আচ্ছা, মৃত্যুর আগ-মুহূর্তে ঠিক কতজন ব্যক্তিকে জানিয়ে যাওয়া সম্ভব?
মানুষ কত ক্ষুদ্র কারণে আত্মহত্যা করে, তাই না? আমি বেশকিছু চিঠি সংরক্ষণ করেছি গত তিন বছর ধরে—এরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে, কিন্তু একটা ব্যাপার চমকপ্রদ...প্রত্যেকটা চিঠিরই নিজস্বতা রয়েছে।
আশ্চর্যের ব্যাপার...ছোট্ট একটা মেয়ে আত্মহত্যা করেছে... শুধু তার মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে বলে। মাত্র দু-লাইনের নোট, এতে লেখা—"জীবন নিয়ে এত ভেবে হয়েছেটা কী? জীবনটাও কি স্থির আছে?" ব্যস্, এটুকুই! কী আশ্চর্য রকমের পরিপক্ব দৃষ্টিভঙ্গি মেয়েটির!
এক যুবক হতাশা কিংবা ব্যর্থতার গ্লানি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে...কারণটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। জীবনের প্রতি মুগ্ধতা না থাকায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে—এমন মানুষের সংখ্যা কিন্তু কম নয়; অথচ এদের প্রত্যেকেই যথেষ্ট বিত্তশালী। আবার, ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে পায়নি বলে...জীবনটাকে মূল্যহীন ভাবা মৃত মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
সত্যিই, জীবনটা ঈশ্বরের দেওয়া অনিশ্চিত এক উপহারমাত্র। এর পরতে পরতে রহস্য লুকোনো। আমার চলে যাবার কারণটা এই পৃথিবীর কাউকেই বলে যেতে চাই না। এই শেষচিঠিতে তুমি মৃত্যুর সঠিক কারণটা কখনোই ধরতে পারবে না—সেভাবে করেই লেখা। আজকের পর থেকে তুমি আর আমাকে কখনোই খুঁজে পাবে না।
সময়টা কেমন যেন অদ্ভুত, অদৃশ্য শেকলে বাঁধা! আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পেরেছিলাম কি কখনো? এই কঠিন সত্যটাই আমাকে দুর্বল একজন মানুষে রূপান্তর করে।
আমার মনে আছে, আমার প্রথম চিঠিটি আমি তোমাকে দিয়েছিলাম—প্রেমের নয়, প্রস্থানের। কিন্তু কোথা থেকে কী-যে ঘটে গেল—নিয়মিত তোমার সংস্পর্শে থাকতেই হঠাৎ লেখালেখি শুরু করলাম। এসব কিছু আমার সাথে কতখানি প্রাসঙ্গিক, তা না-ভেবেই তোমার গভীর প্রেমে পড়ে যাই। জানো, সেই সময়গুলোতে আমার নিজেকে সবচাইতে সুন্দর মনের মানুষটা মনে হতো—যত বার আমি তোমাকে আমার গভীর অনুভূতি দিয়ে স্পর্শ করেছি।
স্পষ্টতই, আমার যোগ্যতা নেই বাস্তবে তোমাকে কাছে পাবার। কিছুটা শক্ত আত্মবিশ্বাসে আমি সৃষ্টির আনন্দ উপভোগ করি।
সৌন্দর্যের এক নিখুঁত সংজ্ঞা আমার জানা আছে—তোমাকে স্পর্শ করে জেনেছিলাম। তোমার আলিঙ্গনে নিজেকে ভীষণ সুখী মানুষ ভেবে নিলাম। সবটাই কি ভুলবশত? আমার কষ্ট হচ্ছে না এই ভেবে যে—আমি আর কতখানি আলোর মুখ দেখতে পেতাম! শুধু কষ্ট হয় ভাবলে—আমি আর কখনও লিখতে পারব না।
জীবনে কিছু সিদ্ধান্ত নিজের অনিচ্ছাতেই নিতে হয়, হয়তো সবচেয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত—জীবনের ইতি টানা।
খোদার দরবারে দু-হাত তুলে চেয়েছিলাম শান্তি, আর তার বদলে পেলাম কিনা প্রেম!
প্রস্থানের পাণ্ডুলিপি
লেখাটি শেয়ার করুন