দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

শূন্যের সপ্তক: ৯



আমি কে? এই বিরহ কার?

কখনো কখনো মানুষের মনে এমন এক গোপন বাক্য জন্ম নেয়, যা মুখে উচ্চারিত হওয়ার আগেই আত্মার ভেতর কেঁপে ওঠে—একদিন আমি তোমার থেকে মুক্ত হব। কিন্তু এই বাক্যটি যত সরল শোনায়, তার তত গভীরে আছে অদৃশ্য খাদ। কারণ যে বলে, "আমি মুক্ত হব", সে কে? আর যার কাছ থেকে মুক্তি চাওয়া হচ্ছে, সেই-বা কে? মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কি সত্যিই মুক্তির লক্ষণ, না কি বন্ধনের আর-এক সূক্ষ্ম ভাষা?

সুফিরা জানতেন, মানুষের সবচেয়ে গভীর কারাগার লোহার নয়, নামের। দেয়ালের নয়, পরিচয়ের। মানুষ নিজেকে বেঁধে রাখে শেকলে নয়, বরং "আমি" বলার অভ্যেসে। সেই "আমি"—যে নিজেকে চিনেছে বলে বিশ্বাস করে, নিজেকে আলাদা বলে মেনে নিয়েছে, নিজের দুঃখকে নিজের, নিজের সাধনাকে নিজের, এমনকি নিজের বিনয়কেও নিজের সম্পদ করে রেখেছে—সেই "আমি"-ই একদিন সমস্ত পর্দার মূলে দেখা দেয়।

খোরাসানের মায়হানার দরবেশ আবু সাঈদ আবুল খায়ের (৯৬৭-১০৪৯) বলেছিলেন, সুফিবাদ হলো সব নামিয়ে রাখা, এবং কিছু নিয়ে আর ব্যস্ত না হওয়া। এই বাক্যটি শুনতে যেমন মোলায়েম, তেমনি ভেতরে তার কঠিন শাসন। কারণ আমরা জিনিস আঁকড়ে ধরি শুধু হাতে নয়; আমরা আঁকড়ে ধরি নিজের কাহিনি, নিজের অপমান, নিজের পবিত্রতার ধারণা, নিজের আধ্যাত্মিকতার সৌন্দর্য, নিজের কষ্টের মর্যাদা, নিজের ত্যাগের মুকুট। মানুষ কখনো কখনো পাপের চেয়ে বেশি আসক্ত হয় নিজের পুণ্যে; অন্ধকারের চেয়ে বেশি মুগ্ধ হয় নিজের আলো নিয়ে। তাই "সব নামিয়ে রাখা" মানে কেবল দুনিয়া ছেড়ে দেওয়া নয়—নিজের ভেতরে গড়ে-তোলা সেই অদৃশ্য সিংহাসন থেকে নেমে আসা, যেখানে বসে "আমি" নিজেকেই উপাসনা করে।

এখানে পাঞ্জাবের মহান সুফি কবি বুল্লেহ শাহ (১৬৮০-১৭৫৭) এসে সমস্ত পরিচয়ের গায়ে এক অদ্ভুত আগুন ধরিয়ে দেন। তিনি ঘোষণা করেন না, তিনি খণ্ডন করেন। তিনি নিজেকে নির্মাণ করেন না, বরং নিজেকে উন্মোচন করতে করতে ভেঙে দেন। তিনি মৈখানার কোণ থেকে ডাকেন—তাঁর সেই অমোঘ ডাক: "বুল্লিয়া, কি জানা মৈঁ কৌন?—না মৈঁ মোমিন বিচ মসীতাঁ, না মৈঁ বিচ কুফর দীয়াঁ রীতাঁ", অর্থাৎ “হে বুল্লে (গভীর আত্মসম্বোধন), আমি জানি না, আমার প্রকৃত পরিচয় কী। আমি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভেতর বাঁধা কোনো ‘বিশ্বাসী’ নই, আবার ‘অবিশ্বাসী’দের দলে গিয়েও নিজেকে খুঁজে পাই না।”; এটা শুধু আত্মপরিচয়ের সংকট নয়, বরং সমস্ত পরিচয়-লোভের বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক বিদ্রোহ। তিনি বলেন না, আমি এই ধর্মের, ওই বংশের, এই বিশ্বাসের, ওই অবিশ্বাসের। তিনি নিজেকে এমন কোনো ঘরে রাখেন না, যার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ তিনি জানেন, প্রতিটি পরিচয় প্রথমে আশ্রয় দেয়, পরে সীমা টানে; প্রথমে রক্ষা করে, পরে আড়াল করে; প্রথমে নাম দেয়, শেষে দূরত্ব তৈরি করে। নাম মানুষকে চিনিয়ে দেয় বটে, কিন্তু হকিকতের মুখোমুখি হতে গেলে সেই নামই অনেক সময় পর্দা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি নাম প্রথমে ছায়া, পরে দেয়াল। মানুষ নিজের চারপাশে যে পরিচয়ের ইট সাজায়, একদিন দেখে—সেই ইটের ঘরই তার আকাশ ঢেকে দিয়েছে।

বুল্লেহ শাহের "না-জানা" তাই অজ্ঞতার অন্ধকার নয়; বরং আত্মাভিমান থেকে মুক্ত এক তীক্ষ্ণ জাগরণ। যতক্ষণ মানুষ নিশ্চিতভাবে জানে, সে কে, ততক্ষণ সে নিজের তৈরি মানচিত্রের ভেতর বন্দি। "আমি ধার্মিক", "আমি পথহারানো", "আমি প্রেমিক", "আমি পাপী", "আমি সাধক", "আমি মজলুম"—প্রতিটি উচ্চারণেই সূক্ষ্মভাবে এক কেন্দ্র স্থাপিত হয়, আর সেই কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরতে থাকে অহংকারের অদৃশ্য নক্ষত্রমালা। বুল্লেহ শাহ সেই কেন্দ্রটিকেই সরিয়ে দেন। তিনি শুধু দেয়াল ভাঙেন না, দেয়াল বানানোর প্রবণতাটিকেই ভেঙে দেন। এমনকি "আমি সুফি"—এই মধুরতম অহংও তাঁর দরবারে ক্ষমা পায় না।

তখন প্রশ্ন জেগে ওঠে—এই যে "আমি", সে আসলে কী? কোনো স্থির সত্তা? কোনো অবিচ্ছিন্ন শিখা? না কি অসংখ্য ধার-করা শব্দ, স্মৃতি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, লজ্জা, তৃষ্ণা, প্রশংসার নেশা, প্রত্যাখ্যানের ক্ষত, অভ্যাসের জাল, এবং বহু মৃত কণ্ঠের প্রতিধ্বনি মিলে তৈরি এক সাময়িক মুখোশ? মানুষ যাকে নিজের স্বরূপ ভেবে এত যত্নে রক্ষা করে, তা কি সত্যিই স্বরূপ, না কেবল মায়ার গাঢ় নকশা?

যখন এই "আমি" আলগা হতে শুরু করে, তখন কষ্টের অর্থও বদলে যায়। আগে যে-ব্যথা ছিল ব্যক্তিগত বিপর্যয়, তা একসময় হয়ে ওঠে উদ্ঘাটনের ছুরি। আগে যে-দুঃখ ছিল আঘাত, তা একসময় দেখা দেয় শুদ্ধির আগুন হিসেবে। আগে যে-বিরহ ছিল শূন্যতা, তা একসময় নিজেকে প্রকাশ করে আহ্বান হিসেবে। সুফিরা জানতেন, হৃদয় ভাঙে কেবল নষ্ট হওয়ার জন্য নয়; কখনো কখনো তা ভাঙে যাতে আলো ভেতরে ঢুকতে পারে। যে-ক্ষতকে আমরা অভিশাপ বলি, তার ভেতরই অনেকসময় হকের নিঃশ্বাস কাজ করে। হৃদয়ের ওপর আঘাতের পুনরাবৃত্তি অনেকটা জিকরের মতো—বার বার এক জায়গায় হাত পড়তে পড়তে অহংকারের ধুলো ঝরে যায়, ভেতরের অপ্রয়োজনীয় শব্দ স্তিমিত হয়, আর আত্মা ধীরে ধীরে শুনতে শেখে সেই নীরব আহ্বান, যা কোলাহলের মধ্যে কখনও ধরা পড়ে না।

তখন বোঝা যায়: আমি কেবল আমার ক্ষত নই। আমি কেবল আমার কাহিনি নই। আমি কেবল আমার আর্তি নই।

তাই যে বলে, "আমি তোমার কাছ থেকে মুক্ত হব", সুফি তার দিকে মৃদু হেসে তাকায়। কারণ মুক্তি-চাওয়া সত্তাটিকেই আগে দেখা দরকার। যে মুক্তি চায়, সে-ই যদি পর্দা হয়, তবে মুক্তি কাকে বলে? যে আহত, যে বিদীর্ণ, যে বঞ্চিত, যে পিপাসিত—তাকে আমরা খুব সহজে "আমি" নাম দিয়ে দিই। অথচ হয়তো সে-ই শেষ সত্য নয়; হয়তো সে কেবল একটি অবস্থান, একটি ঘূর্ণি, একটি মেঘ, একটি সঞ্চিত শব্দরাশি। যদি "আমি"-র এ কেন্দ্রটি সত্যিই স্থায়ী না হয়, তবে তার দাসত্বও কি চূড়ান্ত? তার মুক্তিও কি অনন্ত? পর্দা কি সত্যিই বাইরের, না ভেতরের দৃষ্টি-ভ্রম?

যে-"আমি" মুক্তি চায়—সুফিরা প্রথমে তাকেই কুরবানি দিতে শেখান। কারণ "আমি"-ই যদি না থাকে, তবে কার দাসত্ব? কার মুক্তি? কার গ্লানি? কার জয়? তারপর কষ্টকে জিজ্ঞেস করো—সে তার চিঠি কোন ঠিকানায় পাঠাবে। ঠিকানাই যদি মুছে যায়, চিঠি কোথায় পৌঁছবে?

সাসুই: মরুভূমির প্রেম

এখান থেকে প্রেমের মরুভূমি শুরু হয়।

সিন্ধের শাহ আবদুল লতিফ ভিট্টাই (১৬৮৯-১৭৫২), যাঁর ‘শাহ জো রিসালো’ সিন্ধি সাহিত্যের মুকুটমণি, তিনি সাসুইর কাহিনি গেয়েছিলেন; কিন্তু তিনি কেবল প্রেমকাহিনি বলেননি, তিনি রূহের যাত্রার মানচিত্র এঁকেছিলেন। সাসুই মরুভূমি পাড়ি দেয়—এ কথা আমরা জানি। এই মরুভূমি কেবল বালির বিস্তার নয়; মরুভূমি হলো সেই স্থান, যেখানে বাহ্য আশ্রয় একে একে সরে যায়, আর মানুষের অন্তর নগ্ন হয়ে পড়ে নিজের আকাঙ্ক্ষার সামনে। সেখানে ছায়া কম, জল কম, সান্ত্বনা কম, নিশ্চয়তা কম; অথচ ডাক বেশি। সাসুই হাঁটে, কারণ তার জন্য গন্তব্য কোনো ভৌগোলিক বিন্দু নয়; গন্তব্য হলো সেই টান, যা তাকে নিজের চেয়ে বড়ো কিছুর দিকে টেনে নিয়ে যায়। তার পায়ের নিচের তপ্ত বালি, তার কণ্ঠের শুকিয়ে যাওয়া, তার শরীরের ক্লান্তি—সবই তখন বিরোধিতা নয়, বরং পরীক্ষিত প্রেমের বর্ণমালা।

সবরের অর্থও এইখানেই উন্মোচিত হয়। সবর শুধু দাঁত চেপে সহ্য করা নয়; সবর হলো ব্যথাকে অস্বীকার না করে তাকে অন্য আলোয় পড়া—রহমতের কঠিন বর্ণমালা হিসেবে পড়তে শেখা। যে-ব্যথাকে আমরা শত্রু ভেবে তাড়াতে চাই, প্রেমিক তাকে কখনো কখনো প্রিয়র পাঠানো চিহ্ন বলে বুকে রাখে। এটি নৈরাশ্য নয়, আত্মবিসর্জনের এক গভীর শৃঙ্খলা। সাসুই জানে, যে-প্রেম কেবল ফুলের গন্ধে টেকে, সে এখনও নিজের আরামের প্রেম; প্রিয়র প্রেম নয়। প্রিয়র দিকে যাওয়া পথের কাঁটাও তখন প্রিয়র; বিলম্বও প্রিয়র; তৃষ্ণাও প্রিয়র; এমনকি পথ হারানোও প্রিয়র। যে বলে—"এই বেদনাও আমার বিরুদ্ধে নয়; আমার জাগরণের পক্ষে"—তার কাছে মরুভূমিও মসজিদ হয়ে যায়। তপ্ত বালি তখন আর নিছক নির্দয়তা নয়; তা হয়ে ওঠে প্রিয়র দেশের ধূলি। পা পুড়ে যায়, কিন্তু হৃদয় আরও স্পষ্ট হয়। শরীর ক্লান্ত হয়, কিন্তু প্রেমের প্রমাণ গভীরতর হয়। সে নিজের ভালোবাসাকে দেহের চেয়ে বড়ো প্রমাণ করে। এই অবস্থায় মরুভূমি আর শূন্য ভূমি থাকে না—তা হয়ে ওঠে রহস্যের দরবার, যেখানে প্রতিটি উত্তাপ আত্মাকে অমসৃণতা থেকে মুক্ত করে।

এই গ্রহণের ভেতর অপমান নেই; আছে আত্মসমর্পণ। এই আত্মসমর্পণের ভেতর দুর্বলতা নেই; আছে এক অন্যরকম শক্তি—যার নাম তাওয়াক্কুল।

বুল্লেহ শাহ "আমি" ভেঙে দিলেন; সাসুই দেখালেন, "আমি" ভাঙার পরও পথ থাকে—এক অন্তহীন, অনামা, প্রিয়মুখী পথ। বরং পথ তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ গন্তব্য আর কোনো দূরের শহরে থাকে না; গন্তব্য ধীরে ধীরে হাঁটার ভেতর প্রবেশ করে। প্রেমিক হাঁটতে হাঁটতে এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে চলাই মিলন, তৃষ্ণাই স্মরণ, বিরহই সঙ্গ। তখন প্রশ্ন থাকে না—কবে পৌঁছব? কারণ পৌঁছানো রৈখিক সময়ের বিষয় নয়; তা এক অন্তর্গত রূপান্তর। মানুষ কখনও কখনও প্রিয়কে পায় না এই কারণে যে, সে এখনও "পাওয়া"-কেই বাহ্য বস্তুর মতো কল্পনা করে যাচ্ছে।

গালিব: মুক্তির ভ্রম

এখানেই উর্দু ও ফারসি কাব্যের শীর্ষতম কবি গালিব (১৭৯৭-১৮৬৯) এসে মানুষের অন্তরের এক কোমল প্রতারণা ধরিয়ে দেন। তিনি জানতেন, আশা মানুষের রুটি, কিন্তু সেই আশাই অনেকসময় সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিলম্বের ফাঁদ। তাঁর সেই বিখ্যাত শের: "হম কো মালুম হ্যায় জান্নাত কি হাকিকাত লেকিন / দিল কে খুশ রাখনে কো গালিব ইয়ে খেয়াল আচ্ছা হ্যায়", অর্থাৎ জান্নাতের হাকিকত আমরা জানি—তবু হৃদয়কে খুশি রাখার জন্য এই কল্পনা মন্দ নয়।

এটি শুধু পরকালের ধারণাকে হালকা বিদ্রূপ করে না; এটি মানুষের সমস্ত স্থগিত মুক্তির ধারণাকে প্রশ্ন করে। মানুষ নিজের ব্যথা বহন করতে করতে নিজেকে প্রতিশ্রুতি দেয়—একদিন সব ঠিক হবে, একদিন গিঁট খুলবে, একদিন মুক্তি আসবে, একদিন ক্ষত শুকোবে, একদিন জানালা খুলবে। এই "একদিন" অনেকসময় আশ্রয়; আবার অনেকসময় বিলম্বিত আত্মপ্রবঞ্চনা। কিন্তু সেই "একদিন" কত বার আজকের দৃষ্টিহীনতার আরামদায়ক অজুহাত? কত বার আমরা ভবিষ্যতের নামে সেই সত্যটিকে পিছিয়ে দিই, যা এই মুহূর্তেই আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু আমরা তাকাতে সাহস করছি না?

গালিবের সূক্ষ্মতা এখানেই: তিনি আশা কেড়ে নেন না, কিন্তু আশার মায়াটাকে উন্মোচন করেন। তিনি যেন ফিসফিস করে বলেন—যে-মুক্তিকে তুমি কালকের হাতে তুলে দিচ্ছ, সে মুক্তি আজকের অন্ধকারেই গোপনে উপস্থিত থাকতে পারে। যে-জান্নাতকে তুমি দূরের প্রতিশ্রুতি ভাবছ, তার দরজা হয়তো এই মুহূর্তেই হৃদয়ের ভেতর অল্প খুলে আছে। পর্দা সরাতে হয়, স্থান বদলাতে নয়।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *