দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

আলো ও নৈঃশব্দ্য: ৭



শোপেনহাওয়ার ও পাশ্চাত্য দর্শনে ভারতীয় প্রতিধ্বনি


আর্থার শোপেনহাওয়ার (১৭৮৮-১৮৬০) সম্ভবত প্রথম ইউরোপীয় দার্শনিক, যিনি ভারতীয় দর্শনকে কেবল কৌতূহলের বিষয় হিসেবে নয়, নিজের দর্শনের অন্তর্গত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, উপনিষদ তাঁর জীবনের সান্ত্বনা এবং মৃত্যুরও সান্ত্বনা হবে। তাঁর মূল গ্রন্থ Die Welt als Wille und Vorstellung ('ইচ্ছা ও ধারণা হিসেবে জগৎ', ১৮১৮)-এ দুটি মৌলিক প্রত্যয় আছে: প্রথমত, জগৎ হলো 'ধারণা' (Vorstellung)—অর্থাৎ আমরা যা দেখি, তা জগৎ নয়; জগতের একটি চেতনায় প্রক্ষেপণ, একটি ছবি, যা আমাদের মন তৈরি করছে। দ্বিতীয়ত, এই ছবির পেছনে আছে 'ইচ্ছা' (Wille)—একটি অন্ধ, অতৃপ্ত, অবিরাম তাড়না, যা সমস্ত অস্তিত্বকে চালিয়ে যাচ্ছে। গাছের মূল যেমন মাটির গভীরে জল খোঁজে—কোনো 'সিদ্ধান্ত' নিয়ে নয়, একটি অন্ধ তাড়নায়—তেমনি সমগ্র জগৎ এই ইচ্ছার অন্ধ তাড়নায় চলছে।


এখানে দুটি ভারতীয় প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। শোপেনহাওয়ারের 'ধারণা' ও বেদান্তের মায়া—উভয়ই বলে: দৃশ্যমান জগৎ প্রকৃত নয়, একটি আবরণ বা প্রক্ষেপণ। শোপেনহাওয়ারের 'ইচ্ছা' ও বৌদ্ধ তণ্হা (তৃষ্ণা)—উভয়ই বলে: দুঃখের মূল হলো অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, যা কখনও পূর্ণ হয় না এবং যা অস্তিত্বকে এক অন্তহীন চক্রে ঘুরিয়ে চলে। শোপেনহাওয়ার নিজেও এই সংযোগ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন—১৮৫৬ সালের একটি পত্রে তিনি বৌদ্ধ উপাদান (upādāna, আঁকড়ে ধরা) ধারণাকে তাঁর 'ইচ্ছা-জীবনের' (Wille zum Leben) সমতুল্য বলেছেন। তাঁর দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য—'ইচ্ছার নিষেধ' (Willensverneinung, ইচ্ছাকে 'না' বলা)—তিনি নিজেই নির্বাণের সাথে তুলনা করেছেন: যখন মানুষ এই অন্ধ তাড়নাকে চিনতে পারে এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করে, তখনই মুক্তি।


তবে শোপেনহাওয়ারের দর্শন ভারতীয় দর্শনের সুনির্দিষ্ট কোনো শাখার অনুবাদ নয়—বরং দুটি শাখার একটি অসম্পূর্ণ সংকর। কেন অসম্পূর্ণ? কারণ শোপেনহাওয়ারের 'ইচ্ছা' কান্টের 'বস্তু-স্বরূপ' (Ding an sich, thing-in-itself)-এর সমতুল্য—অর্থাৎ পরম সত্তা, জগতের পেছনে যা আসলে আছে। কিন্তু বেদান্তের ব্রহ্ম সৎ-চিৎ-আনন্দ (অস্তিত্ব-চেতনা-আনন্দ), আর শোপেনহাওয়ারের 'ইচ্ছা' অন্ধ ও দুঃখময়—অর্থাৎ, তিনি বেদান্তের কাঠামো নিয়েছেন, কিন্তু তাতে বৌদ্ধ বিষয়বস্তু যোগ করেছেন। তাঁর 'ইচ্ছার নিষেধ' নির্বাণের মতো শোনায়, কিন্তু তিনি একে 'শূন্যতা' (Nichts, Nothing) বলেন—এবং পাদটীকায় বৌদ্ধ প্রজ্ঞাপারমিতা সাহিত্যের শূন্যতার সাথে তুলনা করেন। অর্থাৎ, তিনি একই সাথে বেদান্তের মায়াবাদ এবং বৌদ্ধ শূন্যতা—দুটি পরস্পরবিরোধী দর্শন—নিজের কাঠামোয় মেশাতে চেয়েছেন, যা গ্লাজেনাপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী অসম্ভব।


শোপেনহাওয়ারের পরে দু-জন পাশ্চাত্য দার্শনিক ভারতীয় দর্শনের ভিন্ন ভিন্ন দিকের প্রতিধ্বনি তুলেছেন—যদিও সরাসরি প্রভাবের প্রমাণ সর্বত্র পাওয়া যায় না। লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন (১৮৮৯-১৯৫১) তাঁর Tractatus Logico-Philosophicus (১৯২১)-এর শেষ বাক্যে লিখেছেন: 'Wovon man nicht sprechen kann, darüber muss man schweigen'—“Whereof one cannot speak, thereof one must be silent.”—'যা বলা যায় না, তা নিয়ে নীরব থাকতে হবে।' এই বাক্য একই সাথে বেদান্তের নেতি নেতি (ব্রহ্মকে ভাষায় ধরা যায় না) ও বৌদ্ধ শূন্যতার (পরম সত্য ভাষার অতীত) প্রতিধ্বনি। ভিটগেনস্টাইন ভারতীয় দর্শন পড়েছিলেন কি না, তা বিতর্কিত, কিন্তু অনুরণনটি অস্বীকার্য। অন্যদিকে, ডেভিড হিউম তাঁর A Treatise of Human Nature (১৭৩৯) গ্রন্থে 'বান্ডল থিওরি অব সেলফ' প্রস্তাব করেছিলেন—'আমি' বলে কিছু নেই, কেবল অভিজ্ঞতার একটি প্রবাহ আছে, যাকে আমরা 'আমি' বলে ডাকি। এটি বৌদ্ধ অনাত্মতত্ত্বের সাথে এতটাই সাদৃশ্যপূর্ণ যে, জেমস জাইলস তাঁর Philosophy East and West (১৯৯৩) প্রবন্ধে বিস্তারিত তুলনা করেছেন। তবে হিউমের সাথে বৌদ্ধধর্মের কোনো ঐতিহাসিক যোগসূত্র পাওয়া যায়নি—এটি দুটি স্বতন্ত্র চিন্তাধারার স্বাধীন আবিষ্কার, যা মানবমনের একটি সর্বজনীন দার্শনিক সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে।


স্পিনোজা, সিমোন ভেইল ও আধুনিক আধ্যাত্মিকতা


বারুখ স্পিনোজা (১৬৩২-১৬৭৭)—আমস্টারডামের পর্তুগিজ-ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ধর্মদ্রোহের অভিযোগে সিনাগগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন—তাঁর Ethics (১৬৭৭, মৃত্যুর পর প্রকাশিত) গ্রন্থে একটি সাহসী ঘোষণা করেন: 'দেউস সিভে নাতুরা' (Deus sive Natura, “God, or Nature”)—'ঈশ্বর, অর্থাৎ প্রকৃতি'। ঈশ্বর ও প্রকৃতি আলাদা কিছু নয়—ঈশ্বরই প্রকৃতি, প্রকৃতিই ঈশ্বর। এই ধারণাকে অনেকে 'পাশ্চাত্য বেদান্ত' বলে থাকেন, এবং সাদৃশ্যটি গভীর: স্পিনোজার একমাত্র 'দ্রব্য' (Substance)—যা স্বনির্ভর, অসীম, সব কিছুর কারণ ও ভিত্তি—বেদান্তের ব্রহ্মের সাথে কাঠামোগতভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। যেমন ব্রহ্ম থেকে সব কিছু বেরিয়ে আসে এবং ব্রহ্মই সব কিছু, তেমনি স্পিনোজার দ্রব্যই সব কিছু—বাকি সব তার 'পদ্ধতি' (mode) বা প্রকাশভঙ্গি মাত্র। বৌদ্ধ দর্শনের সাথে স্পিনোজার বিরোধ তাই বেদান্তের বিরোধেরই সমান্তরাল—স্পিনোজার 'একমাত্র দ্রব্য' বৌদ্ধ অনাত্মা ও শূন্যতার সরাসরি বিপরীত।


সিমোন ভেইল (১৯০৯-১৯৪৩)—ফরাসি দার্শনিক, সমাজকর্মী ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ, যিনি মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে মারা যান—তাঁর দর্শনে একটি অদ্ভুত ধারণা আছে: 'ডিক্রিয়েশন' (décréation)। সৃষ্টি (création) মানে ঈশ্বর জগৎ তৈরি করেছেন; ডিক্রিয়েশন মানে 'অ-সৃষ্টি'—নিজেকে 'অ-সৃষ্টি' করা, নিজের 'আমি'-সত্তাকে এমনভাবে সরিয়ে নেওয়া যেন ঈশ্বরের আলো বাধাহীনভাবে প্রবাহিত হতে পারে। ভেইল বলেছেন: ঈশ্বর জগৎ সৃষ্টি করার জন্য নিজেকে সংকুচিত করেছিলেন (ইহুদি কাব্বালার 'ৎসিমৎসুম' ধারণার মতো)—মানুষের কাজ হলো সেই সংকোচনের প্রতিউত্তরে নিজেকে সংকুচিত করা, নিজের অহং সরিয়ে নেওয়া, যেন ঈশ্বর আবার সেই জায়গায় আসতে পারেন।


ইহুদি কাব্বালার ৎসিমৎসুম (Tzimtzum / Tsimtsum) ধারণা হলো—ঈশ্বর সৃষ্টিজগতের জন্য “স্থান” তৈরি করতে নিজেকে যেন সংকুচিত, সংবৃত, বা আত্মগোপন করলেন।


সহজ করে বললে: ঐশী অসীমতা (Ein Sof) যদি সর্বত্র সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত থাকে, তাহলে সীমিত জগতের আলাদা অস্তিত্বের জায়গা কোথায়? ৎসিমৎসুম এই প্রশ্নের এক মরমি উত্তর: ঈশ্বর তাঁর অসীম আলোর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি আড়াল করলেন, যাতে সৃষ্টির উদ্ভব সম্ভব হয়। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা আছে:

আক্ষরিক অর্থে ঈশ্বর কোথাও থেকে সরে গেছেন—এমনটা সব কাব্বালিস্ট মানেন না।

অনেকে বলেন, এটি রূপক: ঈশ্বর লুপ্ত হননি, বরং তাঁর উপস্থিতি গোপন হয়েছে।

অর্থাৎ, জগৎ ঈশ্বরশূন্য নয়; বরং ঈশ্বরের উপস্থিতি এখানে আবৃত।


এই ধারণাটি বিশেষভাবে যুক্ত আইজাক লুরিয়ার (Isaac Luria, লুরিয়ানিক কাব্বালা) সঙ্গে। এর সঙ্গে আরও দুটি সংশ্লিষ্ট ধারণা প্রায়ই আসে: শেভিরাত হা-কেলিম—পাত্রভঙ্গ, তিক্কুন—মেরামত বা পুনর্গঠন। অর্থাৎ: সংকোচন থেকে সৃষ্টি, তা থেকে ভাঙন, তা থেকে মেরামত।


দার্শনিকভাবে, ৎসিমৎসুম বোঝাতে চায়: কীভাবে অসীম থেকে সীমিত, কীভাবে ঐশী পূর্ণতা থেকে অপূর্ণ জগৎ, কীভাবে ঈশ্বরের উপস্থিতি ও ঈশ্বরের গোপনতা একসঙ্গে ভাবা যায়।


ডিক্রিয়েশ ধারণায় বৌদ্ধ অনাত্মার একটি পাশ্চাত্য প্রতিধ্বনি শোনা যায়: উভয়ই 'আমি'-সত্তার বিলোপ। কাঠামোগত সাদৃশ্য উল্লেখযোগ্য—নির্বাণও তো তৃষ্ণা ও অহংকারের নির্বাপণ, ডিক্রিয়েশনও 'আমি'-র অপসারণ। তবে পার্থক্যটি চূড়ান্ত: ভেইলের কাছে বিলোপের অপর পাশে ঈশ্বর আছেন—'আমি' সরে যাই যেন ঈশ্বর আসতে পারেন। বৌদ্ধ দর্শনে বিলোপের অপর পাশে কেউ নেই—'আমি' সরে যাওয়াটাই শেষ কথা, কোনো 'ঈশ্বর' এসে সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন না। ভেইলের ডিক্রিয়েশন তাই সুফি ফানার মতো—ব্যক্তি বিলীন হয় পরম সত্তায়। বৌদ্ধ নির্বাণে ব্যক্তি বিলীন হয়—কিন্তু কোথাও না, কারণ 'কোথাও' বলে কিছু নেই।


তিব্বতী দ্জোগচেন ও রিগপা: আত্মা-অনাত্মার সীমান্তে


তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের ন্যিংমা সম্প্রদায় তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন ধারা, যা পদ্মসম্ভবের (অষ্টম শতক) সাথে সংযুক্ত। সেখানে দ্জোগচেন (Dzogchen, 'মহাপূর্ণতা') ও রিগপা (rigpa, 'বিশুদ্ধ সচেতনতা') ধারণাদুটি বেদান্ত-বৌদ্ধ বিতর্কের সবচেয়ে ধূসর অঞ্চলে অবস্থিত—যেখানে সীমারেখা এতটাই অস্পষ্ট যে, পণ্ডিতেরা আজও তর্ক করেন এটি সত্যিই বৌদ্ধ না কি ছদ্মবেশী বেদান্ত।


দ্জোগচেন শেখায়: মনের স্বাভাবিক অবস্থা হলো স্বতঃস্ফূর্ত বিশুদ্ধ সচেতনতা—রিগপা—যা সকল চিন্তার আগেই বিদ্যমান। চিন্তা আসে, চিন্তা যায়—রিগপা থাকে। ক্লেশ (রাগ-দ্বেষ-মোহ) রিগপাকে কখনও কলুষিত করে না—যেমন আকাশে মেঘ আসে যায়, কিন্তু আকাশকে স্পর্শ করে না। সাধনার লক্ষ্য তাই নতুন কিছু অর্জন নয়—যা সর্বদা ছিল তার 'পরিচয় লাভ' (recognition, তিব্বতী: ngo sprod; পরিচয়, উপস্থাপন, direct introduction—গুরুর দ্বারা শিষ্যকে মনের প্রকৃতি বা rigpa-র সরাসরি পরিচয় করিয়ে দেওয়া)।


এই বর্ণনা শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্তের সাথে প্রায় অভিন্ন শোনায়: আত্মা সর্বদাই বিশুদ্ধ, অবিদ্যা তাকে ঢেকে রাখে, জ্ঞানে আবরণ সরে যায়—কিন্তু আত্মা কখনও বদলায়নি। পার্থক্যটি সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক: রিগপা কোনো 'দ্রব্য' (substance) নয়, কোনো 'আত্মা' নয়—এটি 'জ্ঞানের প্রকৃতি' (nature of awareness), যার নিজস্ব কোনো স্থির সারসত্তা (svabhāva) নেই। রিগপা 'আছে' বলা যায় না সেভাবে, যেভাবে বেদান্তে আত্মা 'আছে'—রিগপা বরং জ্ঞানের সেই গুণ, যা কোনো বস্তু নয়।


লংচেনপা (কুনখ্যেন লংচেন রাবজাম, চতুর্দশ শতক) ন্যিংমা দর্শনের সবচেয়ে প্রামাণিক ভাষ্যকার। তিনি স্পষ্ট করেছেন: রিগপা 'শূন্য ও জ্ঞানময়' (stong gsal)—শূন্যতা ও প্রজ্ঞার অবিভাজ্য ঐক্য। অর্থাৎ রিগপা একই সাথে 'শূন্য' (কোনো স্থির সারসত্তা নেই) এবং 'জ্ঞানময়' (একটি স্বচ্ছ সচেতনতা আছে)—এই দুটি একসাথে ধরতে না পারলে দ্জোগচেন বোঝা যায় না।


তথাগতগর্ভ তত্ত্বের মতোই দ্জোগচেন বেদান্তের ভাষায় কথা বলে, কিন্তু বৌদ্ধ ব্যাকরণ অনুসরণ করে—অর্থাৎ, শব্দগুলো পরিচিত শোনায় ('বিশুদ্ধ সচেতনতা', 'সর্বদা বিদ্যমান', 'কলুষিত হয় না') কিন্তু তাদের পেছনের দার্শনিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্লাজেনাপের পরিভাষায়: বেদান্ত বলে, 'পর্দার পেছনে আত্মা আছে', দ্জোগচেন বলে, 'পর্দার পেছনে স্বচ্ছতা আছে, কিন্তু সেই স্বচ্ছতা কোনো জিনিস নয়।'


ইবন আরাবীর ওয়াহদাত আল-উজুদ: ইসলামি অদ্বৈতবাদ


সুফি দর্শনের সর্বোচ্চ শিখর মুহিউদ্দিন ইবন আরাবী (১১৬৫-১২৪০)—আন্দালুসিয়ার (বর্তমান স্পেন) মুরসিয়ায় জন্ম, দামেস্কে মৃত্যু, 'আশ-শাইখ আল-আকবর' (মহত্তম শিক্ষক) উপাধিতে ভূষিত। তাঁর কেন্দ্রীয় ধারণা ওয়াহদাত আল-উজুদ (waḥdat al-wujūd, 'অস্তিত্বের একত্ব')—প্রকৃত অস্তিত্ব কেবল আল্লাহর, বাকি সব কিছু সেই একক সত্তার প্রতিফলন, ছায়া, দর্পণে প্রতিবিম্ব। তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ 'ফুসুস আল-হিকাম' ('প্রজ্ঞার রত্নসমূহ')-এ তিনি বলেছেন: 'জগৎ ঈশ্বরের দর্পণ, ঈশ্বর জগতের দর্পণ'—অর্থাৎ, ঈশ্বর জগতের মধ্য দিয়ে নিজেকে দেখেন, জগৎ ঈশ্বরের মধ্য দিয়ে নিজের অর্থ পায়।


শঙ্করের অদ্বৈতের সাথে এর সাদৃশ্য গভীর—উভয়ই বলে: পরম সত্তা এক, বহুত্ব আপাত। কিন্তু পার্থক্যটি তাৎপর্যপূর্ণ: শঙ্করে জগৎ 'মিথ্যা' (mithyā)—জগতের কোনো স্বতন্ত্র বাস্তবতা নেই, ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, জগৎ সম্পূর্ণ মায়া। ইবন আরাবীতে জগৎ 'মিথ্যা' নয়—জগৎ আল্লাহর 'তাজাল্লী' (tajallī, আত্মপ্রকাশ, self-disclosure)—অর্থাৎ, ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করার জন্য জগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাই জগতের একটি নিজস্ব মর্যাদা আছে, যদিও সেই মর্যাদা ঈশ্বর-নির্ভর। এদিক থেকে ইবন আরাবী শঙ্করের চেয়ে বরং রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতের কাছাকাছি—যেখানে জগৎ ব্রহ্মের শরীর, মিথ্যা নয় কিন্তু ব্রহ্ম-নির্ভর। বৌদ্ধ দর্শনের সাথে ইবন আরাবীর বিরোধ তবে মৌলিক—কারণ তিনি একটি পরম সত্তা (আল-হক, 'সত্য') স্বীকার করেন, যা বৌদ্ধ দর্শনে অস্বীকৃত।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *