দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

দর্পণের দর্পণ: ৬


সৌন্দর্য ও মহিমার সংশ্লেষ—কোমলতা ও কঠোরতার একত্ব


চাঁদের একপিঠে রুপোলি আলো—অন্যপিঠে গাঢ় অন্ধকার—কিন্তু চাঁদ একটিই। সৌন্দর্য ও মহিমা—সৃষ্টির দুই মুখ—কোমলতা ও কঠোরতা, করুণা ও ন্যায়—দুটোই একই প্রকৃতির দুই ঋতু, একই হৃদয়ের দুই স্পন্দন। সমুদ্র একই সঙ্গে জেলেকে মাছ দেয় ও জাহাজ ডোবায়—একই জল, একই গভীরতা—কিন্তু দুটো মুখ।


ঝড়ের মধ্যে সমুদ্রের গভীরে নামো—পঞ্চাশ ফুট নিচে—পৃষ্ঠে যে-প্রলয় চলছে, তার কোনো চিহ্ন নেই—নিস্তব্ধ, শান্ত—মাছ ধীরে ধীরে সাঁতার কাটছে, প্রবাল ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে—উপরে মৃত্যুর হাতছানি, নিচে জীবনের শান্ত ধারা—একই মুহূর্তে, একই সমুদ্রে। কোমলতা দুর্বলতা নয়—কোমলতা সবচেয়ে গভীর শক্তি—জল পাথরকে ক্ষয় করে, কিন্তু ধীরে, নিঃশব্দে, শত বছর ধরে—পাথর শক্ত, কিন্তু হেরে যায়; জল কোমল, কিন্তু জেতে। যে নরম মাটি বীজকে জায়গা দেয়—সেই মাটিই সবচেয়ে উর্বর—কংক্রিটে কিছু জন্মায় না।


প্রকৃত পথপ্রদর্শক জানেন, কখন জল হতে হবে, কখন আগুন—কখন বুকে টানতে হবে, কখন দূরে সরাতে হবে—এবং দুটোই যে একই ভালোবাসা থেকে উৎসারিত, তা কখনও ভোলেন না। মা যখন শিশুকে বকা দেয়—সেই বকাতেও ভালোবাসা, যেমন আলিঙ্গনেও। শিশু বকা শুনে কাঁদে—কিন্তু মায়ের কোলেই ফিরে আসে—কারণ সে জানে, বকা আর আলিঙ্গন একই উৎস থেকে—একই হৃদয় থেকে। পরমসত্তার কঠোরতা ও কোমলতাও তেমনই—একই ভালোবাসার দুই প্রকাশ—এবং জীব যখন এটি বোঝে—যখন সে কঠোরতার মধ্যেও ভালোবাসা দেখতে পায়—তখন সে ভয় থেকে মুক্ত—কারণ ভয়ের উৎস ছিল "শাস্তি"—কিন্তু যদি "শাস্তি"-ও ভালোবাসা হয়, তাহলে ভয়ের আর কোনো ভিত্তি নেই।


দ্রষ্টা ও দৃশ্যের বিপর্যয়—বিধান, সত্য ও পরম দর্শন


সংসার সাগরে ভাসমান—ঢেউয়ের পর ঢেউ—কখনও স্থির জল নেই—কিন্তু ডোবে না। কারণ? ভেতরে একটি ফাঁকা জায়গা আছে—যেমন নারকেল ভাসে, কারণ খোলসের ভেতরে বাতাস ভরা—সেই ভেতরের ফাঁকাই জীবনদায়ী। জীবের অন্তরে চৈতন্যের শ্বাস—সেই অদৃশ্য ফাঁকা—যা তাকে পৃষ্ঠে রাখে। এবং সংসারের মধ্যেই অপ্রত্যাশিত একটি হাত বেরিয়ে আসে—করুণার হাত—সাধক কখনও ডোবে না—সমুদ্র যতই গর্জাক।


বাহ্যিক বিধান ও অন্তর্গত সত্য—এই দ্বন্দ্ব আধ্যাত্মিক যাত্রার চিরকালীন সঙ্গী। কখনো কখনো বাইরে থেকে "ভুল" দেখায় যা, তা ভেতর থেকে "ঠিক"—পৃষ্ঠতলের নিয়ম বলে "না", গভীরের প্রজ্ঞা বলে "হ্যাঁ"। কিন্তু সাবধান: পৃষ্ঠতল ছাড়া গভীরতা বিপজ্জনক—কারণ "আমি নিয়মের ঊর্ধ্বে" বলা হয়তো প্রজ্ঞা, হয়তো অহংকার—দুটোর চেহারা একই, উৎস ভিন্ন। শেকড় ও পাতা একসঙ্গেই বৃক্ষ—শেকড় ছাড়া পাতা শুকোয়, পাতা ছাড়া শেকড় মরে।


"দেখাও তোমাকে"—মানবহৃদয়ের সবচেয়ে আদিম আর্তনাদ। "দেখতে পাবে না"—উত্তর। কারণ চোখ নিজেকে দেখতে পারে না—আত্মা সমগ্র অভিজ্ঞতার দ্রষ্টা—তাঁকে "দেখা" মানে দ্রষ্টাকে দৃশ্যে পরিণত করা—কিন্তু দ্রষ্টা কখনও দৃশ্য হয় না। তাহলে দর্শন কি অসম্ভব? না—"আমি"-র মৃত্যুতেই দর্শন—যখন "আমি" থাকে না—তখন যা আছে, তা-ই "তিনি"—দেখা নয়, হয়ে যাওয়া—অথবা জানা যে, চিরকালই ছিলাম।


অথবা—একটি ভিন্ন উত্তর: এই ক্ষুদ্র দেহে পূর্ণ দর্শন অসম্ভব—কাপ ভেঙে গেলে? দেহের সীমা খসে গেলে?—তখন পূর্ণ দর্শন—খোলা আকাশে মুক্ত পাখি। সংজ্ঞাহারা হওয়া ধ্বংস নয়—মহিমায় অভিভূত হওয়া—সমুদ্রের সামনে কেউ যদি নিশ্চল হয়ে যায়—ভুলে যায়, কোথায় আছে, কে সে—সে ডুবে যায়নি—সে বিস্মিত হয়েছে—সে হারিয়ে গেছে—কিন্তু সুন্দরে হারানো কি হারানো?—সেই বিস্ময়, সেই নিশ্চল হয়ে-যাওয়া—এটিই উপাসনার শুদ্ধতম রূপ—শব্দের আগে, ভাষার আগে, চিন্তার আগে—শুধু—বিস্ময়।


মৃত্যু ও রূপান্তর—অন্তর্বর্তী জগতের রহস্য


পর্দার আড়ালে—চিরকাল—মৃত্যু ও পুনর্জীবনের মধ্যবর্তী জগৎ। কেউ সেখান থেকে ফিরে এসে পূর্ণ বিবরণ দেয়নি—যেমন গর্ভস্থ শিশু পৃথিবীর বর্ণনা বুঝবে না—তার কাছে "আলো" অর্থহীন, "বাতাস" অর্থহীন, "মায়ের মুখ" অর্থহীন—কারণ সে এমন একটি জগতে আছে, যেখানে এসব নেই। কিছু জ্ঞান এই পার্থিব অবস্থায় অধরা—এবং সেই অধরতাকে স্বীকার করা—"আমি জানি না" বলা—এটিও প্রজ্ঞা—সব কিছু জানার দাবি অজ্ঞানতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ।


কিন্তু কিছু ইঙ্গিত আছে—কিছু ফিসফিস—পর্দার ওপাশ থেকে। স্বপ্নে কখনো কখনো মৃত প্রিয়জনকে দেখা যায়—তাঁরা হাসছেন, শান্ত, আলোকিত—এটি কি শুধু স্মৃতি, না যোগাযোগ? উত্তর নিশ্চিত নয়—কিন্তু সম্ভাবনা আশ্চর্য। সাধকরা বলেন, মৃত্যুর পর আত্মা একটি যাত্রা করে—আলোর পথে—পরমসত্তার দিকে—এবং সেই যাত্রার বিবরণ তাঁদের অভিজ্ঞতায় আশ্চর্যরকম সামঞ্জস্যপূর্ণ—ভিন্ন সভ্যতায়, ভিন্ন ভাষায়, একই আলোর বর্ণনা—যেমন একই চাঁদ বিভিন্ন নদীতে প্রতিফলিত, প্রতিবিম্ব ভিন্ন, কিন্তু চাঁদ একটিই।


গভীরতম দৃষ্টিতে মৃত্যু একটি শব্দমাত্র—আত্মা কখনও জন্মায়নি, কখনও মরেওনি—আকাশ—মেঘ আসে, মেঘ যায়—কিন্তু আকাশ অপরিবর্তিত। ব্যাবহারিক দৃষ্টিতে, মৃত্যু একটি দ্বার—অন্ধকারের নয়, রূপান্তরের—শূঁয়োপোকার "মৃত্যু" প্রজাপতির জন্ম—এবং শূঁয়োপোকা কি জানত, সে প্রজাপতি হবে?—জানত না—কিন্তু হলো।


পূর্ণ মানব—মানবিক ও ঐশীর সেতু


অনন্যতা—একক—অদ্বিতীয়—যেমন সমগ্র সংগীতের সারাৎসার একটি নোটে ধরা যায়, যেমন সমগ্র সমুদ্র একটি বিন্দু জলে উপস্থিত—মানবপ্রজাতির পূর্ণতম প্রকাশ এমন একটি সত্তা—যিনি সৃষ্টির আগেও বিদ্যমান ছিলেন এবং সৃষ্টির শেষেও থাকবেন—আদিবীজ ও অন্তিম ফল একসঙ্গে—যেমন বৃক্ষের উদ্দেশ্য বীজ, এবং বীজের উদ্দেশ্য বৃক্ষ—কে কার জন্য?—উত্তর: দু-জন দু-জনের জন্য। পূর্ণ মানব—সেই কেন্দ্রবিন্দু, যার চারপাশে সব কিছু ঘোরে—এবং কেন্দ্রবিন্দু নিজে?—নিশ্চল—গতিহীন—কারণ গতি তাঁর থেকে উৎসারিত, তিনি নিজে গতির অতীত।


তিনটি গভীর ভালোবাসা—তিনটি মহাজাগতিক মাত্রা। সৃজনশীলতায়—সেই দর্পণ, যেখানে পরমসত্তা নিজের সৃষ্টিক্ষমতা দেখেন—যেমন শিল্পী ক্যানভাসে নিজের আত্মাকে ঢেলে দেন এবং তারপর পিছিয়ে এসে দেখেন—"এই তো আমি! এই রঙে, এই রেখায়—আমি নিজেকে চিনতে পারছি!"—সৃষ্টি সেই ক্যানভাস। সৌরভে—ঐশী নিঃশ্বাস—সেই রস, যা সৃষ্টিতে সুবাসের মতো অদৃশ্য কিন্তু সর্বব্যাপ্ত—ফুলে সুগন্ধ, ফলে মিষ্টি, সন্তানের গায়ে মায়ের গন্ধ—সব একই রস—কিন্তু রস নিজে অদৃশ্য। ধ্যানে—ঐশী সাক্ষাৎকার—যেখানে ধ্যানকর্তা, ধ্যান ও ধ্যেয় তিনটি নদী একটি সমুদ্রে মিশে যায়—সংগীতকার, বাদ্যযন্ত্র ও সুর যখন একাকার—তখন কে বাজাচ্ছে?—কেউ না—সংগীত নিজেই বাজছে।


দেহে থেকে দেহাতীত—কালে থেকে কালাতীত—মানবিক ও ঐশীর সেতু—দিগন্তরেখার মতো—যেখানে আকাশ ও পৃথিবী চুম্বন করে—কিন্তু দিগন্তে পৌঁছুতে গেলে সে সরে যায়—কারণ দিগন্ত কোনো "স্থান" নয়, দিগন্ত একটি "দর্শন"—দেখতে পাও, ছুঁতে পারো না। অথবা, জীব কখনও পরমসত্তা হয় না—তরঙ্গ কখনও সমুদ্র হয় না—কিন্তু পরমসত্তার সবচেয়ে প্রিয় হওয়া সম্ভব—বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুল, আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা—এবং সেই প্রিয়ত্বই মানবজীবনের পরম গন্তব্য।


ত্রিশটি মুদ্রা—একটিমাত্র সত্যের ত্রিশটি মুখ—যেমন একটি হীরকের মধ্য দিয়ে ত্রিশটি কোণ থেকে দেখলে ত্রিশটি ভিন্ন আলো চোখে পড়ে—কিন্তু হীরা একটিই। সত্তার একত্ব, নিরাকারের নিঃসীমতা, সাকারের গুণসমুদ্র—আঙুলগুলো ভিন্ন, চাঁদ একটিই। এবং সেই চাঁদকে দেখা—জানা—ভালোবাসা—তাতে বিলীন হওয়া অথবা তাঁর নিত্য সান্নিধ্যে বাস করা—এটিই প্রজ্ঞার শেষ মুদ্রা—এটিই সমস্ত মুদ্রার মুদ্রা। এবং এর পরে?—এর পরে শুধু নৈঃশব্দ্য—কারণ যা বলা যায়, তা শেষ হয়ে গেছে—যা অবশিষ্ট আছে, তা শুধু অনুভব করা যায়—এবং সেই অনুভূতির কোনো নাম দেওয়া সম্ভব নয়—তবু মানুষ চেষ্টা করে—এবং সেই চেষ্টার নাম—শান্তি।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *