গল্প ও গদ্য

একটা বাড়তি থালা: ২



ছয়


শ্রাবণীর সাথে দেখা কলেজের লাইব্রেরিতে।


জানালা দিয়ে বিকেলের আলো এসে বইয়ের পাতায় সোনালি ছোপ ফেলত। ধুলোর কণা সেই আলোয় ভাসত—শুভ্র মাঝে মাঝে বই না পড়ে ওসব দেখত, কেমন উদ্দেশ্যহীন ঘুরছে, কোথাও যাচ্ছে না।


একটা মেয়ে এসে পাশে বসল। চুলে ক্লিপ—নীল, ছোটো, প্রজাপতির মতো।


এই বইটা কি তোমার? একটু দেখতে পারি?


কেউ প্রথম বার তার কাছে কিছু চাইছে। জোর করে নিচ্ছে না, দয়া করে দিচ্ছে না। শুধু একটা বই চাইছে—সরল, স্বাভাবিক, যেমন মানুষ চায়।


তারপর কথা হলো। ক্যান্টিনে চা—দুই কাপ, মুখোমুখি। চায়ের ধোঁয়ার ফাঁক দিয়ে শ্রাবণীর মুখটা একটু ঝাপসা, একটু ভোরের কুয়াশার মতো। শ্রাবণী কথা বলত অনেক—সিনেমা, বই, রাজনীতি, ক্যান্টিনের চায়ের মান নিয়ে অভিযোগ—আর শুভ্র শুনত। শোনাটা তার জন্য সহজ ছিল। সারাজীবন তো শুনেই এসেছে। কিন্তু এই শোনায় কষ্ট ছিল না—একটা উষ্ণতা ছিল, যেন শীতের রোদে বসে থাকা।


একদিন শ্রাবণী জিজ্ঞেস করল—তুমি নিজের কথা কিছু বলো না কেন?


শুভ্র একটু চুপ করে ছিল। তারপর বলতে শুরু করল—ধীরে, ছেঁড়া ছেঁড়া; যেমন অনেক দিন বন্ধ-থাকা কল প্রথমে ফোঁটায় ফোঁটায় দেয়, তারপর ধারায়। কুষ্টিয়া, পদ্মা, বারান্দা, থালাবাসন, মামির কথা, হাসপাতালের সেই ত্রিশটা বেড।


শ্রাবণী শুনল। জাজ করেনি, সান্ত্বনার বাণী দেয়নি। শুধু শুনল—পুরোটা, শেষপর্যন্ত। তারপর শুভ্রর হাত ধরল।


থালাবাসন-ধোওয়া রুক্ষ হাতে শ্রাবণীর নরম আঙুল। বারো বছর বয়সে মায়ের কোল ছেড়ে আসার পর প্রথম কেউ ভালোবাসায় ছুঁল।


শ্রাবণী তার চুলের ক্লিপটা খুলে শুভ্রর বইয়ে আটকে দিত—বুকমার্কের মতো। বলত—এটা থাক, আমি আছি, মনে রাখবে। সেই নীল প্রজাপতি এখনও একটা বইয়ের ভেতর আছে—কোন বই, শুভ্র ভুলে গেছে; কিন্তু মাঝে মাঝে পাতা ওলটাতে গিয়ে পড়ে যায়। তখন একটু থামে।


তিন বছর। তিন বছর শুভ্র বেঁচেছিল শ্রাবণীর জন্যে। ভেবেছিল—চাকরি হলে একটা ঘর, শ্রাবণী, মা, বাবা, ছোট্ট একটা রান্নাঘর, যেখানে ডাল রাঁধবে—পুড়বে না সেই ডাল, কারণ পাশে কেউ থাকবে, যে বলবে, নাড়ো, নাড়ো, পুড়ে যাচ্ছে!


সেদিন সন্ধেবেলায় ফোন এল।


শ্রাবণীর গলাটা অন্যরকম ছিল। যেমন কাচে চিড় ধরলে বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতর থেকে আলোর চেহারা বদলে যায়।


শুভ্র, আমি আর পারছি না।

একটু সময় দাও।

কতটুকু? পঁচিশ পেরিয়ে গেল। বাবা-মা জিজ্ঞেস করে। তোমার বন্ধুরা চাকরি পাচ্ছে, বিয়ে করছে। আর আমি কী বলব?—ও মেসে থাকে, পরীক্ষা দেয়, আলসার আছে?


শুভ্র কিছু বলল না। কী বলবে। সত্যিটাই তো বলল।


দীর্ঘ চুপ। ফোনের ওপার থেকে শ্রাবণীর অসমান-এলোমেলো শ্বাস। এপারে শুভ্রর ভেতরে কিছু-একটা ভাঙল, নিঃশব্দে—যেমন জানালার কাচ ঠান্ডায় ফাটে, কোনো শব্দ হয় না, শুধু সকালে দেখা যায়, একটা রেখা চলে গেছে এপার থেকে ওপারে।


আমি সরি, শুভ্র।


ফোন কেটে গেল। শুভ্র কানের কাছে ধরে রইল আরও কিছুক্ষণ। যেমন কেউ চলে গেলেও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা যায়।


আর ফেরেনি। শুভ্ররা ফেরাতে পারে না।


পরদিন ক্যান্টিনে গেল। অভ্যেসের বশে দুটো চা অর্ডার দিল। দ্বিতীয় কাপটা সামনে রেখে দেখল, ধোঁয়া উঠছে, কমছে, তারপর চা ঠান্ডা হয়ে গেল। কেউ খেল না।


সাত


সেই রাতে ছাদে গেল।


কলকাতার আকাশে তারা দেখা যায় না। কুষ্টিয়ায় রাতে এত তারা দেখা যেত যে, মনে হতো, কেউ কালো কাপড়ের ওপর সাদা সাদা ফুলের মতো ভাত ছড়িয়ে দিয়েছে। মায়ের কোলে শুয়ে গুনত। মা বলত—ওই দ্যাখ, ধ্রুবতারা, ওটা সবসময় একজায়গায় থাকে, কোনোদিন সরে না।


শুভ্র আজ সেই ধ্রুবতারা খুঁজছে। পাচ্ছে না।


নিচে রাস্তায় অটোরিকশার হেডলাইট, সরু আলো অন্ধকার কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছে। দূরে কুকুরের ডাক—একটা ডাকলে আরেকটা জবাব দেয়, যেন অন্ধকারে ওরা নিজেদের মধ্যে কী-একটা মানচিত্র আঁকছে শব্দ দিয়ে। নিচতলা থেকে হিন্দি গান ভেসে আসছে।


রেলিংয়ের কাছে গেল। লোহার। মরচে-ধরা। কালো রং জায়গায় জায়গায় খসে গেছে, তলায় কমলা-বাদামি মরচে। দু-হাতে ধরল। ঠান্ডা।


নিচে তাকাল। চারতলা। সিমেন্টের ফুটপাত।


একটা পা। শুধু একটা পা এগিয়ে দিলে…


একটা অদ্ভুত রকমের শান্তি নামল মাথায়। সব শব্দ থেমে গেল। ভাবল—সব শেষ করে দিলে আর কিছু নেই। না জ্বর, না একলা রান্না, না খালি চেয়ার। একটা বই বন্ধ করে দেওয়ার মতো—যে-বইটা কেউ পড়ছে না।


হঠাৎ পকেটে ফোন কাঁপল।


দু-হাত রেলিংয়ে। বাতাস চুলে লাগছে। মেসেজ।


ওপারের নম্বর। মা।


কিছু অক্ষর বাংলায়, কিছু ইংরেজিতে, স্পেলিং এলোমেলো। মায়ের ফোনে বাংলা কিবোর্ড ঠিকমতো কাজ করে না। হয়তো পনেরো মিনিট লেগেছে এই একটা মেসেজ লিখতে—একটা-একটা অক্ষর খুঁজে, ভুল হলে মুছে আবার লেখে। চোখে ভালো দেখে না, মুখ নিয়ে যায় স্ক্রিনের কাছে। হয়তো বাবা পাশে বসে বানান বলে দিয়েছে।


বাবা, খেয়েছিস? শরীর কেমন? তোর কথা মনে পড়ে।


তোর কথা মনে পড়ে…রেলিং থেকে হাত সরাল।


পিছিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে নামল, একটা-একটা ধাপ। প্রতিটা ধাপে পায়ের তলায় সিমেন্টের শক্ত স্পর্শ—মাটি আছে। ঘরে ফিরে শুয়ে পড়ল। মায়ের মেসেজটা আবার পড়ল। আবার। আবার।


সে রাতে একটু ঘুম হলো। অনেক দিন পর।


আকাশে ধ্রুবতারা পায়নি। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে মায়ের মেসেজটা জ্বলছে—সে-ও তো একজায়গায়, স্থির!


আট


দিনগুলো কাটে। একই ছকে—সকালে ওষুধ, লাইব্রেরি, প্রস্তুতি, মেসের খাওয়া, ঘুম। ঋতু বদলায়, শুভ্র বদলায় না।


ফোনে মেসেজ আসে—দোস্ত, আমার অমুক জায়গায় হয়ে গেছে! শুভ্র লেখে—অনেক খুশি হলাম। কনগ্রাচুলেশনস রে! ফোন রাখে। দেয়ালের দিকে তাকায়।


বিয়েতে যায়। জামা ইস্ত্রি করে পরে। শুভ্রর হাসিটা এখন ভালোই হয়—অভ্যেসের জোরে। কেউ ধরতে পারে না, ভেতরে কী চলছে। কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে—তোরটা কবে হবে রে? শুভ্র হাসে। সেই হাসিটা রাতে মেসে ফিরে শার্টটা খোলার সাথে সাথে খুলে পড়ে।


দেয়ালে কিছু নেই—কোনো ছবি, কোনো ক্যালেন্ডার। ইচ্ছে করেই লাগায়নি। মায়া থাকলে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়। সবাই অসুখে মরে না, কেউ কেউ মায়ায়‌ মরে।


একদিন মাসিও গেল।


মাসিই ছিল শেষ মানুষটা, যে সপ্তাহে একবার ফোন করত। রোববার সকালে, দশটায়। তিনটে প্রশ্ন—খেয়েছিস? শরীর কেমন? ওষুধ খাচ্ছিস? তারপর দু-মিনিট পাড়ার গল্প—কার মেয়ের বিয়ে হলো, চালের দাম বাড়ছে। তুচ্ছ কথা। কিন্তু পৃথিবীতে যখন আর কেউ ফোন করে তুচ্ছ কথাটুকও বলে না, তখন বোঝা যায়, পৃথিবীতে তুচ্ছ বলে কিছু নেই।


বাস দুর্ঘটনা। ব্যস্‌! সব শেষ।


ফোনে মাসির নামটা এখনও আছে—"মাসি"। মুছতে পারে না। কখনো ভুলে সেই নামে চোখ পড়ে—একটা মুহূর্ত মনে হয়, ফোন করি, তারপর কত কিছু মনে পড়ে। সেই "তারপর মনে পড়াটা"—প্রতিবার একটু একটু করে মরমে মারে।


রোববার সকালে দশটায় ফোন বাজে না আর। সেই সময়টা এখন ফাঁকা—শুভ্র বসে থাকে, দশটা পেরোতে দেয়।


পিসি আছে। কথা বলে না। কেন—শুভ্র জানে না। জানার চেষ্টাও ছেড়ে দিয়েছে। শুভ্রদের অত জানতে নেই।


নয়


আজ শরীর আবার খারাপ।


সেই এক-শো দুই প্লাস। পেট জ্বলছে। ওষুধ টেবিলে, জল নেই। মেসের বাইরে ছেলেরা ক্রিকেট নিয়ে চেঁচাচ্ছে। কেউ জানে না, বারো নম্বর ঘরে একটা ছেলে তিনদিন ধরে ঠিকমতো খায়নি।


ফোন স্ক্রল করছে। সবার জীবনে কেউ-না-কেউ আছে।


স্ক্রল করতে করতে একটা লেখায় থামল।


এক দাদা—যাকে আগেও ফলো করত—একটা লেখা পোস্ট করেছে। দর্শন নয়, তত্ত্ব নয়, সস্তা বাজারি অনুপ্রেরণাও নয়। নিজের একটা গল্প। কীভাবে একটা সময় ছিল, যখন সে বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকত, কারণ ও-ই একমাত্র জায়গা, যেখানে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না।


কীভাবে একবার রাতে হেঁটে একটা ব্রিজের ওপর উঠেছিল, তারপর একটা চায়ের দোকান দেখে নেমে গিয়েছিল—চায়ের গন্ধটা কেমন যেন মায়ের রান্নাঘরের মতো লাগছিল তখন। লেখাটা এলোমেলো, ছেঁড়া—কিন্তু একধরনের সততা আছে, যা তৈরি করা যায় না।


তার মধ্যে একটা লাইন—সেই চায়ের দোকানদার আমাকে চিনতেন না, আমিও ওঁকে চিনতাম না, কিন্তু উনি এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন—"খান, গরম আছে।" ব্যস্‌। ওইটুকু। আর সে ভাবল—আচ্ছা, আরেকটু থাকি, দেখি, কাল কী হয়।


এর আগে কত বার সে পড়েছে হরেক রকমের মোটিভেশনাল কথাবার্তা—"তুমি একা নও", "আলো আসবে"। মাথার ওপর দিয়ে গেছে প্রতিবারই। কিন্তু এই লেখাটায় কোনো উপদেশ নেই, কোনো সমাধান নেই। শুধু একটা মানুষ বলছে—আমিও ছিলাম তোমার ওখানটায়; আর তখনই এক অচেনা চায়ের দোকানদারের "খান, গরম আছে" আমাকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।


শুভ্রর ভেতরে কিছু-একটা নড়ল।


শিখা নয়। শিখার আগে যে-স্ফুলিঙ্গটুকু ওঠে, তা। দেশলাইয়ের কাঠি ঘষার মুহূর্ত—জ্বলেনি এখনও, কিন্তু একটা শব্দ হয়েছে, একটা গন্ধ উঠেছে। এ মহত্ত্ব নয়, মমতা।


শুভ্র উঠে বসল। হাত কাঁপছে। ফোন তুলে সেই দাদার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে গেল।


লিখতে শুরু করল।


কিবোর্ডের অক্ষর ঝাপসা—জ্বরে চোখ জ্বলছে। কমা ভুল জায়গায়, ফুলস্টপ নেই, বাক্য ছেঁড়া। কিন্তু কী যায় আসে। লিখছে। প্রথম বার। কোনো সাজসজ্জা ছাড়া, কাঁচা, অসম্পাদিত—যেমন কলের তলায় প্রথমে মরচে-রঙা জল আসে, তারপর পরিষ্কার। এলে আসুক না মরচেটা আগে! মরচে জরুরি।


সব লিখল। মামা, দিদা, হাসপাতালের সেই রাত, পোড়া ডাল, শ্রাবণী, রেলিং, মায়ের মেসেজ, মাসির বাস, পিসির চুপ, বালতির জল, খালি চেয়ার।


শেষে লিখল—দাদা, তোমার লেখাটা পড়ে মনে হলো, একবার আরেকটু থাকি। দেখি, কাল কী হয়।


সেন্ট।


ফোন বুকের ওপর। বুকটা একটু হালকা। যেন বন্ধ ঘরের জানালা কেউ একটু ফাঁক করে দিয়েছে।


দশ


জানালা দিয়ে আকাশটা বদলাচ্ছে। কালো থেকে নীল, নীল থেকে ধূসর, ধূসর থেকে একটু কমলা—সেই কমলাটা শুভ্র চেনে। কুষ্টিয়ার পুকুরের জলে-ভাসা সেই একই কমলা। এখানে ফিকে, ক্লান্ত। কিন্তু রংটা একই।


দূরে কাক ডাকছে। কোথাও আযান। রাস্তায় প্রথম বাসের ইঞ্জিন।


শুভ্র ঘুমিয়ে আছে। জ্বর একটু কমেছে। ফোন বুকের ওপর, স্ক্রিন অন্ধকার। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো মেসেজ—নীল টিক হয়নি। হয়তো হবে, হয়তো না।


তা অবশ্য এই গল্পের বিবেচ্য কিছু নয়।


মুখে একটু শান্তি আছে। ক্ষণিকের। কিন্তু আছে।


কাল সকালে উঠবে। পা রাখবে ঠান্ডা মোজাইকে—সেই ঠান্ডায় একটু চমকাবে, আর সেই চমকটাই মনে করিয়ে দেবে যে, শরীর আছে, শরীর জীবিত। মুখে জল দেবে। আয়নায় দেখবে নিজেকে—ক্লান্ত, রোগা, কিন্তু জ্যান্ত। চা বানাবে, চিনি একটু বেশি, যেমন মা বানাত। বই খুলবে। পড়বে।


অনেক দূরের কথা ভাবে না আর। শুধু আজকের দিনটা।


আজ উঠব। আজ বেঁচে থাকব। মানুষ জীবনে কিছু করতে না পারলেও কোনোমতে স্রেফ বেঁচে থাকতে পারে। আর কিছু হোক না হোক, খালিপেটে জল খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়তে তো পারে!


কাল? কাল আসুক। তারপর দেখা যাবে।


হাসপাতালে সেদিন শুভ্রর পাশে কেউ ছিল না। তা সত্যি।


কিন্তু কোথাও কেউ যদি এই গল্পটা পড়ে, আর একবার, শুধু একবার, পাশের মানুষটাকে জিজ্ঞেস করে—খেয়েছিস?


…তাহলে শুভ্র নিশ্চয়ই আর একা নেই। একা আছে জেনেও…নেই।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *