বেদের আলোয় অদ্বৈত: তিন



প্রামাণ্য পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা দেখা যাক। ভারতীয় দর্শন প্রমা বা যথার্থ জ্ঞান লাভের জন্য ‘প্রমাণ’ নামক বিভিন্ন পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। প্রধান প্রমাণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষ (উপলব্ধি), অনুমান (inference), এবং শব্দ (শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য)। এই প্রমাণগুলো কেন আত্মার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তার ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:

প্রত্যক্ষ প্রমাণের ব্যর্থতা: ইন্দ্রিয়সমূহ কেবল বাহ্যিক বস্তুকে উপলব্ধি করতে পারে, যার একটি আকার, আকৃতি বা গুণ রয়েছে। আত্মা অব্যক্ত (unmanifest), অচিন্ত্য (unthinkable) এবং বিকাররহিত। এটি কোনো গুণের অধিকারী নয়। আত্মা ইন্দ্রিয়ের অতীত একটি সত্তা (অতীন্দ্রিয়), তাই তাকে সরাসরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। যেহেতু ইন্দ্রিয়ের সাথে আত্মার কোনো অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ নেই, তাই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের মাধ্যমে আত্মাকে জানা যায় না।

অনুমান প্রমাণের অপ্রাসঙ্গিকতা: অনুমান প্রমাণ একটি সর্বজনীন মধ্যপদ বা হেতু (middle term) এবং একটি সর্বজনীন পূর্বানুমানের ব্যাপ্তির উপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, পাহাড়ে ধোঁয়া দেখে আমরা আগুনের অনুমান করি, কারণ আমরা জানি যে, যেখানেই ধোঁয়া থাকে, সেখানেই আগুন থাকে। এই জ্ঞানটি পূর্বে প্রত্যক্ষের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আত্মা যেহেতু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় এবং তার সঙ্গে যুক্ত কোনো মধ্যপদ সরাসরি জানা যায় না, তাই অনুমানের জন্য প্রয়োজনীয় যৌক্তিক ভিত্তিই অনুপস্থিত। ফলে, অনুমানের মাধ্যমে আত্মাকে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

অন্যান্য প্রমাণের অপ্রাসঙ্গিকতা: অর্থাপত্তি (presumptive evidence) বা অভাবপ্রমাণ (non-perception of an object)-এর মতো অন্যান্য প্রমাণ-পদ্ধতিও মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। যেহেতু মূল প্রত্যক্ষ প্রমাণই আত্মার ক্ষেত্রে ব্যর্থ, তাই তার উপর নির্ভরশীল অন্য প্রমাণগুলোও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

অর্থাপত্তি (arthāpatti) এবং অভাবপ্রমাণ (anupalabdhi / non-perception)—দুটোই ভারতীয় দর্শনে স্বীকৃত জ্ঞানের স্বতন্ত্র প্রমাণ (প্রমাণ)।

অর্থাপত্তি (Presumption / Postulation): যখন কোনো অবস্থা ব্যাখ্যা করার জন্য অন্য কোনো অবস্থা অনুমান করে নিতে হয়, সেটাকেই অর্থাপত্তি বলে। অর্থাৎ, প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান বা শাস্ত্রপ্রমাণ দিয়ে যখন ব্যাখ্যা সম্ভব নয়, তখন অনিবার্যভাবে একটি নতুন অবস্থার অস্তিত্ব অনুমান করতে হয়। উদাহরণ: সারাটা সকালই স্বাস্থ্যবান দেবদত্তকে না খেয়ে থাকতে দেখা যায়, কিন্তু তিনি তো ভালোই স্বাস্থ্যবান আছেন। অনুমান করতে হয়—তিনি গোপনে রাতে খান। এই “রাতে খাওয়া” সরাসরি দেখা বা শোনা যায় না, কিন্তু অনিবার্যভাবে ধরে নিতে হয়। আবার, রাজপুত্র বিদেশে আছেন। রাজপ্রাসাদে তাঁর আরোহী হাতি দেখা গেল। অনুমান করতে হয়—রাজপুত্র দেশে ফিরেছেন। অতএব অর্থাপত্তি = অব্যাখ্যাত ঘটনার অনিবার্য ব্যাখ্যা হিসেবে নতুন কোনো অবস্থা অনুমান।

অভাবপ্রমাণ (Non-perception): কোনো বস্তুকে যখন ইন্দ্রিয়সামীপ্য থাকা সত্ত্বেও উপলব্ধি করা যায় না, তখন তার অভাব (অস্তিত্বহীনতা) প্রমাণ হয়। অর্থাৎ ‘অভাব’ ব্যাপারটা অনুপলব্ধি দ্বারা জানা যায়। উদাহরণ: দিনের আলোয় ঘরে হাঁড়ি চোখে না দেখা গেলে বলা হয়—“এখানে হাঁড়ি নেই।” জমিতে বীজ বোনা হয়েছে, বহুদিন পরও চারা গজাল না। বলা হয়—“বীজ পচে গিয়েছিল।” এখানে প্রত্যক্ষের অভাব থেকেই “অস্তিত্বহীনতা” জ্ঞান হয়।

অল্পকথায়, অর্থাপত্তি: কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা করতে অনিবার্য অনুমান (positive presumption)। অভাবপ্রমাণ: কোনো বস্তু না দেখা/না পাওয়া থেকে তার অনুপস্থিতি নির্ণয় (negative cognition)।

'শব্দ-প্রমাণ'-ই আত্মার জ্ঞানের একমাত্র উৎস। এই আলোচনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক উপসংহার টানা যায়: আত্মার অতীন্দ্রিয় প্রকৃতিই তার জ্ঞানের জন্য শব্দ বা শাস্ত্রীয় প্রমাণের অপরিহার্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। আত্মা নির্গুণ এবং নির্বিশেষ সত্তা।

নির্গুণ (গুণহীন সত্তা) অর্থ: গুণ (সত্, রজঃ, তমঃ—প্রকৃতির তিন গুণ) থেকে মুক্ত। সত্তার ওপর কোনো প্রকার সীমাবদ্ধ উপাধি বা গুণধর্ম চাপানো যায় না। উপনিষদে ব্রহ্মকে বলা হয় “নির্গুণ ব্রহ্ম”—মানে, ব্রহ্ম কোনো রূপ, রং, ধর্ম, দোষ বা বিশেষণ দ্বারা বর্ণনা করা যায় না। এখানে নির্গুণ মানে সত্তাকে কোনো বৈশিষ্ট্য দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না। উদাহরণ: ব্রহ্মকে বলা হয় না “সে শুভ্র”, “সে কালো”, “সে জ্ঞানী” ইত্যাদি। কারণ, এগুলো সীমিত গুণ; ব্রহ্ম তার বাইরে।

নির্বিশেষ (গুণবিহীন সত্তা) অর্থ: কোনো বিশেষতা বা ভেদবোধ নেই। নির্বিশেষ সত্তা মানে—যেখানে “এইরকম”–“সেইরকম” পার্থক্য আরোপ করা যায় না। ব্রহ্মকে বলা হয় “নির্বিশেষ সত্তা”, কারণ সেখানে দ্বিত্ব নেই—সচেতন/জড়, শুভ/অশুভ, জ্ঞান/অজ্ঞান—এসব ভেদ বিলীন। এখানে জোর দেওয়া হচ্ছে—সত্তার একত্ব ও অদ্বৈত অবস্থার ওপর। উদাহরণ: “সত্–চিত্–আনন্দ” যেটা বলা হয়, সেটিও কোনো বিশেষণ আরোপ নয়; বরং সীমাহীন চৈতন্যের নির্বিশেষ অবস্থা।

প্রত্যক্ষ প্রমাণ সংবেদনশীল গুণাবলির ওপর নির্ভরশীল। এটি শুধুমাত্র বস্তুর বাহ্যিক দিক এবং তার গুণ ও বিশেষত্বকে উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু আত্মা তো কোনো বস্তুগত সত্তা নয়, যা গুণ বা বিশেষের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়। আত্মা অনুভূতির ঊর্ধ্বে, তাই প্রত্যক্ষ প্রমাণের মাধ্যমে এর স্বরূপ বা অস্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা যায় না।

অন্যদিকে, অনুমান প্রমাণ প্রত্যক্ষের ওপর নির্ভরশীল এবং তার জন্য ব্যাপ্তি বা সর্বজনীন সম্পর্কের জ্ঞান অপরিহার্য। অর্থাৎ, কোনো একটি দৃষ্টান্তের ভিত্তিতে একটি সাধারণ নিয়ম তৈরি করতে হয়, যা থেকে ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতিতে অনুমান করা যায়। যেমন, ধোঁয়া দেখে আগুনের অনুমান করা হয়, কারণ ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে একটি অনিবার্য সম্পর্ক বিদ্যমান। কিন্তু আত্মার ক্ষেত্রে, যেহেতু কোনো প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই, তাই ব্যাপ্তির গঠন সম্ভব নয়। আত্মার মতো একটি অতীন্দ্রিয় সত্তার সঙ্গে কোনো জাগতিক গুণের ব্যাপ্তি স্থাপন করা কঠিন। ফলে, অনুমানের মাধ্যমেও আত্মার অস্তিত্ব বা স্বরূপ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

অতএব, আমরা দেখতে পাই যে, প্রচলিত জ্ঞান লাভের এই দুটি প্রধান মাধ্যম আত্মার মতো একটি সূক্ষ্ম এবং অতীন্দ্রিয় বিষয়কে বুঝতে বা প্রমাণ করতে ব্যর্থ। আত্মার অস্তিত্ব বা স্বরূপ সম্পর্কে কোনো যৌক্তিক জ্ঞান লাভের জন্য প্রচলিত প্রমাণের বাইরে এক ভিন্ন ধরনের উপলব্ধির প্রয়োজন হয়, যা হয়তো অভিজ্ঞতামূলক অথবা আধ্যাত্মিক হতে পারে। এই সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করে যে, লৌকিক জ্ঞান দিয়ে অলৌকিক বা পরাবিদ্যাগত সত্যের সম্পূর্ণ উপলব্ধি সম্ভব নয়।

এক্ষেত্রে একমাত্র পথ হলো সেই জ্ঞান, যা অভিজ্ঞতা ও যুক্তির ঊর্ধ্বে। এটি হলো শব্দপ্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞদের (যেমন বেদ ও উপনিষদের ঋষিগণ) সাক্ষ্য। বেদান্ত দর্শন অনুসারে, ব্রহ্ম বা আত্মাকে বাক্য ও মনের অতীত বলা হয়েছে। তাই, শব্দ বা শাস্ত্রীয় প্রমাণই চিরন্তন আত্মার অন্তর্দৃষ্টি দিতে সক্ষম। শঙ্করাচার্যের মতে, জীব ও ব্রহ্ম এক এবং অভিন্ন—এই ব্রহ্মজ্ঞানই মায়া বা অবিদ্যাকে দূর করে।

বৈদিক দর্শনের পাশাপাশি, ভারতীয় দর্শনের মহাযাত্রায় জৈন ও বৌদ্ধধর্মের মতো অন্যান্য প্রধান ধারাগুলি আত্মা ও কর্মফলের ধারণাকে তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে, যা গভীর দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। এই তুলনা কেবল ভারতীয় দর্শনের সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যকেই তুলে ধরে না, বরং তাদের মধ্যকার সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলিকেও সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

জৈন দর্শন: জৈনধর্মে, আত্মা (জীব) একটি চিরন্তন, অবিভাজ্য এবং স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে বিবেচিত। প্রতিটি জীব অসংখ্য আত্মার সমন্বয়ে গঠিত নয়, বরং প্রতিটি জীবই একটি একক আত্মা। জৈনরা বিশ্বাস করে যে, আত্মা তার নিজস্ব প্রকৃতিতে শুদ্ধ এবং সর্বজ্ঞ, কিন্তু কর্মফল (পুদ্গল) নামক সূক্ষ্ম জড় কণার দ্বারা আবৃত থাকার কারণে তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশিত হয় না। এই কর্মফল আত্মার সাথে লেগে থাকে এবং এর গতিপথ ও অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। জৈনধর্মে কর্মফল কেবল ক্রিয়ার ফল নয়, বরং এটি একটি প্রকৃত জড় উপাদান যা জীবকে বন্ধনে আবদ্ধ করে।

পুদ্গল হলো জৈন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা আত্মা ব্যতীত সমস্ত জড় পদার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। জৈন ধর্ম অনুসারে, পুদ্গল হলো একটি বাস্তব, চিরন্তন এবং অবিভাজ্য পদার্থ, যা বিশ্বের সমস্ত জড় বস্তু ও শক্তি তৈরি করে। জৈন ধর্ম বিশ্বকে জীব (জীবন্ত সত্তা, আত্মা) এবং অজীব (অ-জীবন্ত সত্তা) এই দুটি মূল শ্রেণীতে ভাগ করে। পুদ্গল হলো অজীব-এর পাঁচটি উপাদানের মধ্যে একটি। এর মূল বৈশিষ্ট্য: চিরন্তন ও বাস্তব—পুদ্গল কোনোভাবে সৃষ্ট বা ধ্বংস হয় না। এটি চিরকাল অস্তিত্বশীল। অসীম সংখ্যায়—প্রতিটি পুদ্গল পরমাণুর সংখ্যা অসীম। রূপী—পুদ্গলের রূপ আছে, অর্থাৎ এটি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা উপলব্ধিযোগ্য (স্পর্শ, গন্ধ, স্বাদ, বর্ণ)। এটিই পুদ্গলকে আত্মা থেকে আলাদা করে, কারণ আত্মা অরূপী (গুণ-বিহীন)।

জৈন দর্শনে পুদ্গলকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:

পরমাণু (Atom): এটি হলো পুদ্গলের সবচেয়ে ক্ষুদ্র এবং অবিভাজ্য কণা। জৈনরা মনে করেন, প্রতিটি পরমাণুর নিজস্ব গুণাবলী রয়েছে (স্পর্শ, রস, গন্ধ, বর্ণ), কিন্তু এটি ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধ নয়। এটিই বিশ্বের সমস্ত বস্তুর মূল উপাদান।

স্কন্ধ (Aggregate): এটি হলো পরমাণুগুলির সমন্বয়ে গঠিত বড় বস্তু। এই স্কন্ধগুলিই আমাদের চারপাশে দৃশ্যমান সমস্ত বস্তু (যেমন পাহাড়, নদী, শরীর, এবং এমনকি আলো ও অন্ধকার) তৈরি করে। স্কন্ধ আবার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন: স্থূল স্কন্ধ—যা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষযোগ্য (যেমন একটি পাথর)। সূক্ষ্ম স্কন্ধ—যা ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষযোগ্য নয়, কিন্তু অস্তিত্বশীল (যেমন মন, কর্মফল এবং শক্তি)।

জৈন দর্শন মতে, কর্ম হলো এক ধরনের সূক্ষ্ম পুদ্গল। এই কর্ম পুদ্গলগুলি আত্মার সাথে যুক্ত হয়ে তার বন্ধনের কারণ হয়। মোক্ষ বা মুক্তি লাভের জন্য এই কর্ম পুদ্গলগুলিকে আত্মা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন। মোক্ষলাভের জন্য জৈনরা কঠোর আত্ম-সংযম, অহিংসা এবং তপস্যার উপর জোর দেয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্মা থেকে ধীরে ধীরে কর্মফল ঝেড়ে ফেলা হয় এবং আত্মা তার স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মোক্ষ লাভ করে। জৈনধর্মে মোক্ষ প্রাপ্তির পর আত্মা অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত সুখ, অনন্ত শক্তি এবং অনন্ত দর্শনে স্থিত হয়।

বৌদ্ধ দর্শন: বৌদ্ধধর্মে, আত্মার ধারণাটি বৈদিক এবং জৈন ধারণার থেকে অনেকটাই ভিন্ন এবং এটি বৌদ্ধধর্মের একটি মৌলিক স্তম্ভ। বুদ্ধ 'অনাত্মা' (আত্মাহীনতা) বা 'নিরাত্মা' মতবাদ প্রচার করেন, যেখানে কোনো স্থায়ী, অপরিবর্তনীয় আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়। এই মতবাদটি আত্মসত্তার প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং সত্তার ক্ষণস্থায়ীতা ও শর্তাধীনতার ওপর জোর দেয়।

বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে যে, আমরা যাকে আত্মা বা 'আমি' বলি, তা আসলে পাঁচটি স্কন্ধের (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান) একটি ক্ষণস্থায়ী সমষ্টি মাত্র। এই স্কন্ধগুলি হলো:

রূপ (Rupa): এটি আমাদের শারীরিক অস্তিত্ব, যার মধ্যে শরীর এবং ইন্দ্রিয়গুলি অন্তর্ভুক্ত। এটি স্থূল এবং পরিবর্তনশীল।

বেদনা (Vedana): এটি অনুভূতি, যা সুখকর, দুঃখকর বা নিরপেক্ষ হতে পারে। এটি ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বস্তুর সংস্পর্শ থেকে উৎপন্ন হয় এবং সর্বদা পরিবর্তিত হয়।

সংজ্ঞা (Samjna): এটি ধারণা বা উপলব্ধি। আমরা যা দেখি, শুনি, গন্ধ পাই, স্বাদ গ্রহণ করি বা স্পর্শ করি, তার অর্থ নির্ধারণ করার ক্ষমতা। এটিও ক্ষণস্থায়ী এবং পরিবর্তিত হয়।

সংস্কার (Samskara): এটি মানসিক প্রবণতা, অভ্যাস এবং কর্মফল। ইচ্ছাশক্তি, মনোযোগ, সংকল্প ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। এই সংস্কারগুলি আমাদের পরবর্তী জীবন এবং কর্মের গতিপথ নির্ধারণ করে।

বিজ্ঞান (Vijnana): এটি চেতনা বা জ্ঞান। এটি ইন্দ্রিয় এবং মনের মাধ্যমে বস্তুসমূহের প্রতি সচেতনতা। এটি অন্যান্য স্কন্ধের ওপর নির্ভরশীল এবং নিজেও পরিবর্তনশীল।