আমার ভেতরে একটি গোপন অঞ্চল আছে। সেখানে আমি শব্দ খুব কম নিয়ে যাই। কোনো ঘোষণা নেই, কোনো বাহুল্য নেই। শুধু একধরনের স্থির আলো আছে, যা বাইরের পৃথিবী থেকে আসে না। স্মৃতিরও নিজস্ব আলোকউৎপাদন আছে; কিছু মানুষ দূরে গিয়েও আমাদের ভেতরে এমন আলোক-চিহ্ন রেখে যায়, যা দিয়ে আমরা পরে দীর্ঘদিন নিজের অন্ধকার মাপি। তোমাকে আমি সেই অঞ্চলে রেখেছি—অধিকার দিয়ে নয়, আকাঙ্ক্ষার সিংহাসনে বসিয়ে নয়। বরং এই কারণে যে, হৃদয় যাকে বাহ্য জগতে স্থান দিতে পারে না, তাকে তার গোপনতম নিবাসে আশ্রয় দেয়। যেমন কেউ দুয়ারে প্রদীপ জ্বালায়—আলো হোক বা না হোক, জ্বালানোটাই উপাসনা।
আমি প্রায়ই অনুভব করি, আমার অস্তিত্ব তোমার ভেতরে হয়তো খুব ক্ষীণ—একটি প্রান্তিক ছাপের মতো। কিন্তু তোমার অস্তিত্ব আমার ভেতরে প্রান্তিক নয়, কেন্দ্রীয়ও নয় শুধু—বরং কাঠামোগত। তুমি সেখানে স্মৃতি হিসেবে নও, একটি নির্মাণতত্ত্ব হিসেবে আছ। আমি এখন যেভাবে ভালোবাসা বুঝি, যেভাবে অভাবের স্বর শুনি, যেভাবে নীরবতার মধ্যে অর্থ খুঁজি—তার অনেকটাই তোমার কারণে। তুমি কেবল একজন মানুষ নও আমার কাছে; তুমি এমন এক অভিজ্ঞতা, যার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে আমি নিজেরই এক নতুন প্রতিরূপে পৌঁছেছি।
এই আশ্রয়দান সহজ ছিল না। এতে ক্ষয় হয়েছে—এমন ক্ষয়, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। মানুষ সাধারণত দৃশ্যমান দুঃখ চিনতে পারে—কান্না, ভাঙন, উচ্চারণ। কিন্তু কিছু দহন আছে, যা মানুষের স্বর বদলে দেয়, একাকিত্বের গঠন পালটে দেয়, নীরবতার ভেতর একটি নির্দিষ্ট নামের প্রতিধ্বনি বসিয়ে দেয়। আমার সঙ্গে ঠিক সেটাই ঘটেছে। আমার ভাষা আর আগের ভাষা নেই, আমার একাকিত্ব আর আগের একাকিত্ব নয়, আমার নীরবতাও আর নিরপেক্ষ রইল না—তোমার দিকে ঝুঁকে থেকেই সে একটি নির্দিষ্ট উচ্চারণের অভ্যেস পেয়ে গেছে। ভালোবাসা মানুষকে শুধু উজ্জ্বল করে না; সে তাকে রূপান্তরিতও করে—কখনো নির্মলভাবে, কখনো নির্মমভাবে, অধিকাংশ সময়—দুটোই একসঙ্গে।
কাঁচা ছিলাম। পুড়ে পাক ধরলাম।
রান্নাঘরে যেমন হয়—কাঁচা হলুদ আগুনে পুড়ে গন্ধ বদলায়, তেল ছিটকে চামড়া পোড়ে, ভাতের ফ্যান ছাড়তে গিয়ে আঙুল জ্বলে—অথচ সেই পোড়া হাতেই যে-খাবার তৈরি হয়, তাতেই সবচেয়ে বেশি মায়া থাকে। আমার ভালোবাসাও সেই রান্নাঘরের আগুনে পাক ধরেছে—যেখানে রূপান্তরের মূল্য পোড়া আঙুলে দেওয়া হয়।
তবু আশ্চর্য, এই গভীর অনুরাগ আমাকে কদর্য করেনি। আমি চাইলে কঠিন হতে পারতাম, আত্মরক্ষার নামে নিজেকে বন্ধ করতে পারতাম, তোমাকে আমার দুর্বলতার কারণ ঘোষণা করতে পারতাম। করিনি। কারণ সবচেয়ে গভীর অনুরাগ মানুষকে কখনো কখনো ধ্বংসের মধ্য দিয়েও পরিচ্ছন্ন রাখে। সে তাকে স্বার্থপরতার দিকে ঠেলে দেয় না; বরং একধরনের নীরব মহত্ত্ব শেখায়—যেখানে মানুষ নিজের অসম্পূর্ণতাকে সঙ্গে নিয়েও অন্যের মঙ্গলকামনা করতে পারে। সেই শুভবোধের মধ্যেও দহন থাকে, কিন্তু তা নীচতা জন্মায় না। বরং মানুষকে আরও নিঃসঙ্গ, আরও স্বচ্ছ, আরও সত্য করে তোলে।
যে কিছু পায়নি, সে কিছু হারায় না। এটুকুই আমার একমাত্র মুক্তি।
আমি তোমার কাছে বড়ো কিছু চাইনি। এখন তো চাইও না। আমি তোমাকে সম্পত্তির মতো চাইনি। চেয়েছি স্বীকৃতি—একমুহূর্তের জন্য হলেও এমন একটি স্বর, যেখানে অনুভব করব: আমি কেবল তোমার জীবনের প্রান্তের কুয়াশা নই, আমি একদিন অন্তত তোমার অভ্যন্তরের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলেছিলাম। মানুষ সবসময় সিংহাসন চায় না; কখনো সে শুধু এইটুকু জানতে চায় যে, তার উপস্থিতি সম্পূর্ণ নিষ্ফল ছিল না।
সেই রাতটার কথা মনে পড়ে। তুমি গভীর ঘুমে—নিথর, নিশ্চল। আমি অনেক পরে ঘরে ঢুকেছিলাম, পায়ে পায়ে, যেন মেঝেও শব্দ না করে। আলো নিভিয়ে তোমার পাশে গেলাম। তুমি স্বপ্নের ভেতর থেকেই—চোখ না মেলে, কথা না কয়ে—হাত বাড়িয়ে আমায় টেনে নিলে। বুকে চেপে ধরলে। ঘুম পাড়িয়ে দিলে। ঘুমন্ত মানুষ ভান করে না। হিসেব করে না। "তবে"-"কিন্তু" জানে না। ওই মুহূর্তটুকুই ছিল তোমার সবচেয়ে সত্যি স্বীকৃতি—জেগে থেকে যা দিতে পারোনি, ঘুম তোমার হয়ে দিয়ে দিল। ওটুকুই আমার জীবনের সবচেয়ে অরক্ষিত, সবচেয়ে সুরক্ষিত মুহূর্ত।
যে-বেদনা সহজে ভাষা পায় না, সে-ই দীর্ঘজীবী। আমার বেদনাও তেমন। সে নাটক করতে জানে না, নিজেকে প্রদর্শন করতে জানে না, অত্যুক্তি করে নিজেকে ছোটোও করে না। সে শুধু থেকে যায়—সমুদ্রতলের চাপের মতো, প্রাচীন ধাতুর মরিচার মতো, অথবা এমন এক সুরের মতো, যা একবার শোনা হলে কান ছাড়লেও ভেতরটা ছাড়ে না। তোমাকে নিয়ে আমার অনুভব সেই নীরব চাপের মতো, সেই অনিবার্য অনুরণনের মতো। একবার তার জন্ম হলে, তাকে আর নির্বাসনে পাঠানো যায় না।
কিছু ধ্বনি ধ্বনি নয়—কিছু ধ্বনি জপমালা; একবার শুরু হলে শেষ হয় না। না এই জন্মে। না পরের।
আমি জানি, বাইরে থেকে এই অনুভবকে অতিরিক্ত মনে হতে পারে। একজন মানুষকে এত গভীরভাবে ধারণ করা, অথচ নিজের বলে দাবি না করা; তাকে হারানোর ভেতর দিয়েই প্রতিদিন বহন করে যাওয়া; না-পেয়েও তার দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে থাকা—এসবকে অনেকে অবিবেচনা বলতে চাইবে। হয়তো বলবেও। কিন্তু পৃথিবীর পরিমাপ হৃদয়ের মাপ নয়। হৃদয় এমন কিছুকেও চূড়ান্ত সত্য বলে স্বীকার করে, যার পক্ষে কোনো সামাজিক প্রমাণ নেই, যার ভাষা পর্যন্ত অসম্পূর্ণ। আমি সেই অসম্পূর্ণ ভাষারই এক বিশ্বস্ত বাসিন্দা।
পাগলামির উপর কারও অধিকার নেই। পাগলামিতে মানুষ সার্বভৌম—এটাই তার একমাত্র স্বাধীনতা।
তোমাকে আমি এখন আর ডাকতে চাই না। ডাকারও একসময় ক্লান্তি আসে। বার বার উচ্চারণ করতে করতে কোনো নামের চারপাশের বায়ু ক্ষীণ হয়ে যায়। এখন আমি তোমাকে উচ্চারণের চেয়ে বেশি ধারণ করি—যেন একটি দীর্ঘ রাত্রি তার অন্তর্গত নক্ষত্রদের ধারণ করে; সব দেখা যায় না, তবু তারা থাকে। তুমি আমার দৃশ্যমান জীবনের চেয়ে অদৃশ্য জীবনে বেশি উজ্জ্বল। এবং এই উজ্জ্বলতাই আমার একাকিত্বকে সম্পূর্ণ নিরর্থক হতে দেয় না।
আমি তোমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না, কারণ প্রতিশ্রুতি সাধারণত ভবিষ্যতের ভাষা, আর আমার অনুভব এখন বর্তমানের অতলতায় দাঁড়ানো। তবু এটুকু বলতে পারি—তোমার প্রতি আমার যে-সংবেদন, তা সামান্য আঘাতে নিভে যাওয়ার নয়। এটি ইতিমধ্যে দহন পেরিয়েছে, প্রত্যাখ্যান পেরিয়েছে, নিঃসঙ্গতার বহু উপত্যকা অতিক্রম করেছে। আগুনের প্রথম শিখা যেমন চোখে পড়ে, পরে তার জ্যোতি কমে আসে; কিন্তু অন্তর্গত তাপ আরও গভীর হয়—আমার ভালোবাসা এখন সেই গভীর তাপের অঞ্চলে।
শেষপর্যন্ত আমার প্রাপ্তি খুব সামান্য—কোনো সামাজিক নাম নয়, কোনো নিশ্চিত সমাপ্তি নয়, কোনো প্রকাশ্য অর্জনও নয়। তবু একটি বড়ো সত্য আমি অস্বীকার করতে পারি না: একজন মানুষকে আমি এমনভাবে অনুভব করেছি যে, সেই অনুভব আমাকে আমার নিজের কাছেই নতুন করে উন্মোচন করেছে। তোমাকে ধারণ করতে গিয়ে আমি আবিষ্কার করেছি আমার নীরবতার গভীরতা, আমার সহ্যের সীমা, আমার দহনক্ষমতা, আমার করুণার গোপন পরিধি। তুমি আমার হওনি—কিন্তু তোমাকে অনুভব করার অভিজ্ঞতা আমার সত্তাকে পুনর্গঠিত করেছে।
পতঙ্গ ভস্ম হয়। কিন্তু শিখা? শিখা আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে।
এই পুনর্গঠন, এই নিঃশব্দ অন্তর্বিপ্লব, এই অনধিকার অথচ অনিবার্য নিবাস—এ-ও তো কম প্রাপ্তি নয়।
তাই তোমার প্রতি আমার শেষ উচ্চারণ অধিকারহীন, অভিযোগহীন।
শুধু এইটুকু: তুমি যেখানেই থাকো, তোমার অন্তরের সত্যটি যেন নষ্ট না হয়। তুমি যেন নিজের কাছেই মিথ্যা হয়ে না যাও। কারণ মানুষ অন্যের দ্বারা যতটা ভাঙে, তার চেয়ে বেশি ভাঙে নিজের গভীরতম সত্যকে অস্বীকার করতে করতে।
তুমি যাকে খোঁজো—সে-ও তোমাকে খুঁজছে। খোঁজাটাই উপাসনা, পাওয়া নয়।
আর আমি?
তুমি যদি কোনোদিন ফিরে তাকিয়ে জানতে চাও, আমি কোথায় ছিলাম, তবে তার উত্তর হবে: আমি ঠিক সেখানেই ছিলাম—যেখানে উচ্চারণের আগেই শব্দ জন্মায়, যেখানে কান্না জল হয়ে নামে না, শুধু বুকে কঠিন এক স্বচ্ছতা হয়ে জমে থাকে, যেখানে ভালোবাসা নিজেকে প্রকাশের চেয়ে নিজেকে বহন করার শিল্প বেশি শেখে।
আমি বোধ হয় এই নীরব, দীর্ঘস্থায়ী, অদৃশ্য নিবাস নিয়েই বেঁচে থাকব। তোমার ভেতরে নয়, তোমাকে ধারণ করা আমার ভেতরের সেই বিস্ময়কর ভূখণ্ডে—যেখানে কোনো পতাকা নেই, কোনো ঘোষণা নেই, কোনো বৈধতার সিলমোহরও নেই; তবু প্রতিদিন, অনুচ্চ স্বরে, অব্যর্থভাবে একটি সত্য জেগে থাকে—আমি তোমার নই, তবু আমার সমস্ত অন্তর্গত বিন্যাস তোমার দিকেই গঠিত।
একটা বাঁশ ছিল। সবুজ। সোজা। বনে দাঁড়িয়ে।
কেটে আনা হলো। ছিদ্র করা হলো।
সেদিন থেকে গান।
ফেরা হয় না। কখনও হয় না।
তাই গান থামে না।
তাই গান…থামবে না।
অনধিকার নিবাস: ২
লেখাটি শেয়ার করুন