গল্প ও গদ্য

তবুও গান: পাঁচ



৮। বিদায় ও প্রত্যাবর্তন

ফেরিওয়ালার দর্শন

দূরত্বের দোষে সব মিশে যাচ্ছে—পাহাড় আর আকাশের সীমানা ঝাপসা হয় বহুদূর থেকে, ইমপ্রেশনিস্ট ছবির মতো। জানালা, থালাবাসন, ফেরিওয়ালার ডাক—একাকার, দৈনন্দিনের সিম্ফনি। ফুল চাই, মাটির পুতুল চাই—কিন্তু কী দিই, কী পাই? বিনিময়ের এই অসম অঙ্ক কে কষেছে, কোন অর্থনীতিবিদ? আবর্জনা জমে—কোন সম্পর্ক আসল, কোনটা প্রসাধন, কোনটা হীরে, কোনটা কাচ? ক্রমশ সব ভারী হয়ে ওঠে—ঝোলায়, বুকে, চোখের নিচে, মেরুদণ্ডে।

পুরোনো পাদপীঠে কত শ্যামল স্মৃতি—শ্যাওলার মতো; যত পুরোনো, তত সবুজ; যত অবহেলিত, তত জীবন্ত। কিন্তু সেই সবুজও ফুরোচ্ছে—প্রতিটি স্মৃতি একটু একটু করে বিবর্ণ হচ্ছে, পুরোনো ফটোগ্রাফের মতো। তবু কিছু কিছু জিনিস দামি থাকে—শিল্পগুণে নয়, স্মৃতির মন্থনে, হৃদয়ের রসায়নে। একটা ভাঙা বোতাম, হলদে-হয়ে-যাওয়া চিঠি, শিশুর আঁকা ছবি…যেখানে সবার মাথা শরীরের চেয়ে বড়ো—এসবের বাজারদর নেই, নিলামে উঠবে না, তবু মূল্য অপরিমেয়। ক্ষুদ্র জিজ্ঞাসাগুলো থাকুক—তারাই জীবনকে জীবন্ত রাখে। ফেরিওয়ালা নীরবে চলে যাক—তার ঝোলায় এমন কিছু আছে, যা সে নিজেও জানে না, যার দাম সে নিজেও বোঝে না।

পলাতকের ছায়া

মাসে মাসে অন্তরের গভীরে কেউ ডাকে—বাতাসের শব্দে, পাতাঝরায়, শিশিরভেজা ঘাসের সবুজে নাম ধরে, আমার আসল নাম ধরে, যে-নাম কেউ জানে না। অনুক্ষণ পাশে হাঁটে—ছায়ার মতো শরীরী, কিন্তু ছায়ার চেয়েও অধরা, কুয়াশার চেয়েও ক্ষণস্থায়ী। আমার সঙ্গে আছে, দেখতে পাই না—চোখ নিজেকে দেখতে পায় না, আঙুল নিজেকে ছুঁতে পারে না।

কাজের ফাঁকে, শব্দময় ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে খুঁজি—কোনো ভিড়ে মিশে যায় সে, জনস্রোতে দ্রবীভূত হয়। পলাতক—জনারণ্যে নিজেকে লুকোয়, গাছ যেমন বনে লুকোয়। হয়তো আমারই সেই অংশ, যাকে চিনতে রাজি নই—আয়নার পেছনের মুখ, ফ্রেমের বাইরের দৃশ্য, ফটোগ্রাফের ক্রপ-করা অংশ। একদিন সামনাসামনি হব—সেদিন হয়তো ভয় পাবো, হয়তো চিনে নেবো, হয়তো দুটোই একসঙ্গে।

অদৃশ্য পদচিহ্ন

কোনো এক নিমগ্ন পথিক অবিরাম হেঁটে চলে—তোমার, আমার, সকলের বুকের ভেতর দিয়ে, শিরার রাস্তায়, স্নায়ুর গলিপথে। ঘুমেও সে হাঁটে—পায়ের ছাপ পড়ে স্বপ্নে, সকালে বালিশে তার গন্ধ থাকে। কৈশোরের সুখ-দুঃখ, ছোটাছুটি, বিশুদ্ধ উদ্যানের গন্ধ সে বহন করে—স্মৃতির ভারী পোঁটলায়, কুলির মতো, মজুরি ছাড়া। মুখোমুখি দূরত্বের রোমাঞ্চে সারাক্ষণ চলে ইচ্ছের সংলাপ, নিভৃত নিঃশ্বাস—চোখের আয়নায় আঁকা জীবনের সমগ্র ছবি, প্রতিমুহূর্তে বদলায় কিন্তু ফ্রেম একই, ক্যানভাস একই।

সে পার্থিব—একদিন শেষ আসনে শুয়ে পড়বে, মাটির আসনে, ঘাসের চাদরে, আকাশের ছাদের নিচে। শোকে আর বিস্ময়ে সেই দিন গড়িয়ে যাবে—একটি বিরতি থেকে অন্য ভূমিকায়, পর্দা পড়ে, আবার ওঠে। তারপর নীরবতা—সেই নীরবতা, যা শব্দের চেয়ে জোরে কথা বলে। অভিনয় শেষ, চরিত্র বেঁচে থাকে—মঞ্চ ভাঙে, গল্প থাকে।

দিঘির ওপারের মুখ

রোববার, কাজ নেই—ছুটির দুপুরে শুধু দেখি, শিশু যেমন দেখে—বিচার ছাড়া, বিশ্লেষণ ছাড়া, নাম না জেনে, শ্রেণিবিভাগ না করে। দু-ধারে ফলন্ত মাঠ, ফসলের অকুণ্ঠ সবুজ স্মৃতির সুতোয় টানে—দেখা যায় না সেই সুতো, কিন্তু টান ছেঁড়ে না, মাকড়সার জালের চেয়ে শক্ত। নদীও একটি ছবি—জলরঙে আঁকা, প্রতিমুহূর্তে বদলায়, তবু একই নদী, একই নাম। জীবন দুরূহ নয়—সুখ আর ক্ষমতার ঘুম…সবই রঙিন ছলনা, সবই মরীচিকা, তৃষ্ণার্ত মরুর বিভ্রম।

আমিও তো প্রতারিত পাখির ছানা—আয়নায়-দেখা পাখিটিকে বন্ধু মনে করেছিল যে, ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকাতে গিয়ে কাচে ধাক্কা খেয়েছিল। তবু সেই মুখ—চোখে আবিরের রং, ঠোঁটে অপ্রকাশিত হাসি, যে-হাসি ফোটেনি কিন্তু ফোটার প্রস্তুতি নিচ্ছে—মনে পড়ে। কৈশোরের টলোমলো দিঘির ওপারে দেখেছিলাম যাকে—সেই মুখ ডোবেনি, জলের নিচে ভাসছে এখনও, প্রবালের মতো জীবন্ত, শ্যাওলায় ঢাকা কিন্তু অক্ষত।

সন্ধের পরের সংলাপ

এখন আকাশ দেখব—সারাদিন ছেঁড়া ঘুড়ির মতো উড়ে বেড়িয়ে, বাতাসের দাস হয়ে, এখন চুপ করে বসে আকাশ দেখব, বাতাসের ঘ্রাণ নেবো—শহর যে-ঘ্রাণ ভুলিয়ে দিয়েছে, নাক মনে রেখেছে, নাসারন্ধ্রে খোদাই করা আছে গ্রামের গন্ধ। কালপুরুষকে চিনব—ঠাকুমা দেখিয়ে দিত ছোটোবেলায়, আঙুল তুলে, চোখে চশমা ছাড়াই; এখন নিজে খুঁজে বের করতে হয়, আলোদূষণে তারা হারিয়ে যায়। সব কিছু কাদায় মিশে গেছে—কিন্তু কাদা থেকেই পদ্ম, সবচেয়ে নোংরা জলেই সবচেয়ে সুন্দর ফুল।

তোমার সব সবুজ আলো ম্লান হলেও—জাগো, বেঁচে থাকো, হাসো। হাসি সবচেয়ে সস্তা ওষুধ আর সবচেয়ে দামি উপহার—একই সঙ্গে বিনামূল্যে প্রদত্ত আর অমূল্য। তারপর—হয়তো একদিন সন্ধেমুখে মুখোমুখি দাঁড়াব—শেষ সংলাপের পরে। শব্দ ফুরিয়ে যাবে—অভিধান খালি হবে, কলম শুকোবে। শুধু নীরবতা থাকবে—আর সেই নীরবতায় যা বলা হবে, কোনো ভাষায় তার অনুবাদ হয় না, কোনো অনুবাদক জন্মায়নি তার জন্য।

অন্ধকারের উলটোপিঠ

দুই হাতে বীজ বুনি—ভালোবাসার, উজ্জ্বলতার। প্রতিটি বীজ একটি ভাঁজ-করা চিঠি—মাটি তাকে পড়ে ধীরে, জল তাকে পড়ে ফোঁটায় ফোঁটায়, তারপর একদিন সে উত্তর দেয় অঙ্কুরের ভাষায়, সবুজ কালিতে। নীলাভ জোনাকির মতো জলছবিগুলো আমাকে সম্রাট করে রাখে—যার রাজত্ব স্বপ্নে, মুকুট কল্পনায়, সিংহাসন একটুকরো দুপুরের ছায়ায়, প্রজা একপাল মেঘ।

ফসল কাটার সময় সন্দিগ্ধ সিন্দুকে গোপনে তুলে রাখি—মুঠোয় দু-টুকরো রুটি, দুপুরের ক্লান্ত আলোর অবশেষ, একটা অসম্পূর্ণ গান, যা কেউ কোনোদিন শেষ করবে না, যার শেষ লাইন লেখার আগেই কবি ঘুমিয়ে পড়েছিল।

কৃত্রিম সেই দোসরের পাশে হয়তো বুঝি—এখানেই মোহ, এখানেই জীবন—দুটো একই ঠিকানায় থাকে। কৃপণ বন্দরে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি চুপচাপ বসে—জাহাজ আসবে বলে, যে-জাহাজ আসবে না, যে-দিগন্ত সবসময় সমান দূরে। তখন ঠিক বুঝতে পারি—অন্ধকারের উলটো পিঠে আলোর ঠিকানা লেখা আছে—শুধু উলটে ধরতে হয়, শুধু সাহস করে ঘুরিয়ে দেখতে হয়।

বিদায়ের ব্যাকরণ

আমি ফিরে যাব—হাট ভাঙলে হাটুরে ফেরে, খালি ঝোলা কাঁধে, পায়ে ধুলো, বুকে সারাদিনের ক্লান্তি; চূড়া থেকে শিশির ঝরে সকালে—ওজনহীন, শব্দহীন, ঠিকানাহীন। রোদ চলে যায়, অতিথি যায়, ঋতু যায়, যৌবন যায়—সব কিছু এভাবেই ঝরে, মুছে, ক্ষয়ে বেঁচে থাকে—ক্ষয়ের মধ্যেই বেঁচে থাকা, ঝরার মধ্যেই ফেরা। যাওয়ার মধ্যেই ফেরার বীজ—প্রতিটি বিদায়ের ভেতরে লুকিয়ে পুনর্মিলনের ভ্রূণ, প্রতিটি শেষের গর্ভে শুরু।

শাখা থেকে ফুল, ফুল থেকে সৌরভ, সৌরভ থেকে স্মৃতি, স্মৃতি থেকে স্বচ্ছ ছায়া, স্বপ্ন থেকে কান্না—সব চলে যায়, টলোমলো দীর্ঘশ্বাস হয়ে, শেষশ্বাসের কুয়াশা হয়ে। যাওয়াই জীবন—যেতে যেতে সব মিশে যায়, নদী সমুদ্রে মিশে নাম ভোলে, ব্যক্তি বিশ্বে মিশে সীমানা ভোলে। কিন্তু জল থাকে। জল সবসময় থাকে—রূপ বদলায়, নাম বদলায়, ঠিকানা বদলায়—কিন্তু জল থাকে। জলই একমাত্র, যা চিরকাল থাকে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *