলব্ধি করতে পারে। উদাহরণ দিচ্ছি। একটি অন্ধকার ঘরে টেবিল রাখা আছে। যদি কেউ তা না দেখে, তবে “অন্ধকারে টেবিল আছে” কথাটির অর্থ হয় না। অন্তত একজন দেখার মতো সচেতন সত্তা থাকতে হয়, যে বলবে: “অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।” ঠিক তেমনি, “অজ্ঞতা” কেবল সচেতনতার মধ্যেই অর্থবহ; নিছক জড় (অনাত্মা)-এর মধ্যে নয়।

অনাত্মার ভেতরে অজ্ঞতার উদয় হলে কী পরিবর্তন হলো? ধরুন, তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম—অজ্ঞতা অনাত্মার মধ্যেই জন্ম নিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর ফলে নতুন কী হলো? অনাত্মা তো নিজেই অজ্ঞতার প্রকৃতি। তার মধ্যে আবার অজ্ঞতা জন্ম নিলে কী ঘটল? কোনো তাৎপর্যময় পরিবর্তনই ঘটল না। তাই এই তর্ক অর্থহীন।

অনাত্মা হলে জ্ঞানলাভ সম্ভব নয়। যদি বলা হয়—অজ্ঞতার আধার অনাত্মা, তাহলে কখনও জ্ঞানলাভ হতো না, কারণ অজ্ঞতা নিজের অস্তিত্বের জন্য জ্ঞানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে। যদি জ্ঞানই না থাকে, তবে “অজ্ঞতা” কথাটির অর্থই হবে না। যেমন, “অন্ধকার” কথাটার মানে বোঝাতে হলে আগে “আলো” থাকা দরকার। আলো ছাড়া অন্ধকারের কোনো সংজ্ঞাই হয় না। তেমনি, জ্ঞান ছাড়াও অজ্ঞতা ব্যাখ্যা করা যায় না।

অনাত্মা নিজেই অজ্ঞতার ফল। শাস্ত্রে বলা হয়েছে—অনাত্মা জন্ম নিয়েছে অজ্ঞতা থেকেই। এখন যদি বলি—অজ্ঞতার আধার অনাত্মা, তবে দাঁড়ায়—অজ্ঞতা (কারণ) থেকে অনাত্মা (ফল)। আবার অনাত্মা (ফল) অজ্ঞতার আধার হয়ে তথা কারণ হয়ে দাঁড়াল। এটা কার্য-কারণ সম্পর্কের বিরোধ—কারণ নিজেই নিজের ফলের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। যেমন বলা হলো, “গাছই হলো বীজের আধার।” কিন্তু বাস্তবে তো গাছ জন্মেছে বীজ থেকে! বীজই যদি গাছের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সব যুক্তি ভেঙে যায়।

অনাত্মার কোনো আলাদা স্বরূপ নেই। অনাত্মা হলো জড়, চেতনার অভাব। এর নিজের কোনো স্বতন্ত্র, স্থায়ী রূপ নেই। তাই অজ্ঞতার আধার হওয়ার মতো স্বাধীন সত্তাও সে নয়। অজ্ঞতা শূন্যে থাকতে পারে না। অনাত্মা এর আধার হতে পারে না, কারণ: (১) অনাত্মার প্রকৃতিই অজ্ঞতা—অজ্ঞতার মধ্যে আবার অজ্ঞতা অকল্পনীয়। (২) অনাত্মার ভেতরে অজ্ঞতার উদয় হলেও কোনো পরিবর্তন ঘটল না। (৩) অনাত্মা হলে জ্ঞানলাভই অসম্ভব। (৪) অনাত্মা নিজেই অজ্ঞতার ফল, তাই আধার হতে পারে না। (৫) অনাত্মার আলাদা কোনো স্বরূপ নেই।

অজ্ঞতার আধার (āśraya) আত্মা কীভাবে হতে পারে? এর উত্তর পেতে আগে ভাবতে হবে, অজ্ঞতা কার মধ্যে থাকে? আমরা সবাই অনুভব করি: “আমি জানি না”। যেমন—“আমি জানি না আজ বৃষ্টি হবে কি না”, বা “আমি জানি না আত্মার প্রকৃতি কী”। এখানে “আমি” হলো চেতনা, আর তার মধ্যে “না-জানা”র অনুভূতিই হলো অজ্ঞতা। তাই অজ্ঞতা কোনো জড় পদার্থে থাকতে পারে না। এটা সর্বদা সচেতন আত্মার মধ্যে থাকে।

আত্মা চৈতন্যময়। আত্মা কখনও অজ্ঞতার সঙ্গে অভিন্ন নয়। আত্মার প্রকৃতি হলো চেতনা, জ্ঞান, আলো। তাই চেতনার ভেতরেই “অজানা”র অনুভব সম্ভব। যেমন আলো আছে বলেই বোঝা যায়, অন্ধকার আছে। আলো না থাকলে অন্ধকার নিয়ে বলার উপায়ই থাকত না—অন্ধকারের প্রসঙ্গটাই তো আসত না। অজ্ঞতার উপস্থিতি মানে জ্ঞানের সাময়িক “বিচ্ছেদ”। যখন আত্মার জ্ঞানে একটি অন্তরাল হয়—অর্থাৎ কোনো বিষয় বোঝা যায় না—তখন সেখানে অজ্ঞতা ধরা পড়ে। ফলে বলা যায়, আত্মার মধ্যেই অজ্ঞতা টিকে থাকে। মেঘ ঢেকে দিলেও সূর্য (আলো) থাকে, কেবল আবরণের কারণে আলো কম দেখা যায়। তেমনি, আত্মার ভেতরে অজ্ঞতা মানে জ্ঞানের ওপর একটা আবরণ।

আত্মা থেকে জ্ঞান সম্ভব, তাই অজ্ঞতাও অর্থবহ। আত্মাই মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়কে আলোকিত করে। সেই আলোকের অভাব বা আড়াল হলে তাকে বলা হয় অজ্ঞতা। তাই আত্মা ছাড়া অজ্ঞতার ধারণাই দাঁড়ায় না। আত্মা জন্মহীন ও নিরন্তর। অনাত্মা যেমন অজ্ঞতার ফল, আত্মা তেমন নয়। আত্মা চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়; তাই তার ভেতরেই অজ্ঞতার “সমর্থন” থাকতে পারে, অথচ আত্মা নিজে অজ্ঞতায় কলুষিত হয় না। পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি কাঁপলেও আসল চাঁদ আকাশে অটল থাকে।

আপত্তি ওঠে: আত্মা যদি স্বরূপতই জ্ঞানময়, তবে অজ্ঞতা তার মধ্যে কীভাবে সম্ভব? এর উত্তর: আত্মা আসলে অজ্ঞতা-অকলুষিত। কিন্তু অধ্যাস (superimposition)—যেমন দড়িকে সাপ মনে হওয়া—এর কারণে আত্মা-কে “অজ্ঞ” মনে হয়। বাস্তবে আত্মা বদলায় না, শুধু অজ্ঞতার আচ্ছাদনে “অজ্ঞ” বলে মনে হয়।

অজ্ঞতা শূন্যে থাকতে পারে না; অনাত্মা আধার হতে পারে না, কারণ তা জড়, আর জ্ঞান ছাড়া অজ্ঞতার অর্থ নেই। আত্মাই হলো অজ্ঞতার আধার (āśraya) ও বিষয় (viṣaya) দুটোই: আত্মা-চৈতন্যের ভেতরেই “আমি জানি না” ধরা পড়ে। আর যে-আত্মাকে অজ্ঞতা আড়াল করে রাখে, সেই আত্মাই তার বিষয়। দড়ি-সাপ ভ্রমে যেমন দড়িই ভ্রমের আধার (যার ওপর ভুলটা বসেছে) আর দড়িই ভ্রমের বিষয় (যা আসলে ঢেকে গেছে), তেমনি আত্মাই অজ্ঞতার আধার ও বিষয়।

এই যুক্তিগুলো প্রমাণ করে যে, অনাত্মা কখনও অজ্ঞতার আধার হতে পারে না, এবং সঠিকভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, এটি অজ্ঞতার আড়াল-কৃত বিষয়ও হতে পারে না। তাই অনাত্মা—না অজ্ঞানের আধার (āśraya of avidyā), না অজ্ঞানের বিষয় (viṣaya of avidyā)। অতএব, একমাত্র অবশিষ্ট বিকল্প হলো, আত্মাই অজ্ঞানের আধার (āśraya) ও বিষয় (viṣaya) উভয়। আমাদের সকলেরই অভিজ্ঞতা হয়—“আমি জানি না”; এবং শ্রুতিতে শ্রী নারদও বলেন: “হে প্রভু, আমি কেবল মন্ত্রজ্ঞ; আত্মাকে জানি না” (ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৭।১।৩, নারদ-সনৎকুমার সংলাপ)। অর্থাৎ, নারদ বোঝাচ্ছেন, তিনি শাস্ত্র–বেদ পাঠ করেছেন, নানা বিদ্যা আয়ত্ত করেছেন। তাঁর কাছে বাহ্য জ্ঞানের ভাণ্ডার আছে—কিন্তু তিনি এখনও আত্মজ্ঞান লাভ করেননি। তাই তিনি সনৎকুমারের কাছে শিক্ষা চাইছেন।