দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

নিঃশব্দ ঝড়: ২



রাত তিনটা। চোখ জ্বলছে। মাথায় কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে। পৃথিবীটাকে অর্থহীন লাগছে, বইয়ের অক্ষরগুলো পিঁপড়ের মতো ঘুরছে পাতায়; সামনে পরীক্ষা, মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। বই ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে। ঠিক তখনই সেই মুখটা মনে পড়ে, আর হাত আবার বই তুলে নেয়। এটা শৃঙ্খলা নয়। শৃঙ্খলা ভাঙা যায়। এটা প্রেম। প্রেম ভাঙলে ভেতরটা ভাঙে—আর ভেতরটা ভাঙলে বাইরেটা দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী?

একটা ভয় আছে। চুপচাপ, গভীর, হাড়ে-পৌঁছানো এ ভয়।

যদি না পারি। যদি না হই। যদি তাকে সেই সম্মান দিতে না পারি, যা তার প্রাপ্য।

এই "যদি"-টা সবচেয়ে ভয়ংকর। নির্দিষ্ট বিপদের সাথে লড়া যায়—ঝড় আসছে, দরজা বন্ধ করো, জানালায় তক্তা লাগাও। কিন্তু "যদি"? সে তো ছায়া। তোমার নিজেরই ছায়া। যতই পালাও, সে তোমার সাথে সাথে। ইয়ুং বলতেন, মানুষের ভেতরে একটা অন্ধকার থাকে, যা সে নিজেও জানে না—অচেতনের গভীরে চুপচাপ বসে থাকে, কিন্তু সেখান থেকেই দড়ি টানে। এখানে সেই অন্ধকার হলো অযোগ্যতার ভয়। যথেষ্ট না হওয়ার আতঙ্ক। আর রাতে এসব বড়ো হয়—দিনের আলোয় যা একটা চিন্তা, রাতের অন্ধকারে তা-ই এক দৈত্য।

নিজের সম্মানের চেয়ে ওর সম্মান বেশি দরকারি। নিজে না খেয়ে থাকা—যদি তাতে ওর একটু ভালো হয়। নিজের ঘুম কেড়ে নেওয়া—যদি তাতে ওর একটুখানি সম্মান বাড়ে। ভাগ্যে কতটুকু সম্মান লেখা আছে কে জানে। কিন্তু যতটুকু আছে—তার সবটুকু ওর। সবটুকুই। নিজের জন্য রাখার ইচ্ছেটুকুও নেই। নদী কি কখনো সমুদ্রে যাবার আগে নিজের জন্য একটু জল রেখে দেয়? দেয় না। পারেও না।

এটা কি দুর্বলতা? পৃথিবী বলবে, হ্যাঁ। আজকালকার মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলবে পরনির্ভরতা, নিজেকে মুছে ফেলা, অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক। হয়তো তারা ঠিকও। যুক্তির বিচারে ঠিক।

কিন্তু যুক্তির বাইরেও একটা জগৎ আছে।

সুফিরা এটাকে বলতেন ফানা—নিজেকে মুছে ফেলা, প্রেমাস্পদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া, যেমন নদী হারিয়ে যায় সমুদ্রে, আর তখন সে আর নদী থাকে না, সমুদ্র হয়ে যায়। নিজেকে মুছতে মুছতে মনসুর হাল্লাজ এমন এক জায়গায় পৌঁছুলেন, যেখান থেকে একদিন উচ্চারিত হলো—'আনাল হক', আমিই সত্য। তারপর কী হলো? দশম শতকের বাগদাদের এক উন্মুক্ত চত্বরে তাঁর হাত-পা শরীর থেকে আলাদা করা হলো, আর তারপর জনসমক্ষে হত্যা করা হলো তাঁকে। বিলীন হওয়ার মূল্য সেদিন এভাবেই চুকিয়েছিলেন তিনি। কারণ পৃথিবী সেই মানুষকে সহ্য করতে পারে না, যার ভেতরে "আমি" বলে আর কিছু নেই—সে খালি, পুরোপুরি খালি, আর সেই শূন্যতা ভরে আছে অন্য কিছুতে, যা পৃথিবীকে ভয় পাইয়ে দেয়। উপনিষদ বলে, তৎ ত্বম্ অসি—তুমিই সেই। আমি আর তুমি যখন আলাদা নয়—তখনই প্রেম তার চূড়ান্ত চেহারা পায়। পৃথিবী সেটাকে পাগলামো বলে। হোক। কিছু পাগলামো জ্ঞানের চেয়ে গভীর, যুক্তির চেয়ে পবিত্র।

বিছানায় পাশ ফেরে সে। বালিশ উলটে দেয়—শুকনো দিকটা ওপরে। ঘড়িতে দুইটা বাজে হয়তো, হয়তো তার বেশি। সময়ের হিসেব নেই আজ। শুধু বুকের ভেতরটা এখনও জ্বলছে।

বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে।

এতদিন ধরে কারও জন্য বুকের ভেতরটা এরকম টনটন করে না সাধারণত। সময় সব কিছু খেয়ে ফেলে—ধীরে ধীরে, যেভাবে লবণ খায় লোহাকে, যেভাবে রোদ ফ্যাকাশে করে রং। অভ্যেস প্রতিটি তীব্রতাকে ভোঁতা করে দেয়। দূরত্ব মানুষকে কুয়াশা বানিয়ে দেয়—ছিল, হারিয়ে গেল, মনেও পড়ে না। পদার্থবিজ্ঞানের কথাই ধরা যাক—এনট্রপি, মহাবিশ্বের সব কিছু বিশৃঙ্খলার দিকে যায়, তাপ ঠান্ডা হয়, আগুন নেভে, সব একদিন থামে।

কিন্তু এই অনুভূতি সেই হিসেব মানেনি। একদমই না। প্রথম দিন যেমন ছিল, আজও তেমন—যেন কেউ জলের তলায় আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে, যেখানে অক্সিজেন নেই, বিজ্ঞানের কোনো যুক্তি নেই, তবু সে জ্বলছে। কারণ ওই আগুনের জ্বালানি পদার্থ নয়—বিশ্বাস। আর বিশ্বাস তো রসায়নের ধার ধারে না। বিশ্বাস সেই জিনিস, যা এনট্রপিকে বুড়োআঙুল দেখায়।

কোনো কারণ ছাড়া ভালোবাসা। কী আজব কথা, তাই না? স্পিনোজা বলতেন, ঈশ্বর নিজেই নিজের কারণ—তাঁকে কেউ বানায়নি, তাঁর অস্তিত্বের জন্য কারও অনুমতি লাগে না। কিছু ভালোবাসাও সেরকম। কারণ খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন, যেমন অর্থহীন কেন তুমি শ্বাস নাও, সেটা খোঁজা। নাও, কারণ নাও। ভালোবাসি, কারণ ভালোবাসি। ব্যস্‌। এটুকুই। লালন বলতেন, সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে—লালনের জাত যেমন কোনো খোপে পড়ে না, এই ভালোবাসাও কোনো খোপে পড়ে না। সে ভালোবাসা, না মায়া, না নেশা, না পাগলামো? কোনো তকমা সইবে না তাকে। যে-ভালোবাসায় "কেন" প্রশ্নটাই বেমানান, যেখানে "বিনিময়ে কী পাবো" হিসেবটা অশ্লীল—তা-ই হয়তো একমাত্র ভালোবাসা, যা আসলে সেই নামের যোগ্য। বাকি সব? বাকি সব লেনদেন। পরিশীলিত, পালিশ-করা—কিন্তু লেনদেন।

সামনে কী হবে? কোথায় যাবে? কী করবে?

কিচ্ছু জানা নেই। ভবিষ্যৎ একটা কুয়াশা—ঘন, স্যাঁতসেঁতে, যার ভেতরে হাঁটতে গেলে জামাকাপড়ে জল লাগে, কিন্তু বৃষ্টি পড়ছে না। পথ দেখা যাচ্ছে না। পেছনে ফিরলে পেছনটাও মুছে যাচ্ছে। আমরা কেউ এই পৃথিবীতে আসতে চাইনি। কেউ এই পরিস্থিতি বেছে নিইনি। ছুড়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের—ঝড়ের মুখে পাতা যেমন, তেমনই। দিক নেই, গন্তব্য নেই, শুধুই বাতাসের মর্জি।

কিন্তু কখনো কখনো সেই ছুঁড়ে-দেওয়ার ভেতরেও একটা নোঙর পাওয়া যায়। একটা মানুষ পাওয়া যায়। আর তখন ভাসতে থাকাটা অন্যরকম লাগে—ভয় কমে না, কিন্তু একটা দিক পাওয়া যায়। কোথাও তীর আছে। দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আছে। বোঝা যাচ্ছে। কারণ কেউ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

এমন মানুষ আগে আসেনি। আর আসবেও না। জীবনে কিছু কিছু জিনিস এক বারই ঘটে। গ্রিকরা একটা সুন্দর কথা বলত—ঘড়ির সময় আর ক্ষণ এক নয়। ঘড়ি চলে নিজের মতো, নির্দয়, কারও জন্য থামে না—সেটাকে তারা বলত ক্রোনোস। কিন্তু আরেকটা সময় আছে, যা হঠাৎ আসে, এক বারই আসে, ফেরে না, শুধু হাড়ে ছাপ রেখে যায়—সেটার নাম কাইরোস। এই মানুষ সেই কাইরোস। সময়ের কাপড়ে একটা ফাটল, যেখান দিয়ে অনন্তকাল উঁকি দিচ্ছে।

এক জনই হয় এরকম। পৃথিবীতে এক জনই। সে-ই জীবনের অর্থ। সে-ই সেই কারণ, যার জন্য সকালে চোখ খুলতে ইচ্ছে করে। যার জন্য "ভবিষ্যৎ" শব্দটা আতঙ্কের বদলে একটু, শুধু একটু, সম্ভাবনার মতো শোনায়।

আর যদি কপালে কোনো সুখ থাকে? যদি স্রষ্টা কোনো আশীর্বাদ রেখে থাকেন ভাগ্যে? সেই সুখের একটা কণাও নিজের জন্য রাখবে না সে। পুরোটাই ওর। পুরোটাই। নিজের নসিবের সুখ ভেঙে ভেঙে ওকে দিতে পারলে—সেটাই হবে জীবনের সবচেয়ে ভালো কাজ।

ইবনে আরাবি বলতেন, প্রেম সেই আয়না, যেখানে খোদা নিজেকে দেখেন। জানি না, সেটা কতটা সত্য। কিন্তু যদি সত্য হয়—তাহলে এই ভালোবাসা সেই আয়নার একটা টুকরো। ছোট্ট। কিন্তু দাগহীন। আর তাতে যা দেখা যায়—সেটা মানুষের চেয়ে কিছুটা বড়ো, ভাষার চেয়ে কিছুটা পুরোনো, সময়ের চেয়ে কিছুটা...কিছুটা কী? জানি না। সেই শব্দটা এখনও তৈরি হয়নি।

ফোন রাখে সে। স্ক্রিন অন্ধকার। ঘরে আবার সেই নৈঃশব্দ্য—ফ্যানের আওয়াজ, দূরে একটা ট্রাকের হর্ন, পাশের ঘরে নাক ডাকা। নৈঃশব্দ্য কখনও পুরোপুরি নীরব নয়—সে ভরা, কানায় কানায়, আমরা শুধু শুনতে ভুলে যাই।

বুকের ভেতর ঝড়টা থেকে যায়। নিঃশব্দ ঝড়। যে-ঝড়ের কোনো আওয়াজ নেই, কিন্তু যে-ঝড় পৃথিবী উলটে দিতে পারে।

প্যাসকাল—সেই অসুস্থ, ঈশ্বর-মাতাল গণিতজ্ঞ, তিনি একরাতে এমন কিছু অনুভব করেছিলেন যে, সেটা কাগজে লিখে কোটের আস্তরণে সেলাই করে রেখেছিলেন, বুকের কাছে, মৃত্যু পর্যন্ত। তাঁর মৃত্যুর পর চাকর কোটের ওই জায়গায় ফোলা দেখে খুলে পেয়েছিল সেটা। তিনি একদিন লিখেছিলেন: হৃদয়ের নিজস্ব যুক্তি আছে, যা যুক্তি জানে না। সাড়ে তিন-শো বছরের বেশি হয়ে গেল। এখনও এর চেয়ে সত্য কথা কেউ বলতে পারেনি।

মধ্যরাতের এই লেখা সেই হৃদয়ের ভাষায়—মস্তিষ্কের হিসেবে নয়, পাঁজরের কম্পনে। হয়তো কেউ পড়বে না এটা। হয়তো ফোনের মেমোরিতে চাপা পড়ে থাকবে—পুরোনো ছবি, ডিলিট-না-করা মেসেজ, আর এই লেখা—পাশাপাশি, নীরবে।

কিন্তু যে পড়বে—সে হয়তো থামবে একটু। হয়তো নিজের বুকে হাত রাখবে। হয়তো চিনবে এই ওজন। এই ভার। এই সৌন্দর্য। আর বুঝবে—এই ভার বহন করাটাই বোধ হয় বেঁচে থাকার সবচেয়ে অর্থবহ কাজ। সেই অর্থ, যা কোনো দর্শনের বইয়ে নেই, কোনো সভায় বলা হয় না, কোনো ক্লাসরুমে পড়ানো হয় না।

সেই অর্থ শুধু একজন মানুষের চোখে পাওয়া যায়…যদি তাকানোর সাহস থাকে।

...ফোন রাখার পরও আঙুলগুলো কাঁপছে একটু। ঘামে ভেজা। স্ক্রিন অন্ধকার, কিন্তু চোখদুটো খোলা। ঘুম আসবে না আজ। আসার কথাও নয়। কিছু রাত ঘুমের জন্য নয়—কিছু রাত শুধু সহ্য করার জন্য, পার করার জন্য, বুকের ভেতরে যেটুকু জমেছে, সেটাকে আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য।

সকাল হবে। রোদ উঠবে। দিনের আলোয় সব কিছু অন্যরকম দেখায়—ছোটো, সামান্য, "আরে, এত ভাবার কী আছে"। কিন্তু সে জানে—রাতেরটাই সত্যি ছিল। দিনের আলোয় আমরা ঢাকি, রাতের অন্ধকারে খুলি। আর যা খোলা অবস্থায় দেখা যায়—সেটাই আসল চেহারা।

সেই চেহারায় লেখা আছে একটা কথা। একটাই। কিন্তু সেটা বলার ভাষা এখনও তৈরি হয়নি। হয়তো হবেও না। বোধ হয় তা-ই ভালো।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *