গল্প ও গদ্য

ধুলোরাও জানত



তুমি আমার ভেতরে ঢুকেছ—যেমন ঢোকে শীতের রাতে কাঠের ঘরে আগুনের ওম—দেয়ালে, মেঝেতে, কাপড়ের তন্তুতে, ঘুমন্ত শরীরের এমন গভীরে, যেখানে ঠান্ডা লুকিয়ে ছিল বহুদিন। কেউ দেখে না সে আগুন, শুধু টের পায়—কাঁপুনি থামে, পেশি শিথিল হয়, আর শ্বাসের যেটুকু ভয়ে আটকে ছিল বুকের খাঁচায়, সেটুকু আস্তে আস্তে ছাড়া হয়ে যায়—যেমন ছাড়া হয় খাঁচার পাখি, যে ভুলেই গিয়েছিল, আকাশ কী। তুমি সেই ছাড়া-হয়ে-যাওয়া, তুমি সেই মনে-পড়া আকাশ।

আমি একটা বন্ধ ঘর ছিলাম—জানালা ছিল, কিন্তু পর্দা টানা, দরজা ছিল, কিন্তু খিল আঁটা…ভেতর থেকে, নিজের হাতে। ভেতরে আসবাব ছিল—চেয়ার ছিল, কিন্তু কেউ বসেনি কোনোদিন, টেবিল ছিল, কিন্তু কেউ রাখেনি চায়ের কাপ, বিছানা ছিল, কিন্তু কেউ গায়ে কম্বল টেনে দেয়নি ঘুমের ভেতর। ধুলো জমেছিল প্রতিটি তলে, মাকড়সা বুনেছিল জাল কোণায় কোণায়, আর নীরবতা এমন ঘন হয়েছিল যে, দেয়ালে কান পাতলে শোনা যেত—ঘর কাঁদছে, চুপচাপ, যেমন কাঁদে মানুষ রাতে একা, বালিশে মুখ চেপে, যেন সেই কান্নাটুক কারও কাছে বোঝা হয়ে না যায়।

তুমি সেই ঘরে এসেছিলে—জিজ্ঞেস না করে, জুতো খুলে, পা টিপে টিপে, যেমন আসে বৃষ্টির আগে মাটির গন্ধ—কেউ ডাকে না তাকে, কিন্তু সে আসে, কারণ মাটির দরকার তাকে, আকাশের‌ও দরকার শূন্য হতে। তুমি পর্দা সরিয়েছিলে, আর এত বছর পর আলো এসে পড়েছিল মেঝেতে—তীব্র নয়, আলতো, যেমন পড়ে বোনের হাত জ্বরে-কাঁপা মাতৃহীন কপালে—আর সেই আলোয় ধুলোর কণাগুলো নেচেছিল, যেন তারাও অপেক্ষায় ছিল, যেন তারাও জানত—কেউ আসবে, কেউ একদিন এই ঘরকে ঘর বলে ডাকবে।

পৃথিবী বলে—দেওয়া-নেওয়ায় ভারসাম্য চাই, হিসেব চাই, খাতা চাই। তুমি খাতা খোলোনি। তুমি দিয়েছিলে, যেমন দেয় মাটি—বীজকে জিজ্ঞেস করে না, কোন গাছ হবে, ফল ধরবে কি না, ছায়া দেবে কি না—শুধু জায়গা দেয়, শুধু অন্ধকারে ধারণ করে, শুধু বলে নিঃশব্দে—এবার বেড়ে ওঠো। আমি বেড়ে উঠেছি তোমার সেই অন্ধকারে, তোমার সেই ধৈর্যে, তোমার সেই না-চাওয়ায়—যা এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো দেওয়া।

এখন আমার ভেতরে যে-ঘর, তার প্রতিটি ইটে তোমার আঙুলের ছাপ। কিছু কথা আছে, যা গলার কাছে আসে, থমকে যায়, চোখ ভেজায়, আবার ফিরে যায় বুকে—ভাষা হয়ে উঠতে পারে না, কারণ ভাষা ছোটো, ভাষা অপর্যাপ্ত। কিন্তু তোমার কাছে সেসব পৌঁছে যায় অন্য পথে—হাতের চাপে, চুপ করে পাশে বসে থাকায়, একসাথে আকাশ দেখায়, নিঃশ্বাসের তালে তাল মেলানোয়—যেখানে কেউ কিছু বলে না, আর না-বলাটাই সম্পূর্ণ হয়ে যায়, যেমন সম্পূর্ণ হয় রাতের শেষে ভোর—ঘোষণা ছাড়া, প্রমাণ ছাড়া, শুধু আলো এসে বলে—এই যে আমি, এসেছি, যেমন আসি রোজ, যেমন আসব চিরকাল।

তুমি শক্ত করে আঁকড়ে ধরো আমায়—
যেমন সমুদ্র নীরবতার ভাষ্য বুঝিয়ে দেয়।

তুমি তীব্রভাবে চেয়ে বসো আমায়—
যেমন চোখের গভীরে অশ্রু লুকিয়ে রয়।

তুমি তোলপাড় করে খুঁজে চলেছ আমায়—
যেমন পথের বাঁকে গন্তব্য থমকে দাঁড়ায়।

এই পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম উপেক্ষা করেই—
তোমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়েছিলে আমায়।

আমার ভেতর যত জংলা গাছ…
কেটে বসতবাড়ি বানানো।

বুকের গভীরে রাখি শব্দ,
স্পর্শের গভীরে থাকো তুমি।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *