দর্শন ও মনস্তত্ত্ব

সব নাম ঝরে গেলে: পাঁচ



উপস্থিতির তলায়, তার ভেতরে, তার মধ্য দিয়ে, শীতের মাটির নিচে-থাকা উষ্ণতার মতো, পুকুরের তলায়-থাকা ঝরনার মতো, একটা স্রোত আছে। ধারণা নয় এটি, দর্শনও নয়, যুক্তি-করে-পৌঁছানো উপসংহার নয়। এটা অনুভূত হয়। আর যা অনুভূত হয়, তা হলো ভালোবাসা।

রোমান্টিক ভালোবাসা নয় এটি, শর্তের ভালোবাসাও নয়, দেনা-পাওনার হিসেবের ভালোবাসাও নয়। হারানোর ভয়ে যে-বন্ধন গড়ে ওঠে, তা-ও নয়। "আমি এতে কী পাবো?" সেই প্রশ্নের ভালোবাসাও নয়। আমরা সাধারণত ভালোবাসা বলতে যা বুঝি, এ তার কোনোটাই নয়।

এ আরও পুরোনো। আরও নীরব। আরও ছড়ানো, যেমন বাতাস ছড়ানো, যেমন আকাশ ছড়ানো। অস্তিত্বের তন্তুতে বোনা। এ বোঝানো কঠিন, কারণ এ বোঝার জিনিসই নয়, টের পাবার জিনিস। সব কিছুর তলায়-থাকা কোমলতা—যেটাকে আমরা মাঝে মাঝে অন্য নামে ডাকি—সৌন্দর্য বা শান্তি বা ঘরে ফেরার অনুভূতি। এ দেখা দেয় পাতার ফাঁক দিয়ে আসা বিকেলের আলোয়; শোকে, যা হৃদয় খুলে দেয় এমন জায়গায়, যা তুমি জানতেই না যে, বন্ধ ছিল। একান্তে ঝরে-পড়া অশ্রুতে, কারণ ছাড়া, ব্যাখ্যা ছাড়া। সেই যন্ত্রণায়, যা যায় না, কারণ সে এখনও তোমাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। তোমাকে এটা বানাতে হয় না। এ আবিষ্কৃত হয়। একে আঁকড়ে ধরতে হয় না, বরং ছেড়ে দিলেই একে দেখা যায়, যেমন হাত খুললে প্রজাপতি বসে, মুঠো বন্ধ রাখলে বসে না।

এ-ই প্রিয়তম।

প্রিয়তম দূরে কোথাও বসে-থাকা কোনো মূর্তি নয়, যাকে খুঁজে বের করতে হবে; শরীরের ভেতর দিয়ে যাওয়া স্রেফ আবেগও নয়—সমস্ত কিছুর মধ্যে চলমান পবিত্র স্পন্দন। তোমার প্রতিটি আকুলতার পেছনে যে অপেক্ষা করেছে, সে-ই। তুমি যখন খুঁজছিলে, সে তোমাকে দেখছিল। একাকিত্বে ছিল সে। শূন্যতায়। শ্বাসে। সেই ব্যথায়ও যাকে তুমি পরিত্যাগ ভেবেছিলে, যখন মনে হয়েছিল, কেউ নেই, কিছু নেই, সব শেষ, তখনও সে ছিল, ঠিক সেখানে। আকুলতাটাই ছিল তার প্রমাণ। তা দূরত্বের প্রমাণ ছিল না, তা ছিল আত্মার স্মৃতি, সেই ভালোবাসার, যা কোনো বিকল্প বস্তুতে তৃপ্ত হওয়ার জন্য অনেক বড়ো সহায়ক।

আকুলতা পবিত্র। এ ত্রুটি নয়, বরং আত্মার ভাষা। যে গভীর তেষ্টা বিনোদনে, সাফল্যে, প্রশংসায়, বা ক্ষণস্থায়ী সুখে মেটে না—তোমার মধ্যে কিছু অংশ ভাঙা আছে, এর প্রমাণ তা নয়। বরং এই প্রমাণ যে, তোমার কোনো অংশ জানে, এর চেয়ে বেশি কিছু আছে, গভীরে কিছু আছে, কাছে কিছু আছে, যদি থামো, তাহলে টের পাবে। এ হচ্ছে ঘরে ফেরার ডাক, নির্বাসনের ভেতর থেকেই এ শোনা যায়। প্রিয়তমের চুম্বকের টান প্রতিটি অতৃপ্তির ভেতর দিয়ে তোমাকে ভেতরের দিকে নিয়ে যায়।

জীবনের অনেকটা সময় আমরা কাটাই এ ভেবে যে, শান্তি খুঁজছি, বা অর্থ, বা কাউকে, বা সাফল্য, বা এমন কোনো ব্যাখ্যা, যা শুনলে সব ঠিক জায়গায় বসে যাবে। কিন্তু এসবের নিচে হয়তো আরেকটা খোঁজ আছে—নিজের ভেতরের সেই জায়গার খোঁজ, যেখানে প্রিয়তম সবসময় ছিল। ওপরে নয়, অন্য দেশে নয়, অন্য জীবনে নয়। শ্বাসে, শোকে, কোমলতায়, অস্তিত্বের একদম মাঝখানে। সেখানে যেতে হলে ছুটে চলা থামাতে হবে। হাত বাড়ানো বন্ধ করতে হবে। ভেতরে ফিরতে হবে, জোর করে নয়, শ্রদ্ধায়, যেমন মন্দিরে ঢুকলে জুতো খোলো, তেমন করে।

হৃদয় শুধু অনুভূতির পাত্র নয়। এ আশ্রয়। এখানে কৃতজ্ঞতা আর দুঃখ পাশাপাশি বসে, আশা আর ক্ষত মিশে যায়, স্মৃতি আর আকাঙ্ক্ষা একই ছাদের নিচে থাকে। এই আশ্রয়ে ঢুকতে হলে খালি পায়ে ঢুকতে হয়, ভান ছাড়া, অধিকার দেখানো ছাড়া, পবিত্র জিনিসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বলে যে-অহংকার, তা ছাড়া। এখানে ভঙ্গুরতা দুর্বলতা নয়, দরজা। ক্ষমা সাজসজ্জা নয়, জরুরি। কারণ হৃদয়কে বাঁচাতে তুমি যে-দেয়াল তুলেছ, সেই দেয়াল ব্যথাকে বাইরে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসার পথও বন্ধ করে দিয়েছে। যে-বর্ম তোমাকে রক্ষা করেছে, সেই বর্মই তোমাকে বন্দিও করেছে।

প্রিয়তম জোর করে ঢোকে না, ভাঙচুর করে না, তালা ভাঙে না। অপেক্ষা করে। নরম হওয়ার জন্য। সম্মতির জন্য। সেই মুহূর্তের জন্য, যখন চোখের জল নিয়ন্ত্রণের তাগিদের চেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে, যখন আত্মসমর্পণ অভিনয়ের চেয়ে সত্য হয়ে ওঠে, যখন আত্মা ভান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে শেষপর্যন্ত খোলা থাকা বা হওয়াকে বেছে নেয়, না পেরে নয়, বরং তার চেয়ে ভালো কিছু না থাকায়। ভালোবাসা হয়তো প্রথমে আসে ঝলক হিসেবে। কারণহীন একটা স্থিরতা, তুমি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছ, আর হঠাৎ সব ঠিক লাগছে; কেন, জানো না। অনিশ্চয়তার মধ্যে শান্তি। শরীরের সামর্থ্যের চেয়েও গভীর শ্বাস। একটা কোমলতা, যা এসে থেকে যায়, চায়ের মতো, ধীরে ঠান্ডা হলেও উষ্ণতার ছাপ থাকে। তুমি তাকে যুক্তিতে চেনো না, স্বীকৃতিতে চেনো। মনে হয়, হারিয়ে-যাওয়া বাড়ি আবার মনে পড়েছে। মনে হয়, নিঃশব্দ একটা 'হ্যাঁ'।

তুমি যত ছেড়ে দাও, ভালোবাসা তত কম-ঘটা কোনো ঘটনা হিসেবে থাকে আর তত বেশি এই মুহূর্তের একটা অবস্থা হয়ে ওঠে। চলাফেরা বদলায়—কম আঁকড়ানো, কম রক্ষণাত্মক। নিজেকে পূর্ণ করার জন্য পৃথিবীর ওপর কম নির্ভরশীল। ভালোবাসা কোনো কিছু পাবার চিন্তায় কম আচ্ছন্ন, ভালোবাসা নিজেকে ছড়ানোর জন্য বেশি উন্মুক্ত। জীবন ওতে সহজ হয়ে যায় না—বিল আসে, মানুষ অসুস্থ হয়, সম্পর্ক জটিল থাকে, কিন্তু তুমি জীবনকে আর এত নির্মমভাবে ভাগ করো না: এটা ভালো, ওটা খারাপ, এটা আমার প্রাপ্য, ওটা অন্যায়। তুমি জীবনের কাছে আর এমন দাবি করো না, যেন সে তোমাকে এমন কিছু দিক, যার বীজ ইতিমধ্যেই তোমার ভেতরে আছে। নিজের ভেতরের সমগ্রতা মনে পড়ে, আর তাই অনুসন্ধান আর আগের মতো মরিয়া থাকে না, কিংবা থাকেও, তবে তাকে ‘মরিয়া’ নামে ডাকা যায় না।

তখন পৃথিবী নিজেই অন্যরকম দেখায়। ছোটো ছোটো জায়গায় পবিত্রতা চোখে পড়ে—শোকে, অপেক্ষায়, অপরিচিত কারও মুখের ভাঁজে, বাসে জানালার পাশে-বসা বৃদ্ধের চোখে। সেই ব্যথাতেও, যা এখনও রয়ে গেছে, কারণ সে এখনও তোমাকে কোমলতা শেখাচ্ছে, এখনও তোমাকে কোমল করছে সেসব জায়গায়, যেখানে তুমি শক্ত হয়ে গিয়েছিলে। কষ্টও তার অন্য একটা মুখ দেখাতে শুরু করে, কখনোবা মনে হয়, এ এক কঠোরতার পোশাক-পরা ভালোবাসা। ভোগ হিসেবে নয়, রূপান্তর হিসেবে।

এভাবে বাঁচা অহমের হিসেবে বড়ো হওয়া নয়। বরং উলটো, আত্মগরিমা থেকে ফাঁকা হওয়া। আরও স্বচ্ছ হওয়া, যেন কাচের মতো, আলো পেরিয়ে যেতে পারে। নিজেকে আর প্রতিমুহূর্তে প্রমাণ করতে হয় না। প্রতিটি প্রতিচ্ছবি রক্ষা করতে হয় না। প্রতিটি পথের সাথে নিজেরটা তুলনা করতে হয় না। প্রতিটি ক্ষতকে পরিচয়পত্র বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে ঘুরতে হয় না। দুর্গের মতো কম হয়ে ওঠো, পাত্রের মতো বেশি। স্মৃতিস্তম্ভ কম, জানালা বেশি। যা আরও স্বচ্ছ হতে আপত্তি করে না, ভালোবাসা তার ভেতর দিয়ে অনায়াসে যাতায়াত করে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। একবার জেগে উঠলে ভালোবাসা ধ্যানের কোণে চিরকাল লুকিয়ে থাকতে চায় না। সে দেহ চায়, চায় হাত, ভাষা, দৃষ্টি, ধৈর্য, সাহস। সে চায় রোজকার জীবনের বাজারে ঢুকতে, হট্টগোলের মধ্যে, দরদামের মধ্যে, ঠেলাঠেলির মধ্যে। কার‌ও কথা শোনার ভঙ্গিটুকু হতে চায়, রাগের মুহূর্তে সংযম হতে চায়, কঠোর পৃথিবীতে একটুখানি কোমলতা হতে চায়। সে বাঁচতে চায়—বাস্তবে, হাতেকলমে, দিনের পর দিন, ঘামে আর ধুলোয়।

তাই পথ আবার ফেরে সমন্বয়ের দিকে। যে-একাকিত্ব ক্ষত সারায়, তাকে এখন মানুষের মাঝে স্থিরতা হয়ে উঠতে হবে। যে-শূন্যতা উন্মুক্ত করে, তাকে কাজের মধ্যে বিনয় হতে হবে। যে-উপস্থিতি ভেতরে জেগেছে, তাকে বাসন মাজায়, যানজটে, শোকে, আড্ডায়, মতভেদে, যত্নে, সব জায়গায় সঙ্গে থাকতে হবে। যে-ভালোবাসা নীরবতায় দেখা দিয়েছে, তাকে এখন তোমার বাঁচার ভঙ্গিতে প্রকাশ পেতে হবে। পবিত্রতা আলাদা বাক্সে রেখে দেবার কিছু নয়, সাধারণের মধ্যে মিশিয়ে দেবার বস্তু, যেমন চিনি চায়ে মেশে, আলাদা করে দেখা যায় না, কিন্তু স্বাদটা থাকে।

এভাবে বাঁচতে হলে ধীর হতে হয়, এতটাই ধীর যে, আলাদা করে লক্ষ করা যায়। বলার চেয়ে বেশি শুনতে হয়। নিজের মানবিকতাকে আর অন্যের মানবিকতাকে একটু বেশি জায়গা দিয়ে ধরতে হয়। শুধু মন্দিরে বা মসজিদে বা গির্জায় নয়, দোরগোড়ায়, রান্নাঘরে, ক্লান্তিতে, হতাশায়, আনন্দে, প্রতিদিনের শ্রমে পবিত্রতা দেখতে হয়। ঝড়ের মাঝখানে নিঃশব্দ কেন্দ্র হওয়ার চেষ্টা, ভেতরের সবচেয়ে সত্য জিনিসটাকে ঘোষণায় নয়, উপস্থিতির মাধ্যমে কথা বলতে দেওয়া। তুমি কীভাবে হাঁটো, দেখো, সাড়া দাও, ভালোবাসো, এসবের মধ্য দিয়ে।

তাই এ যেন শুধু সুন্দর কথা হয়ে না থাকে। এ প্রতিজ্ঞা হয়ে উঠুক। প্রতিদিনই ফেরার শান্ত প্রতিজ্ঞা। শ্বাসে ফেরা, নীরবতায় ফেরা, সেই ভেতরের ঘরে ফেরা, যেখানে অভিনয়ের দরকার নেই। একাকিত্ব হোক শক্তি। স্থিরতা হোক অন্তর্দৃষ্টি। হৃদয় হয়ে উঠুক দরজা। আর যদি ভুলে যাও, যেমন সব মানুষই ভোলে, তাহলে লজ্জায় নুয়ে যাওয়া নয়, নিজের কাছেই ফিরে এসো আগে। সেই উপস্থিতির কাছে, যে আসলে কোনোদিন যায়নি। সব নামের নিচে-থাকা সেই চুপচাপ সত্তার কাছে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *