চৌত্রিশ।
বিষয়-জগত ও ধর্ম-জগতের শিক্ষা
যারা বিষয়-জগতের প্রবক্তা—রাজা, মহারাজা, দেশ-নেতা বা রাষ্ট্রনেতা—তাঁরা মানুষকে শেখালেন দৈহিক, ঐহিক ও বৈষয়িক উন্নতির পথ। আবার যারা ধর্ম-জগতের নেতা—তাঁরা চেষ্টা করলেন আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানসিক উন্নতির পথে পরিচালিত করতে। তাঁরা সকলেই নানান শাস্ত্র-গ্রন্থ লিখে নিজেদের উপলব্ধি অনুযায়ী মানুষের জন্য নানান নিয়ম-কানুন তৈরি করলেন।
কিন্তু এই দুই ধারা একে অপরের বিপরীত। ফলে মানুষের জীবনের শুরুতেই এল সমতার অভাব। শিশু বয়সেই তাকে শেখানো হলো—“মানুষ মরণশীল”। এতে তার মনে জন্মাল ভক্তি ও ভয়; একই সঙ্গে নিজের সীমাহীন আত্মশক্তির ভিতেই পড়ল অবিশ্বাসের দাগ।
শৈশবের শিক্ষা
শিশু শিখল—“পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতার তৃপ্তিতেই দেবতাদের তৃপ্তি।” আবার শিখল—“জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।” ফলে তার মনে দ্বন্দ্ব জাগল—পিতা বেশি মাননীয়, না মাতা? কেউ মায়ের প্রতি বেশি ঝুঁকল, কেউ বা পিতার প্রতি। তবুও এভাবেই সন্তান শিখল মা-বাবার প্রতি কর্তব্যের পাঠ।
যৌবনের দ্বন্দ্ব
যৌবনে এসে সন্তান নতুন এক সংঘাতের মুখোমুখি হলো। শাস্ত্রে বলা হলো—স্ত্রীর কাছে স্বামীই পরম গুরু, আবার স্বামীর কাছে স্ত্রীর প্রতিও কর্তব্য আছে। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে মননশীল তরুণ-তরুণী শাস্ত্রের এই বিরোধপূর্ণ বাণীতে বিভ্রান্ত হয়ে গেল। শৈশবে যে-কর্তব্যকে মুখ্য মনে হয়েছিল, যৌবনে তা গৌণ হয়ে গেল।
সংসারে প্রবেশের পর বুঝল—শৈশবে মা-বাবাই ছিল আশ্রয়স্থল, কিন্তু এখন দাম্পত্যই হলো প্রধান আশ্রয়। পরবর্তীতে যখন সন্তান জন্ম নিল, তখন মায়ের মনোযোগ পুরোপুরি গেল সন্তানের দিকে। সন্তানের লালন-পালনই হলো তার প্রধান কর্তব্য। পিতাও সন্তানের গঠন ও শিক্ষার দিকে মন দিলেন। ফলে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আকর্ষণও কমে এল।
বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা
ধীরে ধীরে বয়স বাড়ল, দেহে রোগ-ব্যাধি, মনে ক্লান্তি। তখন সে বুঝল—সংসারে তার আর তেমন প্রয়োজন নেই। সবাই তাকে অবহেলা করছে, আশেপাশে আলো নেই, আশা নেই। তখন সে হয়ে উঠল একেবারেই অবাঞ্ছিত। তার জন্য আর কারও কর্তব্য নেই, সেও কারও জন্য কিছু করতে অক্ষম। তখন একমাত্র উপায় রইল নিঃসঙ্গ হয়ে বসে অজানা ঈশ্বরকে স্মরণ করা আর চোখের জল ফেলা।
শেষ পরিণতি
এভাবেই চলতে থাকে তার জীবন—যতক্ষণ না আসে চেতনার অবসান, বোধের অবসান, প্রাণের অবসান। শেষপর্যন্ত মানুষকে একাকিত্ব ও অসহায়তার মধ্যেই মৃত্যুর অপেক্ষায় কাটাতে হয়।
পঁয়ত্রিশ।
মানবজীবনের সংঘাত
জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ কেবল সংঘাতই দেখে—আদর্শে সংঘাত, শিক্ষায় সংঘাত, কর্তব্যে সংঘাত। বিষয়-জগতের নেতারা একরকম নির্দেশ দেন, ধর্ম-জগতের নেতারা দেন আরেকরকম। বিষয় বলে—“আমাকে আশ্রয় করো”, ধর্ম বলে—“আমাকে আশ্রয় করো।” ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
শৈশব, যৌবন, প্রৌঢ়—প্রতিটি বয়সে মানুষের একেকটি কর্তব্য শিখানো হয়। কিন্তু বার্ধক্যে এসে মানুষ বুঝতে পারে—যা-কিছু সে এতদিন করেছে সবই অকর্তব্য, সবই বৃথা। নিজের প্রতি কোনো কর্তব্য সে জানেইনি বা পালনও করেনি। এই ব্যর্থতা আর আর্তনাদ নিয়েই তাকে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিতে হয়।
মানবসমাজের দিশাহারা অবস্থা
আজ মানুষ দিশাহারা। তার ভেতরে জন্ম নিয়েছে হতাশা, বেদনা, বিভ্রান্তি, ক্রোধ আর ক্ষোভ। ধর্মের অনুশাসন তার কাছে হয়ে গেছে শূন্য বাণী, আর বিষয়-জগতের শাসন-শিক্ষা-সংরক্ষণও মনে হচ্ছে অর্থহীন। ধর্মীয় নেতা ও বৈষয়িক নেতাদের মমতাহীন শাসনে মানুষ জর্জরিত। এমনকি ধর্মীয় নেতারাও এখন বুঝতে পারছেন তাঁদের এতদিনকার ধ্যান-ধারণার অসারতা। অন্যদিকে রাজা-মহারাজা, বাদশাহ বা রাষ্ট্রীয় নেতারাও নিজেদের ব্যর্থতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন।
মানবতার স্বভাবনেতা
এই চরম সংকটকালে সবাই আর্তভাবে প্রার্থনা করছে—একজন প্রকৃত নেতা আসুক, যিনি সত্যিকার মঙ্গলদাতা হবেন। এই সময় মানবদেহ ধারণ করে আবির্ভূত হলেন স্বভাব-মানব, স্বভাব-নেতা। তিনি এলেন সব অভাব মোচন করে মানুষকে পূর্ণ মনুষ্যত্বে প্রতিষ্ঠা করতে।
চরম অবস্থাতেই পরমের সূচনা হয়। তাই এই সন্ধিক্ষণে তিনি প্রকাশিত হলেন—যাঁকে না জেনে, না চিনে, না বুঝেই মানুষ এতদিন হাহাকার করে ফিরেছে।
স্বভাবনেতার ঘোষণা
তিনি সবাইকে ডেকে বললেন—
“এখন আর ভয় নেই। তোমাদের সংকট কেটে গেছে। এতদিন তোমরা নিজের অপূর্ণ জ্ঞান, শিক্ষা আর চিন্তায় নিজেকে ও সমাজকে পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছ। তোমরা আদর্শ, ভিত্তি, পন্থা ও কর্তব্য কিছুই সঠিকভাবে জানোনি। তাই তোমাদের প্রচারিত কোনো আদর্শ, কোনো পন্থা, কোনো কর্তব্যই মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক হয়নি। বরং অভাব বেড়েছে বহুগুণে।
স্থাবর, জঙ্গম, কীটপতঙ্গ, লতা-গুল্ম—সবই স্বভাবের সৃষ্টি। সবার অভাবও স্বভাবের সৃষ্টি, আর তার সমাধানও স্বভাবের ভেতরেই আছে। একের পূর্ণতায় সবার পূর্ণতা নিহিত।
তোমাদের ছোটো সংসার—মা, বাবা আর সন্তানকে নিয়ে—যদি স্বাভাবিক পূর্ণতার পথে পরিচালিত হয়, তাহলে পুরো বিশ্বের অসংখ্য সংসারও সেই পূর্ণতার পথে এগিয়ে যাবে।”
সংসারে প্রবেশের পূর্বে কর্তব্য
সংসারজীবনে প্রবেশ করার আগে ভবিষ্যৎ মা ও বাবার প্রথম কর্তব্য হলো নিজ নিজ চরিত্র গঠন। চরিত্র গঠন মানে আরোপিত বা কৃত্রিম ব্রহ্মচর্য নয়, বরং স্বাভাবিক ব্রহ্মচর্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। যখন এই স্বাভাবিক ব্রহ্মচর্যে স্থিতি আসে, তখন ভাব, আদর্শ ও কর্ম—সব এক লক্ষ্যে মিলিত হয়।
অহম্ থেকে সেবায় উত্তরণ
যেখানে খণ্ড অহম্ স্বভাবের পথে “সোহম্”-এ পর্যবসিত হয়, সেখানে “আমিই কর্তা” ভাবের অবসান ঘটে। তখন আসে সেবার আদর্শ। মা ও বাবা সংসারে আর কর্তৃত্বশালী নয়, তারা কেবল “সেবক” মাত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সংসারের প্রতি সঠিক কর্তব্য সম্পাদন সম্ভব।
আদর্শ মাতা-পিতা
যদি মা-বাবা স্বভাবশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সংসারে প্রবেশ করেন, তবে তাঁরাই হতে পারেন আদর্শ মাতা-পিতা।
মায়ের আদর্শ হবে সন্তানের জীবনের স্বাভাবিক ভিত্তি গঠন।
পিতার আদর্শ হবে সন্তানের জীবনপথে সঠিক দিঙ্নির্দেশ।
সন্তান হলো মা-বাবার যুগ্ম ভাবের জীবন্ত প্রকাশ। তাই সন্তান হবে মা-বাবার আদর্শের পূর্ণ প্রতিপালক।
পূর্ণ মনুষ্যত্ব ও স্থায়ী শান্তি
এই আদর্শ বাস্তবায়নের পথই হলো স্বভাব-পন্থা, যার লক্ষ্য পূর্ণ মনুষ্যত্ব অর্জন। পূর্ণ মনুষ্যত্বে প্রতিষ্ঠিত হলে সংসারে স্বাভাবিকভাবেই স্থায়ী শান্তি আসবে।
একটি ক্ষুদ্র সংসার যদি স্বভাব-পূর্ণতায় পৌঁছায়, তবে সমগ্র বিশ্ব-সংসারও পূর্ণতায় প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন মা-বাবা-সন্তান কারও কর্তব্যে কোনো ত্রুটি থাকবে না।
বিষয় ও ধর্মের ঐক্য
যখন বিষয়-জগত আর ধর্ম-জগত মিলিত হয়, তখন মানুষ এক ভাব, এক আদর্শ, এক লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। কেননা প্রতিটি জগতই অপরের পরিপূরক—কোনোটি বাদ দিয়ে কখনও পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব নয়।
ছত্রিশ।
মানুষে শুভ বুদ্ধির প্রয়োজন
মানুষের মনে যদি শুভ বুদ্ধির উদয় না ঘটে, তবে জগতে কোনো শুভ কাজই সম্পন্ন হবে না। মানুষের অভাব-অভিযোগ যত বাড়বে, ততই সাধারণ মানুষ পশুবৃত্তির দিকে ঝুঁকবে। রাজনীতি কখনোই মানুষকে অভাব-অভিযোগ থেকে মুক্ত করতে পারবে না।
মানুষের স্বভাব-নীতি
মানুষের নিজের একটা চলার ধারা আছে—তার নাম স্বভাব-নীতি। এটা মানুষের বানানো নয়; জন্মের আগেই মানুষ এই ধারার অন্তর্গত। মানুষের তৈরি নীতি দিয়ে কোনো দিনও মানুষকে অভাব-অভিযোগ থেকে মুক্ত করা যাবে না, বরং অভিযোগ আরও বাড়তেই থাকবে।
আজকের বিশ্বরাজনীতির ফলাফল হলো—মানুষের অন্তর থেকে সরলতা, কোমলতা, স্নেহ, মায়া, মমতা, সমদুঃখবোধ, শান্তি, আনন্দ, বিশ্বাস সব কেড়ে নিয়েছে। সেই শূন্য হৃদয়ে ভরে গেছে বিষের বাষ্প। অথচ এর জন্য কারও মাথাব্যথা নেই।
ধর্মীয় বিভ্রান্তি
ধর্মজগত থেকে নির্দেশ আসে—“এই পথে এসো, শান্তি পাবে।” কিন্তু তারাও আসলে একে অপরের ওপর আস্থা রাখে না। ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ নিয়ে সবাই নিজেদের সম্প্রদায়ের প্রশংসায় ব্যস্ত। ফলে আজও মানুষের মধ্যে পূর্ণ মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটেনি। সেখানে দেবত্ব বা ঈশ্বরত্বের কথা কীভাবে সত্যি হতে পারে?
জ্ঞানের, ভক্তির আর প্রেমের অবতাররা এসেছেন, তাঁরা বলেছেন—জ্ঞান, ভক্তি, প্রেম অমর। কিন্তু তাঁদের নিজেদের মৃত্যুশীল দেহকে তাঁরা অমর প্রমাণ করতে পারেননি। তাঁরা সবাই কালের গ্রাসে বিলীন হয়েছেন। তাই জীবন্ত প্রমাণ না দেখলে মানুষ বিশ্বাস করবে কেন? আর জোর করে বিশ্বাস করাতে চাওয়াও অন্যায়।
পূর্ণ মনুষ্যত্বই আসল লক্ষ্য
মানুষের কাম্য একটাই—পূর্ণ মনুষ্যত্বের জাগরণ। কারণ এর ভেতরেই আছে পশুত্ব, দেবত্ব, ঈশ্বরত্ব, ব্রহ্মত্ব—সবকিছুর স্বাভাবিক প্রকাশ। মানুষ নামের বৈশিষ্ট্য এখানেই। মনের পূর্ণ বিকাশের শেষ সীমাও এখানেই।
মানুষ ভালো এবং মন্দ—দুটোই চরমভাবে ভোগ করেছে। সে ভগবানের কাছ থেকে স্বর্গসুখ আর চরম দুঃখ দুটোই চেয়েছে, ভোগও করেছে; কিন্তু কোথাও শান্তি বা তৃপ্তি পায়নি। তাই এবার মানুষের মধ্যে জাগবে একটাই প্রশ্ন—“কীসের উপর নির্ভর করব?”
মানুষ বিদ্যা-বুদ্ধির সব দৌড় শেষ করে ফেলেছে, তাই নিজের উপর তার আর বিশ্বাস নেই। সে দিন প্রায় এসেছে, যখন মানুষের বানানো সব কিছুই তার কাছে মায়া বা অলীক মনে হবে। তখনই সে নির্ভর করবে ভগবানের উপর।
স্বভাবই চূড়ান্ত আশ্রয়
ওই স্বভাবই মানুষকে সব রকম সুখ-দুঃখ থেকে চিরমুক্ত করে তাকে স্থাপন করবে পূর্ণ মনুষ্যত্বের আসনে। বিভক্ত মতবাদের কথা ভুলে গিয়ে ভাবতে হবে শুধু মনুষ্যত্বের কথা—যা মানুষের স্বাভাবিক সম্পদ। মনুষ্যত্বের সেই বিশ্বব্যাপী নামই হলো স্বভাব।
মানুষ কেবল এই স্বভাবেরই উপাসক। এই স্বভাবই তার সব অভাব পূর্ণ করে। বিষয়-জগত ও ধর্ম-জগত—দুটোই একে অন্যের পরিপূরক। এই দুইয়ের মধ্যে সমতা না হলে ধর্ম সম্বন্ধে উপদেশ দেওয়াই বৃথা।
সাইত্রিশ।
আমি স্বভাব—আমি এসেছি জীবন্ত, অমর দেহের সন্ধান দিতে। এতদিন তোমাদের ভালো-মন্দ, প্রিয়-অপ্রিয়, সৎ-অসৎ সব কাজই তোমাদের ইচ্ছেমতো করতে দিয়েছি। আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে কোনো বাধা দিইনি। ভেবেছিলাম, তোমরা কর্মের ফল দেখে নিজেরাই ভুল-ত্রুটি বুঝবে, শিখবে। তাই সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অপেক্ষা করে আছি।
এতদিন তোমাদের ভেতরে পশুর মতো থেকেছি, শুধু তোমাদের পশুত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য। কিন্তু তোমাদের দিকে তাকিয়ে মনে হয় না যে, তোমরা সত্যিই পশুত্ব থেকে মুক্তি চাও। আমি যেমন ক্ষুদ্রতম অণুরূপে তোমাদের ভেতরে আছি, তেমনি বিশাল বিশ্বরূপেও আছি। অথচ তোমরা ভোগের নেশায় এমন ডুবে আছ যে, ভেবেই দেখো না—কার জন্য ভোগ করছ, কাকে ভোগ করছ আর এর শেষ পরিণাম কী হতে পারে।
আমি তোমাদের দেহ, মন, প্রাণ, বুদ্ধি, জ্ঞান, চিন্তা, অনুভূতি আর কর্মশক্তি সবই দিয়েছি। কিন্তু তোমরা তার সঠিক ব্যবহার শেখোনি। যতদিন আমাকে দেহ, মন, প্রাণ আর আত্মা বলে চিনতে, ধরতে এবং অনুভব করতে না পারবে, ততদিন তোমাদের সত্যিকারের আপনভাব প্রতিষ্ঠিত হবে না। আর আপনভাব না হলে প্রকৃত ভালোবাসার সূত্রপাতও হবে না।
আমার স্বভাব কেমন জানো?
আমার স্বভাবে কোনো অভাব নেই। যারা আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তারাই অনন্ত অভাবের শিকার হয়েছে—তোমরাই তার জীবন্ত প্রমাণ। তোমরা অভাব মেটাতে ছটফট করছ, এক অভাব মিটলেই আরেক অভাব এসে ঘিরে ধরছে। তবু আমার আশ্রয় নিচ্ছ না।
তোমরা ভগবান, ঈশ্বর, দেব-দেবী, লক্ষ্মী, নারায়ণ, কুবেরের উপাসনা করেও অভাব মেটাতে পারোনি। আজ অভাবের তাড়নায় দিশেহারা হয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যা করছে। আমি জানি, মানুষ যখন আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে অভাবের ফাঁদে পড়ে, তখন তারা দেব-দেবীর আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেই সব দুয়ার বন্ধ হয়ে গেলে, একদিন-না-একদিন তারা আবার আমার কাছেই ফিরবে। কারণ আমিই সেই স্বভাব—যার ছাড়া অভাব মেটানোর আর কেউ নেই।
আমি কে—তা ক্রমে প্রকাশ করছি। আমি স্বভাব। আমার পূর্ণ জীবন্ত রূপ হলো মানব। মানবেই নিহিত সৃষ্টির প্রথম ও শেষ রূপ। মানুষই স্বভাবের পূর্ণ প্রকাশ। এর পর আর কোনো সৃষ্টি নেই। যা-কিছু অপ্রাকৃত সৃষ্টি, তা-ও মানুষেরই অপ্রাকৃত রূপ, অন্য কিছু নয়।
আমার মধ্যে কর্ম আপনিই ঘটে—কাউকে দিয়ে আমাকে প্রেরণা দিতে হয় না। তাই আমার মধ্যে জ্ঞান, ভক্তি, প্রেম আর কর্ম—সব একই জিনিস, ভেদহীন। একটিকে দেখলেই বাকিগুলোও দেখা হয়ে যায়।
আমার পূর্ণ পরিচয়: আমি সবসময় জীবন্তভাবে স্থূলের মতো মাধ্যমেই দিয়ে থাকি। আমার মধ্যে কাল বা অকালের কোনো প্রশ্ন নেই। সূক্ষ্ম, কারণ আর মহাকারণ—সবই আমার স্থূল দেহের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়।