চার।
ভালোবাসি—জলের সহজতায়
তোমাকে আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছে—ভালোবাসি।
থামো। ভুল বুঝো না। এই কথাটা শুনলেই মানুষ ভাবে প্রেম, ভাবে দাবি, ভাবে সম্পর্ক, ভাবে চাওয়া-পাওয়া। কিন্তু 'ভালোবাসি' শব্দটা এত সংকীর্ণ না—এটা একটা মহাসাগর, আর প্রেম তার একটা মাত্র ঢেউ।
যেমন করে মানুষ গল্পের নায়কদের ভালোবাসে—যাদের সাথে কোনোদিন দেখা হবে না, কারণ তারা কালির মানুষ, কাগজের শরীর, কল্পনার রক্তে বেঁচে থাকে। তারপরও মানুষ তাদের জন্য কাঁদে, তাদের জন্য চিন্তা করে, বই বন্ধ করার পরেও তাদের কথা ভাবে—এটা কি প্রেম? না। এটা ভালোবাসা—প্রেমের চেয়ে বড়ো, প্রেমের চেয়ে বিশুদ্ধ, কারণ এতে কোনো প্রত্যাশা নেই।
যেমন করে পাঠক তার প্রিয় লেখককে ভালোবাসে—চেনে না, জানে না, রাস্তায় দেখলে চিনবে না, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দ মুখস্থ, তার প্রতিটি বাক্য রক্তে মিশে আছে। ঠিক সেভাবে তোমাকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসা কোনো কিছু দাবি করে না—এ শুধু আছে, জলের মতো। জল নিচের দিকে বয়ে যায়, এটা তার ধর্ম। জল জানে না, কেন বয়ে যায়; জল জানে না, কোথায় যাচ্ছে—শুধু জানে, থামতে পারে না। আমার ভালোবাসাও তেমন—তোমার দিকে বয়ে যাচ্ছে, কোনো কারণ ছাড়া, কোনো গন্তব্য ছাড়া।
তোমাকে যে কত কিছু বলতে ইচ্ছে করছে!
ভাগ্যিস লিখছি, আর মুছতে পারছি। কথা বললে এই সুবিধা থাকত না—কথা একবার বাতাসে মিশে গেলে ফিরিয়ে নেবার কোনো উপায় নেই, যেমন ছেড়ে-দেওয়া পাখি আর ফেরে না, যেমন ফুঁ দিয়ে ওড়ানো বীজ ফিরিয়ে আনা যায় না। কিন্তু লেখায় সেই সুবিধে আছে—আঙুল চাপলেই সব মুছে যায়, যেন কিছু হয়ইনি। আজ আমি যা লিখেছি, তার অর্ধেক মুছে ফেলেছি—আর সেই মুছে-ফেলা শব্দগুলো এখন কোথাও ভাসছে, অদৃশ্য হয়ে, ভূতের মতো—বলা হলো না যে-কথাগুলো, সেগুলোই হয়তো সবচেয়ে সত্যি ছিল। সত্যের ভাগ্যই বুঝি এমন—সে সবসময় মুছে যায়, আর মিথ্যে টিকে থাকে।
আর সেই বিকেলটার পর—জানো, কতটা ঘুমিয়েছিলাম?
অনেক অনেক দিন পরে অমন ঘুম হলো—সেই ঘুম, যেটায় স্বপ্ন আসে না, শুধু একটা গভীর অন্ধকার, খুব নরম, খুব নিরাপদ, মায়ের কোলের মতো। যেখানে কিছু ভাবতে হয় না, কিছু হতে হয় না, কোনো পরিচয় লাগে না, কোনো যোগ্যতা লাগে না—শুধু থাকলেই চলে। মানুষ সারাজীবন যে-শান্তি খোঁজে—মন্দিরে, মসজিদে, পাহাড়ে, সমুদ্রে—সেই শান্তি কখনো কখনো এমনি এমনি চলে আসে, একটা বিকেলের পর, একটা ফুচকার পর, আর মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে—পৃথিবীর সবচেয়ে নিশ্চিন্ত ঘুম।
পাঁচ।
তিনটে প্রশ্ন—অন্যকথায়, সাধারণের অসাধারণত্ব
আচ্ছা, আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারি—তুমি কেমন আছ? কী করছ? কী নিয়ে ভাবছ?
