: হ্যালো নীরা, কেমন আছিস?
: .........................................................
: কথা বলছিস না কেন?
: তোকে না বলেছি, আমাকে ফোন করবি না?
: কেন, ডার্লিং? আমি আর কাকে ফোন করব, তোকে ছাড়া? বল? বল না?
: তোকে না বলেছি, মাতলামো করতে আমাকে ফোন করবি না।
: মদ খেয়েছি তো কী হয়েছে? আমার ইচ্ছে, আমি খাব, এক-শো বার খাব। তুইও খেয়ে দেখ। কী হয়েছে জানিস...রাহাত না...
নীরা ফোনটা নামিয়ে রাখল। ঘড়িতে তিনটে বেজে ছাব্বিশ। কোনো সুস্থ মানুষ এই সময়ে বিনা কারণে কাউকে ফোন করতে পারে? ও, হ্যাঁ...তমা তো সবই পারে, ভুলেই গিয়েছিল নীরা। তমা গিটার বাজাতে পারে, ভলিবল খেলতে পারে, মন নিয়েও খেলতে পারে হয়তো।
আচ্ছা, এসব কী ভাবছে নীরা? তমা মন নিয়ে খেলতে পারে কি না, এটা তো তার জানার কথা নয়। মনগড়া একটা কথা সে নিজেকে শুনিয়ে দিল? কেন শোনাল? জেলাসি? না কি নিজেকে সান্ত্বনা দিল?
আরে, না না। নীরার মতো একটা মেয়ের কি আর অত অনুভূতি থাকতে আছে? সে কেন হিংসা করতে যাবে তমাকে? তমার তো কোনো দোষ ছিল না, রাহাত তো নিজে থেকেই ওকে...
আচ্ছা, কী হয়েছে আমার? নীরা নিজেই নিজেকে বলল। আমি এই ভোররাতে কেন এসব পুরোনো কথা ভাবছি? ওসব তো আমি কবেই পেছনে ফেলে এসেছি। ওরা যা ইচ্ছে করুক।
ফজরের আজান পড়ে গেল। চারটা বাজতেই ইদানীং আজান দিয়ে দেয়। নীরা চুল খোঁপা করতে করতে বিছানা ছেড়ে উঠল। আজ আর তার ঘুম হবে না। মাথা ধরার আগেই চা খেতে হবে।
ও শাড়ি ঠিক করতে করতে যেই রান্নাঘরের দিকে যাবে, তখনই মনে পড়ল, এখন চা বানাতে গেলে নিশ্চিত হাসুর মা'র চিল্লাপাল্লা শুরু হবে। "আইজও অ্যাত্ত শিগ্গিরি উইঠা পড়ছেন, আফা? শরীরডারে আর কত কষ্ট দিবেন? যান, গিয়া হুইয়া থাকেন। আমি বেলা হইলে চা দিয়া আমু। যান, যান।"
এর চেয়ে বরং শুয়ে থাকাই ভালো। সকালে আবার বেরোতে হবে নীরার। একটা বেসরকারি কলেজে ইংরেজি পড়ায় ও।
কলেজের ছেলেগুলো এমনিতেই কথা শোনে না, পড়া শিখতে চায় না। কোনো কারণে যদি ওর চেহারায় একটুও ক্লান্তির ছাপ দেখায়, স্টুডেন্টদের মধ্যে তো সেদিন যেন পড়া ফাঁকি দেবার প্রতিযোগিতা লেগে যায়। এই উঠতি বয়সের ছেলেগুলোকে ম্যানেজ করা যে কী কঠিন, তা একমাত্র নীরাই জানে। নীরা নিজেও ইয়ং একটা মেয়ে, ও বোঝে ছেলেদের এই বয়সের দোষগুলো। কিন্তু মাঝেমধ্যে ছেলেগুলো এমন কাণ্ড ঘটায় যে, লজ্জায় কুটিকুটি হয়ে যায় ও।
একদিন এক ছাত্র দাঁড়িয়ে বলল, "ম্যাম, ইংরেজিটা একটু বাংলায় পড়ানো যায় না?" এই কথায় পুরো ক্লাসে হাসির রোল পড়ে গেল। সে কী হাসাহাসি, একে অন্যের গায়ে লুটিয়ে পড়ছিল যেন হাসতে হাসতে।
ওদের থামাতে থামাতেই সেদিন ঘণ্টা পড়ে গেল। নীরা ক্লাস থেকে বেরোবে, ঠিক সেই সময় এক ছাত্র কাছে এল।
: ম্যাম, আমার ইংরেজিতে কিছু সমস্যা হচ্ছে ইদানীং, ক্লাসে সবার সামনে বলতে লজ্জা পাই।
: ঠিক আছে, একটা খাতায় সমস্যাগুলো লিখে সেমিনার রুমে আমার ডেস্কের ওপরে রেখে যেয়ো। আমি দেখব।
: থ্যাংক ইউ, ম্যাম।
পরের দিন সেমিনার রুমে গিয়ে নীরা দেখে, ডেস্কের ওপরে গতকালের সেই ছেলেটির খাতা। খাতা খুলে দেখল, ওই ছাত্র শেক্সপিয়ারের ড্রামার একটা প্যারা লিখেছে, এবং তার নিচে লিখে রেখেছে— "ম্যাম, শেক্সপিয়ারের লেখা কিচ্ছু বুঝি না, এত কঠিন লিটারেচার! এটা আমাকে পড়তেই হবে, তাই আপনার সাহায্য চাইছি। সরি, ম্যাম।"
এটা দেখে প্রচণ্ড রাগেও কেন জানি না নীরার হাসি পাচ্ছিল। আর ছেলেটার আগ্রহ দেখে ভালো লাগাও কাজ করছিল। ওই ছেলেটাকে সঙ্গে সঙ্গে টিচার্স রুমে ডেকে আনল।
: এসবের মানে কী? তোমাকে শেক্সপিয়ার কে পড়তে বলেছে?
: না, মানে আমি...
: সিলেবাসের পড়া কমপ্লিট করো, আমি এগুলো সময় নিয়ে একদিন বুঝিয়ে দেবো তোমাকে। কেমন?
: ম্যাম, রোম্যান্টিক গল্প তো, তাই আর কি...
এটা বলেই কোনোদিকে না তাকিয়ে ছেলেটা দৌড়ে পালাল।
আরেক বার তো ডেস্কের ওপরে একটা পেপারে মোড়ানো শাড়ি পেয়েছিল নীরা। চিরকুটে লেখা ছিল—"আপনাকে আমার খুব পছন্দ, এটায় খুব মানাবে।"
কী লেভেলের অসভ্যতা! ভাবা যায়? অবশ্য দোষটা নীরা ওকে না দিয়ে ওর বয়সকেই দিল। কী-একটা বয়স! কিছুই ভাবে না, কাউকে তোয়াক্কা করতে চায় না! এরকম বয়স তো নীরারও গেছে। বেশিদিন আগের কথা তো নয়। সে-ও কি এমন ছিল? যা ইচ্ছে করে ফেলতে পারত ওই বয়সে? মনে যা আসত বলে দিতে পারত?
এমন আরও অনেক পুরোনো জিনিস ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়ে গেল। হাসুর মা চা নিয়ে রুমে এল।
: গুড নাইট, সিস্টার। হু আর ইউ?
: উফ, তোমাকে কত বার বলেছি, ভুল ইংরেজি শুনলে আমার রাগ হয়। তুমি বাংলায় বলতে পারো না?
: সিস্টার, নাও, অনলি ইংলিশ ফ্রম এভরি ডে।
: হা হা হা...তুমি থামবে এবার?
: ওকে, আই নাও স্টপ ইট।
আফা, আফনের কাছে ইংরেজি শিইখাও যদি বাংলায় কতা কই, ইংরেজগো মান থাকব?
নীরা চা হাতে নিতে নিতে বলল—"ইংরেজদের মান তোমাকে রাখতে হবে না। নাশতা খেয়েছ?"
: না, আফা। আপনে চা'ডা শেষ করেন। আমরা আচার দিয়া গরম গরম খিচুরি খামু, একলগে।
: আমি খাব না কিছুই। তুমি খেয়ে নিয়ো। বাথরুমে কাপড় দাও। জলদি গোসল করে বেরোতে হবে।
: একটু খিচুরি খাইলে...
: যা বললাম, তা-ই করো।
তমা এক নিঃসন্তান দম্পতির পালিত সন্তান। কোনো কিছুর অভাব দেখেনি সে বুদ্ধি হওয়ার পরে। তাই, তমার শুধুই জীবনের অভাব। যেসব মানুষ কখনও অভাব দেখে না, তারা একটা সময় জীবনই দেখতে পায় না। ঝকঝকে তকতকে করে রাখা তমার ফেইসবুকের জীবনটা যতটা সুন্দর, ততটাই ভয়ংকর ওর বাস্তব জীবন। ওর জীবনের কথা ভাবতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় নীরার।
তমাকে যখন দত্তক নেওয়া হয়, তখন ওর বয়স ছিল চার বছর। ও খুব চেষ্টা করেও ওর ছোটোবেলার কথা মনে করতে পারে না। একদিন ওরা তিন বন্ধু মিলে ক্যান্টিনে আড্ডা দিচ্ছিল। নীরা, তমা আর সুতপা। সেদিন শুধু নীরা আর সুতপা কথা বলছিল। তমা চুপ করে ছিল। হঠাৎ ঘড়ি দেখে সুতপা জানায়, ওর ক্লাস আছে, ওকে এখন উঠতে হবে।
সুতপা উঠে যেতেই নীরা তমাকে জিজ্ঞেস করে—
: কী রে, তোরও তো এই টাইমে ক্লাস থাকে, থম ধরে বসে আছিস কেন? ওঠ, ক্লাসে যা।
: প্রতিদিনই ক্লাসে যেতে হবে?
তমার গলাটা অন্যরকম শোনাচ্ছিল সেদিন।
: কী রে, ঠান্ডা লেগেছে নাকি?
: আরে ধুর! মাল খেয়েছি, শালা।
: কী!
: মাল বুঝিস না? মাল? মাল খেয়েছি, ঘুমোইনি রাতে। তাই গলা এমন শোনাচ্ছে।
: আচ্ছা...মন খারাপ হলেই এসব খেতে হবে? জীবনে কত কিছু...
: অ্যাই শালি, থামবি? লেকচার শুনব না বলে ক্লাস মিস দিলাম, আর তুই লেকচার দিচ্ছিস?
: তোর মন কি খুব বেশি খারাপ, দোস্ত?
: তুই কোনোদিন তোর বাবার সাথে শুয়েছিস?
: হুঁ, বাবা বলতে মামা-মামির সাথে তো কতই শুয়েছি।
: আরে শালি, ওই শোয়া না, সেক্স করেছিস মামার সাথে?
: এসব কী বলছিস, তমা? তুই কি খুব বেশি অসুস্থ? এদিকে আয় তো দেখি।
: শোন, নীরা, তোর এই সরলতাই তোকে একদিন ডোবাবে, শেষ করে দেবে। মিলিয়ে নিস আমার কথা।
: তুই বাবা-মায়ের পালক সন্তান, এটুকু আমাকে আগেই বলেছিস। তুই খুব হ্যাপি এবং প্রিভিলেজড একটা লাইফ লিড করিস, আমি সেটুকু জানি। আজ এসব মদ, সেক্স কী সব বলে যাচ্ছিস, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
: বুঝতে চাইছিস?
: হ্যাঁ।
: বলব?
: হ্যাঁ, আজ আমিও ক্লাস মিস দিয়ে শুনব তোর সব কথা।
তমা শুরু করে।
আমাকে দত্তক নেওয়া হয় চার বছর বয়সে। আমি খুব চেষ্টা করেও ছোটোবেলার কিছু মনে করতে পারি না। যা-ই মনে পড়ে, সেগুলো খুবই ঝাপসা।
আমাকে আমার পালক পিতামাতা খুবই যত্নে রাখতেন, একদম মাথায় করে। এখন মনে হয়, একটা দারুণ শৈশব ছিল আমার। জীবনের যত আনন্দ, আমি সবই করে ফেলেছি, আর কিছুই বাকি রাখিনি সামনের জীবনের জন্য।
আমার যখন বয়স বারো, মানে আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, সে সময় আম্মু প্যারালাইজড হন, তাঁর আরও নানান অসুখ ছিল। আমি কী করব, কী করব না, তেমন কিছুই বুঝতাম না। শুধুই আম্মুর হাত ধরে বসে থাকতাম আর কাঁদতাম। প্রায়ই আম্মু সারারাত জেগে ভোরের দিকে ঘুমোতে যেতেন। সারারাত বাবাও আমাদের সাথেই থাকতেন।
একদিন ভোরে আমার চোখ লেগে আসে, আম্মুর ওপরেই মাথা রেখেছিলাম। বাবা কোনো শব্দ না করে আমাকে কোলে তুলে আমার রুমে নিয়ে যান। গায়ে কাঁথা দিয়ে শুইয়ে, রোজকার মতো কপালে একটা চুমু দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যান।
সেদিন ভোরে বাবা অনেকক্ষণ রুমের বাইরে পায়চারি করেন, আমি শুনতে পাই। অনেকক্ষণ পায়চারির পর তিনি রুমে ঢোকেন। আর সেদিন তাঁর পুরুষসত্তার কাছে হেরে যায় পিতৃসত্তা। আমি ওই একদিনে যেন নরক ঘুরে আসি। এতটাই অবাক হয়ে যাই যে, মনে হয়, আমি যেন রোবটে পরিণত হয়েছি। বারো বছর বয়সে আমি নিজের শরীরের কী-ই বা বুঝি? কিন্তু আমার পিতা আমার শরীরটাকে বুঝে নিয়েছিলেন ষোলোআনা। এরপর থেকে বলতে গেলে রোজই এমন হতো। আম্মুর সামনে তিনি আমার বাবা হয়েই থাকতেন। প্রতিদিন ভোর হলেই…
আমি যখন কাঁদতাম, বাবা নিজ হাতে আমাকে মদ খাইয়ে দিতেন, যেমন করে বাবারা সন্তানদের নিজহাতে খাবার খাইয়ে দেন। বাবা হয়ে শুরু করা খেলা, পুরুষ হয়ে শেষ করতেন। প্রথম দিকে মদ খেয়ে খুব বমি হতো। এরপর থেকে অভ্যাস হয়ে যায়। আমি দেখতাম, ওসব ভদকা-গন্ধওয়ালা জিনিস ওষুধের মতো কাজ করছে। আমি ক্ষতস্থানে কোনো ব্যথা অনুভব করছি না, আমার শরীর অনেক হালকা লাগছে। এভাবে আমিও অভ্যস্ত হতে থাকি মদে, পুরুষে, বিছানায়, অভিনয়ে। ওই অস্বাভাবিক জীবন আমার কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমার বাবা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন আজকের হোসেন সাহেব।
জানিস, হোসেন সাহেব আমার ওপরে চড়ে প্রায়ই একটা কথা বলত— "শোনো মেয়ে, জীবনে সেক্স আর টাকা ছাড়া কোনো কিছুই সত্যি না"— এবং বিচ্ছিরিভাবে হাসতেন।
নীরের তৃষ্ণা: ১
লেখাটি শেয়ার করুন