দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

আলো ও নৈঃশব্দ্য: ৫



গ্লাজেনাপ এই গবেষণাগুলোর আলোকে বৌদ্ধ মুক্তিপথের সারসংক্ষেপ দেন এভাবে: মুক্তির জন্য প্রয়োজন তিনটি প্রশিক্ষণ—শীল (নৈতিক সংযম, অর্থাৎ সঠিক আচরণ), সমাধি (একাগ্রতা, অর্থাৎ মনকে স্থির করা) এবং প্রজ্ঞা (paññā, পঞ্ঞা, অন্তর্দৃষ্টি, অর্থাৎ অস্তিত্বের প্রকৃত স্বরূপ দেখা)। এই প্রজ্ঞার মূল বিষয়বস্তু: সমস্ত সংস্কার অনিত্য, সমস্ত সংস্কার দুঃখময় এবং সমস্ত ধর্ম আত্মাশূন্য। এই তিন-অন্তর্দৃষ্টি অর্জিত হলে সাধক জীবদ্দশায় সোপাধিশেষ নির্বাণ লাভ করেন—অর্থাৎ তৃষ্ণা ও অজ্ঞানতা নিভে গেছে, কিন্তু শরীর এখনো আছে, কর্মের পুরোনো ফল এখনও ভোগ করতে হচ্ছে। মৃত্যুর পর অনুপাধিশেষ নির্বাণ—অর্থাৎ সম্পূর্ণ নির্বাপণ, কোনো শর্তযুক্ত অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই।


সবশেষে গ্লাজেনাপ তাঁর সমগ্র বিশ্লেষণের চূড়ান্ত বাক্য বলেন: নির্বাণও একটি ধর্ম (dharma)—এবং সমস্ত ধর্ম অনত্তা। অর্থাৎ নির্বাণও আত্মা নয়। এটি বৌদ্ধ দর্শনের মূল ধারণা: সমস্ত ধর্ম—শর্তযুক্ত হোক বা অশর্তযুক্ত হোক, সংসার হোক বা নির্বাণ হোক—আত্মাশূন্য। এই একটি বাক্যে গ্লাজেনাপের পুরো ভাবনার সার নিহিত।


বেদান্তের নেতি নেতি ও পঞ্চকোষ: নঞর্থক ধর্মতত্ত্বের আলোকে


বেদান্তের সবচেয়ে গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি হলো নেতি নেতি—'এটিও নয়, ওটিও নয়' (বৃহদারণ্যক ২.৩.৬; ৪.৫.১৫)। এই পদ্ধতিটি বোঝা দরকার, কারণ এটি বেদান্তকে বৌদ্ধ শূন্যতার সবচেয়ে কাছে নিয়ে আসে—এবং একই সাথে দুইয়ের মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম পার্থক্যটি ধরিয়ে দেয়।


বৃহদারণ্যক উপনিষদে যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞেস করা হয়: ব্রহ্ম কী? তিনি উত্তরে বললেন না, ব্রহ্ম কী—বরং বললেন, ব্রহ্ম কী নয়: 'স্থূলও নয়, সূক্ষ্মও নয়; হ্রস্বও নয়, দীর্ঘও নয়; রক্তবর্ণও নয়, তৈলাক্তও নয়; ছায়াহীন, অন্ধকারহীন; বায়ুহীন, আকাশহীন।' প্রতিটি ইতিবাচক গুণকে একে একে বারিত করা হচ্ছে—যেন পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো হচ্ছে, স্তরে স্তরে। বেদান্তের দাবি: সব খোসা ছাড়ানোর পরও কিছু একটা থেকে যায়—সেটিই ব্রহ্ম। বৌদ্ধধর্মের দাবি হতো এমন: সব খোসা ছাড়ালে দেখবে, ভেতরে কিছুই নেই—পেঁয়াজটাও শুধুই খোসা, কোনো 'সার' নেই।


এই নঞর্থক পদ্ধতি—যাকে পাশ্চাত্য ধর্মতত্ত্বে বলা হয় apophatic theology বা via negativa (নেতিবাচক পথ)—পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। গ্রিক-রোমান নব্য-প্লেটোবাদী প্লোটিনোস (২০৫-২৭০ খ্রি.) তাঁর এন্নিয়াদে (Enneads) বলেছেন: পরম সত্তা 'দ্য ওয়ান' (তো হেন, to hen) সমস্ত গুণের অতীত—'সত্তার ঊর্ধ্বে' (এপেকেইনা তেস উসিয়াস, epekeina tes ousias)। যেমন সূর্যের দিকে সরাসরি তাকালে চোখ অন্ধ হয়ে যায়—আলো এতটাই তীব্র যে, দেখা যায় না—তেমনি পরম একত্ব বুদ্ধি দিয়ে ধরা যায় না, কেবল 'হেনোসিস' (henosis, মিলন)—অর্থাৎ নিজেকে সেই একত্বে হারিয়ে ফেলা—দ্বারা অনুভবযোগ্য। প্লোটিনোস বেদান্তের ব্রহ্মের মতো একটি ইতিবাচক পরম সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করেন—তাঁর 'দ্য ওয়ান' বৌদ্ধ শূন্যতার মতো নেতিবাচক 'অতলতা' নয়, বরং সব কিছুর উৎস ও ভিত্তি।


মধ্যযুগীয় জার্মান খ্রিস্টান সন্ন্যাসী মাইস্টার একহার্ট (১২৬০–১৩২৮) আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন—এতটাই যে, ক্যাথলিক চার্চ তাঁর কিছু শিক্ষাকে ধর্মদ্রোহ বলে নিন্দা করেছিল। একহার্ট পার্থক্য করেন 'ঈশ্বর' (Gott) ও 'ঈশ্বরত্ব' (Gottheit, Godhead)-এর মধ্যে। ঈশ্বর হলেন যিনি সৃষ্টি করেন, রক্ষা করেন, ভালোবাসেন—খ্রিস্টানরা যাঁর কাছে প্রার্থনা করেন। কিন্তু ঈশ্বরত্ব হলো ঈশ্বরেরও পেছনে থাকা সেই অনির্বচনীয় শূন্যতা—'মরুভূমি' (ভ্যুস্টে, Wüste)—যেখানে কোনো নাম নেই, কোনো গুণ নেই, কোনো ক্রিয়া নেই। একহার্ট বলেছেন: 'আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাকে ঈশ্বর থেকে মুক্ত করেন।' এই অভিব্যক্তিটি—ঈশ্বরকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—বৌদ্ধ শূন্যতার সাথে আশ্চর্য সাদৃশ্য বহন করে। তবে একহার্টের 'মরুভূমি'ও শেষ পর্যন্ত একটি ইতিবাচক সত্তা—'সমস্ত নিষেধের পরও যা থেকে যায়'—বৌদ্ধ শূন্যতা সেই 'থেকে যাওয়া'-টুকুকেও অস্বীকার করে।


তৈত্তিরীয় উপনিষদে (২.১-৫) বর্ণিত পঞ্চকোষ তত্ত্ব নেতি নেতি পদ্ধতির একটি সুসংগঠিত প্রয়োগ। পাঁচটি কোষ বা আবরণ—অন্নময় (শরীর, খাদ্য দ্বারা পুষ্ট), প্রাণময় (জীবনীশক্তি, শ্বাসপ্রশ্বাস), মনোময় (মন, চিন্তা ও আবেগ), বিজ্ঞানময় (বুদ্ধি, বিবেক, সিদ্ধান্ত-ক্ষমতা) ও আনন্দময় (আনন্দ, গভীর ঘুমের প্রশান্তি)—এই পাঁচটি স্তরে আত্মা যেন প্যাঁচানো। সাধক প্রতিটি স্তরে বলেন: 'এটিও আমি নই—আমি এই শরীর নই, আমি এই শ্বাস নই, আমি এই মন নই, আমি এই বুদ্ধি নই, আমি এই আনন্দও নই'—এবং সমস্ত কোষ ছাড়িয়ে পৌঁছান নিরবয়ব আত্মায়, যা কোনো কোষ নয়, কিন্তু সব কোষের ভেতরে আছে।


এই প্রক্রিয়া বৌদ্ধ পঞ্চস্কন্ধ বিশ্লেষণের সাথে কাঠামোগতভাবে আশ্চর্যরকম সাদৃশ্যপূর্ণ—রূপ (শরীর), বেদনা (অনুভূতি), সঞ্ঞা (প্রত্যক্ষণ), সঙ্খার (মানসিক গঠন), বিঞ্ঞাণ (চৈতন্য)। উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচটি স্তর, উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিটি স্তরকে 'এটি আমি নই' বলে পরীক্ষা করা। কিন্তু সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ বিপরীত: বেদান্তী বলেন, 'পাঁচটি কোষ ছাড়ানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে—সেটিই আমি, সেটিই আত্মা'; বৌদ্ধ বলেন, 'পাঁচটি স্কন্ধ পরীক্ষা করার পর দেখা যায়—কিছুই অবশিষ্ট থাকে না যাকে আত্মা বলা যায়।' একই হাতিয়ার, একই পদ্ধতি, বিপরীত ফলাফল।


অগ্নিসূত্র ও কচ্চানগোত্ত সুত্ত: বৌদ্ধ আধ্যাত্মিকতার গভীরতর স্তর


বৌদ্ধ আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী উপদেশগুলোর একটি হলো আদিত্তপরিয়ায় সুত্ত (SN 35.28, অগ্নি উপদেশ)। এই সুত্তের পটভূমি নাটকীয়: গয়ার কাছে উরুবেলায় এক হাজার পূর্ববর্তী অগ্নি-উপাসক ভিক্ষুর সামনে—যাঁরা সদ্য দীক্ষা নিয়েছিলেন এবং যাঁদের কাছে 'আগুন' ছিল পবিত্র—বুদ্ধ ঘোষণা করলেন: 'ভিক্ষুগণ, সব কিছু জ্বলছে। কী জ্বলছে? চোখ জ্বলছে, রূপ জ্বলছে, চক্ষু-বিজ্ঞান জ্বলছে—কীসের আগুনে? রাগের আগুনে, দ্বেষের আগুনে, মোহের আগুনে, জন্ম-জরা-মৃত্যু-শোক-কান্না-দুঃখ-বিষাদ-হতাশার আগুনে।' এই 'আগুনে জ্বলা' উপমাটি সরাসরি নির্বাণের সাথে সম্পর্কিত—'নির্বাণ' শব্দের আক্ষরিক অর্থই 'আগুন নেভা'—সেই তৃষ্ণার আগুন, যা সংসারচক্রকে ঘুরিয়ে চলে। অগ্নি-উপাসকদের জন্য এটি বিশেষভাবে তীক্ষ্ণ ছিল: তোমরা আগুনকে পবিত্র মনে করো, কিন্তু আসল আগুন তোমাদের ভেতরেই জ্বলছে—এবং সেটি পবিত্র নয়, যন্ত্রণাদায়ক।


কচ্চানগোত্ত সুত্ত (SN 12.15) আরেকটি অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ—সম্ভবত বৌদ্ধ দর্শনের সবচেয়ে ঘনীভূত দার্শনিক বক্তব্য। কচ্চানগোত্ত বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন: 'সম্যক্ দৃষ্টি কী?' অর্থাৎ সত্যকে সঠিকভাবে দেখা মানে কী? বুদ্ধ উত্তরে বললেন: 'জগৎ সাধারণত দুটি চরমের ওপর নির্ভর করে—অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব। কিন্তু যিনি যথার্থ প্রজ্ঞায় জগতের উৎপত্তি দেখেন, তাঁর কাছে অনস্তিত্বের ধারণা ওঠে না; যিনি যথার্থ প্রজ্ঞায় জগতের নিরোধ দেখেন, তাঁর কাছে অস্তিত্বের ধারণা ওঠে না।'


সহজ ভাষায়: সাধারণ মানুষ মনে করে, হয় 'জিনিসটা আছে' (শাশ্বতবাদ, sassatavāda—বেদান্তের আত্মবাদ এই দিকে ঝোঁকে), অথবা 'জিনিসটা নেই' (বিনাশবাদ, ucchedavāda—বস্তুবাদী শূন্যবাদ)। বুদ্ধ উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করেন: যা আছে, তা 'আছে' বা 'নেই' কোনোটিই নয়—যা আছে, তা 'উৎপন্ন হচ্ছে ও নিরুদ্ধ হচ্ছে'—একটি প্রক্রিয়া, কোনো জিনিস নয়। এই মধ্যম পথ নাগার্জুনের মধ্যমক দর্শনের প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি—নাগার্জুন নিজেই মূলমধ্যমককারিকায় এই সুত্ত উদ্ধৃত করেছেন—এবং বৌদ্ধধর্মকে শূন্যবাদ (nihilism) বলে সমালোচনা করার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ। বৌদ্ধধর্ম বলে না, 'কিছু নেই'—বলে, 'কিছু "আছে" বা "নেই" সেভাবে নয়, যেভাবে তুমি ভাবছ।'


চতুরার্য সত্য: বৌদ্ধ দুঃখবিদ্যার সম্পূর্ণ কাঠামো


বৌদ্ধধর্মের মুক্তি-ধারণাকে পূর্ণভাবে বুঝতে হলে চতুরার্য সত্যকে (cattāri ariyasaccāni)—বুদ্ধের প্রথম উপদেশ ধম্মচক্কপ্পবত্তন সুত্তে (SN 56.11, বারাণসীর কাছে ঋষিপতন মৃগদাবে পাঁচজন সঙ্গী-পরিব্রাজকের সামনে প্রদত্ত)—সামগ্রিকভাবে দেখা দরকার, কারণ এটিই বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণ রোগনিদান ও চিকিৎসাবিধি। বুদ্ধ নিজেকে একজন চিকিৎসকের সাথে তুলনা করেছেন: রোগ কী (দুক্খ), রোগের কারণ কী (সমুদয়), রোগ সারানো সম্ভব কি না (নিরোধ), এবং চিকিৎসা কী (মগ্গ)।


প্রথম সত্য—দুক্খ (dukkha, দুঃখ): জন্ম দুঃখ, জরা দুঃখ, ব্যাধি দুঃখ, মৃত্যু দুঃখ; অপ্রিয়ের সংযোগ দুঃখ, প্রিয়ের বিয়োগ দুঃখ, যা কামনা করা হয়, তা না পাওয়া দুঃখ। সংক্ষেপে পঞ্চ-উপাদান-স্কন্ধই দুঃখ—অর্থাৎ এই পাঁচটি স্কন্ধকে 'আমি' বলে আঁকড়ে ধরাটাই দুঃখের মূল। 'দুক্খ' শব্দটি বুঝতে ভুল হলে পুরো বৌদ্ধধর্ম ভুল বোঝা হয়। এটি কেবল 'কষ্ট' বা 'যন্ত্রণা' নয়—বরং সমগ্র শর্তযুক্ত অস্তিত্বের এক মৌলিক অসন্তোষজনকতা (unsatisfactoriness)। সুখের মুহূর্তেও দুক্খ আছে—কারণ সেই সুখ টিকবে না, এবং তার না-টেকাটাই দুক্খ। অনিত্যতা থেকে দুক্খ অনিবার্যভাবে উদ্ভূত।


দ্বিতীয় সত্য—সমুদয় (samudaya, দুঃখের কারণ): তণ্হা—তৃষ্ণা বা আকাঙ্ক্ষা। তিন প্রকার: কামতণ্হা (ইন্দ্রিয়সুখের তৃষ্ণা—সুন্দর দেখতে, সুন্দর শুনতে, সুস্বাদু খেতে চাওয়া), ভবতণ্হা (অস্তিত্বের তৃষ্ণা—'আমি থাকতে চাই, আমি চিরকাল থাকতে চাই'—শাশ্বতবাদ) এবং বিভবতণ্হা (বিনাশের তৃষ্ণা—'আমি আর থাকতে চাই না, সব শেষ হয়ে যাক'—বিনাশবাদ)। ভবতণ্হা গ্লাজেনাপের বিশ্লেষণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এটিই সেই তৃষ্ণা, যা 'একটি শাশ্বত আত্মা আছে, আমি চিরকাল থাকব' এই বিশ্বাসকে জন্ম দেয়। বেদান্তের দৃষ্টিতে আত্মনে প্রত্যাবর্তনই মুক্তি; কিন্তু বৌদ্ধ দৃষ্টিতে সেই প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষাই (ভবতণ্হা) বন্ধনের এক সূক্ষ্মতম রূপ—সবচেয়ে সূক্ষ্ম শিকল, কারণ মানুষ একে শেকল মনেই করে না, মুক্তি মনে করে।


তৃতীয় সত্য—নিরোধ (nirodha, দুঃখের নিবৃত্তি): তণ্হার সম্পূর্ণ বিরাগ, নিরোধ ও পরিত্যাগ—এটিই নির্বাণ। চতুর্থ সত্য—মগ্গ (magga, পথ): আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ—সম্যক্ দৃষ্টি (বাস্তবতাকে যথার্থভাবে দেখা), সম্যক্ সংকল্প (ত্যাগ, অহিংসা ও করুণার সংকল্প), সম্যক্ বাক্ (মিথ্যা-পরনিন্দা-কঠোর-অসার কথা থেকে বিরত থাকা), সম্যক্ কর্মান্ত (হত্যা-চুরি-ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা), সম্যক্ আজীব (সৎ জীবিকা), সম্যক্ ব্যায়াম (অকুশল মনোবৃত্তি দমন ও কুশল মনোবৃত্তি উদ্দীপন), সম্যক্ স্মৃতি (শরীর-অনুভূতি-মন-ধর্মের প্রতি সচেতন পর্যবেক্ষণ) এবং সম্যক্ সমাধি (গভীর একাগ্রতা, ধ্যানের চারটি স্তর)। এই আটটি অঙ্গ তিনটি প্রশিক্ষণে বিভক্ত: শীল (নৈতিকতা—বাক্, কর্মান্ত, আজীব), সমাধি (মানসিক শৃঙ্খলা—ব্যায়াম, স্মৃতি, সমাধি), এবং প্রজ্ঞা (অন্তর্দৃষ্টি—দৃষ্টি, সংকল্প)। লক্ষণীয়: এই পথে কোনো 'ঈশ্বরের কৃপা' বা 'আত্মার উন্মোচন' নেই—কেবল নিজের চেষ্টায় নিজের অজ্ঞানতা দূর করা। বেদান্তেও পুরুষকার (ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা) গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেখানে শেষপর্যন্ত 'আত্মা নিজেকে নিজে চেনে'—একটি অন্তর্নিহিত সত্তার স্ব-উদ্ঘাটন। বৌদ্ধ মার্গে কোনো 'অন্তর্নিহিত সত্তা' নেই, যে নিজেকে চিনবে—আছে শুধু একটি প্রক্রিয়া, যা ক্রমশ নিজের প্রকৃতি বুঝতে শেখে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *