১৯। অন্ধকারের শরীরবৃত্তান্ত
আমার মনের তলায় যেন বহুদিনের জমানো কালো—পচা, দুর্গন্ধময়, বস্তির ডাস্টবিনে যেমন জমে ওঠে জীবনের উচ্ছিষ্ট—পচা সবজির খোসা, ছেঁড়া কাপড়, ভাঙা স্বপ্নের টুকরো। তবু কোনো নিভৃত জায়গায় ওরা আড্ডা জমিয়েছে—রাতের অন্ধকারে, যেখানে বিচার নেই, নীতি নেই; কুকুরের ঘ্রাণশক্তির মতো প্রখর—নারীর গন্ধ চিনে চিনে পথ খুঁজে নেয়—আদিম, অমোঘ ওরা।
ক্লেদমাখা পৃথিবীতে রক্তের উৎসাহী চিৎকারে যে-দিনগুলো নীরবে কেটে গেছে—বর্ষার ভিজে বাতাসের মতো স্যাঁতসেঁতে, ছত্রাকের মতো ধীরে ধীরে সব গ্রাস করা—অর্থহীন হিংস্রতায়, ফুলের বাগানে হেঁটে গিয়ে নতুনের জন্মক্ষণে পৌঁছে যাওয়া—সেদিন কে চায় শেষ হতে দিতে? কে চায় এই ক্লেদমাখা, রক্তমাখা, বীভৎস সুন্দর দিনগুলো ফুরিয়ে যাক?
২০। কাচের বালা ও চিরবৃত্ত
ওদের সব কিছু আছে—ঝগড়া, আনন্দ, কান্না; কেমন মধুর সব…ঘুরেফিরে অকারণে হাসছে, যেমন পাগলেরা হাসে—কারণ ছাড়াই, বিশুদ্ধ আনন্দে কিংবা বিশুদ্ধ বিভ্রান্তিতে। প্রসববেদনার মতো অসহ্য আনন্দ, কিংবা জুতোর ফিতে বার বার খুলে যাওয়ার মতো তুচ্ছ কিন্তু অবিরাম যন্ত্রণা—ভালোবাসা যেন এক অনিবার্য বৃত্ত, যার শুরু নেই, শেষ নেই, শুধু ঘূর্ণন আছে।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে এক বিস্ময়ে দেখি—সমস্ত অনুভূতি চাঁদনি-রাতের শরীর গড়ছে; যে-সব শরীর অবিরাম আশা দিয়েছিল—ভালোবাসা পাবো, পাবো সেই রঙিন কাচের চুড়ি, জাফরান রঙে রাঙানো জীবনের সেই চুড়ি, যা পরলে হাত সুন্দর হয়, কবজি সুন্দর হয়, গোটা পৃথিবী সুন্দর হয়ে ওঠে। ঝুলন্ত সাইনবোর্ড—বড়ো মজার, বলছে, “দাদা, একবার ঢুকলে আর বেরোনোর দরজা নেই।”
অনেক ভাবনার ভিড়ে মন শুধু ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়; অনেক জনতায় ডুবে গিয়ে তৃপ্তি জেগে ওঠে—যেমন পুকুরের তলায় ডুব দিলে কাদার ভেতরে শীতল স্পর্শ পাওয়া যায়! কিন্তু মন তবু একদিকেই কাত—নদীর ঘাটে ফেরি ডাকছে: চাই ভালোবাসা, চাই সেই কাচের চুড়ি—তার নিজস্ব কুসুমকোমল, ভঙ্গুর, অথচ অটুট বিশ্বাসে।
২১। গুহাগর্ভের সমুদ্রনাদ
হঠাৎ—কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, কোনো আলামত ছাড়াই—গুহার ভেতরে সমুদ্রের গর্জন শোনা গেল। যেন পাথরের বুক চিরে জল উঠে আসছে, যেন পৃথিবীর গভীরতম তলদেশ থেকে কেউ চিৎকার করে উঠেছে—এতকাল চুপ ছিল, আর পারছে না।
কে যেন প্রচণ্ড খেলায় মেতে উঠেছে—ষোড়শ যোদ্ধার শক্তিতে, গৈরিক ছন্দে জীবনের জটিল জোয়ার এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে সব—বাঁধ, পাঁচিল, নিয়ম, ভয়, সংকোচ—সব। ঢেউ নাভিমূলে ক্রীড়া করে, মুক্তির স্বাদ টানে—আদিম, লোনা, তীক্ষ্ণ। এই ভোজসভায় আমরা সকলে নিমন্ত্রিত—পরমতৃপ্ত, অপরিহার্য অতিথি—যাদের না বলার উপায় নেই, এই যেমন, জন্মের আমন্ত্রণ কেউ ফিরিয়ে দিতে পারে না।
২২। তুষারপথের তিনটি অধ্যায়
বরফের ওপর দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে হেঁটে এলাম। সকালের আলোয় সামনে হিমশৃঙ্গ আর তুষারমুকুটধারী পর্বতশিখর তোমার হাসির মতো ঝকমক করছিল—ধারালো, উজ্জ্বল, চোখ-ধাঁধানো। আমার বুটের চাপে পথের বরফগুলো মুদ্রার আকার নিচ্ছিল—যেন পথ নিজেই আমার যাত্রার মূল্য গুনে রাখছে, প্রতিটি পদক্ষেপের হিসেব কষছে।
হাঁটতে হাঁটতে একসময়—ঠিক যেমন তিনলাইনের কবিতায় পুরো পৃথিবী ধরে যায়—আমার ছোটো ছিমছাম বাংলোটা দিগন্তে মিলিয়ে গেল; তখনও আমি হাঁটছিলেম। পেছনে ফেরার মানে হারিয়ে গেছে, সামনে যাওয়ার মানেও অস্পষ্ট—শুধু হাঁটা, শুধু পায়ের নিচে বরফের কুটকুট শব্দ।
তারপর কোমল সূর্য মেঘের আড়ালে থমকে দাঁড়াল—যেমন কেউ কথা বলতে গিয়ে ভুলে যায়। একঝাঁক পাখি কিচিরমিচির করতে করতে পাহাড়ের নরম সবুজ গালিচায় বসে পড়ল—খেলা করতে, যেমন স্কুলছুটির পরে বাচ্চারা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। পিঠে কাঠের বোঝা, পাহাড়ি মেয়েরা নরম হেসে বোঝা নামিয়ে বিশ্রাম নিল; অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে ঘরে-বানানো পানীয় খেল—নির্মল, টাটকা, জীবনের স্বাদে ভরা।
এবার ফিরতে হবে। দূরের রাস্তা সাপের মতো এঁকেবেঁকে নেমে গেছে—সেখান থেকে এক দেশ কিংবা অন্য দেশ। সাদা সিঁথির মতো সেই পথ কেমন যেন চেনা চেনা লাগে, হাতছানি দিয়ে ডাকে—যেমন ঘুমের মধ্যে মায়ের গলা শুনলে চেনা লাগে, দেখা না হলেও। পাহাড়ের বরফ গলছে; তরুণ অধ্যাপকের ক্লাসে-বসা মেয়েটি শুনছে—শুধু শুনছে—শুনেই চলেছে—যেমন নদী শোনে সমুদ্রের ডাক।
অনেকটা পথ—চড়াই, উতরাই—বুকের ভেতরে দম ফুরিয়ে আসে; তবু ফিরতে হবে, সেই সুন্দরের কাছে, যেখানে আমার নির্জনতা বাস করে—নিঃশব্দ, সংক্ষিপ্ত, তিন পঙ্ক্তির কবিতার মতো।
২৩। রাত্রিগাড়ির ধ্যান
নিস্তব্ধ রাত; ট্রেন থেমে আছে মাঝপথে—যেন ভুলে গেছে, কোথায় যাচ্ছিল। নীলচে আলো জানালায় কাঁপছে; ভাবছে কি ট্রেন নিজেই—কেন থামল, কোন স্টেশন এটা, না কি কোনো স্টেশনই নয়? চাঁদনি-রাত এক অবাস্তব মায়া—ঝাপসা মাঠ, পলিমাটি, প্রান্তর; নদীর অস্পষ্ট আভাস, গাছপালার কালো ছায়া, বালিয়াড়ি—ক্ষীণ আলোয় তালগাছের সারি দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মতো, কিন্তু কী প্রহরা দিচ্ছে, কেউ জানে না।
জীবনযাপন মাছি-মারার জালের মতো—সূক্ষ্ম, ক্ষুদ্র, অদৃশ্যপ্রায়। এমন দিনে চলে যাওয়াই যদি একমাত্র পথ হতো—কোনো গন্তব্য ছাড়া, ফেরার কোনো ঠিকানা ছাড়া!
শীতল বাতাস, জলের স্পর্শ; বায়ু ভারী—হয়তো বর্ষা আসছে, হয়তো কান্না। অনেকটা পথ এসে গেছি বটে—রাতের পর রাত, স্টেশনের পর স্টেশন—কিন্তু মনে হয়, এসে কী পেলাম? জানালার ওপাশে ঝাপসা পৃথিবী নীরবে, উত্তর দেয় না।
২৪। সরু গলির ওপারে
অচেনা গলি, ক্লান্ত বিদ্যুতের আলো—যেন আলোটাও ঘুমোতে চায়। অচেনা মানুষজন তাদের প্রয়োজনে, তাদের আশায় ছুটছে—প্রত্যেকে নিজের ছোটো ছোটো জরুরি কাজে ব্যস্ত, প্রত্যেকের জীবন একটা আলাদা গল্প। অতৃপ্ত মন, অন্ধ বাসনা তবু ঘরের মতো গুটিয়ে বসে আছে—যেমন করে শীতের রাতে বেড়াল গুটিয়ে ঘুমোয়, চারপাশে ঝড় উঠলেও নড়ে না। বেদনার চোখে কাজলের ক্লান্ত রেখা; অবসাদ নামছে ভাঙা পাখির ডানায়। কী হবে অযথা জল ঢেলে জল ভরে? আমার বুকের গভীরে রাত্রি তার নিজস্ব মূর্তি গড়ছে—কোনো ভাস্কর নেই, শুধু অন্ধকার নিজেই খোদাই করছে নিজেকে।
হয়তো কোথাও সুখ আছে—এই দরজার ওপারে, এই সরু গলিটা পেরোলেই। কে দাঁড়িয়ে আছ প্রহরায়? সবুজ দ্বীপের খোঁজে বেরিয়ে রাতের শেষ ট্রেন কবেই ছেড়ে দিয়েছে—আর ট্রেন নেই, আর সুযোগ নেই, শুধু পায়ে হেঁটে যাওয়া। অমনোযোগের শেষ কবে, কে জানে—জীবনের এই অজানা দিকগুলো কোথায় গিয়ে মেশে, কোন সাগরে পড়ে। রাত এখন ঘনিয়ে এসেছে এই গলিতে—প্রশ্ন একটাই: সরু গলিটা পেরিয়ে কি ফেরার পথ আছে, না কি ওপারেও আরেকটা সরু গলি?
২৫। মায়াজীবনের নাটমঞ্চ
সূর্য ডুবলে মঞ্চ থেকে নেমে আসে অভিনেতা—রং মুছে, পোশাক খুলে, আয়নায় নিজের আসল মুখ দেখে চমকে ওঠে। জীবন নিয়ে পারদর্শী ব্যবচ্ছেদ চলতেই থাকে—ঠান্ডা কার্নিশে উল্লসিত কাকের দল গৌরবময় অতীতের লাশের ওপরে বসে ভোজ সারছে; গৌরবময় অতীত এখানে পরিত্যক্ত শহিদ—কেউ ফুল দেয় না, কেউ প্রণাম করে না। শিকারি বিধাতার ছুরিতে শান দিয়েছে নিজের হাতে; বুঝে গেছে—জীবন শুধু অন্ধগলির সমাহার, প্রতিটি মোড়ে আরেকটি গলি, প্রতিটি গলির শেষে আরেকটি মোড়। কামনার সাদা আলোয় দেবতাও হাবুডুবু খায়—মজা দেখে শয়তান অট্টহাসি হাসে, কেননা এই খেলায় জেতা তারই।
মৃত্যু তো নিছক ধারণা—পোশাকের মতো পরা যায়, খোলা যায়; তাই জীবনের ছায়া আরও দীর্ঘ হতে থাকে, বিকেলের রোদে গাছের ছায়া যেমন লম্বা হয়। কে আসবে এই বিবর্ণতা ঘোচাতে? বেহালার তারের ফাঁক দিয়ে জীবনকে দেখা—মাঠে-চরা গাভীর মতো নিরুদ্বিগ্ন, যেন কিছুই হয়নি, কিছুই হবে না—সে-ই কি শেষদর্শন?
কখনো মাঝরাতে বেহালার তার ছিঁড়ে গেলে—যেমন দীর্ঘ নৈঃশব্দ্যের পরে হঠাৎ শব্দ—অভ্যেসবশত রমণীর লাল ঠোঁটে রূপকথা জুটে যায়; হৃদয়ের গভীর তলদেশে ডুবে-থাকা দ্বীপ প্রাণ পায়, ছায়া আরও দীর্ঘ হয়—দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর—যতক্ষণ না অন্ধকার গিলে খায় সবটুকু।
২৬। দুপুরের আকস্মিক প্রতিকৃতি
ভরদুপুরে হঠাৎ তাকে দেখলাম—সাজানো ঘরে, ঘন জনতার মধ্যে, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাঁধে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ কাউকে চেনে না, অথচ সবাই পাশাপাশি। তখন জলাশয়ের ঢেউয়ে রাঙা রোদ হৃদয়ের জলরঙে ছবি আঁকছিল—সেই ছবিতে রং ছিল, কিন্তু রেখা ছিল না; আবেগ ছিল, কিন্তু ভাষা ছিল না।
সাগরের দোলায় দুলছে ছোট্ট নৌকো; বুক ধড়ফড়, কাছে—বড়ো কাছে—হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। কিন্তু শত বছর পেরিয়ে গেছে এই দু-চোখের তাকানোর মধ্যিখানে; ক্লান্ত, জরাগ্রস্ত প্রাচীন দার্শনিক হয়ে বসে আছি—যিনি সব জানেন, কিন্তু কিছুই করতে পারেন না; যিনি সত্য দেখেন, কিন্তু বলতে গেলে জিভ জড়িয়ে আসে।
বাইরে হাত মেলাও, ভেতরে প্রেম রাখো—এটুকু শিখেছি জীবনে। কিছুক্ষণ পরেই দরজা থেকে বিদেয় নিলেম—নিঃশব্দে, যেমন এসেছিলেম; পেছনে ফেলে রেখে গেলাম ভরদুপুরের সেই আলো আর ঘরভর্তি মানুষ—যাদের কেউ খেয়াল করল না, আমি ছিলেম; কেউ খেয়াল করবে না, আমি নেই।
২৭। উত্তরাধিকারের ছন্দ
অনেক মানুষের ভিড়ে মুখ ফেরাতেই দেখি—তুমি; দূর আকাশে চোখ রাখতেই দেখি—কাছেই তুমি। যেমন খুঁজলে পাওয়া যায় না, না-খুঁজলে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। হঠাৎ যেন গাছের ডালে কাঁপন ওঠে—পাখি বসেনি, বাতাসও নেই, তবু কাঁপছে; গোধূলিতে শীতের পূর্বাভাস জেগে ওঠে—যদিও এখনও শরৎ, তবু শরীর জানে, শীত আসছে।
তোমার প্রেমে বন্ধন আছে, সাথে ব্যথাও, স্বীকার করি; কিন্তু পরমুহূর্তেই সব ওলটপালট হয়ে যায়—যেমন ঘুমের মধ্যে বিছানা থেকে পড়ে গেলে পৃথিবী উলটে যায়। আমার মনের গোপন কথা দারুণ শীতে জমে আছে—বরফের নিচে চাপা-পড়া ঘাসের মতো, জীবিত কিন্তু অচল; গোধূলির আলোয় সব কুঁকড়ে ওঠে, শীর্ণ হয়ে আসে।
তোমার পাশে হেঁটে যাওয়ার কোমলতায় নতুন ফুল ফোটে—মাটি ফুঁড়ে, অপ্রত্যাশিত; চাওয়া আর পাওয়ার মাঝখানে বিশাল ভার—গোধূলিতে ক্রমশ অন্ধকার ঘনীভূত হয়, যেমন কালি ছড়ায় জলে।
ঢেউ আসে, তীরে ভাঙে—কার জন্য? কেউ জানে না, ঢেউও জানে না। অধরাকে ধরতে হবে শরীরের মায়ায়—কেননা শরীর ছাড়া আর কোনো ভাষা নেই, যা সত্য বলতে পারে। অনেক জনতার নির্জনতায় কী যেন খুঁজছি—হারিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, হাতের সব পুঁজি ফুরিয়ে গেছে—আর বাকি নেই কিছু, শুধু এই খোঁজাটুকু, শুধু এই হেঁটে যাওয়া।
ছায়াবীজ: ৩
লেখাটি শেয়ার করুন