অন্তর্মার্গ: ৩




কণ্ঠ ১ (স্বগতোক্তি): তাহলে এই মন—যার মধ্য দিয়ে আমি ভাবি, অনুভব করি—এ-ই যদি শত্রু হয়, তবে কে বন্ধু?
কণ্ঠ ২ (শান্ত গভীরতায়): মনই জগত। মনই মায়া। মনই জন্ম-মৃত্যুর শেকল। যেখানে মন নেই, সেখানেই তুমি।

দু-জন একসাথে (সুরে, স্তব্ধতা ছুঁয়ে যাবার মতো করে): জ্ঞান ও অজ্ঞান—উভয়ই শূন্য। স্বপ্ন ও জাগরণ—উভয়ই বিভ্রম। সাধন ও সিদ্ধি—উভয়ই মায়া। হরিণের শিঙের মতো—এই জগত এক কল্পনামাত্র।

কণ্ঠ ২ (শেষ পঙ্‌ক্তি, নীরবতা ছেদ করে): আর সেই নীরবতার নামই ব্রহ্ম। জগৎ নেই, ঈশ্বর নেই, মুক্তিও নেই—সবই কল্পনার মায়া। মনই রচনা করে এ বিশ্ব, আর সেই মনই বিভ্রান্তি। যেখানে মন থামে, সেখানেই আমি জেগে উঠি—রূপহীন, নামহীন, চির-আমি।

কণ্ঠ ১ (নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়ী, আত্মঅন্বেষণে প্রশ্ন রাখে): আমি কে? এই দেহ তো ক্ষয়প্রাপ্ত, মন তো রাগে-ভয়ে কাঁপে! তবে সেই “আমি” কোথায়, যে থাকে সমস্ত পরিবর্তনের অতলে?
কণ্ঠ ২ (স্থির, নিরুত্তাপ, সত্যবোধে দীপ্ত কণ্ঠ): তুমি সেই—যে দেহ নয়, মন নয়, স্মৃতি নয়। তুমি চৈতন্য—নিরাকার, নিরুদ্দেশ, নির্ভয়। তুমি ব্রহ্ম।
কণ্ঠ ১ (মৃদু বিস্ময়ে): আমি? ব্রহ্ম? এই দীন-ক্ষীণ দেহে আবদ্ধ মানুষটি?
(কণ্ঠ ২): না, মানুষ বলেই তুমি সীমাবদ্ধ—এই বোধটাই মায়া। তুমি সে বোধেরও ঊর্ধ্বে। “আমি ব্রহ্ম”—এই অনুভবই সত্যের একমাত্র আলয়।
(কণ্ঠ ১): তবে কি এ অনুভবই যথেষ্ট? কোনো সাধনা, কোনো উপাসনা নয়?
কণ্ঠ ২ (মৌন সুরে, যেন নিরন্তর বয়ে চলা): “আমি ব্রহ্ম”—এই ধ্যানেই ত্যাগ সম্পূর্ণ হয়। এই অনুভবেই সব মন্ত্র বিলীন। এই উপলব্ধিই অনন্ত হোম, চেতনার যজ্ঞ।
(কণ্ঠ ১): তবে কি এই “আমি” হয়ে ওঠে সর্বব্যাপী? এই আমি-ই কি বিশ্ব, এই আমি-ই কি শূন্য?
(কণ্ঠ ২): তুমি জ্যোতি, তুমি নিঃসীম, তুমি শুদ্ধ, তুমি আদি ও অনাদি। তুমি সেই, যা না শুরু, না শেষ—তুমি সেই, যা শুধু “আমি”।

দু-জন একসাথে (ধীরগতিতে ও গভীর ছন্দে, যেন আত্মপ্রকাশ): “আমি ব্রহ্ম”—এই বোধে লীন হয় সকল ভ্রান্তি। এই অভিজ্ঞানই মুক্তির উৎস, এই আমি-ই অনন্ত চৈতন্য। আমি নই মাটির দেহ, নই মন-ভরা স্নেহ। আমি চির, আমি স্থির, নই কোনো জন্মের তীর। “আমি ব্রহ্ম”—এই যে ধ্বনি, পুড়িয়ে ফেলে মোহের কণি। জ্ঞান, সাধনা, রীতি-নীতি—সব পেছনে ফেলে, আমি জেগে উঠি।

কণ্ঠ ১ (উৎসুক কণ্ঠে, বৈদিক রীতি জানার আগ্রহে): হোমে ঘৃত, মন্ত্র, অগ্নি, আহুতি—এ-ই তো ব্রহ্মার্পণ যজ্ঞের রীতি? সেই অগ্নি কি পবিত্র পথ?
কণ্ঠ ২ (শান্ত, স্বনির্ভর কণ্ঠে): যে জানে—“আমি ব্রহ্ম”, তার নীরবতা-ই হোম, চৈতন্য-ই অর্ঘ্য, আর আত্মস্থ হওয়াই তার যজ্ঞ।