তিনটে প্রশ্ন। খুব সাধারণ, খুব পুরোনো—পৃথিবীর প্রথম মানুষ থেকে শেষ মানুষ পর্যন্ত এই প্রশ্নগুলো করে যাবে। কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই প্রশ্নগুলো করে—চায়ের দোকানে, অফিসের লিফটে, ফোনের ওপার থেকে। বেশিরভাগ সময় এগুলো আসলে প্রশ্নই না—এগুলো শিষ্টাচার, অভ্যাস, কথা শুরু করার অজুহাত।
কিন্তু আমি যখন তোমাকে করছি—তখন প্রতিটি শব্দে একটু বেশি ওজন আছে, যেমন বৃষ্টির জলে মাটির গন্ধ মেশানো থাকে—জলটা সাধারণ, কিন্তু গন্ধটা অন্যরকম, সেই গন্ধটাই বলে দেয়, এই বৃষ্টি আলাদা। আমার প্রশ্নেও সেই গন্ধ আছে—উদ্বেগের গন্ধ, আগ্রহের গন্ধ, একটু ভালোবাসার গন্ধ—যেটা মুখে আসে না, কিন্তু যে পাবে, সে টের পাবে।
ছয়।
নদীর দেশ—তিনটে পছন্দের একসাথে আসা
তুমি নদীর দেশে যাচ্ছ?
জানলাম সেদিন। তারপর মাথায় একটা পাগলামো ঢুকে গেল—তোমাকে বলব, আমিও যাব সাথে। এটা কিন্তু সত্যি সত্যিই ভেবেছিলাম, একদম গুছিয়ে—কোন জাহাজে উঠব, কোন ঘাটে দেখা হবে, নদীর কোন বাঁকে প্রথম চোখে চোখ পড়বে—সব ঠিক করে ফেলেছিলাম মনে মনে, যেমন শিশুরা বিয়ের পরিকল্পনা করে পুতুল নিয়ে—সব কিছু নিখুঁত, সব কিছু অসম্ভব। তারপর নিজেই নিজেকে থামালাম। কিন্তু থামানোর পরেও চিন্তাটা রয়ে গেল—চুলের গোড়ায় আটকে-থাকা বাতাসের মতো, দেখা যায় না, কিন্তু মাথা নাড়ালেই টের পাওয়া যায়।
জানো, জাহাজে চড়ে নদীর বুক দিয়ে ভেসে যাবার ইচ্ছে আমার অনেক দিনের। আর সেদিন যদি পূর্ণিমা হয়—তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
জল আমার খুব পছন্দ—জল শেখায় নম্রতা, জল শেখায় বয়ে যেতে, জল শেখায় বাধা পেলে পথ বদলাতে কিন্তু না থামতে। আকাশ আমার খুব পছন্দ—আকাশ শেখায় বিশালতা; শেখায়, কতটুকু জায়গা আছে পৃথিবীতে; শেখায়, আমরা কতটা ছোটো আর সেই ছোটো হওয়াটা লজ্জার নয়, বরং মুক্তির। রাত আমার খুব পছন্দ—রাত শেখায় সততা, কারণ অন্ধকারে মুখোশের দরকার পড়ে না, কেউ দেখছে না বলে মানুষ যা, তা-ই হতে পারে।
তিনটে জিনিস আলাদা আলাদাভাবেই আমাকে টানে—যেমন তিন রকমের সুর আলাদা আলাদাভাবে সুন্দর, কিন্তু তিনটে একসাথে বাজলে যে-সুরটা তৈরি হয়, সেটা অন্য কিছু—সেটা সংগীত নয়, সেটা প্রার্থনা। জাহাজের ছাদে শুয়ে; চারপাশে অসীম জল, মাথার ওপর ভরা তারার আকাশ—আর রাতের সেই নীরবতা, যা শুধু জলের ওপরেই পাওয়া যায়, কারণ জল শব্দ গিলে খায়, আর যেটুকু শব্দ বেঁচে থাকে, তা শুধুই জলের নিজের—ছলাৎ, ছলাৎ—পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ঘুমপাড়ানি গান।
সাত।
পুনর্পাঠ—'ইসস্ শব্দের ওজন
তোমার লেখাগুলো বার বার পড়ছি।
যত পড়ছি, ততই নতুন লাগছে—যেমন একটা প্রিয় গান প্রতিবার শুনলে একটু অন্যরকম শোনায়; প্রতিবার একটা নতুন শব্দ কানে আসে, যা আগে খেয়াল করিনি। গানটা বদলায় না—আমি বদলাই, আর বদলে-যাওয়া আমি পুরোনো গানে নতুন অর্থ খুঁজে পাই। তোমার লেখাও তেমন—প্রতিবার পড়লে এক-একটা নতুন স্তর খুলে যায়, যেমন পেঁয়াজের খোসা ছাড়ালে ভেতরে আরও একটা খোসা, আরও একটা, আরও একটা—শেষ নেই।
তুমি সেদিন আদর করে একটা ছোট্ট শব্দ বলেছিলে—'ইসস্'।
আমাকে কেউ কোনোদিন ওভাবে বলেনি। দুটো অক্ষর। একটা নিঃশ্বাস। তার বেশি কিছু না—কিন্তু কখনো কখনো দুটো অক্ষরই যথেষ্ট সমস্ত কিছু বদলে দিতে। 'মা' দুটো অক্ষর—কিন্তু এই দুটো অক্ষরে সমস্ত নিরাপত্তা আছে। 'না' দুটো অক্ষর—কিন্তু এই দুটো অক্ষরে সমস্ত ভেঙে পড়া আছে। তোমার 'ইসস্' দুটো অক্ষর—কিন্তু তোমার মুখে শুনে মনে হলো, সারাটা পৃথিবী একটু নরম হয়ে গেল, যেমন শক্ত মাটিতে বৃষ্টি পড়লে মাটি নরম হয়, আর সেই নরম মাটিতে কিছু একটা রোপণ করা যায়—একটা বীজ, একটা আশা, একটা শুরু।
আমাকে কিছু একটা বলো। যে-কোনো কিছু? তোমার কাছ থেকে দুটো শব্দ শুনতে পেলেই আমি পাথেয় করে রাখব—মরুভূমির মানুষ যেমন একটুখানি জল রেখে দেয় সবচেয়ে কষ্টের দিনের জন্য, সবচেয়ে তৃষ্ণার্ত রাতের জন্য। তোমার শব্দ আমার সেই জল।
আট।
ছাদ—আকাশের সাথে মুখোমুখি
জানো, আজ রাতে আবার ছাদে চলে যেতে চেয়েছিলাম।
আমার ছাদটা আমার গোপন রাজত্ব। সেখানে আমি রানি, আর আকাশ আমার প্রজা—অথবা উলটোটা, আকাশ রাজা আর আমি তার একটা মাত্র প্রজা, আর আমাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই, কোনো সিংহাসন নেই, কোনো মুকুট নেই—শুধু দুটো অসীমতা মুখোমুখি বসে আছে, চুপচাপ।
আমি মাঝে মাঝে একা একা অনেক রাত পর্যন্ত ছাদে বসে থাকি। কখনো শুয়ে থাকি—পিঠে ঠান্ডা সিমেন্ট, চোখে অসীম আকাশ। আগে প্রতিদিনই যেতাম, এখন মাঝে মাঝে—যেমন পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা হয় মাঝে মাঝে, কিন্তু দেখা হলে মনে হয়, কোনো দূরত্বই হয়নি, কোনো সময়ই যায়নি, সব আগের মতোই আছে। ছাদটা আমার সেই বন্ধু—বিশ্বস্ত, নীরব, চিরকালের।
সেখানে আকাশ দেখি—তারাগুলোকে গুনি না, শুধু তাকিয়ে থাকি, যেমন কারও মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে কোনো কথা লাগে না, তাকানোটাই একটা সম্পূর্ণ বাক্য। গাছের পাতা ধরে আদর করি—গাছ কখনও ফিরিয়ে দেয় না; কখনও জিজ্ঞেস করে না, কেন এসেছ এত রাতে; কখনও বলে না, তুমি অদ্ভুত। গাছ শুধু থাকে, আর সেই থাকাটাই সবচেয়ে বড়ো সান্ত্বনা। ফিসফিস করে কথা বলি—কার সাথে, নিজেও জানি না। হয়তো রাতের সাথে। হয়তো নিজের সাথে। হয়তো ঈশ্বরের সাথে, যদি ঈশ্বর থাকেন। হয়তো এমন কারও সাথে, যে এখনও আসেনি—কিংবা আসবেই না—দুটোই সমান সম্ভব, আর দুটোই সমান সুন্দর, কারণ অপেক্ষার সৌন্দর্য ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না।
আমার চেনা অনেকেই আমাকে একটু অদ্ভুত ভাবে—রাতে একা ছাদে ভয় পাই না দেখে। তারা ভাবে, ভূত আছে; তারা ভাবে, বিপদ আছে; তারা ভাবে, অন্ধকারে একা থাকা অস্বাভাবিক।
তারা বোঝে না। আমার কাছে রাতের ছাদটা পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা—কারণ সেখানে কোনো মুখোশ লাগে না। দিনের বেলা আমরা সবাই অভিনেতা—কারও সামনে হাসি, কারও সামনে গম্ভীর, কারও সামনে শক্ত, কারও সামনে ভদ্র। কিন্তু ছাদে, রাতে…একা—আমি, শুধু আমি। আর সেই 'আমি'-কে আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি—কারণ সে সৎ।
আজ রাতে পড়তে বসব। মন ভীষণ ভালো—আর মন ভালো থাকলে আমি অসম্ভব পড়তে পারি। আনন্দ আমার মস্তিষ্ককে ধারালো করে, যেমন শান দিলে ছুরি কাটে—আজ রাতে বই আমাকে কাটবে না, আমি বইকে কাটব।
নয়।
সকাল—দেবতার সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসা
তুমি ডাক দিয়েছ কোন সকালে, কেউ তা জানে না,
আমার মন যে কাঁদে আপনমনে, কেউ তা মানে না।
ফিরি আমি উদাস প্রাণে, তাকাই সবার মুখের পানে—
তোমার মতো এমন টানে আর কেউ তো টানে না।
শুভ সকাল।
তোমাকে একটা কবিতা বলতে ইচ্ছে করছিল। অনেকক্ষণ ভাবলাম, কোন কবিতা দেবো—পৃথিবীতে কত সুন্দর কবিতা আছে, কিন্তু কোনোটাই ঠিক খাপ খাচ্ছিল না, যেমন ধার-করা জামা গায়ে ঠিক বসে না—হয় একটু বড়ো, নয় একটু ছোটো, নয় রংটা ঠিক আমার না। শেষমেশ এটাই এলো—কারণ এটা ধার-করা নয়। এটা আমার নিজের ভেতর থেকে আসা, আমার নিজের সুরে, আমার নিজের অপূর্ণতায়।
জানো, এতদিন তোমাকে আত্মার খুব কাছের কেউ মনে হতো—কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে।
যেন কোনো দেবতা। অথবা দূর পাহাড়ের মাথায় জমে-থাকা মেঘ—দেখা যায়, কিন্তু হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায় না, শুধু বাতাসে ভেজা আঙুল ফিরে আসে। অথবা শৈশবের কোনো স্মৃতি—যা মনে আছে, কিন্তু সেখানে ফিরে যাবার কোনো পথ নেই। তুমি ছিলে সেই দেবতা, সেই মেঘ, সেই স্মৃতি—উপস্থিত, কিন্তু অধরা।
তারপর সেই মানুষটা যখন আমার সাথে কথা বলল—দেবতা যদি হঠাৎ মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে চটি পরে, ধুলোয় পা ফেলে, আর পাশে এসে বসে বলে—'বলো, কী হয়েছে?'—তাহলে যেমন লাগে, সেদিন ঠিক তেমন লেগেছিল। মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। বুকের ভেতর কে যেন দৌড়োচ্ছিল। হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। আর মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না—কারণ দেবতার সাথে কী কথা বলবে মানুষ? তখন যে শুধুই তাকিয়ে থাকা যায়।
জোনাকির পাণ্ডুলিপি: ২
লেখাটি শেয়ার করুন