সত্য কি এক, না বহু? যদি এক হয়, তাহলে যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা কেন ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় তাকে ডেকেছে? যদি বহু হয়, তাহলে প্রতিটি আধ্যাত্মিক পরম্পরা কেন শেষপর্যন্ত একই জায়গায় গিয়ে পৌঁছোয়—সেই নিঃশব্দ কেন্দ্রে, যেখানে শব্দ ফুরিয়ে যায় এবং অভিজ্ঞতা শুরু হয়? এই লেখা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে না—কারণ উত্তর খোঁজা মানে প্রশ্নকে সীমাবদ্ধ করা। এই লেখা প্রশ্নটিকে ত্রিশটি দ্বারে উন্মুক্ত করে—প্রতিটি দ্বার এক-একটি বিশেষ প্রজ্ঞার ভাণ্ডারের তালা খোলে।
পরমসত্তা, সৃষ্টি ও মুক্তি—এই তিনটি চিরন্তন বিষয়কে কেন্দ্র করে ত্রিশটি অধ্যায় আবর্তিত। প্রতিটি অধ্যায় এক-একটি মুদ্রা—একটি সিলমোহর—যা একটি বিশেষ সত্যকে বিমূর্ত দার্শনিক গদ্যে উন্মোচন করে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরম্পরার একচেটিয়া কণ্ঠস্বর নেই—আছে মানবচৈতন্যের সেই সর্বজনীন অনুসন্ধান, যা সীমানা মানে না, ভাষা মানে না, কাল মানে না।
এই সমস্তকিছুর পেছনে একটিমাত্র সত্তা—এবং সেই সত্তাকে জানা, ভালোবাসা, তাতে বিলীন হওয়া অথবা তার সান্নিধ্যে বাস করা—এটিই মানবজীবনের পরম অর্থ। এই লেখা সেই নামহীন সত্যের দিকে আঙুল তুলে দেখায়—আঙুলটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, চাঁদটি গুরুত্বপূর্ণ।
দর্পণ ও দর্শন—সৃষ্টির আদিকারণ
শুরুতে ছিল একটিমাত্র চোখ—অনন্ত, অন্ধকারহীন, আলোকহীন—কারণ আলো তখনও জানে না, সে আলো; অন্ধকার তখনও জানে না, সে অন্ধকার। সেই চোখ নিজেকে দেখতে চাইল। চাওয়াটুকুই বিস্ফোরণ—সমগ্র সৃষ্টির বীজ সেই একটি কম্পনে নিহিত। কিন্তু এই "চাওয়া" ক্ষুধার চাওয়া নয়, এটি ফুলের ফোটা—গোলাপ ফোটে কারও জন্য নয়, সুগন্ধ ছড়ানোর পরিকল্পনায় নয়—ফোটাই তার প্রাণের ধর্ম, না-ফুটে সে থাকতে পারে না। পরমসত্তার আত্মপ্রকাশ তেমনই—পরিপূর্ণতার উচ্ছলন—কূল ছাপানো নদীর মতো—নদী কূল ছাপায় অভাবে নয়, আধিক্যে।
কিন্তু চোখ নিজেকে দেখবে কীভাবে? চোখ পৃথিবীর সব কিছু দেখে—শিশিরে-ভেজা ঘাসের ডগায় ভোরের প্রথম আলো, সন্ধ্যার আকাশে মেঘের রক্তিম আঁচল, মৃত পাতার শিরায় জমে-থাকা শেষ সবুজ—কিন্তু নিজেকে দেখে না। নিজেকে দেখার জন্য দর্পণ চাই। সৃষ্টি সেই দর্পণ। কিন্তু তা সাধারণ দর্পণ নয়—এমন দর্পণ, যা দর্পণও বটে, প্রতিবিম্বও বটে, এবং যে-মুখ দেখা হচ্ছে, সেই মুখও বটে—কারণ পরমসত্তার বাইরে কোনো পদার্থ নেই, যা দিয়ে দর্পণ তৈরি হবে। তিনি নিজেই নিজের দর্পণ হলেন—নিজের ভেতরেই একটি প্রতিধ্বনি তৈরি করলেন—যেমন পাহাড়ে চিৎকার করলে নিজের আওয়াজ ফিরে আসে—সৃষ্টি সেই প্রতিধ্বনি।
এই প্রতিধ্বনির একটি রহস্য আছে: সে মূল আওয়াজের হুবহু নকল, তবু সে মূল আওয়াজ নয়। সে মূল থেকেই জন্ম নিয়েছে, মূলের সমস্ত গুণ তার মধ্যে আছে, তবু সে মূল থেকে একটু "পরে"—একটু "দূরে"—একটু "অন্য"। সৃষ্টির এই "একটু অন্য" হওয়াটাই তার সৌন্দর্য—এবং তার যন্ত্রণা। সৌন্দর্য, কারণ পৃথকতা না থাকলে বৈচিত্র্য নেই, বৈচিত্র্য না থাকলে রূপ নেই, রূপ না থাকলে দেখা নেই—এবং দেখাটাই তো উদ্দেশ্য ছিল। যন্ত্রণা, কারণ পৃথকতা মানে দূরত্ব, দূরত্ব মানে বিরহ, বিরহ মানে কান্না—এবং সৃষ্টির এই কান্নাই কবিতা, এই কান্নাই সঙ্গীত, এই কান্নাই প্রার্থনা।
সমুদ্র চিরকাল একা ছিল। অথই—তলদেশ নেই। অসীম—তীর নেই। নিস্তরঙ্গ—কম্পন নেই। তারপর একটি তরঙ্গ উঠল—কোত্থেকে? সমুদ্র থেকেই। কোন বাতাসে? কোনো বাতাস ছিল না—সমুদ্রের নিজেরই ভেতর থেকে—যেমন ঘুমন্ত মানুষের বুকে শ্বাসের ওঠানামা—কেউ বাইরে থেকে ঠেলে দেয়নি, ভেতরের জীবনীশক্তিই ওঠানামা করছে। তরঙ্গ উঠল—এবং নিজেকে পৃথক মনে করল—"আমি তরঙ্গ, আমি সমুদ্র নই।" এই একটি বাক্যে সমস্ত অবিদ্যার সারসংক্ষেপ। তরঙ্গ সমুদ্রেরই জল—একই লবণ, একই ঠান্ডা, একই নীল—তবু সে নিজেকে আলাদা ভাবে। এই ভাবনাই পর্দা—এই পর্দাই সংসার—এই সংসারই স্বপ্ন।
সোনা দিয়ে গহনা তৈরি হয়—আংটি, বালা, হার—রূপ বদলায়, নাম বদলায়, ব্যবহার বদলায়—কিন্তু সোনা সোনাই থাকে। আংটি গলিয়ে বালা করো, বালা গলিয়ে হার করো—রূপ জন্মায় ও মরে—কিন্তু সোনার একটি অণুও কম হয় না, বাড়ে না। সৃষ্টি সেই গহনা—অসংখ্য রূপ, অসংখ্য নাম—কিন্তু সত্তা একটিই, অপরিবর্তিত। কিন্তু গহনার একটি আশ্চর্য গুণ আছে: আংটি যখন আংটি, তখন সে সোনার কথা ভোলে—সে ভাবে, "আমি আংটি", "আমি সুন্দর", "আমি মূল্যবান"—সে ভোলে যে, তার সৌন্দর্য সোনার, তার মূল্য সোনার, তার অস্তিত্ব সোনার—সে নিজে কিছু নয়, একটি রূপ মাত্র, এবং রূপ অস্থায়ী। এই ভোলাটাই অবিদ্যা—এবং মনে করাটাই জ্ঞান।
একটি প্রশ্ন কিন্তু চিরকাল জেগে থাকে: প্রতিবিম্ব আর মূল কি সত্যিই এক? দুটি পথ—দুটি উত্তর—দুটি সত্য। একটি পথ বলে: হ্যাঁ—পৃথকতা স্বপ্ন—ঘুম ভাঙলে দেখবে, চিরকালই তুমি সমুদ্র ছিলে, তরঙ্গ হওয়াটা দুঃস্বপ্ন। এই পথে বিলয় আছে—নদী সমুদ্রে হারিয়ে যায়, নাম শেষ, রূপ শেষ, শুধু জলের স্বাদ থাকে জিভে। অন্য পথ বলে: না—দর্পণ মণি নয়, প্রতিবিম্ব মুখ নয়—সৃষ্টি পরমসত্তার শরীর, ঘনিষ্ঠতম সঙ্গী, কিন্তু অভিন্ন নয়। এই পথে প্রেম আছে—কারণ প্রেমের জন্য দুই চাই—প্রেমিক ও প্রিয়তম—যেখানে এক, সেখানে শুধু অস্তিত্ব, প্রেম নয়। এবং সম্ভবত তৃতীয় একটি পথ আছে—যেখানে দুটো পথই একসঙ্গে সত্য: পরমসত্তার দিক থেকে দেখলে বিলয় সত্য, জীবের দিক থেকে দেখলে প্রেম সত্য—এবং দুটো "দিক" ভিন্ন দুই সত্তা নয়, একই সত্যের দুটো মুখ—চাঁদের আলোকিত পিঠ ও অন্ধকার পিঠ।
চেতন মানবসত্তা সকল গুণের সমাহার—এক রশ্মির আলো নয়, সমগ্র বর্ণালির প্রিজম। পাথরে স্থিরতা আছে কিন্তু গান নেই; পাখিতে গান আছে কিন্তু স্থিরতা নেই; আগুনে তেজ আছে কিন্তু শীতলতা নেই; জলে শীতলতা আছে কিন্তু তেজ নেই—মানুষের মধ্যে সবকটি একসঙ্গে বাজে, যেমন সমস্ত বাদ্যযন্ত্র একসঙ্গে বাজলে অর্কেস্ট্রা হয়। একটি তারা সমগ্র আকাশ নয়; একটি ফুল সমগ্র বাগান নয়; একটি সুর সমগ্র সংগীত নয়—কিন্তু মানবসত্তা সমগ্র আকাশ একটি চোখের মণিতে, সমগ্র বাগান একটি শ্বাসে, সমগ্র সংগীত একটি হৃৎস্পন্দনে। এবং এই সর্বাত্মকতাই তার গৌরব—এবং তার বোঝা—কারণ যে সব কিছু ধারণ করে, সে সব কিছুর দায়ও বহন করে।
সর্বজনীন ধারণাসমূহ—জীবন, জ্ঞান, শক্তি, সৌন্দর্য—এদের কোনো বাহ্যিক সত্তা নেই, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে "জীবন"-কে দেখা যায় না, "জ্ঞান"-কে ছোঁয়া যায় না—তবু এদের ছাড়া কোনো বাহ্যিক সত্তাও সম্ভব নয়। এরা অস্তিত্বের অদৃশ্য নকশা—বীজের ভেতরে লুকোনো বৃক্ষের ছবি। সেই নকশা কি পরমসত্তার ইচ্ছে—তিনি এঁকেছেন বলে আছে? না জগতের স্বতন্ত্র বাস্তবতা—নকশা নিজেই নিজেকে এঁকেছে? না পরমসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ—তিনি আছেন বলে নকশাও আছে, দুটো আলাদা নয়? এই প্রশ্নেই চিন্তার পথ বিভক্ত হয়—এবং প্রতিটি পথই সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হয়, যদিও তীরভূমি ভিন্ন।
দানের দুই ধারা—কারণহীন ও কারণসাপেক্ষ অনুগ্রহ
একটি পর্বত থেকে দুটি ঝরনা নামে—একটি উত্তরে, একটি দক্ষিণে—জল একই, উৎস একই, কিন্তু পথ ভিন্ন এবং যাদের তৃষ্ণা মেটায়, তারাও ভিন্ন। একটি ধারা কারণহীন—ভোরের আলো কোনো অনুরোধের অপেক্ষায় থাকে না, কোনো শর্ত পূরণের দাবি রাখে না, কোনো যোগ্যতাপত্র যাচাই করে না—পৃথিবী ঘুরলেই আলো আসে, এটি সূর্যের স্বভাব, এটি নিয়ম নয়, এটি প্রেম। শিশুর হৃৎস্পন্দন মায়ের গর্ভে শুরু হয়—কে আদেশ দিয়েছে ধুক্ ধুক্ করতে? কোনো চুক্তি হয়েছে জন্মের আগে?—কিছুই না—হৃদয় ধুক্ ধুক্ করে, কারণ ধুক্ ধুক্ করাই তার সত্তা। দেওয়াটাই পরমসত্তার সত্তা—ঠিক যেমন জ্বলাটা আগুনের সত্তা—আগুনকে বলতে হয় না "জ্বলো", সে জ্বলে, কারণ সে আগুন।
অন্য ধারা কারণসাপেক্ষ—সে জানে, কোথায় যাচ্ছে এবং কেন। রোগ সারে ওষুধে—ওষুধটি খুঁজে বের করতে হয়, কিনতে হয়, নিয়ম মেনে খেতে হয়। ক্ষুধা মেটে অন্নে—জমি চষতে হয়, বীজ বুনতে হয়, বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করতে হয়, ফসল কাটতে হয়। জ্ঞান আসে শিক্ষায়—বই পড়তে হয়, গুরুর কাছে যেতে হয়, ভুল করতে হয়, আবার চেষ্টা করতে হয়। এই ধারায় শ্রম আছে, ধৈর্য আছে, কারণ-কার্যের সুশৃঙ্খল শৃঙ্খল আছে—বীজ ছাড়া বৃক্ষ নেই, শ্রম ছাড়া ফল নেই, প্রশ্ন ছাড়া উত্তর নেই।
এই দুই ধারার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক আছে: কারণসাপেক্ষ ধারার পেছনেও কারণহীন ধারা কাজ করছে। ওষুধ রোগ সারায়—কিন্তু ওষুধের ভেতরে সেই আরোগ্যকারী শক্তি কে রেখেছে? বীজ থেকে গাছ হয়—কিন্তু বীজের ভেতরে গাছের নকশা কে এঁকেছে? কারণ-কার্যের শৃঙ্খলটি নিজেই একটি কারণহীন দান—শৃঙ্খলের অস্তিত্বই একটি রহস্য। যেমন একটি ঘড়ি সময় দেখায়—কিন্তু ঘড়ির যন্ত্রাংশের মধ্যে সেই "সময় দেখানোর ক্ষমতা" কে রেখেছে? প্রতিটি কারণের পেছনে একটি কারণহীন মুহূর্ত আছে—এবং সেই মুহূর্তটিই কৃপা।
মুক্তি কোন ধারায়? এই প্রশ্নে মানবচিন্তা দুটি পাহাড়ের মধ্যে দোল খায়। একদিকে: মুক্তি কোনো নতুন জিনিস নয়—মাটির নিচে স্বর্ণ চাপা ছিল, খনন করলে পাওয়া গেল—স্বর্ণ সৃষ্ট হয়নি, স্বর্ণ ছিলই—পর্দা সরলে যা দেখা গেল, তা চিরকালই ছিল, পর্দাই মিথ্যে ছিল। এই দৃষ্টিতে সাধনা মানে "অর্জন" নয়, সাধনা মানে "অপসারণ"—যা ঢেকে আছে, তা সরানো, নতুন কিছু যোগ করা নয়। ভাস্কর মার্বেলের ভেতর থেকে মূর্তি বের করেন—মূর্তি আগে থেকেই ছিল, ভাস্কর শুধু অতিরিক্ত পাথর সরিয়েছেন।
অন্যদিকে: বন্দি কখনও নিজেই শেকল কাটতে পারে না—শেকলবদ্ধ হাত কীভাবে শেকল কাটবে?—কারাগারের মালিককে দরজা খুলতে হবে—এবং সেই দরজা খোলাটাই কৃপা—প্রার্থনায় পাওয়া, যোগ্যতায় নয়। এই দৃষ্টিতে সাধনা মানে "আর্তনাদ"—"আমি পারি না, তুমি পারো, আমাকে মুক্ত করো"—এবং সেই আর্তনাদই যথেষ্ট, কারণ যিনি শোনেন, তিনি করুণাময়।
বৃষ্টি আকাশ থেকে ঝরে পড়ে—প্রতিটি ফোঁটা একই জল, একই মেঘ থেকে—কিন্তু গোলাপগাছ সেই জলকে গোলাপের সুবাসে পরিণত করে, বিষবৃক্ষ সেই একই জলকে বিষে পরিণত করে, পদ্মপাতা সেই জলকে ধারণই করে না—মুক্তোর মতো গড়িয়ে পড়তে দেয়। বৃষ্টি নিরপেক্ষ—সে গোলাপকে বেশি দেয় না, বিষবৃক্ষকে কম দেয় না—পক্ষপাত গ্রাহকের প্রকৃতিতে, দাতায় নয়। একটি ছোট কাপে সমুদ্র ধরে না—কিন্তু এটি সমুদ্রের কৃপণতা নয়, কাপের সীমাবদ্ধতা। এবং কাপকে বড়ো করা?—সেটিও কাপের কাজ নয়—সেটিও কৃপা।
পৃথকতা ও সাদৃশ্যের দ্বন্দ্ব—নিরাকার ও সাকারের সমন্বয়
পরমসত্তা কি আকাশের ওপারে—তারাদের পেছনে—সময়ের বাইরে—নিঃসঙ্গ, অনধিগম্য, নীরব? না কি এই ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দুর কম্পনে—এই শিশুর প্রথম কান্নায়—এই বৃদ্ধের শেষ নিঃশ্বাসে—প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি স্থানে, প্রতিটি স্পন্দনে? যে বলে, "তিনি শুধু ওপারে" সে তাঁকে সীমাবদ্ধ করে—"ওপারে" বলার মুহূর্তেই একটি দেয়াল তৈরি হয়, এবং অসীমের চারপাশে দেয়াল মানে অসীমকে সসীম করা। যে বলে, "তিনি শুধু এপারে—এই পাথরে, এই নদীতে, এই কীটপতঙ্গে"—সে-ও তাঁকে সীমাবদ্ধ করে—কারণ তখন কীটপতঙ্গের সীমা তাঁর সীমা হয়ে যায়। পূর্ণ দৃষ্টি পাখির মতো—দুটি ডানায় ওড়ে—একটি ডানা "তিনি ওপারে", অন্যটি "তিনি এপারে"—দুটি ডানা একসঙ্গে ঝাপটালেই ওড়া সম্ভব—একটিতে শুধু পাক খাওয়া।
"এই সমস্তই সেই"—এই বাক্য যে কেবল বুদ্ধিতে নয়, অস্থিমজ্জায় অনুভব করে—তার পক্ষে কোনো কিছুকেই তুচ্ছ বলা সম্ভব নয়। পিঁপড়ের পায়ে পরমসত্তার স্বাক্ষর, ধূলিকণায় তাঁর আঙুলের ছাপ, ভাঙা ইটের খোয়ায় তাঁর শিল্পকলা। একজন চাষি মাটি চষছে—সেই মাটির প্রতিটি কণায় তিনি। একজন মা শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছে—সেই দুধের প্রতিটি ফোঁটায় তিনি। রাতের আকাশে একটি তারা খসে পড়ছে—সেই পতনেও তিনি। কিন্তু একটি সাবধানবাণী: তরঙ্গকে "সমুদ্র" বলা ভুল—তরঙ্গ সমুদ্রের অংশ, সমুদ্র নয়। তরঙ্গের মধ্যে সমুদ্রের লবণ আছে, গভীরতার ইশারা আছে—এটি দেখা জ্ঞান। কিন্তু তরঙ্গকে ধরে বলা "এ-ই সমুদ্র, আর কিছু নেই"—এটি অবিদ্যা। অংশে সমগ্রের চিহ্ন দেখা জ্ঞানের কাজ; অংশকে সমগ্র ভাবা অজ্ঞানের কাজ।
দর্পণের দর্পণ: ১
লেখাটি শেয়ার করুন