কুয়াশার ওপারে তুমি
সেই রূপসী বাংলা আর নেই—সেই গভীর নদীও নেই, সেই পাটক্ষেতের সবুজও ফিকে। শস্যক্ষেতের বকেরা শিমুল থেকে ফেরে অভ্যেসের ডানায়, ঘোলাটে জীবন সাগরের তেতো ফেনায় ভাসে—উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে দিনে দিনে, পুরোনো ছবি থেকে রং ওড়ে, সেপিয়া হয়ে যায় সব স্মৃতি। এতদিন কোথায় ছিলে—কোন কুয়াশায়, কোন ভুলে?
তবু এখনও নাটোরের কুয়াশায় তোমার ছায়া ভাসে—স্পর্শ করা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়, যেমন বাতাসের ওজন বোঝা যায় না, কিন্তু গায়ে লাগে; গান শেষ হলেও সুর কানে বাজে, ঘণ্টা বেজে থেমে গেলেও কম্পন থাকে। রাতভর বাদুড়ের ডানা অন্ধকারের ভাষায় উড়ে চলে—শব্দের প্রতিধ্বনিতে পথ খোঁজে, অন্ধকারকেই মানচিত্র বানায়। অগণিত প্রতিমা ভাঙলেও ফুটে ওঠে একটিই মুখ—একান্ত তোমার, অমোচনীয়। প্রত্যহ অপেক্ষা—তুমি এসো, পরিযায়ী পাখি যেমন হাজার মাইল পেরিয়ে ফেরে একই গাছের একই ডালে, তুমিও ফিরবে।
ধুলোমাখা বন্দনা
এখানে প্রণাম রেখে যাও—জরাজীর্ণ স্তম্ভে, ভাঙা দেউলে, যেখানে ইট খসেছে, কিন্তু বিশ্বাস খসেনি, যেখানে ছাদ ভেঙেছে, কিন্তু আকাশ আরও কাছে এসেছে। ছায়ায় জুড়িয়ে নাও—বট-অশ্বত্থের ছায়া, শত বছরের ধ্যানের ছায়া, যে-ছায়া রোদের চেয়ে পুরোনো। শ্বাসে শ্বাসে ধ্বনিত করো—এ তোমারই দেশ, মাতৃসমা—মা বেছে নেওয়া যায় না, দেশও না।
এর মাঠে, আকাশে, আলোয়—দুঃখে, দারিদ্র্যে, রোগে, শোকে তুমিও জড়িয়ে আছ—রক্তনালীর মতো অবিচ্ছেদ্য। অশ্রু, বর্ষা, উৎসব, দুর্দিন—সব নিয়েই দেশ, সব ঋতু নিয়েই বছর, সব ক্ষত নিয়েই শরীর। মহান স্মৃতি শ্রদ্ধায় উজ্জ্বল রাখো—দেহাতীত সুখ খোঁজো, মানুষের মধ্যে মানুষকে দেখো, মুখোশের পেছনে মুখ।
এ তোমারই দেশ—নীরবে প্রণাম রাখো, ধুলিকণা মাথায় তুলে নাও, তিলক করো কপালে। দিবানিশি একেই বন্দনা করো—এই ধুলোমাখা, ঘামে-ভেজা, অসম্পূর্ণ, সুন্দর দেশকে—যার অসম্পূর্ণতাই তার সৌন্দর্য।
মাতৃমুখের সহস্র রূপ
কত রূপে সামনে দাঁড়াও—জননী, ঊর্বরা দাত্রী, সহস্রভুজা। মাঠে, ঘাটে, সীমান্তের অরণ্যে, দূর জনপদের উদার বিস্মৃতিতে—যেখানে মানচিত্র শেষ, সেখানেও তোমার পায়ের ছাপ। কখনো ভীতা, বিচ্ছিন্না—শীতের সকালে কুয়াশায় হারানো পথ, দিকচিহ্নহীন; কখনো স্নেহময়ী, শ্যামলা—বুকে ধৈর্যের ফসল, হাতে শাসনের লাঙল, চোখে ক্ষমার অফুরন্ত জল। দুই হাতই তোমার, দুই ভূমিকাই সত্য—যে-হাতে খাওয়াও, সেই হাতে শাসন করো, দুটোই প্রেমের ভাষা।
মা, দিনে দিনে তোমাকে চিনছি—বিমাতার শূন্যতায় খেটে খেটে, অভাবে শিখে; স্বর্ণকার আগুনে পুড়িয়ে সোনা চেনে যেমন। পথেঘাটে বিদেশি চাকচিক্যে রক্তনীল যবনিকা পড়লেও—বাংলা ভুলিয়ো না, ভাষা হারিয়ো না। ভাষা হারালে মানুষ হারায় আদিম ঠিকানা—চাবি-হারানো ঘরের মতো, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঢুকতে পারে না।
প্রার্থনার অন্য নাম
সব নদী সমুদ্রে পৌঁছোয় না—কিছু নদী মরুতে হারায়, বালিতে মিলিয়ে যায়; কিছু ভূগর্ভে ডোবে, অন্ধকারে বয়; কিছু ভুলে যায় গন্তব্য, ঘুরপাক খায় সমতলে। সব মেঘ সবুজে ঝরে না—কিছু শুধু ছায়া দেয়, রোদ আটকায়; কিছু শুধু গর্জায়, বজ্রের ভাষণ দেয়; কিছু চোখে জল আনিয়ে চলে যায়, বৃষ্টি না দিয়ে। সব মাটি প্রতিমা হয় না—কিছু কেবল পথ হয়ে থাকে, যাতে অন্যেরা হাঁটতে পারে, এবং সেই পথ হয়ে থাকাও একধরনের প্রতিমা।
প্রদীপ জ্বালালে ঘরে ঘরে জন্ম-আলোর আশা জাগে—সেই আশা অন্ধকারের সন্তান; আলোর ঘরে আশার জন্ম হয় না, কারণ আশা সেখানেই জন্মায়, যেখানে তার অভাব। বুকের উত্তাপে প্রার্থনা যখন গলে যায়—শব্দ থাকে না, ভাষা থাকে না, ব্যাকরণ থাকে না, শুধু একটা নিঃশব্দ কম্পন, হৃৎস্পন্দনের চেয়েও গভীর—তখনই তার নাম হয় ভালোবাসা।
৭। কবিতা ও কবি
শিকারের নীতিশাস্ত্র
ফুল ঝরছে। বাতাস ঝরাপাতা মুঠোয় নিয়ে উড়ছে—শিশু ঝরাপাতা কুড়িয়ে সোনা ভাবে, প্রাপ্তবয়স্ক আবর্জনা ভাবে। অনিশ্চয়তার মেঘ জমেছে আকাশে, ধূসর পর্দা টানা—তবু কিছুই ভালো লাগে না—না ভেতরে, না বাইরে।
অথচ যখন কবিতার শিকার পাক খেতে খেতে নেমে আসে—শব্দের ডানা ভেঙে, অর্থের রক্তে ভেজা, মাধ্যাকর্ষণে টানা—কিংবা শিকারি নিজেই রক্তাক্ত শুয়ে পড়ে, ক্ষতবিক্ষত, তখন গোপন সুখ জাগে, অন্ধকার ঘরে মোমের আলোর মতো। সে সুখ ততটাই তীব্র, যতটা বড়ো সে শিকার—তিমি শিকারের আনন্দ খরগোশ শিকারে মেলে না। সত্যিকারের শিকারে শিকারি আর শিকারের তফাৎ থাকে না—দু-জনেই রক্তাক্ত, দু-জনেই বিজয়ী, দু-জনেই পরাজিত।
বাঘ হওয়া সহজ—মানুষকে শিকার রোমাঞ্চকর, কারণ মানুষই একমাত্র শিকার, যে পালটা শিকার করতে পারে। তার আগে কোনো মতবাদের আগুনে কলজে পুড়িয়ে নিতে হয়—শিখতে হয়, সাদা-কালোর ভেদ তুচ্ছ; ধূসরেই বাস করে সত্য—ছায়া আর আলোর মিশ্রভূমিতে। নইলে এত বড়ো শিকার ধরা পড়ে না—সত্য পালিয়ে যায়, মিথ্যা ধরা দেয়।
কবিতা, তোমাকে বলছি
তুমি আর ভাস্কর্যের নিষ্প্রাণ রূপ নও—তোমার শিরায় এখন রক্ত চলাচল শুরু হয়েছে, মর্মরের ঠোঁটে তাপ ফিরেছে। শরীরের ভেতরে শব্দ বেড়ে উঠছে শিশুর মতো—ছন্দের মিনার থেকে জীবিকার ধূসর প্রান্তরে তুমি মেঘ আর অলংকারের মিশেলে ফুলের মতো ফোটো—পাথরের ফাটল দিয়ে জন্মানো ফুল, যে-ফুলের শেকড় পাথরকেই খাদ্য বানিয়েছে। কাঁকরের অন্তর্গত আঘাত গদ্যের মাটিতে লিখিত হয়—বাতাসের ধারালো নখরে পল্লব ছিঁড়ে যায়, কিন্তু ছেঁড়া জায়গা থেকেই নতুন কুঁড়ি, ক্ষত থেকেই কোরক।
বিষণ্ণ, ক্লান্ত—তবু অদম্য, পুড়ে যাওয়ার পরও দাঁড়িয়ে-থাকা দেয়ালের মতো। দিনশেষে তারাভরা আকাশের নিচে মেঘের ভেজা ভাঁজে অন্য কোনো অর্থ খুঁজি—তোমার প্রতিমা থেকে জীবনের শেষ মিলন, শেষ চুমু, শেষ শব্দ।
জন্মলতার অভিধান
আমার কবিতা যদি তোমার রক্তের মতো লোনা হয়—সমুদ্রজল, জীবন বহন করে, কিন্তু তৃষ্ণা মেটায় না; বাঁচায়, কিন্তু তৃপ্ত করে না। যদি নদীর মতো মিষ্টি হরিণীর চোখ হয়, কিংবা ক্রোধের শোকে উচ্ছ্বসিত শ্লোক—আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে বেরোনো লাভা-ভাষা—তবে সূচনা শুভ। যদি বর্ণবন্ধনে ডানার ফানুসে আকাশপ্রদীপ জ্বলে—মাটি থেকে আকাশ অবধি, শেকড় থেকে তারা—দূরদেশের নিকুঞ্জে ভাঙা স্বপ্নের বীজ থেকে নীড় গড়ে ওঠে, যে-নীড়ে এমন পাখি জন্মাবে, যা আগে কেউ দেখেনি, যার গান আগে কেউ শোনেনি।
তবে সে শুধু কবিতা নয়—আমার জীবনের জন্মলতা, গভীরতম কামনার অভিধান—প্রতিটি শব্দের অর্থ রক্তে লেখা, প্রতিটি পঙ্ক্তি একটি শিরার মানচিত্র, প্রতিটি স্তবক এক-একটি অঙ্গের ব্লুপ্রিন্ট।
মাদারির মেলায়
কবিতা লিখে কী হবে? তার চেয়ে দিবারাত্র নাচ দেখো—জীবন নিজেই যে-নাচ নাচে—পদ্ধতিহীন, ছন্দহীন, কোরিওগ্রাফিবিহীন, তবু মুগ্ধকর—কারণ প্রতিটি পদক্ষেপ অপ্রত্যাশিত। মাদারির ঘরে দশকের মেলা বসেছে—প্রবেশমূল্য নেই, শুধু বিশ্বাস রাখতে হয়, চোখ খোলা রাখতে হয়। কোন উপবনে সেই অচেনা ফুল—যার গন্ধ স্মৃতিতে নেই—তা নিয়ে কারও চোখে ঘুম নেই, মৌচাকের গোপন স্বাদ খোঁজে মনে মনে, জিভে জল আসে। (“মাদারি” শব্দের অর্থ সাধারণত বানর-খেলা দেখানো ব্যক্তি বা ভেলকি/কৌশল দেখানো ফেরিওয়ালা ধরনের খেলোয়াড়।)
পথে রোদ পড়ে—রেস্তোরাঁর চকচকে পোশাকে শহরের ভিড়ে দুপুরের ক্লান্তি জিরোয়; ভবঘুরে বেড়াল রোদে শুয়ে শুয়ে দার্শনিক হয়, চোখ অর্ধেক বুজে অনন্ত চিন্তা করে; কাক আর ইঁদুর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ সন্ধি করে—যুদ্ধবিরতি, কোনো চুক্তিপত্র ছাড়া। বেকার কবিতার চেয়ে মাঠের পরস্পরাই সত্য—তারা জানে, বেঁচে থাকাটাই একমাত্র শিল্প, সবচেয়ে কঠিন শিল্প।
তুলি ও তারকা
নদীর কাছে থাকলেও দু-পাড়ে পিপাসা জ্বলে—সমুদ্রের মাছ লবণাক্ত জলে থেকেও তৃষ্ণার্ত, প্রাচুর্যের মধ্যে অভাব। আলো জ্বললেও অন্ধকার সরে না—ছায়া আলোরই সন্তান। চোরাবালি হৃদয়ের পথ—যতই হাঁটো, ততই ডোবো; যতই ছটফট করো, ততই গভীরে নামো। এড়ানো কঠিন—এড়ানো মানে নিজেকে এড়ানো, নিজের ছায়া থেকে পালানো। শুধু রং আর তুলি দিয়ে ছবি আঁকা—সেটুকুও নক্ষত্রের মতো কঠিন। নক্ষত্রও তো পুড়তে পুড়তে আলো দেয়—সৃষ্টির মূল্য সবসময় দহন, সবসময় নিজেকে জ্বালানি করা।
তবুও শব্দ বোনা হচ্ছে
এখনও কবিতা—কোথাও কোথাও কিছু লেখা হচ্ছে, ভূগর্ভে ঝরনা বয়ে চলে—কেউ না জানলেও, ভূমির নিচে নদী চলে—কোনো মানচিত্রে না থেকেও। সর্বত্র ইট-বালি-পাথরের চাপা—পৃথিবী শ্বাসরুদ্ধ, কংক্রিটের করসেটে বাঁধা; বাতাসে পোড়া গন্ধ, পথে পথে মিছিলের ছলনা—সত্যের নামে মিথ্যার ফেরি, ন্যায়ের পোশাকে অন্যায়ের ব্যাবসা। তবু কখনো ঘাসের শব্দেও সবুজ সংকেত জাগে—ঘাসের কোনো স্বার্থ নেই, কোনো রাজনৈতিক দল নেই, তাই তার সংকেত সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য। বাদামের শীতল ছোঁয়ায় সামান্য শান্তি—বিকেলের হলুদ আলোয় দিন কাটে, ধীরে, আলস্যে, ক্ষমায়।
আজকাল অনেকেরই কাজ নেই, মাথায় ছাতা নেই, পকেটে পয়সা নেই—খালি হাত, খালি পেট, খালি চোখ। তবু অবাক—কোথাও কবিতার শব্দ বোনা হচ্ছে, তাঁতের মতো, ধৈর্যে, একটি একটি সুতো করে। কবিতা বেঁচে-থাকার শর্ত নয়—কবিতা বেঁচে থাকার কারণ, একমাত্র কারণ, যা যুক্তিতে ধরে না।
তবুও গান: চার
লেখাটি শেয়ার করুন